২০০৮ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বারো কোটি মানুষ আটচল্লিশ হাজার সমবায় সমিতির সদস্য, যা সে দেশের জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ, কৃষিপণ্যের ত্রিশ শতাংশ চৌত্রিশ হাজার সমবায় সমিতির উৎপন্ন, সাড়ে ছয় হাজার আবাসন সমিতি দশ লক্ষ পরিবারের আশ্রয় দেয়, দুশো সত্তর দূরভাষ সমবায় বিশ লক্ষ বাড়িতে পরিষেবা দিয়ে থাকে, এক হাজার গ্রামীণ বিদ্যুৎ সমবায় সাড়ে তিন কোটি মানুষকে সুবিধা দেয়, আড়াইশো বাণিজ্যিক সমবায়ের ছাতার তলায় রয়েছে পঞ্চাশ হাজার ছোট ব্যবসায়ী, এক কোটি মানুষ কর্মচারী সমবায় সমিতির সদস্য, আট কোটি আমেরিকান সমবায় ঋণদান সমিতির সদস্য, তিনশো সমবায় উৎপাদন সংস্থা মাথা উঁচু করে চলছে।
অথচ তৃতীয় বিশ্বের কাছে মার্কিন মুলুক মানেই ধনতন্ত্র, মার্কিনদেশ মানেই যারা সমাজতন্ত্রকে ভুল প্রমাণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। যদিও আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনতন্ত্রের সমস্যা বা সাধারণ মানুষের ধনতন্ত্রে অনিশ্চয়তা নয় তবুও সাধারণ আমেরিকাবাসী যে ধনতন্ত্রকেই জীবনের ধ্রুবতারা, ইতিহাসের শেষ অধ্যায় বলে মেনে নেননি তার প্রমাণ এত সমবায় সমিতির অস্তিত্ব, এত সমবায় সমিতির সদস্যসংখ্যা।
আমেরিকার ইতিহাসের একটা দীর্ঘ সময় মানুষ স্বাধীন জীবিকাকেই অধিকতর সম্মানের মনে করত। ১৮০০ খৃষ্টাব্দে খুব কম শ্বেতাঙ্গ মানুষই অন্যের কর্মচারী ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পায়ন সেই চিত্রকে বদলে দেয়। ১৮৭০ এর গৃহযুদ্ধের পর দেশের অর্দ্ধেক জনসংখ্যা অন্যের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হয়। ১৯৪০-এ ৮০%, ২০০৭এ ৯২% অপরের অধীন কর্মী, মাত্র ৯% স্বনির্ভর।
কিন্তু খুব সহজে একে স্বাধীনচেতা মার্কিনীরা মেনে নেয়নি। দীর্ঘ ক্রীতদাসপ্রথার অভিজ্ঞতা থাকার জন্যই তাদের কাছে মজুরীশ্রমও প্রচ্ছন্ন ক্রীতদাসত্ব — wage slavery, ১৮৩৬ সালে লোয়েলের মিলশ্রমিক মহিলারা প্রথম এই ঘোষণা করেছিল। ১৮৮০ সালে নাইটস অফ লেবার আন্দোলনের নেতা টেরেন্স পাওডারলির কথা থেকেই তা ফুটে ওঠে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক আন্দোলনের একটি দিক ছিল সমবায় গড়ে তোলা। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যে সমাজ গড়ে ওঠে তাতে শ্রমিকের বিশেষ স্বাধীনতা ছিল না। সম্পত্তি না থাকায় তাদের ভোটাধিকার ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রামে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছিল আর তার ভার বহন করতে হচ্ছিল ক্রীতদাস আর শ্রমিকদের, যাদের প্রকৃত অবস্থা ক্রীতদাসদের চেয়ে খুব বেশী ভাল ছিল না। কাজের সময় ছিল সপ্তাহে ৭৫ ঘন্টা, শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠন, ধর্মঘট সবই আইনের চোখে ছিল অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। সেই সময় ফিলাডেলফিয়ার জুতো প্রস্তুতকারক শ্রমিকরা পিটার পলিন ও আনড্রিয়েল বেকসের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়, ধর্মঘট ডাকে এবং নিজেদের সমবায় গঠন করে। সে সময় শ্রমিকদের গুপ্ত সংগঠনের চরিত্র ছিল ত্রিধারায়, অধিক মজুরীর আন্দোলন একদিকে, নিজের অর্থ একত্রিত করে ধর্মঘটের দিনগুলোতে পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তি করা আর অন্য দিকে মালিকের ক্ষমতার বাইরে স্বাধীন উৎপাদন শুরু করে মজুরীশ্রম থেকে চিরদিনের মত মুক্ত হওয়ার চেষ্টা। শুধু ফিলাডেলফিয়া নয়, বোস্টনের দর্জিরা, নিউইয়র্কের মেয়ে শ্রমিকরা, বাল্টিমোরের শ্রমিকরা প্রত্যেকেই কারখানা মালিকদের সাথে তীব্র শ্রেণীদ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং প্রত্যেকেই সমবায় গঠন করে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ এবং স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে।
