এই পর্ব থেকে শুরু হবে ফার্মিঙ্গারের ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদনের অনুবাদ। অনুবাদকের ভূমিকা শেষ করব ১৮১৩ সালে ইওরোপে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিটেনের অবস্থান, তার প্রাপ্তিগুলো আলোচনার পরে।
১) ১৮১৩-য় ব্রিটেন নেপোলিয়নিক যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল এবং খুবই নিরাপদ অবস্থানে ছিল। এখানে একটা বিষয় বলা দরকার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ব্রিটেন তার সাংস্কৃতিক যুদ্ধ — বিশেষ করে তার স্বাধীনতা, প্রোটেস্ট্যান্টবাদ ও শাসনতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে দেখত। এটাই আদতে ১৮১৩-র আইনে ভারতের মত বর্বরদের উদ্ধারে ‘নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মিশন’ হিসেবে তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করবে।
২) যুদ্ধ জোটের নেতৃত্বে ছিল ব্রিটেন (ডিউক অফ ওয়েলিংটনের নেতৃত্বে) আইবেরীয় উপদ্বীপে (স্পেন ও পর্তুগাল) ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে সফলতা পায়। এটাই ইওরোপের একমাত্র স্থল যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে নেপোলিয়নকে পিছু হটতে হল। ব্রিটেন শুধু সামরিক শক্তিতেই প্রবল ছিল না, ‘কোয়ালিশনের অর্থদাতা’ ছিল। গবেষক হেভিয়ার কুয়েঙ্কা দেখয়েছেন প্রুশিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বাহিনীকে অর্থ বিনিয়োগের জন্য ব্রিটেন তার ঔপনিবেশিক সম্পদ (দক্ষিণ এশিয়া) অকাতরে ব্যবহার করেছে। না হলে তাদের এই যুদ্ধ জয় সমস্যা হত।
৩) নৌ ও অর্থনৈতিক আধিপত্য তৈরি হয় ট্রাফালগারের যুদ্ধের (১৮০৫) পর থেকে। এই যুদ্ধে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে নিহত টিপু সুলতানের হাউই/রকেট নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উলরিচের গবেষণাগারে উন্নত করেরার পরেই ব্রিটেনের নৌবাহিনী চরম আধিপত্য তৈরি করতে পেরেছিল। এর ফলে তারা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কন্টিনেন্টাল সিস্টেম (ফ্রান্সের কন্টিনেন্টাল সিস্টেম ছিল ব্রিটেনের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নের অর্থনৈতিক অবরোধ, যা ব্রিটেনকে দুর্বল করতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ব্রিটিশ বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে প্রয়োগ করা হয়েছিল। বার্লিন ডিক্রি (১৮০৬) ব্যবস্থায় ব্রিটিশ পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হলেও, এটা ফ্রান্স ও তার জোটয় সঙ্গীদের অর্থনীতির ক্ষতি করে এবং অনেক দেশ এই ডিক্রি উপেক্ষা করতে বাধ্য হয় – শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নের পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়) নিষেধাজ্ঞা জোরদারভাবে তুলতে পেরেছিল। [এ প্রসঙ্গে বার্লিন ডিক্রি সম্বন্ধে কিছু কথা বলা যাক। জেনার যুদ্ধে প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে ফরাসিদের সাফল্য বার্লিনকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। ১৮০৬-র ২১ নভেম্বর নেপোলিয়ন বার্লিনে বার্লিন ডিক্রি জারি করেন। ১৮০৬-এর ১৬ মে ব্রিটিশ অর্ডার-ইন-কাউন্সিলের প্রতিক্রিয়ায় এই ডিক্রি জারি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে রয়্যাল নেভি ব্রেস্ট থেকে এলবে পর্যন্ত সমস্ত বন্দর অবরোধ করে। ডিক্রিতে ঘোষণা করা হল “ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে