একাদশ অধ্যায়।
ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রারম্ভিক প্রশাসন।
ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ও প্রেসিডেন্ট-এর পদে কার্টিয়েরের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য নিযুক্ত ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২-এর ২০শে ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পৌঁছান; কিন্তু ১৩ই এপ্রিলের আগে কার্টিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে দপ্তরের চাবি হস্তান্তর করেননি। (কার্টিয়ের বছরের শেষ পর্যন্ত কলকাতায় নিজের ব্যক্তিগত কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্রটি ১৪ই নভেম্বর, ১৭৫৯ তারিখের ছিল। সূত্র : Bengal: Past & Present, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬২৭)। নতুন গভর্নর তাঁর এই গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা এবং ফারসি ও হিন্দুস্তানি ভাষার ওপর তাঁর দখলকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সতেরো বছর বয়সে তিনি প্রথম কলকাতায় আগমন করেন এবং কলকাতায় একজন ‘রাইটার’, কেরানী হিসেবে তিন বছর কাটানোর পর, তাঁকে কাশিমবাজার কুঠিতে বাণিজ্যিক সহকারী হিসেবে কর্ম সম্পদানের জন্য পাঠানো হয়। কাশিমবাজার থেকে ঘোড়ায় চড়ে খুব সহজেই মুর্শিদাবাদে পৌঁছানো যেত — যেখানে ১৭৫৬-র জানুয়ারি মাস পর্যন্ত প্রতাপশালী আলিবর্দী খান রাজদরবার পরিচালনা করতেন। ১৭৫৬-তে যখন সিরাজ-উদ-দৌলা কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করার নির্দেশ দেন, তখন হেস্টিংস — যিনি এর আগেই কুঠির কাউন্সিল বা পরিষদের সদস্য পদে উন্নীত হয়েছিলেন — বন্দী হন। কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, ফোর্ট উইলিয়াম লুণ্ঠিত হয়; সেখান থেকে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের সাথে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে হেস্টিংস ফলতায় (Falta) চলে যান; সেখানে সেই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে, কলকাতা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলা ক্লাইভের বাহিনীতে তিনি যোগ দেন। পলাশীর যুদ্ধের পর তাঁকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে মুর্শিদাবাদে পাঠানো হয়। ১৭৫৮-র আগস্ট মাসে — (তাঁর আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র ১৪ই নভেম্বর, ১৭৫৯ তারিখের ছিল। সূত্র: Bengal: Past & Present, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬২৭) — তিনি নবাবের দরবারে ‘রেসিডেন্ট’ হিসেবে লুক স্ক্রাফটনের স্থলাভিষিক্ত হন। ১৭৬০-এ তিনি ফোর্ট উইলিয়ামের কাউন্সিল বোর্ডের সদস্য পদে উন্নীত হন এবং সেখানে তিনি গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্টের একজন অবিচল ও কার্যত একমাত্র সমর্থক হিসেবে অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৭৬৪-র নভেম্বর মাসে তিনি কোম্পানির চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৭৬৫-র ফেব্রুয়ারি মাসে ‘মেডওয়ে’ (Medway) জাহাজে চড়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। চৌদ্দ বছরের কর্মজীবনে তিনি যে বিত্ত-বৈভব অর্জন করেছিলেন, তা ছিল নিতান্তই সাধারণ মানের; আর হেস্টিংস যেহেতু স্বভাবতই ছিলেন অর্থব্যয়ে অসংযত, তাই অচিরেই তাঁর পক্ষে পুনরায় কোনো পদে নিয়োগ লাভের চেষ্টা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। তাঁর প্রথম আবেদন প্রত্যাখ্যাত হল; কিন্তু ১৭৬৯-এ লর্ড ক্লাইভের সদয় সুপারিশের তিনি ‘ফোর্ট সেন্ট জর্জ’-এর কাউন্সিলের ‘দ্বিতীয় সদস্য’ (Second of Council) হিসেবে মনোনীত হন।
