[চলছে অনুবাদ। অনুবাদের ভিতরে প্রথম () ব্রাকেট ব্যবহৃত হয়েছে ফার্মিঙ্গারের দেওয়া সূত্র উল্লেখে। আর তৃতীয় ব্রাকেট [] ব্যবহার করেছি অনুবাদকের মন্তব্য জোড়ার জন্য।
বহুকাল ধরে অনুবাদ করা কেলি ফার্মিঙ্গারের সম্পাদনায় ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদনের ১০তম কিস্তি গত কাল এই সাইটে প্রকাশ করলেন সদ্য মাতৃহারা সম্পাদক জ্যোতিদা। এরকম নিরস বহু কাজ তিনি অবলীলায় প্রকাশ করেছেন বছরের পর বছর। তাঁকে ধন্যবাদ জানাব না।
তো ফিফথ রিপোর্টের মূল টেক্সট অনুবাদ করার আগে আমার ৯টা কিস্তির মুখবন্ধ ছাড়াও আরও কিছু বলার আছে সেটা বন্ধুদের জন্য লিখলাম। কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য বলছি না, এই কন্টেন্ট কিন্তু সবার জন্য না, অর্থাৎ সবার ভাল লাগার বিষয় নয় — ১৮১৩-র আগের ১৩০-৪০ বছরের কোম্পানির চালচলন, তর্ক, রাজনীতি, অর্থনীতির হার্ডকোর ইতিহাসে যার উৎসাহ আছে তাদের জন্যই।
আমার মত অপ্রাতিষ্ঠানিক অনুবাদকের লেখা যারা পড়ছেন, মন্তব্য করছেন দয়া করে, তাদের প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা।
একটা বিষয় বোঝা দরকার কেলি ফার্মিঙ্গার যে রিপোর্ট সম্পাদনা করছেন, সেই ফিফথ রিপোর্ট কিন্তু তৈরি হচ্ছে আঠারো শতের শেষে উনিশ শতের শুরুতে ইংলন্ডের ভদ্রবিত্ত, উচ্চবিত্ত, অভিজাত, অইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্পোরেটদের মধ্যে কোম্পানির একচেটিয়া বিরোধী প্রবল সেন্টিমেন্টের মধ্যেই। ১৭৭০-এর দশকে আমেরিকার ১৩টা কলোনি হারাবার পরে, বাংলা-চিন লুঠকর্মকে খুব সিরিয়াসলি নিয়ে সেই সম্পদে প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠা লন্ডনের বাইরের জেলার কর্পোরেটরা, বন্দরের সঙ্গে জুড়ে থাকা স্বার্থের ব্যক্তি, সঙ্ঘ চায় কোম্পানির হাত থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বাজার দখলদারির হাত বদল — তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। এই প্রবল কোম্পানি বিরোধিতার ধোঁয়া আমরা আগের অনুবাদকের মুখবন্ধগুলোয় — বিশেষ করে একদিনের পার্লামেন্টের বিতর্কে দেখিয়েছি।
তো এই বিরোধিতার আবহাওয়াতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে বিংশ শতকের শুরুতে কলকাতায় বসে কেলি ফার্মিঙ্গার ফিফথ রিপোর্ট সম্পাদনার প্রথম অধ্যায় শুরু করছেন পলাশীকে ডিমিস্টিফাই করে। বলেছেন এই যুদ্ধ আদতে যুদ্ধই না — স্রেফ চক্রান্ত – আমরা উপনিবেশ বিরোধী অবস্থান থেকে যে কথা বলে থাকি — সেটা তিনি অক্লেশে বলছেন ‘এই বক্তব্য আপনাদের অপমানজনক বলে মনে হলে আমার কিচ্ছু করার নেই’ — পরেও এরকম অনেক কিছু বলবেন। পলাশী নিয়ে তাঁর বক্তব্য এই অনুবাদ পর্বের শুরুতেই পাবেন। রিপোর্ট প্রকাশের একশ বছরের মাথায় বেঙ্গল পাস্ট এন্ড প্রেজেন্টস পত্রিকার সম্পাদক কেন এই রিপোর্ট সম্পাদনার কাজ নিজের হাতে তুলে নিয়ে বৈপ্লবিক মন্তব্য করছেন, সেই অবস্থানটি আমাদের বুঝতে হবে — বিশেষ করে আমরা যারা ডিজিটাল প্লাটফর্ম পুঁজির যুগে বসে ইওরোপে বিশেষ করে লন্ডনে পুঁজি সঞ্চয়ের প্রথম পর্বটা বোঝার চেষ্টা করছি। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলায় পরে অন্য অঞ্চলে লুঠ পর্ব না এলে ডিজিটাল পুঁজির আবির্ভাব হওয়া বেশ কঠিন ছিল।