অবরোধ জারি রয়েছে” এবং গ্রেট ব্রিটেনের সাথে সমস্ত চিঠিপত্র বা বাণিজ্য নিষিদ্ধ হল। বলা হল ফ্রান্স বা তার মিত্রদের ভূখণ্ডে পাওয়া সমস্ত ব্রিটিশ প্রজাদের যুদ্ধবন্দী হিসাবে গ্রেপ্তার করা হবে এবং সমস্ত ব্রিটিশ পণ্য বা পণ্যদ্রব্য জব্দ করা হবে। ডিক্রি লঙ্ঘনকারী এবং ব্রিটেনের কোনও বন্দর বা তার উপনিবেশ থেকে কোনও মহাদেশীয় বন্দরে অবতরণকারী যে কোনও জাহাজকে ব্রিটিশ সম্পত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হবে এবং তাই এর সমস্ত পণ্যসম্ভার সহ বাজেয়াপ্ত করা হবে।]
৪) ব্রিটেন তাদের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যপথ ও উপনিবেশ রক্ষা করতে পেরেছিল।
৫) প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক স্বার্থ বিস্তার করেছিল।
৬) বিজয়ের প্রাক্কাল – ১৮১৩ সাল ছিল সন্ধিক্ষণ। অক্টোবরে লাইপজিগের যুদ্ধে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তবে এই জয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই ব্রিটেনের সমস্ত জাতীয় শক্তি যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল।
৭) মাথায় রাখতে হবে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধকে ব্রিটেনে স্বাধীনতা, প্রোটেস্ট্যান্টবাদ ও শাসনতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে দেখা হত। এই ‘নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মিশন’-এর ধারণা পরবর্তীতে ভারতের মতো উপনিবেশগুলোর প্রতি ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করবে – বিশেষ করে মিশনারিদের কাজকর্মে এটাই প্রধান তাত্ত্বিক অবস্থান হয়ে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে, ১৮১৩ সালে ব্রিটেন ছিল নেপোলিয়ন-বিরোধী জোটের অর্থনৈতিক ও নৌ-অধিপত্যবিশিষ্ট শক্তি। দুই দশকের যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে তার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী।
দক্ষিণ এশিয়ার লুঠ করা সম্পদের ওপর নির্ভর করে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়ার পরের আত্মবিশ্বাস আদতে প্রতিফলিত হয়েছে ১৮১৩র আইনে।

ভূমিকা
পঞ্চম প্রতিবেদনের (দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অথবা ফিফথ রিপোর্ট) পুনর্মুদ্রণ সূত্রে বাংলায় (প্রেসিডেন্সি), মাননীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিদের উদ্যমে ভারতবর্ষের শেষ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী (মুঘল সাম্রাজ্যের) ক্ষমতা ধ্বংস করে, কার্যকর বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলার পর্যায়গুলো যথাবিহিত চিহ্নিত করার উদ্যম নিয়েছি। এই প্রতিবেদন লর্ড কর্নওয়ালিসের বাংলায় আগমনের প্রাক্কালে শেষ করেছি, এবং আশা করা যায় যে আমার এই ইতিহাস গবেষণা শিক্ষার্থীকে এমন এক জ্ঞানচর্চার পর্যায়ে পৌঁছে দেবে, যেখান থেকে সে পঞ্চম প্রতিবেদন অধ্যয়ন করার যোগ্য হয়ে উঠবে।
বইটির ভূমিকার একাংশ লিখেছিলাম ১৯১১-১২য় ইওরোপে কাটানো ছুটিতে(ফার্লো) এবং বাকি অংশ ১৯১২-র শীতে বুদাপেস্টের হোটেল ফিউমের মনোরম সুসজ্জিত কক্ষের গবাক্ষ বেয়ে ড্যানিউব নদীর শোভা উপভোগ করতে করতে। আশা ছিল প্রায় ব্যবহার না হওয়া ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডস অফ বেঙ্গল নিয়ে কাজ করার সময় যে সব তথ্য আহরণ করেছিলাম তার বেশিরভাগই এই প্রবন্ধে জুড়তে পারব: কিন্তু, শেষ পর্যন্ত মনে হল, আমইওরোপীয় পড়ুয়ার কাছে এই ইতিহাসের সাধারণ রূপরেখা এখনও এতটাই