হেস্টিংসের ভারতে কর্মজীবনের প্রারম্ভিক পর্বের এই অতি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনাটি একটি গুরুতর ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের পক্ষে যথেষ্ট হবে। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ইতিহাসের রচয়িতারা প্রায়শই মেকলের সেই বর্ণাঢ্য ও চিত্রধর্মী বাকভঙ্গি অনুকরণের বিষয়টিকে নিজেদের কর্তব্য বলে মনে করেছেন; আর তারই ফলস্বরূপ আমাদের এমনটি শোনানো হয়েছে যে, ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর অদম্য পরিশ্রমের জোরেই কর্মক্ষেত্রে স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন — যে ধরনের পরিশ্রম সাধারণত কোনো পাইকারি বস্ত্র-ব্যবসায়ীর সহকারীকে সেই ব্যবসারই একজন ‘কনিষ্ঠ অংশীদার’ (junior partner) হওয়ার যোগ্যতা এনে দেয়। বস্তুতপক্ষে, যদিও কাশিমবাজার কুঠিতে থাকার সময় রেশম চাষ পদ্ধতি এবং কোম্পানির বাণিজ্যের প্রয়োজনে আবশ্যক বিভিন্ন প্রকার বস্ত্র সম্পর্কে হেস্টিংস নিশ্চয়ই কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তবুও প্রথমে ‘রেসিডেন্ট’ এবং পরবর্তীতে কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতাময় কর্মজীবনই তাঁর প্রখর ও শক্তিশালী মননশক্তিকে এমন সব মৌলিক সমস্যার সমাধানের কাজে নিয়োজিত করেছিল, যা মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। (এ কথা সত্য যে, যখন স্ক্রাফটনের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে হেস্টিংস নিযুক্ত হন, তখন বর্ধমান ও নদিয়ার নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব — তাঁর অগোচরেই — রেসিডেন্টের হাত থেকে হুগলির এক স্থানীয় কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল; আর এই কর্মকর্তা ছিলেন স্বয়ং নন্দকুমার (“Nuncomar”)। এর প্রতিবাদ জানিয়ে হেস্টিংস ক্লাইভকে লিখেছিলেন: “আমার আচরণ বা যোগ্যতার প্রতি বিন্দুমাত্র বিরূপ ধারণার বশবর্তী হয়েই যে বর্ধমান ও নদিয়ার প্রশাসনিক বিষয়াবলি হুগলিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে — এমন কোনো সন্দেহ আমার মনে কখনোই জাগেনি; তবে এখানকার সকলেই বিষয়টিকে ঠিক সেভাবেই ব্যাখ্যা করবে বলে আমার আশঙ্কা হয়। কারণ, এখানে সর্বজনীনভাবে এই বিশ্বাসই প্রচলিত ছিল যে, মোরাদবাগে (মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি এলাকা, যেখানে রেসিডেন্টের বাসভবন ছিল) আমাকে মূলত ওই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।” অবশ্য, মুঘল রীতিনীতি সম্পর্কে হেস্টিংসের যে বিশেষ কারিগরি জ্ঞান ছিল, তারই সুবাদে যথাসময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবিষ্কৃত হয়: চব্বিশ পরগনার ক্ষেত্রে ইংরেজরা নবাবের কাছ থেকে কেবল একটি ‘পরওয়ানা’ বা নির্দেশনামা সংগ্রহ করেছিল — এমন একটি দলিল, যা মীর জাফরের পরবর্তী উত্তরাধিকারীর ওপর আইনত বাধ্যতামূলক বা কার্যকর হতো না। হেস্টিংসের তৎপরতার ফলেই শেষ পর্যন্ত সেই প্রয়োজনীয় ‘সনদ’টি (স্থায়ী অধিকারপত্র) হস্তগত করা সম্ভব হয়েছিল। নির্ধারিত জেলাগুলোর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব মুর্শিদাবাদ থেকে হুগলিতে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হেস্টিংসের প্রতি অনাস্থা প্রদর্শন ছিল না; বরং এর নেপথ্যে কাজ করেছিল এই আশঙ্কা যে — মুর্শিদাবাদের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের চোখের সামনে দিয়েই বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ ইংরেজদের কোষাগারে স্থানান্তরিত হতে দেখলে পাছে তাঁরা ক্ষুব্ধ বা অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন।)
১৩ই এপ্রিল হেস্টিংস গভর্নর হিসেবে তাঁর কার্যভার গ্রহণ করেন; আর ১৪ই এপ্রিল কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর এই নির্দেশনামা তাঁর হাতে এসে পৌঁছায়। মিল মন্তব্য করেছেন যে, ডিরেক্টররা যে পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই পরিবর্তনের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে তাঁদের “কোনো ধারণাই ছিল বলে মনে হয় না।” তাঁরা কেবল তাঁদের কর্মচারীদের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রকাশ্যে নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার নির্দেশই দেননি, বরং তাঁরা ‘নায়েব দেওয়ান’-এর পদও লুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন; এই নির্দেশটি এমন এক সময়ে এসেছিল, , যখন স্বয়ং নবাব ছিলেন নাবালক। ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর ভাষায় বললে, তাঁরা “ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে সদয় হয়েছিলেন এবং এর পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের ভার বোর্ডের বিবেচনার ওপর ন্যস্ত করেছিলেন; অথচ তাঁরা পূর্বে যে বিধিমালা প্রণয়ন এবং অন্য এক ব্যবস্থার উপযোগী করে গ্রহণ করেছিলেন — যার বিলোপসাধন করা অনিবার্যভাবেই সেই ব্যবস্থার অধীনস্থ আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলোপকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যদি না সেগুলোকে নতুন ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয় — সেই বিধিমালাগুলো তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেননি।” (কমিটি অফ সিক্রেসি-র ষষ্ঠ প্রতিবেদন, ১৭৭২, পৃ. ১৮)
হেস্টিংসের চেয়ে কম আত্মবিশ্বাসী কোনো গভর্নর হয়তো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার এই অভাব কাজে লাগিয়ে নতুন নীতির জন্য প্রয়োজনীয় বড় ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনার বিষয়টিও পিছিয়ে দিতেন; কিন্তু হেস্টিংসের কাছে বিস্তারিত নির্দেশনার এই অভাব বরং স্বাগতযোগ্যই ছিল, কারণ এই অবস্থা তাঁকে কার্যক্ষেত্রে অধিকতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়েছিল। হেস্টিংসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিরেক্টরদের এই সিদ্ধান্তের মূল কথা ছিল নিজামত আর দেওয়ানি — এই দুই ক্ষমতার পুনর্মিলন ঘটানো, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইংরেজদের হাতেই। ৩রা নভেম্বরের চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, “যতদিন নিজামত আর দেওয়ানি ভিন্ন ভিন্ন পক্ষের হাতে ন্যস্ত ছিল,” ততদিন “দেওয়ানি ক্ষমতার প্রবল প্রভাবের কারণে নিজামত আদালতগুলোর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।” তিনি নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন যে, সরকারের এই দুটি ভিন্ন ভিন্ন কার্যবিভাগের পৃথক অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই; আর এই অনুমিত পুনর্মিলনের ধারণাই পরবর্তীকালে হেস্টিংসের ১৭৭২-এর প্রবিধানমালার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
১৭৭২-এর ১৪ই মে, গভর্নর ও তাঁর পরিষদ তাঁদের “পরবর্তী সকল কার্যক্রমের সাংবিধানিক ভিত্তি” নির্ধারণের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন; তাঁদের সেই সিদ্ধান্তগুলোকে সংক্ষেপে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরা যেতে পারে: —
১. জমিজমাগুলো পাঁচ বছরের মেয়াদের জন্য রাজস্ব ইজারাদারদের (revenue farmers) নিকট ইজারা দেওয়া হবে।
২. প্রধান প্রধান জেলাগুলো পরিদর্শন এবং পাঁচ বছর মেয়াদী রাজস্ব বন্দোবস্ত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে গভর্নর ও পরিষদের চারজন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি ‘সার্কিট কমিটি’ (Committee of Circuit) নিয়োগ করা হবে।
৩. জেলা পর্যায়ে কর্মরত কোম্পানির কর্মচারীদের এখন থেকে ‘সুপারভাইজার’ বা ‘সুপ্রাভাইজার’ উপাধির পরিবর্তে ‘কালেক্টর’ হিসেবে অভিহিত করা হবে [উপনিবেশিক ভারতবর্ষ এবং ১৮৪৭এর পরের ভারতে এই কালেক্টর পরে যা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে রূপান্তরিত হবে। এই পদের পরম্পরা শুরু হয়েছিল হেস্টিংসের আমলেই – অনুবাদক]।
৪. প্রতিটি জেলায় ‘দেওয়ান’ উপাধিতে একজন স্থানীয় কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, যাঁর কাজ হবে কালেক্টরকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা কিংবা তাঁর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ রাখা।
৫. কোনো কালেক্টরের ‘বানিয়ান’ (স্থানীয় প্রতিনিধি) কিংবা অন্য কোনো কর্মচারীকে রাজস্বের কোনো অংশ ইজারা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
৬. জমিদার ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে কালেক্টরদের প্রতি, এবং রায়তদের (প্রজা) পক্ষ থেকে জমিদারদের প্রতি কোনো প্রকার উপহার বা উপঢৌকন প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো।
৭. কালেক্টর এবং তাঁদের বানিয়ানদের রায়তদের (প্রজাদের) অর্থ ঋণ বা দাদন দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