কৃষ্ণনগর মৃৎশিল্পের জন্য জগৎবিখ্যাত। মৃৎশিল্পের উৎপত্তি, কারুকলা ভারত তথা বহির্বিশ্বের কাছে আজও অধরা, আজও বিস্ময়। একজন মৃৎশিল্পীরা মেয়ে হিসাবে নিজেকে অত্যন্ত গর্বিত বলে মনে হয় যখন শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় সেই মৃন্ময়ী মা যখন চিন্ময়ী রূপ ধারণ করেন। শিল্পীর শৈল্পিক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে দেবীর চিন্ময়ী আবাহনে, দেবীর চক্ষুদানে। ঢাকের কাঁসর বাদ্যির তালে তালে, শিল্পীর তুলির টানে, কাশফুলের সুগন্ধে মাতোয়ারা শরৎ প্রকৃতিতে শুরু হয়ে যায় দেবীপক্ষের প্রারম্ভ। দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মৃৎশিল্পের সম্পর্ক অনেক অনেক গভীর। বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বহু বছর ধরেই মৃৎশিল্পের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। তবে তাদের মধ্যে কুমারটুলি, কৃষ্ণনগর, মঙ্গলকোট, দত্তপুকুর বিখ্যাত। আমার স্মৃতিতে দেবীপক্ষ এক বিশেষ স্মৃতিবেদনা আজও বয়ে নিয়ে যায়। প্রথম বাঙালি হিসাবে যিনি বিদেশের মাটিতে বসে ছয় বার তার অভিনব শিল্পসত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, আমার বাবা স্বর্গত নিমাই চন্দ্র পাল।

ছোটবেলা থেকেই দেখেছি কত শত প্রতিকূলতাকে জয় করে বাবা তাঁর অপরিসীম নিষ্ঠা ভক্তি দিয়ে কিভাবে তাঁর অভাবনীয় শিল্পসত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। পাটাতন থেকে শুরু করে বিচুলি বাঁধা, বিভিন্ন মাটির সংমিশ্রনে মৃন্ময়ী রূপের নিখুঁত প্রকাশ, একমেটে, দোমেটে পদ্ধতির মাধ্যমে মাটির কাজের সমাপন, সাথে সাথে এসে পরে রং তুলির এক অভিনব শৈল্পিক সাধনা। ছোটবেলা থেকে দেখতাম বাবা যখন মায়ের চক্ষুদান করছেন তখন পাড়া প্রতিবেশীর বেশ কিছু মানুষ, বাবার বন্ধুরা, চেনা অচেনা মুখ তথা কচিকাচাদের ভিড় এসে জমা হতো আমাদের পুরোনো কারখানায়। তাদের মুখে একটাই কথা শোনা যেত, নিমাইদার হাতের চোখের কোনো তুলনা হবে না, অপূর্ব।

