[গত কিস্তিতে এবং শুরু থেকেই কেলি ফার্মিঙ্গার স্পষ্ট বলেছেন, তিনি মনে করেন পলাশী কোনও যুদ্ধই না এবং একে যুদ্ধ আখ্যা দেওয়া ক্লাইভের পক্ষে গৌরবের কাজ না। যদিও এই যুদ্ধবলে তিনি আইরিশ পিয়ারেজে খুব সহজে প্রবেশলাভ করেছেন এবং ব্রিটিশদের মনে স্থায়ী আসন পেয়েছেন। এবং তিনি আরও স্পষ্ট মনে করেন, ইতিহাস যে সামরিক দৃষ্টিতে লেখা হোক না কেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে দক্ষিণের রাজ্যগুলো [ফিফথ রিপোর্টের সে অংশ তিনি সম্পাদনা করছেন সেটি যেহেতু বাঙলা অঞ্চলেরই প্রতিবেদন তাই তিনি দক্ষিণের অঞ্চলে জমিদারির নাম উল্লেখ করেছেন, বিশদ মন্তব্য করেন নি, বাঙলা নিয়ে প্রভুর তথ্য দিয়েছেন এবং সেসব তথ্য সারা বইতে ছড়ানো] বম্বে আর বাংলায় ধারাবাহিক জমিদারির অধিকার এবং তার এলাকা বিস্তারের ফলে। তিনি আগের কিস্তি থেকেই লিখছেন কেন তিনি এই সিদ্ধান্তে এলেন যে ইংরেজরা শুধুই অস্ত্রের জোরে নয় [যদিও তিনি বলছেন ব্রিটিশ রাজার দেওয়া সনদ অনুযায়ী, আক্রান্ত হলে নিজেদের বাহিনী এবং রাজার বাহিনীও ব্যবহারের অনুমতি তাদের ছিল] বরং আইনিভাবে মুঘলদের থেকে প্রথমে কলকাতা, তারপর পলাশীর পর বাঙলার অন্য অঞ্চলে জমিদারি এবং ১৭৬৫তে বাংলা-বিহার-ওডিসার দেওয়ানি অধিকার অর্জনের প্রশাসনিক উদ্যমের বিস্তৃতির সাফল্যে ভারতের শাসক হয়]
প্রথম দৃষ্টান্তটিতে ফেরা যাক। আমাদের লক্ষ্য করা দরকার, দিল্লিতে সারমান দৌত্য, যে ভূখণ্ড সরকারের থেকে অধিগ্রহণ করতে চেয়েছিল, সেটার আইনি কাঠামো কোম্পানির সার্বভৌম ক্ষমতায় পরিচালন করার মতো এলাকা ছিল না, বরং জমিদারি প্রথার শর্তে ধারণ করার মতো এলাকা ছিল, অর্থাৎ মুঘল সম্রাটের অধীনস্থ হিসেবে ধারণ করার মতো ভূখণ্ড। ‘আটত্রিশটি গ্রাম’ (গ্রাম অর্থে বর্তমান ব্রিটিশ সূত্রে নয়, বরং একে রাজস্বদায়ী একক হিসেবে গণ্য করতে হবে) ছিল কোম্পানির ইতিমধ্যে অধিগ্রহণ করা ‘তিনটি শহর’ — সুতানুটি, কলকাতা এবং গোবিন্দপুর জমিদারি অঞ্চল সম্প্রসারণের উদ্যোগ। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিত জমা দিয়ে, কোম্পানি, জমিদার হিসেবে, অধিকার পাওয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করা বাসিন্দাদের থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারবে। মুঘল কোষাগারে নির্ধারিত অংশ অর্থ জমা দেওয়া এবং জমির দখলদারদের থেকে কোম্পানির আদায় করা মোট অর্থের পার্থক্যই কোম্পানির উদ্ভূত মুনাফা। এই মুনাফা কোম্পানি নিজের প্রশাসন পরিচালনার জন্য ধরে রাখার অনুমতি পেয়েছিল। অন্য কথায়, কোম্পানি তাদের তিনটি শহরের সংলগ্ন আটত্রিশটি গ্রামের রাজস্বের ইজারাদার [ইজারা অর্থ রাজস্ব চুক্তি। মুঘল আমলে ইজারা ব্যবস্থা বহাল ছিল। এ সময়ে রাজস্ব চুক্তিকারী, ইজারাদার বা মুসতাজির নামে পরিচিত ছিলেন। মুঘল আমলের আঠারো শতকের প্রথমার্ধে খালসা বা খাস জমিও ইজারা প্রথার অধীনে আনা হয়। মুঘল সম্রাটরা অবশ্য খাস জমি ইজারা দেওয়া নিয়ে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না এবং সার্বিকভাবে এ সময়ে ইজারা ব্যবস্থা অনেকটাই গণ্ডিবদ্ধ ছিল। সম্রাট বাহাদুর শাহ-র মৃত্যুর পর ইজারা ব্যবস্থা, বাংলা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করে। এ ব্যবস্থা রাজস্ব আদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে মধ্যবর্তী নতুন শ্রেণির সৃষ্টি হয়, যাঁরা পরবর্তী কালে বাংলায় জমিদার হিসেবে পরিচিত হবেন — বাংলাপিডিয়া] হতে চেয়েছিল। জমিদার হিসেবে কোম্পানি কেবল ভূমি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতাই পেত না, বরং