আমায় যেহেতু অনুবাদের জন্য গোটা রিপোর্টটাকে মাইনিউটলি পড়তে হয়েছে, দেখেছি ফার্মিঙ্গার বাক্য গঠনে নির্দিষ্ট শব্দবন্ধের মোচড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রাইড বজায় রেখেও, সাম্রাজ্য স্বার্থে বিন্দুমাত্র আঁচড় না লাগিয়েও, বিভিন্ন ইস্যুতে কোম্পানিকে বেলআউট করেও, অনেকটা কোম্পানির বেশ কিছু কাজকর্ম বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন। ঠিক যেমন সিপাহি লড়াইএর পর অক্ষয় কুমার দত্ত কোম্পানিকে ব্যাপক গালিয়েছিলেন আর রাণীকে তোল্লাই দিয়েছিলেন — ফার্মিঙ্গার এতটা প্রকাশ্য নয় — কারন ফার্মিঙ্গার তো আর অক্ষয় দত্তের মত উপনিবেশিক কোলাবরেটর নন, ফার্মিঙ্গার স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যকে ডিফেন্ড করার দায় নিয়ে ফিফথ রিপোর্ট সম্পাদনা করছেন। তো অক্ষয় দত্ত ‘প্রাচীন হিন্দুগণের সমুদ্র যাত্রা’য় লিখছেন ‘ভারত ত বহুদিন হইতেই পরহস্তগত হইয়েছে, কিন্তু নরপিশাচ নাদের শাহ ও উচ্ছৃঙ্খল আরঙ্গজেবের ন্যায় শাসকগণ ও সর্ব্বগ্রাসী [ইওরোপিয়] বণিকদিগের হস্ত হইতে যে নিস্কৃতি পাইয়া মহারাণীর হস্তে আসিয়াছে, ইহা ভারতবাসী অল্প সৌভাগ্যের বিষয় নয়। মহারাণীর কালে আমাদিগের কোন কোন বিষয়ে যে প্রভূত উন্নতি হইয়াছে, তাহার সন্দেহ নাই’। দত্তজা যখন বাংলায় বৌদ্ধিকভাবে অপদস্থ কোম্পানিকে গালি দেওয়ার কাজে সক্রিয়, সে সময়কার ফার্মিঙ্গারেরা দত্তজাদের মত নবজাগরণীদের কাকে গালানো হবে আর কাকেই বা তৈলমর্দন করতে হবে, সেই পথ দেখাচ্ছিলেন; কোম্পানির আমল শেষ, কোম্পানির প্রতি দায়বদ্ধতা শেষ, এবার নতুন সময়, নতুন কাঠামো, নতুন বস। তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার শত বছর যুগের শুরুয়াত।
এর আগে ৯টা ভূমিকায় বিশদে বলেছি কোম্পানির বিরোধীদের অবস্থান। এবং কেন সেটাও বলেছি।
কিন্তু একই সঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ারে লন্ডনের শেয়ার বাজারে বিপুল বিনিয়োগ করে রাখা ভদ্রবিত্ত, জাহাজ কর্পোরেট — যারা কোম্পানিকে জাহাজ ভাড়া দিত, বাণিজ্য কর্পোরেট — যারা কোম্পানির হয়ে নানান কাজ করে দিত, কোম্পানির আমলাদের ব্যবসা দেখত — যাদের আমরা সওদাগর, মার্চেন্ট বডি বা এজেন্সি হাউস নামে চিনি — তারা বিপুলভাবে কোম্পানির অস্তিত্ব নির্ভর ছিল। সরকারের ওপর তাদের চাপ ছিল। তবে তাদের থেকেও দক্ষিণ এশিয় উপনিবেশে কোম্পানির লুঠ, গণহত্যা আর স্বাধীনতার দাবি নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা ওপর আরও আরও বেশি করে নির্ভর করত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পরিচালকেরা। ১৮১৩-য় সনদ নবীকরণের আগে যদিও বাঙলা থেকে বিপুল পরিমান অর্থ লুঠ করছে কোম্পানির বকলমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ভদ্রবিত্ত আর কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে থাকা কর্পোরেটরা — কিন্তু তাদের সেই কাজ তখনও শেষ হয়ে যায় নি — এটা জানত সাম্রাজ্যের কর্তারা।