দেখতাম শত ব্যস্ততার মধ্যেও, সময়ের এতটুকুও তোয়াক্কা না করে কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন, মশার কামড় খেয়েও কিভাবে তারা বাবাকে ঘিরে রয়েছে। দেখতাম কত রাত পার হয়ে যেত, দেবী পরিবারের নিখুঁত শাড়ী পড়ানো, সামনের ও পিছনের চুলের বৈচিত্র, ডাকের সাজের প্রতিমা, সোলার সাজের প্রতিমা, মাটির সাজের তথা ফাইবার গ্লাসের সাজে ভূষিতা দেবী দুর্গার ভিড় আমাদের সেই পুরোনো কারখানায়। কি অক্লান্ত পরিশ্রম, সাধনা, কাজের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পন থাকলে প্রতিমার পটচিত্রের মধ্যেও তাঁর বৈচিত্রের শোভা প্রকাশ পায়। বাবাকে দেখতাম কত ধৈর্য্য সহকারে শৈল্পিক নৈপুণ্যের সাথে একচালির দুর্গাপ্রতিমার পটচিত্রে বিভিন্ন দেবদেবীর কথা জলছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে। একচালির প্রতিমার সাথে সাথে বিভিন্ন art-এর দুর্গাপ্রতিমার রকমারি সজ্জা সমাবেশ ঘটতো। আঠা জাল দেওয়া, শাড়ীর পাড় আঁকা, চুল লাগানো, সাজ পড়ানোতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত বাবার সাথে সাথে সহকারী কাকুদেরও। এ বিষয়ে আমার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ধৈর্য্য আর সহযোগীতা এই কাজে এক বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে।
বাবার চক্ষুদানের বিশেষত্বই ছিল মূলতঃ দেবীপ্রতিমার সাবেকী টানা চোখের অপূর্ব নিদর্শন। সাথে সাথে থাকতো পুতুলমূর্তির মানবীয় অবয়বের অভিনব সৌন্দর্য্য যা বাংলার তথা ভারতবর্ষের নানান জায়গার মাটিতে ছাপ ফেলেছে। একজন বাঙালি হিসেবে গর্ব হয় যখন বাবা প্রথমবার ১৯৯৫ সালে Salem-এর Peabody Essex Museum-এ একচালির সাবেকি দুর্গাপ্রতিমাটি সুদূর আমেরিকার মাটিতে বসে প্রায় দেড় মাস ধরে সম্পন্ন করেছিলেন। Craft Coucil of West Bengal-এর সহযোগিতায় বাবা পাড়ি দেন বিদেশের মাটিতে। ডাকের সাজে ভূষিতা মা দুর্গার সাবেকি টানা চোখ, সাথে অপরূপ চালচিত্রের নানান পৌরাণিক কাহিনী, অপরূপ সজ্জায় সজ্জিত দেবী দুর্গার পরিবার তথা অসুর, সিংহ, বাহনের কারুকলা, যা পূজার শেষে museum-এ সংরক্ষিত ছিল ১/২ বছর ধরে।
২০০২ সালে Ireland-এর Cardiff-এ National Museum and Gallery তে এবং Scotland-এর Royal museum -এ বাবার করা দু-দুটি দুর্গাপ্রতিমা শুধু সেখানেই নয়, সমগ্র বাংলাতেই সাড়া ফেলে দেয়।
২০০৪ সালে আমেরিকার Hawai দ্বীপপুঞ্জের Honolulu Academy of Arts-এ বাবা আবারও আরেকটি দুর্গাপ্রতিমা বানিয়েছেন। সাবেকিয়ানায় ঘেরা, ডাকের সাজে বেনারসীতে আভূষিতা মা-এর অপরূপ সৌন্দর্যের ছবি দেখে আজও চোখে জল এসে যায়।

এরপর ২০০৬ সালে London-এর British Museum-এ গড়ে তোলা হয় আবারও বাংলার গৌরবময় মৃৎশিল্পের নিদর্শন। বঙ্গীয় হস্তশিল্প পরিষদ এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামের যৌথ উদ্যোগে লন্ডনে বসেই ২০ ফুটের একচালি সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা গড়েছিলেন বাবা ও সাথে দুই সহকারী। বাবার হাতের তৈরি সাবেকি দূর্গাপ্রতিমার কি অপরূপ মৃন্ময়ী রূপ, যা তৎকালীন British Museum-এর Curator Richard Blurton-এর তত্ত্বাবধানে ও Museum-এর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছিল, যা বাংলার কাছে এক বিস্ময়। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতেন ওঁরা, হয়তো চোখে ভাসছে বহুদূরের বাংলা। হোক না বাঁশ কাপড়ের প্যান্ডেলের বদলে মার্বেল পাথরের মেঝে আর কাঁচের দেওয়াল। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের “গ্রেট কোর্ট”-এ আলো করে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি তো মা দুর্গা-ই। সুদূর কলকাতা থেকে আসা বেনারসি শাড়ীতে সজ্জিতা, সালংকারা মা কে চিনে নিতে আর কারো বাকি নেই। সাগরপারের গুরুগম্ভীর সংগ্রহশালা হয়ে উঠেছে বিলেত প্রবাসী বাঙালিদের মিলনমেলা। তাই মিউজিয়ামের দ্বারে আজ ওঁদের সবার নিমন্ত্রণ। সম্মানিত অতিথির আসনে তখন ভারতীয় হাইকমিশনার কমলেশ শর্মা। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ডিরেক্টর Neil Macgregor-এর গলায়, অনুষ্ঠানের স্বাগত ভাষণে তিনি বললেন, “মিউজিয়ামের দেবী মূর্তির নির্মাণ এক বিরল প্রাপ্তি। যতদিন মূর্তি তৈরী হয়েছে, মানুষ আগ্রহ নিয়ে বার বার দেখতে এসেছেন নিমাই ও তাঁর সহযোগীদের কাজ।” এ প্রসঙ্গে বলি, বাবার কাছে শুনেছি, লন্ডনের টেমস নদীতে নানারকম বিধিনিষেধ মেনে দুর্গাপ্রতিমাটি বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। একচালির প্রতিমাটি বিরাট উঁচু হওয়ায় টেমস নদীতে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়ায় অসুবিধার সৃষ্টি হওয়ায় বাবা কতৃপক্ষকে বলে part by part প্রতিমা আলাদা করে সুন্দর ভাবে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন।
“ভয়েসেস অফ বেঙ্গল” মিউজিয়ামের এক বিশেষ প্রদর্শনীতে চলছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবির প্রদর্শনী। সিনেমা, গানবাজনা, ঢালাও ভুরিভোজ, সব মিলিয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যেন সাবেকি বাঙালিয়ানার আসর। আবেগভরা গলায় “ভয়েসেস অফ বেঙ্গল”-এর Richard Blurton বললেন — “প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। এরকম আগে কোনোদিন হয়নি, হয়তো আর হবেও না।