যে আদর্শে আমেরিকার অভিবাসীরা ইওরোপ ছেড়েছিল, রাজতন্ত্রকে পেছনে ফেলে মুক্ত পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল সেই আদর্শই সংগ্রামী শ্রমিকদের প্রেরণা যোগান অন্যের অধীনে, অন্যের নির্দেশে গোলামী করার চেয়ে স্বাধীন সমবায় গঠনের। তাই শুধুমাত্র ধর্মঘটী শ্রমিক নয়, সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যেও সমবায় গঠনের আগ্রহ দেখা দেয় এই সময়ে।
একথা মনে রাখা দরকার আমেরিকার নতুন উপনিবেশ হিসেবে গড়ে ওঠার চরিত্রের মধ্যে সমবায়ের বীজ লুকিয়েছিল।

রেড ইন্ডিয়ান সমাজ ছিল এক সমবায়ভিত্তিক সমাজ। এক বৃহৎ পরিবার, তাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু ছিল না, চাষ বা শিকারের সরঞ্জাম ছিল সেই বৃহৎ পরিবারের সম্পত্তি। ঋতু অনুসারে শিকার ও স্বাভাবিকভাবে জন্মানো শস্যের যোগান বাড়ে কমে, তাই ইনুইট বা শোশোন উপজাতি অনেক সময় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যেত, কিন্তু বছরের নির্দিষ্ট সময়ে আবার তারা মাতৃসমাজে ফিরে আসত বৃহৎ পরিবারের ঐক্যের জয়গান গাইতে। এর পেছনে রয়েছে জীবনসংগ্রাম। সফল শিকার কখনো একা করা যায় না। যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে শিকার করতে পারে। যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় বা জাপানে দেখেছি সমুদ্র ঘেরা দ্বীপে চারিদিকে পাথরের প্রাকার না তুলে দিয়ে প্রতিটি জোয়ারভাটায় শস্যক্ষেত্র ধুয়েমুছে যায় বলে গ্রামসমাজ যৌথ উদ্যোগে সেই প্রাকার তোলে এবং কৃষিকাজ করে, তেমনই। ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীতে ওই শিকার ভাগও হত সমবন্টনের নিয়মে, যাদের শিকার ধরার জাল ছিল না, পরিবারে সক্ষম পুরুষ ছিল না তারা অংশ নিত অন্যান্য কাজে। সমবায় ও যৌথ উদ্যোগ ছিল পুয়েব্লো, হুপা, ইউরক, টিলামুক, চিনুকদের অর্থনীতি ও সমাজের ভিত্তি।
ইরোকিদের মধ্যে এই সমবায়প্রথা রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শাচেমদের সভায় প্রতিটি গোষ্ঠীর মহিলা প্রধানরা গোষ্ঠী থেকে একজন পুরুষকে নির্বাচিত করে পাঠাত, যারা সিদ্ধান্ত নিত সমবেতভাবে।
আজও আমেরিকার ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীগুলি পশুপালন করে একধরনের সমবায়ের মাধ্যমে, যদিও তাতে সদস্যদের ব্যক্তিগত পশু থাকে। একজন মহিলা প্রধানকে কেন্দ্র করে জীবনযাপন করে বৃহত্তর পরিবার।
ইওরোপ থেকে আসা অভিবাসীকে নতুন উপনিবেশের মন্ত্রও ছিল সমবায়, যদিও তা শ্বেতাঙ্গদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন ও অচেনা, কুমারী জল জমি জঙ্গলে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে গেলে এছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। নিজের নতুন অর্থনীতি, নতুন সমাজ গড়ে ওঠে কোন রাজতন্ত্র ছাড়া, সরকার ছাড়া। গোষ্ঠীর নিজস্ব সংগঠনই ছিল প্রথম ঔপনিবেশিকদের প্রধান শক্তি। জমির বন্টনও হত দশটির মত পরিবারকে একসাথে যৌথ মালিকানাধীন হিসেবে। মেক্সিকান ইন্ডিয়ানরাও অনেক সময় স্প্যানিশ অভিবাসীদের থেকে জমি পেত, দীর্ঘ সময় অভিবাসী ও মেক্সিকানদের পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল। ১৮৪৮-এর মার্কিন মেক্সিকো সংঘাতের পর সে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।
