তিন.
এই যে মার্কস ও তাঁর মতবাদ ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বময়, তার তিনটি কারণ অনুসন্ধান করেছেন ব্রাঙ্কো মিলানোভিক তাঁর ‘দ্য ইনফ্লুয়েন্স অব কার্ল মার্কস আ কাউন্টারফ্যাকচুয়াল’ প্রবন্ধে। প্রথম কারণ, বন্ধু ও সহযোদ্ধা হিসেবে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের উপস্থিতি। ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ কার্ল মার্কসের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেন এঙ্গেলস। ১৮৪০ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে মার্কস যে সব রচনা করেছিলেন সেগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশে সাহায্য করেন এঙ্গেলস। এর ফলে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, রাশিয়ার সোশাল ডেমোক্রাটদের গণ্ডী অতিক্রম করে মার্কসের চিন্তাধারা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়। মার্কসের সঙ্গে এঙ্গেলসের নিয়মিত আলোচনা হত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তিনি মার্কসের পরিবারেরই সদস্য ছিলেন। অর্থ দিয়ে, কায়িক ও মানসিক নানাভাবে তিনি মার্কস ও তাঁর পরিবারকে সাহায্য করেছেন। হেলেন ডেমুখের সন্তানকে নিয়ে মার্কসের উপর কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা হলে নীলকণ্ঠের মতো সে কলঙ্ক নিজে গ্রহণ করেন।
দ্বিতীয় কারণ অক্টোবর বিপ্লব। এর ফলে মার্কস ও তাঁর মতবাদের কথা ছড়িয়ে পড়ল বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমজীবীদের মধ্যে। ট্রেড ইউনিয়নগুলির সান্ধ্য স্কুলে চর্চা হতে লাগল মার্কসবাদের। রাশিয়ায় লেনিন ও স্তালিন; স্পেনে বামমার্গী রিপাবলিকানরা; ফ্রান্সে পপুলার ফ্রন্ট, চিনে মাও-জে-দঙ, ভিয়েতনামে হো-চ-মিন, যুগোশ্লাভিয়ায় টিটো, কিউবায় কাস্ত্রো, অ্যাঙ্গোলায় অগস্টিনো নেতো, ঘানায় নক্রুমা, দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যাণ্ডেলা মার্কস ও তাঁর মতবাদকে বিশ্বব্যাপ্তি দিলেন। এলিমেন্টারি মার্কসিজম যেমন প্রভাবিত করল, তেমনি প্রভাবিত করল অ্যানালিটিক্যাল মার্কসিজম। অক্টোবর বিপ্লবই ইউরোকেন্দ্রিকতা থেকে তৃতীয় বিশ্বের দিকে প্রসারিত করে দিল মার্কসের চিন্তাধারা।
তৃতীয় কারণ পুঁজিবাদের বিশ্বায়ন ও সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট। এর ফলে মার্কসবাদ পড়ার আগ্রহ বেড়েছে। মিলানোভিক বলেছেন যে যতদিন পুঁজিবাদ থাকবে, ততদিন সমাধানের রাস্তা খোঁজার জন্য মানুষ মার্কসবাদ পড়তে থাকবে। তাঁর বক্তব্য :
‘In fact his influence is inextricably linked with capitalism. If capitalism ceases to exist he will be read as its best critic. So whether we believe that in another 200 years capitalism will be with us or not, we can be sure that Marx will.’
মিলানোভিক মার্কসের বন্ধু ও সহযোদ্ধা এঙ্গেলসের কথা বলেছেন, কিন্তু বলেন নি জেনির কথা। ইনি জেনি ভন ওয়েস্টফালেন। কার্ল মার্কসের স্ত্রী। একেবারে আক্ষরিক অর্থে সহধর্মিনী। চরম দারিদ্র্য, অসুস্থতা, বারংবার বাসাবদল, একাধিক সন্তানের অসহায় মৃত্যু, এসব মেনে নিয়েও জেনি মার্কসের পাশে থেকেছেন, তাঁকে ভাবতে ও লিখতে প্রেরণা দিয়েছেন। মার্কসের জীবনোপন্যাস ‘ লাভ অ্যাণ্ড ক্যাপিটেল’এর লেখিকা মেরি গ্যাব্রিয়েল বলেছেন :
‘She was not only his friend and lover, but had been his most trusted intellectual sounding board since their honeymoon 13 years earlier. Neither his heart nor his head functioned without her.’
চার.
