এখন প্রশ্ন হলো, গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা সফল হয়েছিল? প্রথমেই বলা যাক ১৭৭৬-এ হেস্টিংস তাঁর শুরুর সময়ের প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সেইসব জরুরি পরিস্থিতির বিশেষ উল্লেখ করতেন, যার অধীনে সার্কিট কমিটি তার নীতি প্রণয়ন করেছিল। ১৭৭৬-এর ২৯শে মে, পরিষদের কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ একটি নথিতে হেস্টিংস লিখেছেন :
“সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভদ্রমহোদয়গণ রাজস্ব নির্ধারণের জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন, তা পেশ করার আগে, তাঁরা যেন দেশের সেই অবস্থার কথা চিন্তা করেন; দুর্ভিক্ষের প্রভাব বিভিন্ন প্রদেশে অসম তীব্রতায় অনুভূত হয়েছিল; কিছু জেলা প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল, অন্যগুলো সেই দুর্যোগে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বাংলার অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল; জমির প্রাচীন ইজারা বা মূল্যায়নের উপর আর নির্ভর করা যেত না; অনেক জায়গায় জনগণের দুর্দশা খাজনা মওকুফের দাবি করছিল, একই সময়ে কোম্পানির জরুরি অবস্থা এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে খাজনা কমানোর সুযোগ দিত না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভদ্রমহোদয়গণ কি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে তাঁরা হ্রাসকৃত কিন্তু ক্রমান্বয়ে বর্ধিত খাজনায় এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জমি ইজারা দিয়ে চাষ করাতেন না? তাঁরা কি নিশ্চিত যে তাঁরা জমির প্রকৃত মূল্য বিচার করার জন্য নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে বেশি যোগ্য বলে মনে করতেন?” যারা তাদের চাষ করার প্রস্তাব দিয়েছিল তারা কি কোনো জমিদার বা কৃষককে, যিনি কুড়ি লক্ষ টাকা রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, জানাতেন যে তিনি পাঁচ লক্ষ টাকা বেশি দিয়েছেন? আর তাদের প্রশাসনের সঞ্চয় ও মিতব্যয়িতা কি তাদের এটা ভাবতে উৎসাহিত করে যে, তারা তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক কম খরচে সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা করতে পারতেন? যখন তারা ঘোষণা করেন যে তারা জনগণের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের দাবি নির্ধারণ করতেন, তখন আমার তাদের জিজ্ঞাসা করার অধিকার আছে যে, কোন নিয়মে তাদের সামর্থ্য নির্ণয় করা যেত? যখন তারা দাবি করেন যে তারা কম রাজস্ব আদায় করতেন, তখন আমার এটা আশা করার অধিকার আছে যে তারা দেখিয়ে দেবেন কীভাবে একই অনুপাতে সরকারি চাকরির পরিমাণ কমানো যেত? যতক্ষণ না এটি করা হচ্ছে, কোম্পানি সম্ভবত তাদের সরকার পরিচালনার পরিকল্পনাকে নিছক অলীক কল্পনা বলে মনে করবে এবং এটিকে ইংল্যান্ডের জাতীয় ঋণ পরিশোধ বা ভূমি কর কমানোর পরিকল্পনার সমতুল্য বলে গণ্য করবে। যদিও হেস্টিংস তাঁর প্রতিপক্ষদের দ্বারা উপস্থাপিত আর্থিক বিবরণীতে অন্যায্যতা তুলে ধরেছিলেন এবং এই কথা অস্বীকার করেছিলেন যে, অনাদায়ী রাজস্বের ধরন থেকে যতটা কম আদায় হওয়ার কথা ভাবা যায়, প্রকৃত আদায় ততটা কম হয়েছিল, যা আংশিকভাবে জমির অতিমূল্যায়নের কারণে ঘটেছিল। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠদের অসঙ্গতি তুলে ধরেন, যারা এক মুহূর্তে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে তিনি ১৭৭২-৭৪-র তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে কম রাজস্ব আদায় করেছেন, এবং পরের মুহূর্তেই তাঁর বিরুদ্ধে দেশের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি আদায় করার অভিযোগ তোলে। ১৭৭৩-৭৪-এ বাংলা ও বিহারের মোট রাজস্বের পরিমাণ ছিল ২,৩০,৭৬,৪১৫ টাকা, এবং এর সাথে লবণ ও আফিম বিক্রি থেকে প্রাপ্ত মুনাফা যোগ করলে তা ২৪৫ লক্ষেরও বেশি হয়। এর তুলনায় পূর্ববর্তী বছরগুলোতে যা অর্জিত হয়েছিল —

১৭৭৫ সালের ৮ই মার্চের কাউন্সিল কার্যবিবরণীর একটি কার্যলিপিতে — যেখান থেকে এই পরিসংখ্যানগুলো সংগৃহীত হয়েছে — হেস্টিংস লিখেছেন :
