১৮৪৯ সালের জুন মাসে কার্ল মার্কস এলেন লণ্ডনে। রাজনৈতিক নির্বাসন। তারপর কেটে গেছে ৩৪ বছর। প্রথমে ছিলেন সোহোতে। ১৮৭৫ সালে চলে এলেন মেইটল্যাণ্ড পার্ক রোডে। এটা উত্তর লণ্ডনের বেলসাইজ পার্ক এলাকার অন্তর্গত। এখানেই ব্রঙ্কাইটিস ও প্লুরিসিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন তিনি। ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ বিকেলবেলা। মাত্র ১৮ মাস আগে মারা গেছেন তাঁর স্ত্রী জেনি।
১৪ মার্চ মারা গেলেও মার্কসের সমাধি দেওয়া হয় ১৭ মার্চ, শনিবার। হাইগেট সেমেট্রিতে জেনির পাশে সমাধি দেওয়া হয় তাঁকে। আউগুস্ট বেবেল মার্কসের সামাধির উপর মনুমেন্ট নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেন যে মার্কসের পরিবার আড়ম্বরময় সমাধি পছন্দ করবেন না। এঙ্গেলসকে সমর্থন করেন লাইবনেখট। তিনি জানান মার্কস নিজেও এ রকম আড়ম্বরময় সমাধি পছন্দ করতেন না; তাছাড়া বিশ্বের শত শত অনুরাগীর মনে যিনি জীবন্ত হয়ে আছেন, তাঁর জন্য এই ধরনের সমাধি অর্থহীন।
১৭ মার্চ হাইগেট সেমেট্রিতে মার্কসের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কসের দুই কন্যা লরা ও এলেনর, লরার স্বামী পল লাফার্গ, জ্যেষ্ঠা কন্যার স্বামী চার্লস লংগেট, রোয়্যাল সোসাইটির সদস্য প্রফেসর রয় ল্যাংক্সটার ও সোরলেমার, জার্মান সোশালিস্ট উইলহেল্ম লাইবনেখট, কমিউনিস্ট লিগের জি লোচনার, জার্মান সোশালিস্ট এফ লেসনার, লেখক ও সম্পাদক গোটলিয়েব লেমকে, মার্কস পরিবারের পরিচারিকা হেলেন ডেমুখ। লেমকে দুটি লাল রিবনে বাঁধা পুষ্প স্তবক সমাধির উপরে স্থাপন করেন। তারপর এঙ্গেলস একটি মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন। বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীদের শোকবার্তা পাঠ করা হয়।
শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সকলে ফিরে যান মার্কসের মেইটল্যাণ্ড পার্ক হোমের বাড়িতে। কয়েক দিন পরে সমাধির উপরে পাথরের ফলকে মার্কসের নাম উৎকীর্ণ করা হয়। দিন পাঁচেক পরে শবযাত্রীদের আবার দেখা যায় হাইগেট সেমেট্রিতে, এবার তাঁরা এসেছেন মার্কসের জ্যেষ্ঠা কন্যার পাঁচ বছরের শিশু হ্যারি লংগেটকে কবর দিতে এসেছেন।
তারপর দীর্ঘদিন মার্কসের সমাধি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসের সমাধি সংরক্ষণ ও সুবিন্যস্ত করার আবেদন জানায়। ইউনাইটেড স্টেটসের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘দ্য ওয়ার্কার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এক মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন। ১৮২৩ সালে ব্রিটিশ সোশালিস্ট কনফারেন্সে মার্কসের সমাধি দেখতে গিয়ে কি করুণ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, সে কথা জানান এক প্রতিনিধি।
১৯৫৪ সালে মার্কসের প্রপৌত্র ফ্রেডারিক ও রবার্ট জিন লংগেটের সম্মতিক্রমে মার্কস মেমোরিয়েল কমিটি হোম অফিসে ‘একজিউমেশন লাইসেন্স’এর জন্য আবেদন করে। মেমোরিয়েল কমিটির সদস্যরা মার্কস ও তাঁর পরিবারের লোকেদের কবর খুঁড়ে তাঁদের দেহাবশিষ্ট নুতন কোন উপযুক্ত স্থানে কবর দিতে চান। যে স্থান তাঁরা নির্বাচন করেন, সেটি পুরাতন কবরস্থানের ১০০ গজ দূরে। হোম অফিসের অনুমতি আসে। তদনুসারে ১৯৫৪ সালের ২৬/২৭ নভেম্বর মার্কসের নতুন সমাধি নির্মাণ করা হয়। সমাধির সমস্ত ব্যয় ভার বহন করেন গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি। একটি স্তম্ভের উপর মার্কসের ব্রোঞ্জনির্মিত মস্তকটি স্থাপিত হয়। স্তম্ভের উপরে প্রথম উদ্ধৃতিটি ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ থেকে নেওয়া হয়েছে :
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’
দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি আছে তার তলায় :
‘দার্শনিকরা পৃথিবীকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন,
কিন্তু আসল কাজ হল তাকে বদলানো।’
এই স্তম্ভের স্থপতি হলেন লরেন্স ব্রাডশ। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য।
নতুন সমাধির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৫৬ সালের ১৫ মার্চ। এত দিন মার্কসের পুত্রের আপত্তিতে নতুন সমাধি নির্মাণ সম্ভব হয় নি। এখন তাঁর প্রপৌত্ররা সম্মতি দিয়েছেন বলে মার্কস মেমোরিয়েল কমিটির চেয়ারম্যান মিঃ রোদেনস্টাইন তাঁদের ধন্যবাদ জানান। অধ্যাপক বার্নেল বলেন যে নিজের অসামান্য কাজ দিয়ে মার্কস নিজেই নিজের মনুমেন্ট তৈরি করে গেছেন। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে হ্যারি পলিট আশা প্রকাশ করেন যে মার্কসের ভাবধারায় ব্রিটেনের মানুষও অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠবেন। মার্কসের সমাধি দেখভাল করার ভার দেওয়া হয় মার্কস গ্রেভ ট্রাস্টের উপর।
দুই.