বিশ শতকের আশির দশকের শেষ দিক। পূর্ব ইউরোপ ও সোবিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের পতন হল। পুঁজিবাদের সমর্থকদের উল্লাস শোনা গেল বিশ্বময়। ১৯৮৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল রবার্ট হেইলবোর্নারের একটি নিবন্ধ — ‘দ্য ট্রাম্ফ অব ক্যাপিটালিজম’ অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিজয়। এতদিন পুঁজিবাদকে চোখ রাঙাচ্ছিল যে সমাজতন্ত্রবাদ, তা আজ শুয়ে আছে কবরে। চিরনিদ্রায়। হে্ইলবোর্নার বললেন, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের লড়াইতে জয়লাভ করেছে পুঁজিবাদ; সোবিয়েত ইউনিয়ন, চিন ও পূর্ব ইউরোপ দেখিয়ে দিল মানুষের মঙ্গল শুধু পুঁজিবাদের দ্বারাই সম্ভব।
ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তাঁর ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’ বইতে বলে দিলেন যে উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির কোন বিকল্প নেই। এর প্রতিবাদ করলেন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক পেরি আণ্ডারসন। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদা লিখলেন ‘স্পেক্টারস অব মার্কস’। বলতে চাইলেন পুঁজিবাদীরা আজ ভূত দেখছে, কার্ল মার্কস ও মার্কসবাদের ভূত। কিন্তু তাঁদের কথা শোনার আগ্রহ নেই পুঁজিবাদীদের। তারা গলা ফাটাচ্ছে TINA TINA বলে। এই TINA হল ‘There is no alternative’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কোন বিকল্প নেই। কিসের বিকল্প? পুঁজিবাদের। আসলে এটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের একটি প্রিয় উক্তি। তিনি বলতেন বাজার অর্থনীতি উৎকৃষ্ট; তিনি মুক্ত বাণিজ্য ও পুঁজিবাদের বিশ্বায়নের জয়গান করতেন, বলতেন পুঁজিবাদের কোন বিকল্প নেই।
কিন্তু ততদিনে এশিয়ায় লেগেছে বিশ্বায়নের প্রবল ধাক্কা। শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। তার সূত্রপাত হয়েছে থাইল্যাণ্ড থেকে। তাই পুঁজিবাদের জয়ধ্বনির মধ্যেও মার্কসের প্রেতচ্ছায়া অপসৃত হল না। যে ‘নিউ ইয়র্কার’ কিছুদিন আগে পুঁজিবাদের বিজয়ের কথা লিখেছিল, সেই পত্রিকার ১৯৯৭ সালের ২০ অক্টোবর জন কাসিডি লিখলেন ‘দ্য রিটার্ন অব কার্ল মার্কস’। পুঁজিবাদ যে একচেটিয়ার দিকে যায়, তা মার্কস লিখেছিলেন; আর এখন যে বিশ্বায়ন নিয়ে অনেকে গলা ফাটাচ্ছেন তাও মার্কসের দূরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল।
১৯৯৮ সাল কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সার্ধ শতবর্ষ। এ বছর প্রকাশিত হল এই বইএর অনেকগুলি সংস্করণ। এক সংস্করণের ভূমিকায় ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এরিক হবসবম রাজনৈতিক পুস্তিকা হিসেবে ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’র সঙ্গে তুলনা করলেন ফরাসি বিপ্লবের ‘ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস অব ম্যান অ্যাণ্ড সিটিজেনে’র; ম্যানিফেস্টোর প্রাসঙ্গিকতা সম্বন্ধে বললেন : — ‘It has to remind ourselves that the Manifesto still has to say to the world in the first half of the twenty first century.’
মান্থলি রিভিউ প্রেস প্রকাশ করেছিলেন ম্যানিফেস্টোর আর এক সংস্করণ। তার ভূমিকায় অর্থনীতিবিদ পল এম সুইজি বললেন যে মার্কসের লেখায় পুঁজিবাদের যে সংকটের পূর্বাভাস আছে, আজ তা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে; পুঁজিবাদ সাসটেইনেবল অর্থনীতির ভিতটাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এলেন মেইকসিনস উড ম্যানিফেস্টোর অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর কথা বললেন এই ভাবে : — ‘The Manifesto has been judged as an account of past, present and future… not only the present and future of its authors, but those of every generations since up to and including our own.’
২০০২ সালের ২১ ডিসেম্বর ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকা লিখল বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক বাজার, বেকারি, অসাম্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে মার্কসের বক্তব্য সঠিক। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হল ফরাসি দার্শনিক এলেন বাডিউরের ‘দ্য কমিউনিস্ট হাইপোথেসিস’। ২০০৯ সালের ১৩ থেকে ১৫ মার্চ লণ্ডনের বির্কবেক কলেজে ‘অন দ্য আইডিয়া অব কমিউনিজম’ শীর্ষক এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। ২০০৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর লণ্ডনের ‘ফিনানসিয়াল টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল ‘ক্যাপিটালিজম ইন কনভালসন : টক্সিক অ্যাসেটস হেড টুওয়ার্ডস দ্য পাবলিক ব্যালেন্স সিট’। ২০১১ সালে টেরি ইগেলটন লিখলেন ‘হোয়াই মার্কস ওয়াজ রাইট’ নামক বই। মার্কসের বিরুদ্ধে যে দশটি অভিযোগ করা হয়, তা তিনি নিপুণ যুক্তিজালে খণ্ডন করলেন। ২০১৭ সালে রোমে কমিউনিজম নিয়ে কনফারেন্স হল ১৮ থেকে ২২ জানুয়ারি। ২০১১ সালে ব্রিটিশ চিত্র পরিচালক জাসন বার্কার ‘মার্কস রিলোডেড’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করলেন। ২০১৫ সালে ‘লেফট বিজনেস অবজারভার’ প্রশ্ন তুললেন : — মার্কসবাদী বিশ্লেষণ ব্যতীত বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের চরিত্র অনুধাবন করা সম্ভব নয়। [সমাপ্ত]