সেকালের এক তরজায় কলকাতার আট বাবুর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কুমারটুলির গোবিন্দরাম মিত্র সম্বন্ধে বলা হয়েছে, —
‘কালো দেশের কালো মানুষ কালো জমিদার
গোবিন্দরাম মিত্রি আনেন জুড়িগাড়ির বাহার।’
কলকাতার পুরনো কালের আর একটি ছড়াতে বলা হয়েছে, —
নন্দরামের ছড়ি
উমিচাঁদের দাড়ি
হুজুরিমলের কড়ি
আর গোবিন্দরামের গাড়ি।
কলকাতায় ঘোড়ায় টানা জুড়িগাড়ির প্রথম মালিক হিসেবে গোবিন্দরাম মিত্রর নাম স্মরণ করা হয়।
তিনি ব্রিটিশ শাসনের প্রথমদিকের একজন ভারতীয় আমলা ছিলেন। তিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি ও খরুচে স্বভাবের জন্যে প্রভূত খ্যাতিলাভ করেছিলেন। গোবিন্দরাম মিত্র বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর তথা চানক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সাবর্ণ রায়চৌধুরির পরিবারের কাছ থেকে কলিকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নামক তিনটি গ্রামের খাজনাস্বত্ব কিনে কলকাতায় জমিদারি বা প্রেসিডেন্সি গঠন করে। এরপর সেখান থেকে খাজনা আদায়ে ইংরেজ কালেক্টরকে সাহায্য করার জন্য একজন ভারতীয় ডেপুটি কালেক্টর নিয়োগ করা হয়। প্রথম ভারতীয় ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন নন্দরাম সেন। তারপরে দ্বিতীয় ভারতীয় ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন গোবিন্দরাম মিত্র। তাঁদের ব্ল্যাক ডেপুটি বলা হত। গোবিন্দরাম মিত্র ১৭২০ সাল থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। যদিও স্টপগ্যাপ ডেপুটি হিসেবে জগৎ দাস ও রামভদ্রের নাম পাওয়া যায়।গোবিন্দরাম মিত্র তার কর্মকালে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।
তিনি এতটাই ক্ষমতাশালী ছিলেন যে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তা জন জেফানিয়া হলওয়েল উপরি উপায়ের অভিযোগ এনেও তাঁকে পদ থেকে সরাতে পারেননি। অনেকেই তাঁকে ঘোড়াগাড়ি চালানো প্রথম বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। তিনি প্রচুর জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে পূজা-পার্বণ করতেন। তাঁর সময়ে দুর্গা প্রতিমাকে স্বর্ণ ও রৌপ্য পাতে মোড়া হত। তাঁর দুর্গার বৈশিষ্ট্য ছিল রামচন্দ্রের উপস্থিতি। এর পাশাপাশি দেবীর ভোগের জন্য তিরিশ থেকে পঞ্চাশ মন চাল ব্যবহার করা হত ও এক হাজার ব্রাহ্মণদের ভোজন করানো হত ও নানাবিধ উপহার দেওয়া হত। কুমারটুলিতে পঞ্চাশ বিঘে জমির ওপর তাঁর বিশাল অট্টালিকা ছিল। গ্রাম বাংলায় নন্দন বাগান নামে তাঁর একটি সুরম্য বাগানবাড়িও ছিল।
১৭৩১ সালে চিৎপুর রোডের পশ্চিম পারে কুমারটুলির কাছে তিনি একটি বিশাল নবরত্ন বা ন’চূড়া স্থাপত্যের কালী মন্দির নির্মাণ করান। এর ১৬৫ ফুট লম্বা চূড়া নাবিকদের নৌচালনায় সাহায্য করত বলে তারা একে প্যাগোডা বলত। জেমস বেইলি ফ্রেজারের আঁকা ছবিতে এই প্যাগোডার ছবি দেখা যায়। ১৭৩৭ সালে ভূমিকম্প ও ঝড়ের দরুন এটি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চূড়াটি ভেঙে পড়ে। পরে ১৮১৩ সালে এটি ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও রাধারমণ মিত্র তাঁর বই কলিকাতা-দর্পণে লিখেছেন, পঞ্চরত্নটি ধ্বংস হলেও তার পাশেই তৈরি নবরত্নটি এখনও টিকে আছে। বাগবাজারের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরের কাছে এই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।
১৭৫৭য় পলাশী যুদ্ধে জয়লাভের পর কলকাতার যে ব্যক্তিদের অর্থদান করে ১৯৫৬য় সিরাজদৌল্লার কলকাতা আক্রমণের সময় কলকাতা ছেড়ে না যাওয়ার জন্যে, তার সিংহভাগ অর্থ পেয়েছিলেন গোবিন্দরাম মিত্র। তাঁর বারোজন আশ্রিতকেও (তারমধ্যে তিনজন রক্ষিতা) অর্থ পাইয়ে দিয়েছিলেন নিজের প্রভাব খাটিয়ে।
গোবিন্দরাম মিত্রই কুমারটুলি নামের স্রষ্টা। তাঁর আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া ছিল। প্রত্যেক ঘোড়ার পেছনে একজন করে সহিস থাকত। সহিসদের শুদ্ধনাম কুমার। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ ও নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ-এ কুমার শব্দের অন্যতম প্রধান অর্থ দেওয়া হয়েছে ঘোড়ার সহিস। কলকাতায় যেমন কুমারটুলি, মুর্শিদাবাদের কান্দিতে তেমনি আছে সহিসপাড়া।

ব্ল্যাক প্যাগোডা
প্রাচীন কলকাতার ঘোড়ার সহিসদের কথা মনে পড়বেই। সহিসরা ঘোড়ার দেখাশোনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করে। কোচোয়ান বা কোচম্যানদের হাতে ঘোড়ারগাড়ির ঘোড়ার লাগাম থাকে। এক ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বা টাঙ্গা বলে। দুই ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে জুড়িগাড়ি বলে। সহিসদের কাজ হল হেঁটে হেঁটে ঘোড়ার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তাই তাদের অশ্ববারকও বলে। তাদেরই ভালো নাম হল কুমার।পুরনো কলকাতার বনেদিবাড়ির লোকজন জুড়িগাড়ি করে বেড়াতে বেরোত, সাহেবরাও তাই। সাধারণ মানুষ টমটম বা টাঙ্গা চড়তেই অভ্যস্ত ছিল। এছাড়া ব্রুহ্যাম, ল্যান্ডো, গিগ, কেরাঞ্চি, ছ্যাকড়া- নামের ঘোড়ার গাড়িও ছিল কলকাতায়। রাধারামণ মিত্র তাঁর বই ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, “সবরকম গাড়ির নিয়ম ছিল এক, ‘যতগুলো ঘোড়া, ততগুলো সইস’।”
কলকাতার সিমলার ছেলে বিলে তথা বালক স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড় হলে তিনি ঘোড়ার সহিস হবেন।
অবন ঠাকুর তো তাঁর লেখায় সমশের কোচোয়ান, রামু কোচোয়ান আর আক্কেল সহিসের কথা বারবার বলেছেন।
তবু যেন সহিসরা কাব্যে উপেক্ষিত।
উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবলগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। তবে ঘোড়াদের জল খাওয়ার বাঁধানো পাত্রগুলো রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে। গোবিন্দরাম মিত্রের ঘোড়ার ট্র্যাডিশন কুমারটুলিতে সমানে চলছে না আর।
গোবিন্দরামের পুত্র রঘু মিত্র নিজের নামে গঙ্গার ধারে একটি স্নানের ঘাট নির্মাণ করান (মতান্তরে গোবিন্দরাম স্বয়ং এটি নির্মাণ করিয়েছেন)। এটি পরবর্তীকালে বাগবাজার ঘাট নামে পরিচিত হয়। রঘু মিত্রের পৌত্র অভয়চরণ মিত্র ২৪ পরগনার কালেক্টরের দেওয়ান ছিলেন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুকে এক লক্ষ টাকা প্রদানের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। কুমারটুলিতে একটি রাস্তা তাঁর নামে রয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত জোড়াবাগান-এর নামকরণের নেপথ্যে এই অঞ্চলে গোবিন্দরাম মিত্র ও উমিচাঁদের দুটি বাগানবাড়ির উপস্থিতি।
গোবিন্দরামের জীবনকাল সম্বন্ধে অনেক বিভ্রান্তি আছে। কেউ কেউ তাঁকে চার্নকের আমলের লোক বললেও সেটা সত্যি নয়। কোম্পানির কাগজপত্রে ১৭৭৭ সালে তাঁর উল্লেখ আছে লবণব্যবসার অংশীদার হিসেবে। তাই মনে হয় জোব চার্নকের বেশ কয়েকবছর পর তিনি কলকাতায় আসেন।
তবে তিনি যে গোবিন্দপুর নামের কারণ নন, সেটা দিনের আলোর মত সত্য। আন্দুল রাজবাড়ির গোবিন্দশরণ দত্তের নাম থেকে এসেছিল গোবিন্দপুরের নাম। গোবিন্দরাম মিত্র কলকাতার ব্ল্যাক জমিন্দার হিসেবে বিখ্যাত এবং কুমারটুলি নামের নেপথ্যে আছে তাঁর পোষ্য ঘোড়াদের সহিস বা কুমাররা।