মার্কসের এই সমাধির উপর বারে বারে নেমে এসেছে আক্রমণ। ১৯৬০ সালে সমাধির উপরে এঁকে দেওয়া হয়েছিল একজোড়া স্বস্তিকা চিহ্ন। নাৎসি এস এস অফিসার অ্যাডলফ আইখম্যান, যিনি ইজরায়েলে বন্দি ছিলেন, তাঁর সমর্থনে লিখে দেওয়া হয়েছিল স্লোগান। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকা ১৯৬০ সালের ৫ জুন লিখল :
‘Two swastkas daubed in yellow paint were found … on the monument above the grave of Karl Marx. father of communism, in Highgate Cemetery . Slogans written in German said the writer loved Adolf Eichman, the Nazi leader now in custody.’
১৯৭০ সালে দু-বার সমাধিতে নিক্ষেপ করা হয় বোমা। ২০১১ সালে সমাধির উপর নীল রঙ মাখিয়ে দেওয়া হয়। এ সব আক্রমণে মার্কসের সমাধির গুরুতর ক্ষতি হয় নি। সে ক্ষতি হল ২০১৯ সালে। ৪ ফেব্রুয়ারি হাতুড়ির আঘাতে বিক্ষত হল মার্কসের স্মৃতিস্তম্ভের মার্বেল ফলক। কিছুদিন পরে আবার আক্রমণ। এবার ফলকের উপরে লাল কালিতে লেখা হল : ‘doctrine of hate’; বলতে চাওয়া হল মার্কস ঘৃণার রাজনীতির কারবারী, আর ‘architect of genocide’ অর্থাৎ গণহত্যার স্থপতি।
ফ্যাসিবাদী দর্শনে বিশ্বাসী মানুষেরাই মার্কসের সমাধি ভাঙচুর করতে চেয়েছিলেন। এঁরাই স্পেন, ফ্রান্স, পোল্যাণ্ড প্রভৃতি স্থানে সমাজতন্ত্রী নেতাদের কবরে হামলা চালান।
মৃত্যু সম্বন্ধে ফ্যাসিবাদীদের এক অদ্ভুত ধারণা আছে। এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন মার্ক নিওক্লিয়াস। ফ্যাসিবাদীরা মনে করেন তাঁদের শত্রুরা দৈহিকভাবে মৃত হলেও সম্পূর্ণভাবে মৃত নয়, undead নিওক্লিয়াস বলেছেন : ‘Unable to actually engage in this struggle in the world of the undead, the Fascist is forced to the next best thing : attack the grave’ . কার্ল মার্কস ও তাঁর মতবাদ ফ্যাসিবাদীদের পরম শত্রু। এই মতবাদে দীক্ষিত রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাস্ত করেছিল হিটলারকে। মার্কস মারা গেছেন বটে, কিন্তু যে কোন মুহূর্তে পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারেন। তাই তাঁর কবরও নিরাপদ নয়। ফ্যাসিবাদীদের কথা ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেছেন এই ভাবে : ‘Marx’s grave does not represent the site of someone dead, but of something threatening to reemerge.’ কবরের অন্ধকার থেকে আবার বেরিয়ে আসতে পারেন মার্কস, তাঁর প্রেরণায় জোরদার হয়ে উঠতে পারে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা। তখন মার্কস হতে পারেন ভূতের চেয়ে ভয়ংকর, ‘Marxism represents the eternal enemy of the Fascist imagination; Marx is not dead, but undead. They fear that Marx is still influencing world history from beyond the grave. Worse, they fear, that the socialist movement is resurrecting Marx from the oblivion of the past . If capitalism is one day overthrown and humanity moves from its pre-history towards real history, then Marx will be more than a ghost; he will be immortalized.’ ফ্যাসিবাদীরা মনে করেন মার্কসের সমাধি ভাঙচুর করলে, তাঁকে যে কোনভাবে অসম্মানিত করলে আর তাঁর পুনরুজ্জীবন হবে না।
শুধু ফ্যাসিবাদ নয়, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদও মার্কস ও তাঁর মতবাদের শত্রু। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে মার্কসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। সোবিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপের কিছু দেশে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার পরে পুঁজিবাদী ও ফ্যাসিবাদীরা ভেবেছিলেন মৃত্যু হয়েছে মার্কসবাদের।
কিন্তু মার্কসবাদ যে রক্তবীজ।
(পরের পর্বে সমাপ্য)