“এ কথা সত্য যে, জমিগুলো সাধারণত অত্যধিক উচ্চমূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এই অতিরিক্ত মূল্য কোম্পানির জন্য কোনো প্রকৃত ক্ষতির কারণ হতে পারে না, এবং এটি প্রতিরোধ করাও সম্ভব ছিল না। জমিগুলোর উপযুক্ত মূল্য কেবল জমিদার এবং পুরনো ইজারাদারদেরই জানা ছিল; আর তাদের থেকে এ প্রত্যাশা করা যেত না যে, তারা তাদের সেই গোপন তথ্য প্রকাশ করবে। জমির প্রকৃত মূল্য নির্ণয়ের সবচেয়ে সম্ভাব্য পদ্ধতি ছিল সেগুলোকে সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছে ইজারা দেওয়া; এবং নতুন বন্দোবস্ত প্রণয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট ভদ্রব্যক্তিদের চরিত্র বা সততা সম্পর্কে যাতে কোনো বিরূপ সন্দেহের অবকাশ না থাকে — তার জন্য সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত ও একমাত্র উপায় ছিল জমিগুলোর ইজারা সর্বসাধারণের সামনে নিলামে তোলা। তবে এই পদ্ধতি এমন তীব্র প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছিল যে, জমিগুলোর মূল্য সাধারণত প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি ধার্য হয়ে গিয়েছিল — বিশেষ করে নদীয়া [Nadia] জেলায়। যেখানেই এমনটি ঘটেছে, সেখানে ইজারামূল্য হ্রাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে; অর্থাৎ, খাজনার ওপর যে অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়েছিল — যা সম্ভব হলে হয়তো এড়িয়ে যাওয়া যেত — তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সমগ্র প্রদেশ জুড়ে জমিগুলোর প্রকৃত উৎপাদন-ক্ষমতা বা সামর্থ্য সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে; যা বর্তমান বন্দোবস্তের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বন্দোবস্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক হবে।”
সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যরা যখন নির্ভুল পরিসংখ্যানের উচ্চতর অবস্থান থেকে সরে এসে রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীদের দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপ পর্যালোচনায় প্রবৃত্ত হলেন, তখন তাদের অবস্থান খুব একটা নিরাপদ বা সুদৃঢ় ছিল না। আমরা আগেই দেখেছি যে, ‘সার্কিট কমিটি’ (Committee of Circuit) স্পষ্টভাবে এই নির্দেশ জারি করেছিল যে, কালেক্টরদের কোনো ‘বানিয়া’ বা স্থানীয় নির্ভরশীল ব্যক্তিকে রাজস্ব ইজারা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া যাবে না। ১৭৭৫-এর ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখের কার্যলিপিতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যরা এই বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেন; যা মূলত চরম দুর্নীতিমূলক আচরণের দায়ে গভর্নর-জেনারেলের বিরুদ্ধে আনীত একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা অভিশংসন হিসেবেই গণ্য হতে পারে। তাঁরা লিখেছেন :
“যখন আমরা এই কথা জোর দিয়ে বলি যে — বছরে সাড়ে তেরো লক্ষ টাকার জমিদারি ইজারা এবং কোম্পানির বিনিয়োগের জন্য আরও ষোলো লক্ষ টাকার সরবরাহ চুক্তি — একমাত্র নিজেদের লাভের উদ্দেশ্যে গভর্নরের বানিয়া, কিংবা তাঁর পুত্র, অথবা তাঁর ভাইয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না; তখন আমরা প্রভু ও ভৃত্যের স্বার্থের পারস্পরিক যোগসাজশের কোনো স্থূল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হাজির করার দাবি করছি না — কেননা হয়তো তা সম্ভবও নয়। তবে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ (পরিচালক পর্ষদ) নিশ্চয়ই লক্ষ্য করবেন যে, এযাবৎ প্রমাণিত সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রেই বানিয়া হলেন সেই দৃশ্যমান ব্যক্তি, যাঁর নামে তাঁর প্রভু জমিদারি ইজারা বা সরবরাহ চুক্তিগুলো ভোগ করে থাকেন। মি. ফ্লিটউডের বানিয়া হলেন শারিগারের নামমাত্র ইজারাদার; মি. থ্যাকারের বানিয়া সিলেটের ইজারাদার; মি. ক্রিস্টির বানিয়া বাঞ্জোরা ও আপোলের ইজারাদার; এবং মি. বার্টনের বানিয়া বেলোয়ার লবণ-ইজারার ইজারাদার। আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই প্রদেশগুলোতে কোম্পানির মালিকানাধীন মোট জমির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জমি বর্তমানে কিংবা অতি সম্প্রতি ইংরেজ ভদ্রলোকদের বানিয়ারাই ভোগদখল করছে। গভর্নরের বানিয়া তাঁর ইজারা আর চুক্তির বিপুল পরিমাণের কারণে সবার চেয়ে অগ্রগণ্য এবং বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন — রাজশাহী আর বর্ধমানের রানিদের থেকে পাওয়া অর্থের হিসাবখাতায় তাঁর নামে জমা থাকা বিশাল অঙ্কের টাকার কথা তো বাদই দিলাম; যে অর্থপ্রাপ্তির বিষয়টি পর্ষদের সামনে মূল নথিপত্র পেশ করার মাধ্যমে কিংবা সাক্ষীদের শপথবদ্ধ জবানবন্দির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। মি. হেস্টিংস সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা রয়েছে, তা আমাদের এমনটি ভাবতে দেয় না যে — নিজের ভৃত্যের সাথে মুনাফা ভাগ করে নেওয়াটা তাঁর নীতিবোধের পরিপন্থী হতো। তিনি যেভাবে দাবি করেছেন যে — এমনটি করা তাঁর নিজের স্বার্থেরই পরিপন্থী হতো — সেই দাবিটি এতটাই অযৌক্তিক ও অবিশ্বাস্য যে, তা কোনো উত্তরের যোগ্য বলেও আমাদের মনে হয় না।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