আমরা যেন মাথায় রাখি, দক্ষিণ এশিয়ার ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ ১৮১৩-য় নতুন করে জারি করার ঠিক ১০ বছর আগে ১৮০৩-এ লর্ড লেক বাহিনী দিল্লি দখলের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভূখণ্ড আদৌ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না, সে বিষয়ে কোম্পানি আর সাম্রাজ্যের কর্তারা নিশ্চিত ছিল না — বিশেষ করে ১৭৯৯তে টিপুকে হারাবার আগে পর্যন্ত সময় পর্যন্ত। ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে মাত্র ১০ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার একটা বড় অংশ দখল করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে এই ভূখণ্ডের গোটা বাজার দখলের অধিকার নতুন সনদে কেড়ে নেওয়া একটা ইস্যু, কিন্তু কোম্পানিকে ক্ষমতা থেকে সরাসরি উচ্ছেদ করে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে খুব প্রুডেন্ট সিদ্ধান্ত হবে না, সেটা কোম্পানির কর্তারা, রাষ্ট্র পরিচালন কর্তাদের বোঝাতে পেরেছিলেন – কারন সাম্রাজ্য কর্তারা জানতেন, মেট্রোপলিটনে কোম্পানির মত এশিয়াকে আর কেউ চিনত না।
তাছাড়া মাথায় রাখতে হবে ১৮১৩-র বছরই আমেরিকার আগ্রাসী মনরো ডক্ট্রিন জারি করার বছর; আমেরিকায় ইওরোপিয় শক্তিগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তারের সুযোগ প্রায় বন্ধই হয়েগিয়েছিল; উত্তর হেমিস্ফিয়ারে তার হাত বাঁধা পড়েগিয়েছিল বলেই দক্ষিণ গোলার্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে কোম্পানির হাত থেকে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া স্রেফ হারাকিরির নামান্তর ছিল। উপনিবেশে এবং মেট্রোপলিটনের কেন্দ্র, লন্ডনে বসে কোম্পানির স্বার্থ বুঝে নেওয়ার বিষয়টা পার্লামেন্টে নেতৃত্ব দিচ্ছিল কোম্পানির এমপিরা। ফলে ১৮১৩-য় পার্লামেন্টের ক্ষমতাবানেরা যুযুধান দুপক্ষের দাবিই মানলেন — কর্পোরেটদের জন্য কোম্পানির হাত থেকে ভারতের বাজারের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে লন্ডনের বাইরের কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হল, আর কোম্পানিকে শাসন ক্ষমতায় রেখে দেওয়া হল আরও বড় লুঠ প্রক্রিয়া, কোলাবরেটর তৈরি প্রক্রিয়া চালানোর উদ্দেশ্যে — যে কাজ তারা অক্লেশে সমাধা করবে আরও সাড়ে চার দশক।
এই প্রেক্ষতেই আপনাদের ফার্মিঙ্গারের সম্পাদনা করা ফিফথ রিপোর্ট পড়তে হবে। একেবারেই হার্ডকোর ইতিহাস; যাদের কোম্পানির সারভাইভ্যাল, পলাশী, আর তারপরে কোম্পানির কনসোলিডেশন, আইন, রাজস্ব আদায়ের তাত্ত্বিক লড়াইএর খুঁটিনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাসে দিলচস্পি আছে এই অনুবাদ শুধুই তাদের জন্য। প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার অনুবাদে ফিরে যাচ্ছি]
ভূমিকা।
প্রথম অধ্যায়।
বিজয় এবং সার্বভৌমত্ব।
‘Men and nations start with a vague notion of being rich, or great, or good. Each step they make brings unforeseen chances into sight, and shuts out older vistas, and the specifications of the general purpose have to be daily changed. What is reached in the end may be better or worse than what was proposed, but it is always more complex and different.’ William James: Pragmatism, p. 141