এরপর ২০০৭ সালে Australia-র The Art gallery of New South Wales-এ ছোঁয়া দেন বাংলার তথা ভারতের ঐতিহ্যের। বিদেশের মাটিতে এটিই ছিল বাবার গড়ে তোলা সর্বশেষ দুর্গাপ্রতিমা। সাবেকিয়ানা আর শৈল্পিক নৈপুণ্যে ভরা প্রতিমাটি মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিল।
প্রায় দিনই দেখতাম দেশ বিদেশ থেকে নানা সাংবাদিকের ভিড় জমতো আমাদের বাড়িতে, তা সে শেখার আকুতিতেই হোক বা সাক্ষাৎকারের জন্যই হোক। ছোট্টবেলা থেকে বিভিন্ন newspaper থেকে reporter দের আসতে দেখেছি। বিদেশ থেকে অনেক গবেষণারত ছেলেমেয়েদের আসতে দেখেছি। কত ধৈর্য্য সহকারে তারা ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে বাবার কাছে কত মণিমাণিক্য সম তথ্য আহরণ করে নিয়ে যেত। বিদেশের মাটিতে পা রাখা, বাবার হাতের কাজ, প্রতিমা তৈরিকে ঘিরে নানা ধরণের তথ্য news channel-এ দেখানো হত, সেই সাথে শুনতাম বাংলার সুনাম। বিদেশের নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিমা তৈরীর ২-৩ মাস আগে থেকেই দেখতাম সেখানকার মানুষ আসতো, কাজের বিবরণের জন্য নানারকম গবেষণা চলতো আমাদের কারখানায়। তারা নানা খুঁটিনাটি কাজের বিবরণগুলো নিয়ে যেতেন। তুলি, চেয়ারি, কাস্তে, দা, প্রতিমার বস্ত্র, ডাকের সাজ, চুল প্রভৃতি বাবা এখান থেকে নিয়ে যেতেন। আর এই সমস্ত কাজে বাবাকে সাহায্য করতেন এক সহকারী কাকু। তবে প্রতিমার মুখের ছাঁচ বাবা ওখানে বসেই বানাতেন। বিদেশ প্রকৃতির শক্ত বিচুলি দিয়ে নিখুঁত ভাবে গড়ে তোলা ওই প্রতিমা গুলোর গড়ন পিঠন ছিল যেন অনন্য সুন্দর। শুধু তাই নয়, প্রতিমার মাটি জোগাড় করতে হতো বিদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে। নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে পরম দয়ালের আশীর্বাদে বাবা সকল মানুষের মনে জয় করেছিলেন অকৃত্রিম ভালোবাসা।

যদিও দুর্ভাগ্যবশত এমন একজন গুণী শিল্পীকে আমরা সশরীরে ২০১৬ সালে হারিয়ে ফেলি। তবুও আজও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর অনন্য শিল্পসত্তায়, তাঁর স্বাতন্ত্রতায়, দেবীর সাবেকি চোখের টানে, সর্বোপরি তাঁর অচ্যুত কর্মনিষ্ঠায়, যা আজও বহমান হয়ে চলেছে তাঁরই গড়ে তোলা ছাত্রদের মধ্যে, যাদের তিনি ছোট্টবেলা তিল তিল করে শিখিয়েছেন এই মৃৎশিল্পের সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য। সুশীল পাল, তারক পাল প্রমুখ আজ তাঁর শেখানো পথেই এই শিল্পের কাজকে বিভিন্ন জায়গায় উপস্থাপিত করে চলেছেন। বাবার তৈরী প্রতিমার মুখের ছাঁচ বা প্রতিমার অবয়ব, রং তুলির কারুকার্যে, চক্ষুদান, সবকিছুর মধ্যে আজও আমার বাবার স্পর্শ বেঁচে রয়েছে।
লেখক শ্রীতমা চক্রবর্তী মৃৎশিল্পী নিমাই চন্দ্র পাল-এর একমাত্র কন্যা, কৃষ্ণনগর, নদীয়া।