[এই কিস্তির শেষ স্তবকে ১৭৭৩-এ একটা সাধারণ ব্যাঙ্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। সেই ব্যাঙ্ক-সংক্রান্ত বিধিমালা জে সি প্রাইসের Notes on the History of Midnapore গ্রন্থের ২০১-২০৬ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত রয়েছে। আমি এই ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য আর প্রবিধান নিয়ে পেজফোরনিউজের বাংলা নববর্ষ সংখ্যায় সংক্ষেপে একটি প্রবন্ধ লিখেছি – অনুবাদক]
এতদিন ধরে চালু থাকা প্রবিধানগুলোর উদ্দেশ্য নতুন কোনো বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করা ছিল না; বরং এগুলোর কাজ ছিল আপিল আদালতগুলো মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তর, কালেক্টরকে তাঁর নিজ জেলার স্থানীয় দেওয়ানি আদালতের সভাপতিত্ব করার অধিকার দেওয়া এবং স্থানীয় ফৌজদারি আদালতে যাতে ন্যায়বিচারের সমস্যা না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করা। মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন বা পরিবর্তন করার যে অধিকার নবাব কিংবা নাজিমের ছিল, তা অত্যন্ত সতর্কভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা হল। কালেক্টরের বহুমুখী আর বিচিত্র দায়িত্বগুলো এই প্রবিধানগুলোর ফলে নিঃসন্দেহে বহুগুণ বেড়েছিল; কারণ এই প্রবিধানগুলো তার ওপর নথিপত্র বা রেকর্ড সংরক্ষণের এবং বিচারকৃত মামলাগুলোর সারসংক্ষেপ-তালিকা প্রেসিডেন্সিতে প্রেরণের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছিল।
১৭৭২ সালের প্রবিধানগুলো এমন কিছু দীর্ঘদিনের অনুভূত ও প্রচলিত অনিয়ম বা ত্রুটি-বিচ্যুতির সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছিল, যার কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. মুঘল শাসনব্যবস্থার পতনের ফলে, মুর্শিদাবাদ থেকে ভৌগোলিকভাবে বেশ দূরে অবস্থিত স্থানীয় আদালতগুলো কার্যত অচল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। এই আদালতগুলোর অনুপস্থিতিতে জমিদার এবং অন্য স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রাজস্ব-কর্মচারীরা কার্যত এমন এক বিচার এখতিয়ার অথবা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে শুরু করেছিল, যার ওপর তাঁদের কোনো বৈধ অধিকার ছিল না। (প্রবিধানের একাদশ অনুচ্ছেদে পরগনার ‘ইজারাদার’ বা রাজস্ব-সংগ্রাহককে ১০ টাকার অধিক মূল্যের নয় — এমন বিবাদ বা বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।) বিচারালয়গুলো কার্যত কেবল বিত্তবানদেরই আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল; অন্যদিকে দরিদ্র প্রজারা যখন বিচারের আশায় সেখানে উপস্থিত হতেন, তখন যাতায়াতের বিপুল খরচ এবং অনুপস্থিতির কারণে নিজেদের কৃষিজমির পরিচর্যায় অবহেলার ফলে তাঁরা সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তেন। এছাড়া বাস্তবে প্রায়শই এমন একদল ‘আইন-পরামর্শদাতাসভা’ অথবা জুরিসকনসাল্ট পরিষদ আহ্বান করা অসম্ভব হয়ে পড়ত — যা মুঘল আইন অনুযায়ী তখন আবশ্যক ছিল, যখন কাজী এবং তাঁর সহকর্মীরা কোনো বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হতেন। আইন-পরামর্শদাতাদের থেকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না পাওয়ায়, কাজী নিজের ব্যক্তিগত মতামতকেই রায় হিসেবে কার্যকর করার প্রথায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
২. প্রাচীন আদালতগুলোর তাদের বিচারিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণে ব্যর্থতা।
৩. আদালতের মাধ্যমে বলপূর্বক আদায়কৃত ঋণের পরিশোধ হিসেবে “ঘৃণ্য,” অথচ অনুমোদিত, জরিমানা ও কমিশন আরোপ। ১৭৭২-এর প্রবিধানমালার অধীনে, ‘ফৌজদারি বাজে জামা’ — এক ধরণের, বিশেষভাবে আপত্তিকর জরিমানা বিলুপ্ত করা হয়; কাজী ও মুফতিদের, পূর্বে জরিমানার মাধ্যমে প্রাপ্ত অতিরিক্ত আয়ের পরিবর্তে, মাসিক বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। ৩৫তম প্রবিধান উদ্ধৃত করার দাবি রাখে, কারণ এটা বাংলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর এক ভয়াবহ আলোকপাত করে:
“যেহেতু, বিগত কয়েক বছর ধরে দস্যুদলের (ডাকাতদের) উপদ্রবে এ দেশের শান্তি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে — যারা কেবল রাস্তাঘাটেই ত্রাস সৃষ্টি করে না, বরং প্রায়শই পুরো গ্রাম লুঠ করে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং অধিবাসীদের হত্যা করে; এবং যেহেতু এই উচ্ছৃঙ্খল ও আইনভঙ্গকারী অপরাধীরা এখন পর্যন্ত সরকারের সতর্ক নজরদারির মাধ্যমে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল এমন জঘন্য অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং বিচারের আওতায় আনা, সে সব তারা ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে; আর তা সম্ভব হয়েছে তাদের গোপন আস্তানা এবং যেসব জেলায় তাদের আক্রমণের প্রবণতা