ইংল্যান্ড থেকে আসা অভিবাসী বা তীর্থযাত্রীদের প্রাথমিক সমাজ ছিল কমিউন, পরে তা সমবায়ের রূপ নেয়। মে ফ্লাওয়ার জাহাজে বাঁধা শ্রমিকদের বিদ্রোহ থেকে এর সূত্রপাত, মার্কিন গণতন্ত্রেরও বীজ এই বিদ্রোহ। কিন্তু অভিবাসন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমি অতিচাহিদার পণ্যে পরিণত হয়। ব্রিটিশ কর্পোরেশনগুলি সমবায়ের যে বীজ আদিপিতারা বপন করেছিল তাকে নষ্ট করে দেয়। একই সাথে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের বিদ্রোহগুলিও জন্ম নিচ্ছিল, জন্ম নিচ্ছিল শ্রমিকদের পারস্পরিক সহায়তার সংগঠন ও সমবায়। এই সময়ে আড়াইশোরও বেশী শ্রমিক বিদ্রোহ এমন কি বেশ গেরিলা সংঘর্ষের ঘটনা ইতিহাসে নথিভুক্ত আছে।

১৭৩১ খৃষ্টাব্দে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন তার বন্ধুদের নিয়ে একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন, প্রত্যেক সদস্যের চাঁদা ছিল চল্লিশ শিলিঙ করে।
ফ্রাঙ্কলিন ১৭৩৬ খৃষ্টাব্দে গড়ে তোলেন একটি অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা, ইউনিয়ন ফায়ার কোম্পানি। ১৭৫০ সালে ওই কোম্পানি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির বীমার ব্যবস্থাও করে। এর থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে গড়ে ওঠে আরও বহু সমগোত্রীয় সংস্থা, যারা ১৭৫২ সালে ফিলাডেলফিয়ায় একটি বৃহৎ সমবায়ধর্মী সংস্থা গড়ে তোলে নিজেরা একত্রিত হয়ে। অন্যান্য সমবায়ের কাছে এই সংস্থা একটি আদর্শস্বরূপ, আজও এটি বেঁচে আছে।
অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের মধ্যেও গড়ে উঠেছিল সমবায়, মূলত চার্চকে কেন্দ্র করে, ১৭৮৩ সালে গড়ে ওঠা নিউ অর্লিয়েন্সের পার্সিভারেন্স বেনিফিট ও মিউচুয়াল এড অ্যাসোসিয়েশন, ১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়াতে পাদ্রী রিচার্ড অ্যালেন ও আবসালোম জোনসের ফ্রি আফ্রিকান সোসাইটি বিশেষ ভাবে খ্যাত। আজকের জ্যাজ সঙ্গীতের জন্ম এই সমিতিগুলোর আয়োজিত শোকসঙ্গীতের মধ্যে থেকে।
আমেরিকার এই সমিতিগুলোর সাফল্য দেখে টোকেভিল লিখেছিলেন ‘পৃথিবীর আর কোনো দেশে যৌথতার নীতির এত সফল ও বহুল প্রসার ঘটেনি যা আমেরিকায় ঘটেছে’।
শুধুমাত্র অর্থনীতি নয়, মিউচুয়াল এড সংগঠনগুলি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, মৃত্যুজনিত ঘটনায় সদস্য পরিবারগুলির পাশে এসে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করেছিল।
এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নিয়ে মার্কিনীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছিল। শুধু ব্রিটিশ সরকার নয়, তাদের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল মার্কিন ধনপতি ও জমিদারশ্রেনীও।
সে সময় স্বাধীনতাকামী মার্কিনীদের আদর্শ ছিল ইরোকিদের যুথবদ্ধ সমাজ। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৫৪ সালে এই মর্মে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। টমাস পেইন ইরোকিদের সংগঠনের সমতুল্য শ্বেতাঙ্গ সমবায় রাষ্ট্রগঠনের ডাক দেন এবং একথা ভুললে চলবে না ইন্ডিয়ানদের ওপর অত্যাচারের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন, তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ক্রীতদাসপ্রথা রদ করার আহ্বান জানান, ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা নামটিও তারই দেওয়া।
