অনেকেই বলেন, হয়ত সেটাই সত্য বলে মনে হয়, মি থ্যাকারে (ডব্লিউ. মেকপি থ্যাকারে — প্রখ্যাত ঔপন্যাসিকের পিতামহ; সিলেটে মি থ্যাকারের পদে এলেন খুবই ইন্টারেস্টিং এক ব্যক্তিত্ব মাননীয় রবার্ট লিন্ডসে — দেখুন – ফার্মিঙ্গার, ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডস অফ সিলেট [অসম সেক্রেটারিয়েট প্রেস]) মূলত জনৈক স্থানীয় প্রতিনিধির ছদ্মনামে সিলেটের রাজস্ব আদায়ের ইজারা নিয়েছিলেন। এ কাজের জন্য তাঁকে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ এবং ‘গভর্নর জেনারেল’ দু’পক্ষের কাছে যে চরম তিরস্কৃত হয়েছিলেন, এ বিষয়টিও নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে থ্যাকারেকে সরকারি নথিতে সচরাচর ‘কালেক্টর’ হিসেবেই অভিহিত করা হলেও, সম্ভবত কিছু কারিগরি অথবা পদ্ধতিগত কারণে ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর আরোপ করা বিধিনিষেধের আওতা থেকে তিনি অনেকটাই মুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে, ক্রিস্টি কিন্তু কালেক্টর ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন জনৈক ব্যক্তিগত বণিক। গভর্নরের বানিয়ান অথবা ব্যক্তিগত দেওয়ানের ওপর নিশ্চিতভাবেই কোনো প্রকার বিধিনিষেধ আরোপিত ছিল না; এবং হেস্টিংস আন্তরিকভাবে অকপট কলমে লিখেছেন:
“পূর্ববর্তী বোর্ডকে আমার ভৃত্য কান্ত বাবুকে ‘বাহারবন্দ’ পরগনা হস্তান্তর মঞ্জুর করতে যেসব কারণ প্রভাবিত করেছিল, সেটা রাজস্ব বিভাগের ১৭৭৪-এর ১২ই ও ১৪ই জুলাইয়ের কার্যবিবরণীতে (Consultations) বিশদে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আমি আপনাদের সেই নথিপত্রগুলো দেখতে অনুরোধ করছি; আপনারা দেখতে পাবেন যে, এটি কোনওভাবেই রানি ভবানীর জমিদারির ছিল না, কিংবা কখনোই তাঁর দখলে ছিল না — বরং এটি ছিল ‘মহল’ বা জেলা, যে অঞ্চল সরাসরি সরকারের অধীনস্থ এবং প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এই জমিদারির হস্তান্তর মঞ্জুরির ক্ষেত্রে আমার ভৃত্যের প্রতি কোনো ধরণের বিশেষ প্রকার অনুগ্রহ প্রদর্শন করা হয়নি; বরং এই ভূখণ্ড হস্তান্তরের মাধ্যমে সরকারেরই লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে — কারন একদিকে দেয় ‘পেশকাশ’ বা নজরানার প্রাপ্তির মাধ্যমে, এবং অন্যদিকে জনৈক অভিজ্ঞ আর বিত্তবান ব্যক্তিত্বের তত্ত্বাবধানে থাকার সুবাদে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পাওয়া নিরাপত্তার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। কাউন্সিলের আদেশের সময় থেকেই মঞ্জুরিপত্র বা ‘সনদ’টি প্রস্তুত হয়ে আমার কাছেই রাখা থাকলেও, তা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি; এবং স্বাভাবিকভাবেই, ‘পেশকাশ’-এর অর্থও পরিশোধ করা হয়নি — কারণ আমি নতুন কাউন্সিল গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এর চূড়ান্ত অনুমোদন বা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। চলতি মাসের ১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত তাঁদের পৃথক বৈঠকে কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা কান্তবাবুকে এই ভূখণ্ড মঞ্জুরি থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; তবে এর পেছনে তাঁরা কী কারণ দর্শাবেন, তা তাঁরা নিজেরাই এখনো খুঁজে পাননি। অবশ্য তাঁরা এর একটা কারণ উল্লেখ করেছেন — তা হলো – যে ব্যক্তির নামে এই মঞ্জুরি প্রদান করা হয়েছিল, নথিপত্রে তাঁকে বিত্তবান আর বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল; কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সী বালক। ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের নিশ্চয়ই নতুন করে বলে দিতে হবে না যে, হিন্দুদের (Gentoos) মধ্যে এটি একটি চিরাচরিত প্রথা যে, তাঁরা তাঁদের সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ আর চুক্তিপত্র তাঁদের পুত্রসন্তানদের নামেই নিবন্ধন করে থাকেন। এই মঞ্জুরির ক্ষেত্রে নামমাত্র জমিদার হিসেবে উল্লিখিত ‘লোকনাথ নন্দী’ হলেন কান্তুবাবুরই পুত্র; এবং সেই বর্ণনার মাধ্যমে বোর্ড মূলত তাঁকেই (কান্তবাবুকেই) নির্দেশ করতে চেয়েছিল।”
হেস্টিংস আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি কান্তবাবুকে তাঁর ইজারা নেওয়া অনেকগুলো জমিদারি বা ‘ফার্ম’ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন; তিনি বলেন যে, “তাঁর (কান্তবাবুর) ইজারা নেওয়া অনেকগুলো জমিদারিই আমার অগোচরে গ্রহণ করা হয়েছিল, এবং প্রায় সবকটিই গ্রহণ করা হয়েছিল আমার পরামর্শের বিরুদ্ধে।” হেস্টিংস আরও জানান, কান্তবাবুকে জমিদারি ইজারা নেওয়া থেকে বিরত রাখার কোনো ক্ষমতা তাঁর (হেস্টিংসের) ছিল না; এবং প্রকৃতপক্ষে, তাঁর (হেস্টিংসের) এখানে আসারও আগের সময় থেকেই কান্তবাবু তাঁর তালুকগুলোর দখলদার হিসেবে বহাল ছিলেন। (দেখুন অনুচ্ছেদ ২৭, বাংলার উদ্দেশ্যে কোর্টের সাধারণ পত্র, ১৫ই এপ্রিল, ১৭৭৬, Para 27, General Letter of the Court to Bengal, 15th April, 1776)
১৭৭৮-এর ৪ঠা মার্চের সাধারণ পত্রে, কোর্ট অফ ডিরেক্টরস (পরিচালক পর্ষদ) তাদের ৭৭তম অনুচ্ছেদে লিখলেন –
“১৭৭৭-এর ৫ই ফেব্রুয়ারির পত্রে আপনাদের জানানো হয়েছিল যে — যদিও অতীতের অপব্যবহার বা অনিয়মগুলোর কঠোর পর্যালোচনা করার চেয়ে ভবিষ্যতের অনিষ্ট প্রতিরোধ করাই আমাদের অধিকতর কাম্য ছিল — তবুও, আমাদের সামনে উপস্থাপিত কিছু কিছু ঘটনায় আমরা চরম দুর্নীতি এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করেছি; তাই অপরাধীদের সম্পূর্ণ শাস্তিহীন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াকে আমরা অন্যায় বলে গণ্য করেছি। এই কারণে, আমরা আপনাদের এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমোদন দিয়েছিলাম যা আপনারা সেই পরিস্থিতিতে উপযুক্ত বলে মনে করবেন। একই সাথে আপনাদের এও জানানো হয়েছিল যে — যদি প্রয়োজন হয় — তবে আমাদের যেসব কর্মচারী অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণে জড়িত ছিলেন, কোম্পানি বা সংস্থার স্বার্থে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারে আপনাদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে, আমরা তাঁদের মূল চুক্তিনামাগুলো (covenants) আপনাদের কাছে ফেরত পাঠাব। এখন, বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করে আমরা এতদ্বারা নির্দেশ দিচ্ছি যে — কোম্পানির স্থায়ী আইনজীবী ও সলিসিটরের মতামতের ভিত্তিতে (যা ১৭৭৭-এর ৫ই ফেব্রুয়ারির বার্তায় আপনাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল) — আপনারা অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকাচারে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়ের করুন: যারা ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর সদস্য ছিলেন (অথবা তাঁদের প্রতিনিধি