সর্বাধিক, সেগুলোর দুর্গম ও বন্য অবস্থার কারণে; এমতাবস্থায় সরকারের জন্য কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেহেতু অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, প্রতিটি নমনীয় ও সাধারণ প্রতিকারই অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। অতএব, এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, এমন প্রতিটি অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাকে তার নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে — যাতে তা অন্যদের জন্য ভীতি ও দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে; এবং এই জঘন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আরও কার্যকর প্রতিরোধের লক্ষ্যে, অপরাধীর গ্রামের ওপর — অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী — জরিমানা আরোপ করা হবে এবং গ্রামের প্রতিটি অধিবাসীর ওপর — তাদের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী — জরিমানা ধার্য করা হবে; অধিকন্তু, অপরাধীর পরিবারকে রাষ্ট্রের দাসে পরিণত করা হবে এবং জনগণের সাধারণ কল্যাণ ও সুবিধার স্বার্থে, গভর্নরের বিবেচনামতো তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।”
তাদের প্রারম্ভিক পত্রে (covering letter), ‘কমিটি অফ সার্কিট’ ব্যাখ্যা করে বলছে, “বাংলার দস্যুরা ইংল্যান্ডের চোর-ডাকাতদের মতো নয় — যারা আকস্মিক অভাবের তাড়নায় এমন বেপরোয়া পথে পা বাড়ায়; বরং এরা পেশাগতভাবেই দস্যু এবং এমনকি জন্মসূত্রেই দস্যু। এরা সুসংগঠিত সম্প্রদায়ের রূপ ধারণ করেছে এবং এদের পরিবারগুলো সেই লুঠের মালের ওপরই নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে, যা দস্যুরা লুঠ করে ঘরে নিয়ে আসে।” লেখকরা স্বীকার করেন যে, “আমাদের আমেরিকান উপনিবেশগুলো থেকে ধার করা দাসত্বের ধারণাগুলো ইংল্যান্ডে অবস্থানরত আমাদের স্বদেশবাসীদের চোখে দাসত্বের যেকোনো রূপকেই এক ভয়াবহ অশুভ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত করবে,” কিন্তু তারা এও উল্লেখ করেন যে, ভারতে দাসত্বের অবস্থাটি মূলত এক মৃদু ও ঘরোয়া ধরনের অধীনতা মাত্র; এবং তাই, যেসব ব্যক্তি স্বাধীন অবস্থায় পৈতৃক পেশাসূত্রে দস্যু ও সমাজের শত্রু হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের দাসত্বাবস্থায় অবনমিত করাটা কোনো প্রকৃত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না।
নবম প্রবিধানটিতে (Regulation-9) স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, কালেক্টরদের কীভাবে নিপীড়িত ও বঞ্চনার শিকার মানুষদের রক্ষক হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল:
“যেহেতু কোনো দেশের সমৃদ্ধির জন্য ন্যায়বিচার ও প্রতিকার লাভের অবাধ ও সহজলভ্য সুযোগের চেয়ে অধিক সহায়ক আর কিছুই হতে পারে না, সেহেতু কালেক্টরদের সর্বদা ক্ষতিগ্রস্ত বা বঞ্চনার শিকার ব্যক্তিদের আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন। অধিকন্তু, কাছারির কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ, পক্ষপাতিত্ব কিংবা বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কারণে যাতে আবেদনকারীরা ন্যায়বিচার লাভের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন — তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে — কাছারির প্রবেশদ্বারে একটি বাক্স স্থাপন করা হবে; এই বাক্সে অভিযোগকারীরা তাদের সুবিধামতো যেকোনো সময়ে বা মুহূর্তে নিজেদের আবেদনপত্র জমা দিতে পারবেন। এই বাক্সের চাবিটি কালেক্টর স্বয়ং নিজের জিম্মায় রাখবেন; এবং আদালতের প্রতিটি কার্যদিবসে, বাক্সের ভেতর প্রাপ্ত আবেদনপত্রগুলো কাচারির ‘আরিজবেগী’-র (আবেদন-পেশকারী কর্মকর্তা) মাধ্যমে নিজের উপস্থিতিতে প্রস্তুত করে নেবেন।”
১৭৭৩-এর এপ্রিল মাসে, সরকার বাংলা প্রদেশের জন্য একটি ‘সাধারণ ব্যাংক’ (General Bank) প্রতিষ্ঠা করে — এমন একটি পরিকল্পনা, যা সম্পর্কে বিশ্বাস করা হতো যে, এটি “কেবল কোম্পানিকেই দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে তাদের রাজস্বের অর্থ প্রেসিডেন্সিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নয়, বরং ব্যক্তিগত বণিকদেরও ‘আড়ঙ’ (Aurangs)-সমূহে অগ্রিম অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে এবং অন্যভাবে তাদের বাণিজ্যের গতিপ্রবাহ ও আবর্তনকে সহজতর ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে — অত্যন্ত উপযোগিতা ও সুবিধা প্রদান করবে।” তবে, ব্যাংক যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ‘পরিচালক পর্ষদ’ (Court of Directors) সেই পরিকল্পনার প্রতি তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে; ফলে এই পদক্ষেপটি শেষ পর্যন্ত একটি স্বল্পস্থায়ী পরীক্ষামূলক প্রয়াস হিসেবেই প্রমাণিত হয়।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