স্বাধীনতার পর যখন দেখা গেল মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা বিত্তশালীর হাতেই রয়ে গেছে টম পেইন তার বিরুদ্ধেও কলম ধরেন এবং সকলের জন্য এক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ডাক দেন, তাতেও সমবায় ভিত্তিক পরিকল্পনা ছিল।
অন্যদিকে শ্রমিক ও সাম্যবাদী ভ্রাতৃত্ব নানান সংগঠন গড়ে তোলে, সানস অফ লিবার্টি, ইলিউমিনেত্তি, ফ্রি মেশনস। এদের সমবেত প্রয়াসে জেফারসন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন, আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়, গণতন্ত্রের খানিক সুবাতাস বইতে থাকে।
স্বাধীন দেশের নির্যাতিত শ্রমিকরা যখন ধর্মঘটের দিনগুলোতে সমবায়ের তাৎপর্য বুঝতে পারছে তখন ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ভয়াবহ শোষণে স্বনির্ভর ও স্বাধীন কারিগররাও খুঁজে পাচ্ছে সমবায়ের সুফল। ভুললে চলবে না জেফারসন লিখেছিলেন ‘সেনাবাহিনীর চেয়েও ব্যাঙ্ক মারাত্বক’। কারিগরদের এই সমবায়গুলি একসাথে কাঁচামাল কিনতে পারে, মধ্যস্বত্বভোগীকে বাদ দিয়েই বিক্রিও করতে পারে। বাল্টিমোর, পিটসবার্গ, মাসাচুসেটসে এমন সমবায় গড়ে ওঠে।

১৮১৯-২২ সালের প্রথম আমেরিকান অর্থনৈতিক সমস্যার সময় কর্নেলিয়াস ব্লাটশ্লি ওয়েনের ভাবনার অনুসারী হয়ে সমবায় সমাজের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার স্থাপনের কথা লিখেছিলেন। অন্যদিকে লংডন বাইলেসবি লিখেছিলেন উৎপাদনমুখী সমবায় সমিতির কথা যার স্থানীয়, আঞ্চলিক, রাজ্যভিত্তিক ও দেশভিত্তিক ফেডারেশন থাকবে এবং সমস্ত শ্রমিক এদের সদস্য হবে।
শ্রমিকদের শিল্প সমবায়ের পাশাপাশি গড়ে ওঠে ভোক্তা সমবায় সমিতি যার উদ্দেশ্য ছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা যাতে বাজারের চেয়ে কম দামে দরিদ্র মানুষ পন্য পেতে পারে। এই ভোক্তা সমবায়গুলি রবার্ট ওয়েনের আদর্শ ও রচডেল সমবায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। রচডেল সমবায়ের পেছনেও রয়েছে শ্রমিক আন্দোলন আর ধর্মঘট।
একই আদর্শে খানিক অন্যভাবে গড়ে ওঠে জোশিয়া ওয়ারেনের টাইম স্টোর। সিনসিনাত্তির এই দোকানটি সমবায় ছিল না। কিন্তু এখানে উৎপাদক আর ভোক্তা টাকার ব্যবহার ছাড়া পণ্য লেনদেন করতে পারত, লেনদেনের ভিত্তি ছিল পণ্যে নিহিত শ্রমসময়। লেনদেনে যখন শ্রমসময় ব্যবহার অসম্ভব মনে হত টাকা বা সোনার পরিবর্তে শস্যকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ধরা হত।
ওয়ারেনের আদর্শে নানান শহরে শ্রমিক সংগঠন বিনিময় প্রথা চালু করে, প্রডিউসার এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন। এছাড়াও প্রতিটি শ্রমিক মহল্লাতেই কোনো না কোনো সমবায় সমিতি গড়ে ওঠে যার উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে যাওয়া।
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত কোনো না কোনো সমবায় সমিতি গড়ে উঠেছে পুঁজিবাদের আক্রমণকে অতিক্রম করার জন্য। কখনো শ্রমিকদের শিল্প সমবায়, কখনো বাণিজ্যিক সমবায়, কখনো আবার আবাসন সমিতি। একই সাথে পুঁজিবাদের আক্রমণ তীব্র হয়েছে। সমবায়ের নেতাদের ধরপাকড়, অসাধু বাণিজ্যিক পথ নেওয়া, সমবায়ের গায়ে ষড়যন্ত্রী, নৈরাজ্যবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী, ধর্মবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া। তার মধ্যেই সমবায় তার গণতন্ত্রের কথা বলে গেছে, মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে সমবায়ে, সমবায় পরিচালনায়, নেতৃত্বে, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, সাম্প্রদায়িক বৈষম্য, শেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বিভাজন, দাসপ্রথা আর ইন্ডিয়ানদের ওপর অত্যাচারের নিন্দা করেছে। পুঁজির বিচিত্র গতিতে কর্মচ্যুত শ্রমিকদের জন্য সমবায় খুলে কীভাবে সমবায় ব্যবস্থা বেকারত্বের সমস্যাকে মোকাবিলা করতে পারে তা প্রমাণ করেছে। মার্কিনী গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে এইসব আন্দোলন আর সমবায়ের হাত ধরে। অভিবাসী আর গৃহযুদ্ধের মূল আদর্শ ছিল সমবায় ভাবনায়।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকান অর্থনীতিতে গড়ে ওঠে কর্পোরেশন। বিপুল বিকাশ পেতে থাকে বৃহদায়তন জটিল যন্ত্র আর কারখানা ব্যবস্থা। অন্যদিকে গড়ে ওঠে প্রভূত অর্থশালী ব্যাঙ্ক। শ্রমিক সমবায়গুলির এই নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত কোন সম্বলই ছিল না। রাজনৈতিক শক্তিও তাদের ছিল না। বরং অনেকক্ষেত্রে শাসক গোষ্ঠী নতুন সমবায়কে আইনী স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। যদিও লিঙ্কনের মত দূরদর্শী নেতা বুঝেছিলেন কী ভয়ানক আকার নিতে পারে এই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
I see in the near future a crisis approaching that unnerves me and causes me to tremble for the safety of my country… Cor-porations have been enthroned, an era of corruption in high places will follow, and the money power of the country will endeavor to prolong its reign by working upon the prejudices of the people until the wealth is aggregated in a few hands and the Republic is destroyed.
গৃহযুদ্ধ পরবর্তী কর্মহীনতা, দারিদ্র, আর্থিক ধ্বস ও অনিশ্চয়তা শ্রমিকশ্রেণীকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করায় যে that in cooperation we recognize a sure and lasting remedy for the abuses of the present industrial system.
জাতীয় শ্রমিক ইউনিয়ন, গ্রিনব্যাক আন্দোলন, গ্রাঞ্জ, কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক সংগঠন, চেসপিক মেরিন রেলওয়ে, ড্রাই ডক কোম্পানি, নাইটস অফ সেন্ট ক্রিস্পিন, নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে গেছে শ্রমজীবী মানুষের সমবায় গড়ে তোলার কাজে।
পুঁজিপতিশ্রেণীও আক্রমণ চালিয়ে গেছে শ্রমিক ও শ্রমিকের সমবায়ের ওপর। কখনো তা অর্থনৈতিক, ঘৃণ্য বাজার দরের খেলা, কখনো রসদ আটকে দেওয়া, কখনো আবার হে মার্কেট কাণ্ডের পর যে সামাজিক আক্রমণ, ম্যাকার্থি নীতির সময় যে রাষ্ট্রীয় আক্রমণ তেমন। অ্যান্টি ট্রাস্ট আইন ব্যবহার করে সমবায় সমিতির দেশব্যাপী বিকাশকে ব্যহত করা হয়েছে।

আমাদের তৃতীয় বিশ্বের ধারণা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মানেই ধনতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা আর সকলের জন্য সমান সুযোগ। বাস্তবে তা নয়। আমেরিকার স্বাধীনতা আসলে ধনী আর কর্পোরেটদের জন্য, সুযোগও তাদের জন্যই। ধনতন্ত্রে গণতন্ত্র কখনোই ছিল না, কখনো হতেও পারে না। মজুরী দাসত্বে বাঁধা পড়া শ্রমিক, মধ্যবিত্তের কোনো স্বাধীনতা নেই, কোনো নিশ্চয়তাও নেই। তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে সমবায়, কখনো শ্রমিককে বিকল্প কর্মসংস্থান দিয়ে, কখনো বাজারের আক্রমণের মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে, কখনো আবার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, আবাসনের ব্যবস্থা করে। গ্র্যাঞ্জ, ফার্মার্স অ্যালায়েন্স, নাইটস অফ লেবার একই সাথে সমবায় এবং শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামী সংগঠন, ১৮৭৭ এর রেল ধর্মঘটে, সিয়াটেলের ১৯১৯ এর সাধারণ ধর্মঘটে, ১৯৩৪ এর সানফ্রান্সিসকো আন্দোলনে, ১৯৭৮ এর কয়লা শ্রমিকের আন্দোলনে সমবায় পাশে দাঁড়িয়েছিল।