অস্পষ্ট যে আমাকে বাধ্য হয়ে আমার গবেষণার সময়কালের বেশ কিছু আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় বিবরণ-তথ্য বাদ দিতে হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ইন্ডিয়া অফিসের রেকর্ড রুমে বাংলার বিভিন্ন রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করার ব্যবস্থা ছিল। বহু বছর আগে, যে সব আধিকারিক এই খণ্ডগুলো তালিকাভুক্ত করেছিলেন, তাদের কাছে রেকর্ডগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন গভর্নিং বডির ইতিহাস আর প্রকৃতি বিষয়ে সহজলভ্য নির্দেশিকা ছিল না।
আমি পলাশীর যুদ্ধ এবং এর তথাকথিত পরিণতি নিয়ে বহুল উদ্ধৃত প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ নিয়েছি। সম্ভবত, বইতে পলাশী সংক্রান্ত কিংবদন্তি যেভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, সেটা আর কখনও এর চেয়ে বেশি ভুল এবং বিপজ্জনকভাবে ব্যবহার হয়নি। এমনটাই হয়েছিল ১৮৫৭-র মে-তে। স্যার জন লরেন্স জেনারেল অ্যানসনকে বলেছিলেন, ‘আমাদের সৈন্যরা দোরগোড়ায় পৌঁছালেই দিল্লি দরজা খুলে দেবে।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা প্রবলভাবে কাজ করে কোথায় ব্যর্থ হয়েছি? আমরা ভীরু পরামর্শে চালিত হয়ে কোথায় সফল হয়েছি? মাথায় রাখবেন, ক্লাইভ প্রধান অফিসারদের পরামর্শ উপেক্ষা করে বারোশো সৈন্য নিয়ে পলাশী যুদ্ধে চল্লিশ হাজার সৈন্য হারিয়ে বাংলা জয় করেছিলেন।’
বই প্রকাশ সূত্রে বাংলা সরকার বেঙ্গল হিস্টোরিক্যাল রেকর্ড রুম তৈরি করেছে এবং প্রেস লিস্টের তিনটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। আমি মিঃ বি. চ্যাম্পকিনের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারন তিনি টাইপ করা প্রবন্ধ মন দিয়ে পড়ে বহু মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন; বাবু কিরণনাথ ধর বই প্রেসে যাওয়ার আগে পর্যন্ত প্রভূত কষ্ট সহ্য করেছেন এবং নির্ঘণ্ট সংকলন করেছেন। ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ড বিভাগের উইলিয়াম ফস্টার, সি.আই.ই. যেভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার জন্য আমি গভীরভাবে ঋণী থাকলাম।
এই সুযোগে ঢাকা রিভিউতে তৃতীয় অধ্যায় এবং কলকাতা রিভিউতে ষষ্ঠ অধ্যায় ছাপার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দুই সম্পাদকের কাছে ঋণী রইলাম। ১৯০৭ থেকে আমার সম্পাদনায় বেঙ্গল পাস্ট এন্ড প্রেজেন্টস পত্রিকায় পঞ্চম আর অষ্টম অধ্যায় প্রকাশিত হয়।
আমার বিশ্বাস, এই প্রবন্ধে শিক্ষার্থীদের জন্য যে সব বই এবং পাণ্ডুলিপি থেকে বিষয়বস্তু উদ্ধার করেছি, সে সব একত্র করলে একটা বড়, ব্যয়বহুল গ্রন্থাগার তৈরি হতে বাধ্য। আমার কাজ ফিল্ডস রেগুলেশনস অফ দ্য বেঙ্গল কোড বা কাওয়েলস কোর্টস অ্যান্ড লেজিসলেটিভ অথরিটিস ইন ইন্ডিয়ার মত বিশেষজ্ঞদের কাজের সাথে তুলনীয় নয়। তবুও বলা যাক আমার লেখায় যে বিপুল পরিমাণে ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থিত, সে সবের সঙ্গে ফিল্ড বা কাওয়েল পরিচিত ছিলেন না। বর্তমান অনুসন্ধানের ফল আরও জনপ্রিয়, আরও পাঠযোগ্য আকারে উপস্থাপন করতে পারলে ভাল হত, কিন্তু বর্তমানকালের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপকরণ সরবরাহ করার প্রচেষ্টায়, আমি প্রশংসাযোগ্য, সহজপাঠ্য বই লেখার উদ্যম পরিহার করতে বাধ্য হয়েছি।
সেন্ট জনস হাউস, কলকাতা;
৯ নভেম্বর, ১৯১৬।
ওয়াল্টার কে. ফার্মিংগার।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