ছিলেন); এবং মি. গ্রুবার, মি. বারওয়েল, মি. বার্টন, মি. শীলস-এর প্রতিনিধিগণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্য সকল উপযুক্ত পক্ষ। এই মামলার উদ্দেশ্য হলো — কোম্পানির স্বার্থে — উপরে উল্লিখিত বিভিন্ন ব্যক্তি বা তাঁদের যেকোনো একজনের মাধ্যমে অর্জিত সমুদয় সুবিধা বা অর্থের পরিমাণ পুনরুদ্ধার করা; যা তাঁরা ঢাকা জেলা বা বাংলার প্রদেশের অন্য যেকোনো স্থানে লবণ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি, লবণ সংগ্রহের ব্যবস্থা, কিংবা লবণের জমি বা খামার ইজারা দেওয়ার সূত্র ধরে বা সেই বাবদ অর্জন করেছিলেন।”
“৭৮. উপরে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়ে আমাদের সলিসিটরের প্রতিবেদন (যা আমাদের স্থায়ী কাউন্সেলের অনুমোদিত) আপনাদের কাছে ইতিমধ্যেই প্রেরণ করা হয়েছে; এবং এই পত্র আপনাদের হতে আসার আগেই — আমরা বিশ্বাস করি — আমাদের অ্যাডভোকেট-জেনারেল স্যার জে ডে-এর আগমনের ফলে, উক্ত মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনারা তাঁর সহায়তা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকবেন।”
হেস্টিংসের প্রারম্ভিক পদক্ষেপগুলোর সাফল্যের বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বিবরণ পাঠ করাটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হবে। তিনি লিখেছেন: —
“রাজস্ব আদায়ের দপ্তরগুলো কলকাতায় স্থানান্তরের সপক্ষে কমিটির কার্যবিবরণীতে যে-সব যুক্তি লিপিবদ্ধ রয়েছে, তার সাথে যুক্ত করার মতো নতুন কোনো কথা আমার নেই। এই পরিবর্তনের ফলে আমার কর্মভার বা পরিশ্রম অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত এই পরিবর্তনের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ আমার রয়েছে। মুর্শিদাবাদে অবস্থিত ‘বোর্ড অফ রেভিনিউ’ বা রাজস্ব পর্ষদটি — যদিও কোম্পানির অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত ছিল — তবুও এর গঠনকাঠামোতে পরিবর্তন আনার পূর্বে, এটি প্রেসিডেন্সির গভর্নর ও কাউন্সিলের চেয়েও অধিকতর শক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ ছিল। কলকাতা এখন বাংলার রাজধানী এবং এই প্রদেশের প্রতিটি সরকারি দপ্তর ও প্রশাসনিক দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু হলো এই শহর।” “বিভিন্ন দপ্তরের কার্যপ্রণালী এখন সম্পূর্ণরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং এত বড় একটি আমূল পরিবর্তনের পর যতটা সুষ্ঠুভাবে কাজ চলার প্রত্যাশা করা যেতে পারে, ঠিক ততটাই সুশৃঙ্খলভাবে বর্তমানে দাপ্তরিক কাজকর্ম পরিচালিত হচ্ছে। আমরা রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যাবলি পরিচালনার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করাও সমীচীন মনে করেছি — যার জন্য একটি পৃথক কাউন্সিল ভবন, একজন সচিব এবং একজন কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে; এবং আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে এ কথা যুক্ত করতে পারি যে, এই বিভাগটি বর্তমানে এতটাই সুশৃঙ্খল ও সুসংহতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যেন মনে হয় এটি জব চার্নকের আমল থেকেই বিদ্যমান ছিল।” (গ্লেগ : মেমোয়ার্স অফ দ্য লাইফ অফ দ্য রাইট অনারেবল ওয়ারেন হেস্টিংস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭১)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