আমাদের মনে রাখা দরকার ইওরোপের তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্র ভাবনার অনেক আগেই আমেরিকার শ্রমিক সংগঠন সমবায়ের কথা বলেছিল, ভেবেছিল ছোট সমবায় থেকে বড় সমবায়ের কনফেডারেশন গড়ে তোলা, স্বেচ্ছাসংযুক্তি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজ্য ব্যাপী, দেশব্যাপী এমন সমবায় গড়ে তোলা যার সদস্য হবে সবাই, কেউ কারো মালিক হবে না, কেউ কাউকে শোষণ করবে না।
মার্ক্স যখন তাঁর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন তার আগেই মার্কিন শ্রমিক হাতে কলমে সে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছে, মার্ক্সের সমাজতন্ত্র যদি কখনো বাস্তবায়িত হয় তা সমবায় ছাড়া অন্য কিছু হওয়া সম্ভব নয়, যেখানে পুঁজির ব্যক্তি মালিকানা থাকবে না, আমলাতন্ত্র থাকবে না। মার্ক্স যেখানে আলাদা তা ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে। পারী কমিউনের অভিজ্ঞতা থেকে মার্ক্স বুঝেছিলেন শ্রমিকশ্রেণীকে মুক্ত হতে দেবে না পুঁজিপতিরা। মার্কিন সমবায় নিজেও তা টের পেয়েছে প্রথম দিন থেকে। মার্ক্সের পুঁজি নিয়ে গবেষণা নিয়েও সমবায় একমত। একমত নয় পরবর্তীতে রুশ চীনের রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র (বা ধনতন্ত্র) নিয়ে যে রক্তাক্ত পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হয়েছে তাতে। রুশ চীনের সমাজতন্ত্র সমবায় নয়, স্বেচ্ছা সংগঠন নয়, গণতন্ত্র নয়। ওপর থেকে পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। এমনটা কিন্তু প্রথম শ্রমিক আন্তর্জাতিক ভাবেনি। মার্কিন সমবায় ঘনিষ্ট ভাবে ১৮৬৪-র প্রথম আন্তর্জাতিকের সাথে যুক্ত ছিল।
বিংশশতাব্দীর ধনতন্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে সহজসাধ্য নয়, তেমনি সে রাষ্ট্রশক্তিও ব্যবহার করে যখনই সাধারণ মানুষের কাছে তার বিত্ত, তার বিজ্ঞান হেরে যায়। মার্কিন সমবায় বিংশশতাব্দীতে জঙ্গী আন্দোলনের পথে আর হাঁটেনি। সাপিরো-নোর্স মডেলে মূলতঃ বাজারভিত্তিক সমবায় গড়ে তোলায় জোর দেওয়া হয় ধনতন্ত্রের নিয়মের মধ্যেই। সে পথে হেঁটে আজকের মার্কিন সমবায় অনেকটাই সফল, তার কথা প্রথমেই বলেছি। ইতিহাস ও অর্থনীতির চলনে কোনো একদিন হয়ত আদিপিতাদের স্বপ্ন সত্য হবে, আমেরিকাজুড়ে বিশ্বজুড়ে সমবায়ই একমাত্র অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হয়ে উঠবে।
বিবেক সেন, অ্যাডিশনাল রেজিস্ট্রার অফ কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার
ভালো আলোচনা।
আমাদের স্বপ্ন আমাদের দেশের গ্রামগুলিতে ছোট ছোট সমবায় উদ্যোগ হবে।যেখানে সকলে শ্রম দান করবে ,সকলে পুঁজি বিনিয়োগ করবে,পণ্য উৎপাদন ও বিপননে সমবায় ব্যাবস্থাপনা হবে মূল ভিত্তি ,সরকার সমবায়ের স্বাধীন পরিচালনায় হস্তক্ষেপ না করে সমবায় গঠনে যথার্থ শিক্ষা ও উৎসাহ প্রদান করবে একে স্বাবলম্বী করার জন্য ।সমবায়ের মাধ্যমে গ্রাম বিকাশ হলে যে নেতৃত্ব তৈরী হবে ,তারাই পরে দেশ গঠনের কারিগর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে ।