বাংলার দুর্গাপুজোকে হেরিটেজ স্বীকৃতি দিয়েছিল ইউনেস্কো। এই স্বীকৃতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আজ প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার রাস্তায় মিছিলে হাঁটলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত কাল-ই নবান্ন থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘দল, মত, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে ঢাকের তালে পা মেলান কাল, সকলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। এবারে আমাদের দুর্গোৎসব ১ মাস আগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, এদিন দুপুর ১টার মধ্যেই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সামনে কলকাতা, হাওড়া ও সল্টলেক থেকে বিভিন্ন ক্লাব ও পুজোকমিটি বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করে হাজির হয়। তার পর ঠিক দুটো বাজার দশ মিনিট আগেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, শশী পাঁজা, অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রীমা ভট্টাচার্য সহ একাধিক ব্যক্তিবর্গ ও বিশিষ্টজন মিছিল শুরু করেন। সঙ্গে চলে মনোরম শোভাযাত্রা।

রেড রোডে মিছিল এসে পোঁছায় প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরে। সেখানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী, তপতী গুহ ঠাকুরতা, ইউনেস্কোর প্রতিনিধি দল সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ।মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গবেষক তপতী গুহঠাকুরতাকে সম্বর্ধনা জানিয়ে ধন্যবান জ্ঞাপন করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তপতীদেবী জানান, ‘এটা আমার একার স্বীকৃতি নয়। সোশাল মিডিয়ায় যে গল্প চলছে তা সত্য নয়। মুখ্যমন্ত্রী আমার স্বীকৃতি কেড়ে নেননি।’

কলকাতা পুরসভার ১ থেকে ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা এই মিছিলে হেঁটেছেন। তাছাড়া দক্ষিণ কলকাতারও বহু ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও জনগণ মিছিলে আসেন। কখনো রোদ ঝলমলে আকাশ আবার কখনো বৃষ্টির জল মাথায় নিয়ে নানান সজ্জায় সজ্জিত হয়ে মিছিলে একাধিক মানুষ এগিয়ে চলে। কোথাও বাজে ধামসা-মাদল, কোথাও শোনা যায় শাঁকের ধ্বনি আবার কোথাও ভেসে আসে ব্যান্ডের আওয়াজ। এছাড়া রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাজছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ও সুরে দুর্গাপুজোর গান। মূলত গত কাল রাত থেকেই কলকাতা সেজে উঠেছিল নানা রঙের আলোয়। আকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ জানান দিচ্ছিল ‘মা দুর্গা আসছেন’।

ব্যস্ততা দেখা গিয়েছিল পুজো কর্মকর্তাদের। এঁদের মধ্যে বাদ পড়েননি, মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, সুজিত বোস, বিধায়ক তথা পুরসভার মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ফিরহাদ হাকিম জানান, এই বছর কলা পাতা দিয়ে চেতলা অগ্রণী ক্লাবের মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে। সেই ক্লাব থেকে আসা মানুষজন সবুজ রঙের পোষাক পড়েছিলেন। সাংসদ তথা কলকাতা পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায় জানান, ‘আজকের এই মিছিলের কোনো তুলনা হয় না। দুর্গাপুজোর এই স্বীকৃতি পশ্চিমবঙ্গের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করল। দুর্গাপুজো মানে শুধু ঠাকুর দেখা, বা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে নতুন জামা-কাপড় পড়ে ভিড় নয়, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে এ রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। কুমোর, ঢাকি, ফুল বিক্রেতা, প্যান্ডের প্রস্তুত কারক, পুরোহিত — প্রভৃতি পেশার বহু মানুষের সারা বছরের রুজি-রুটি এই পুজোকে কেন্দ্র করে আবর্তীত হয়। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ করোনা কালেও তিনি পুজো উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি দুর্গোৎসবের জন্য।

আজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকলকে পাশে নিয়ে এই আনন্দের সূচনা করলেন।’ বিধায়ক দেবাশিস কুমার জানান, ‘আজকে এক ঐতিহাসিক মিছিল হয়েছে। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি কলকাতার মানুষ স্বত:স্ফূর্ত ভাবে গ্রহণ করেছেন। কোনো রাজনৈতিক রং ছাড়া সাধারণ মানুষকে নিয়ে এই রকম মহা মিছিল শহর কলকাতায় আগে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এক ঐতিহাসিক ক্ষণের সাক্ষী থাকল কলকাতা।’ স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগছে কত জন মানুষ আজ উপস্থিত ছিলেন মিছিলে? সংখ্যা তত্ত্বের চুল-চেড়া বিচারে না গিয়ে মিছিলের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলা যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রেড রোডে পোঁছেছেন, তখনও মিছিলের শেষাংশ জোড়াসাঁকোর চৌহদ্দি পার করেনি। চারিদিকে দিকে দেখা গেছে শুধু কালো মাথার বিন্যাস।