‘মানুষ্য সমাজ এবং জাতি [রাষ্ট্র] ধনী, বা মহান, বা ভালো হওয়ার একটি অস্পষ্ট ধারণা নিয়ে [পথ চলা] শুরু করে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ অপ্রত্যাশিত সুযোগ দৃশ্যমান করে, পুরনো দৃশ্যপট হঠিয়ে দেয়, এবং সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো তাকে হররোজ পরিবর্তন করতে হয়। তার শেষ অর্জন, প্রস্তাবিত লক্ষ্যের চেয়ে ভালোও হতে, খারাপও হতে পারে, কিন্তু সেই অর্জন সবসময় আরও জটিল এবং অন্যরকম হয়ে থাকে।’ উইলিয়াম জেমস: প্র্যাগমাটিজম, পৃ. ১৪১।
পলাশীর যুদ্ধ চিরকালই মহান ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গণ্য হতে বাধ্য; তবুও, ইংরেজ বাহিনীর সাফল্যের পেছনে অবদান রাখা সমস্ত কারন খুঁটিয়ে বিবেচনা করার পর মন খুলে স্বীকার করতেই হবে, ১৭৫৭-র ২৩শে জুনের এই বিজয় লর্ড ক্লাইভের চমৎকার সামরিক খ্যাতিতে একটাও নতুন গর্বের পালক যোগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াটসের চক্রান্ত সিরাজ-উদ-দৌলার নামী অভিজাত সঙ্গীদের নিষ্ক্রিয় না করে রাখলে, ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী আক্রমণে জন্য আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেই, অর্ধচন্দ্রাকারে অশ্বারোহী বাহিনী সাজিয়ে অপেক্ষা করা মীর জাফর এবং রায় দুর্লভের হাতে দয়ার পাত্র হয়ে কচু কাটা হত। (এস. সি. হিল: বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-৫৭ (ইন্ডিয়ান রেকর্ডস সিরিজ), খণ্ড ২ এবং ৩) তবে আমার স্পষ্ট মনে হয়, ক্লাইভের মত সেনাপতি তার ছোট সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে হারার ঝুঁকি নিতেন না; এবং তিনি মীর জাফরের প্রতিশ্রুতিতেও ভরসা করেন নি। তাঁর দিনলিপিতে পাচ্ছি, সিরাজের বাহিনীকে তিনি রাতে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। (লেফটেন্যান্ট কর্নেল এন. জে. উইলসনের হিস্ট্রি অফ দ্য মাদ্রাজ আর্মি (১৮৮২)) মাথায় রাখতে হবে এই [রাতে ঝটিকা আক্রমণের] রণকৌশল মুঘল সেনাপতিরা সাধারণত অনুসরণ করতেন না [অর্থাৎ তাদের রণকৌশল শক্ষার অংশ ছিল না]; ফলে এই যুদ্ধকৌশল মোকাবিলায় সামরিক ব্যবস্থা নিতে তারা অনঅভ্যস্ত ছিলেন। জলাভূমি পেরিয়ে বীরত্বপূর্ণ দৌড়ের সিদ্ধান্তে, ফল নির্ধারণ করা প্রবল আক্রমণের ঝড় উঠেছিল ক্লাইভের সাময়িক অনুপস্থিতিতে কিলপ্যাট্রিকের আদেশে এবং এই নির্দেশ ক্লাইভের পূর্বনির্ধারিত রণনীতিকে অনুসরণ করে নি – এবং সেই নির্দেশ একবার কার্যকর হওয়ার পর আর প্রত্যাহার করা যায় নি।
এক কথায় বলা যায়, পলাশী যুদ্ধের ফল, ক্লাইভের সমর প্রতিভার যোগ্য প্রতিফলন নয়; তবে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি দক্ষ হাতে সামলানোর কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য, সন্দেহ নেই। পলাশীর যুদ্ধের প্রতিঘাত ছিল তীব্র—বিশেষ করে নবাবের সাহসী ফরাসি জোটবন্ধুদের জেতার প্রবল চেষ্টাও ছিল — তবুও পলাশী কোনওভাবেই তাঁর মহান সামরিক কৃতিত্বের ভাগিদার নয়। (একে ‘পলাশীর পরাজয় বলুন, কারণ একে যুদ্ধ বলা চলে না।’ স্যার এ. লায়াল: রাইজ অফ দ্য ব্রিটিশ ডমিনিয়ন ইন ইন্ডিয়া, পৃ. ১০৭) আপাতদৃষ্টিতে আমার বক্তব্য অপমানজনক মনে হলেও, আমি কিন্তু নতুন ধারণার বলছি না। ১৭৬৭-তে লুক স্ক্র্যাফটনের জবাবে ভ্যান্সিটার্ট বলেছিলেন ‘তিন হাজার সৈন্য নিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সেনাপতি কল্পনাও করেননি ইংরেজরা আদৌ কখনও পনেরো হাজার সৈন্যের একটি সেনাবাহিনী সদৌ গড়তে পারবেন।’ (স্ক্র্যাফটন; অবজারভেশনস অন মিস্টার ভ্যান্সিটার্টস ন্যারেটিভ, লন্ডন, তারিখবিহীন) ব্ল্যাকহোলের নায়ক ফোর্ট উইলিয়ামের প্রাক্তন গভর্নর হলওয়েল (মীর জাফরের সাথে সিরাজ-উদ-দৌলার সম্পর্ক নিয়ে প্রভূত এবং অদ্ভুত সব অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি) ১৭৫৭-র পলাশীকে নির্ণায়ক যুদ্ধ মনে করতেন না –‘ Let it in the first place be remembered that, howsoever happy in its consequences the defeat at Plassey proved to individual sufferers, the means by which it was obtained should rather be forgot, nor should you blazon that defeat with the semblance of a military act of prowess, which was solely owing to the treason and treachery of Roydullob (Rai Durlabh) and Mir Jaffier, two of Surajah Dowlah’s generals, the highest in office as well as in the confidence of their master; thus betrayed no glory would have been reflected on our arms, had the defeat been achieved with one fourth of the men then under Lord Clive’s command. His Lordship’s established character of a brave officer stands not in need of any false lustre to be cast upon it; nor will you, I believe, Sir, receive his thanks for this wanton folly.’(পলাশীর পরাজয়ের ফল ব্যক্তিগতভাবে হেরোদের জন্য যতই সুখকর হোক না কেন, যে উপায়ে এই জিত অর্জিত হল, সেটা বরং ভুলে যাওয়া উচিত, এবং একে সামরিক বীরত্ব হিসেবে জাহির না করাই মঙ্গলজনক; এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল সিরাজ-উদ-দৌলার দুই সর্বোচ্চ পদাধিকারী এবং প্রভুর বিশ্বস্ত সেনাপতি রায় দুর্লভ এবং মীর জাফরের চরম বিশ্বাসঘাতকতায়; এইভাবে বিশ্বাসঘাত করে বিজয়ী হওয়া আমাদের অস্ত্রের গৌরব প্রতিফলন নয়, এমন কি এই পরাজয় যদি লর্ড ক্লাইভের অধীনে এক-চতুর্থাংশ সৈন্য দিয়েও অর্জিত হতো, তাও এই বিজয় গৌরব হিসেবে গণ্য করা সমস্যার। সাহসী অফিসার হিসাবে লর্ডশিপের প্রতিষ্ঠিত চরিত্রে মিথ্যা আভা ফেলার কি কোনও প্রয়োজন আছে? আমি বিশ্বাস করি, স্যার, এই অর্থহীন মূর্খতার জন্য আপনি বিন্দুমাত্রও তাঁর ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য নন)।’(An Address from John Zephaniah Holwell, Esq. to Luke Scrafton, Esq. in Reply to his Pamphlet, entitled-’ Observations on Mr. Vansittart’s Narrative.’ London, 1767, pp. 12-13. — আমি মনে করি, মীর জাফরকে সিরাজ-উদ-দৌলার অন্যতম সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করাটা বড় ভুল — মিস্টার জে. ডব্লিউ. ফোরটেস্কিউ-এর সামরিক ইতিহাসের ১৬০ পৃষ্ঠার একটি অনুচ্ছেদ সম্পর্কে এই যুক্তিতে আপত্তি তোলা গেল)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