রাস্তা আর সেতু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটানোর জন্য কমবেশি হালকা শুল্ক আরোপ করার এবং আনুষঙ্গিকভাবে তার এখতিয়ারের মধ্যে থাকা ঘাট (নদীর খেয়াঘাট) ও বাজার থেকে শুল্ক আদায় করে যথেষ্ট মুনাফা করার সুযোগ পেত। তাছাড়া জমিদার হিসেবে সে দেওয়ানি বিষয়েও বিচার ক্ষমতা পেত, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ভোগ করত। কিন্তু, জমিদার হিসেবে যেহেতু কোম্পানি, মুঘল সাম্রাজ্যের এখতিয়ারে থাকত এবং তার বিশেষাধিকার কেড়ে নেওয়ার শাস্তির ভয় থাকত, তাই সে বিভিন্ন দপ্তর সুশাসন দেওয়ার জন্যও দায়ী থাকত। জমিদারি অধিকার অর্জনকে ‘ভূখণ্ড’ অধিগ্রহণ হিসেবে উল্লেখ করা নিঃসন্দেহে ভুল, কিন্তু এই ভুলটি তাদের অধীনে থাকা জমি সম্পর্কে তাদের মানসিকতার পরিচয় দেয়। অতএব, এই সময়ে কোম্পানি পরিচালকদের মনে নিঃসন্দেহে যে ধারণা ছিল এবং যা বাংলায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল, সে সব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
(১) পশ্চিম ভারতে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, ‘মহাদজি সিন্ধিয়া, নিজেকে প্যাটেল পরিচয়ে ভূষিত ভারত অধিপতি হয়েছিলেন।’ [মহাদাজি শিন্ধে বা সিন্ধিয়া প্রখ্যাত মারাঠা সেনাপতি, রাজনীতিবিদ। তিনি গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া রাজ্যকে বিশালভাবে বাড়িয়েছিলেন এবং ১৮ শতকের শেষের দিকে ভারতে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠেন। প্যাটেল আদতে জমিদার বা ঐতিহ্যবাহী গ্রাম [রাজস্বদায়ী ভূখণ্ড] প্রধান, স্থানীয় বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা এবং সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের প্রতীক, বিশেষ করে পশ্চিম ভারতে (মহারাষ্ট্র/গুজরাট অঞ্চল)] সঙ্গত কারণে বলা যেতে পারে যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেকে জমিদার পরিচয়ে সক্রিয় থেকে পরবর্তীকালে ভারতজোড়া সাম্রাজ্য তৈরি করতে পেরেছিল। কোম্পানি ব্যক্তিগতভাবে দুঃসাহসী সংগঠন ছিল না, বরং সে ছিল ব্রিটেনে সনদপ্রাপ্ত আইনগতভাবে নিবন্ধ পাওয়া সংস্থা। সে গ্রেট ব্রিটেনের সার্বভৌমের দেওয়া নির্দিষ্ট কিছু সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিল। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যবসা করতে এসে সেই অঞ্চলের সরকারের থেকে যে সুবিধাই অর্জন করুক না কেন, তাদের মালিকরা প্রয়োজনে অস্ত্রের জোরে সেটা ধরে রাখতে চেয়েছিল; কারণ ১৬৮৩-র সনদ অনুযায়ী ব্রিটেনের রাজা কোম্পানিকে ‘দুর্গ, অঞ্চল এবং বাগিচাকে যেকোনো বিদেশী আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ অথবা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রক্ষা করার জন্য সামরিক আইন ব্যবহার করার’ (to use martial law for the defence of the said forts, places, and plantations against any foreign invasion or domestic insurrection or rebellion) ক্ষমতা দিয়েছিল। এমনকি জমিদারি অধিকার লাভের বিষয়টিও ইংল্যান্ডের কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে অবিলম্বে “কোনো প্রতিবেশী ক্ষুদ্র শাসকের আগ্রাসন থেকে সেগুলোকে রক্ষা করার” সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল, এবং কালক্রমে, সিরাজ-উদ-দৌলার কলকাতা দখলের উন্মত্ত সামরিক আগ্রাসনের পর, কোম্পানি প্রমাণ করেছিল যে মুঘল সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধাগুলো ধরে রাখার জন্য তারা ব্রিটিশ রাজার সামরিক সম্পদের ওপর নির্ভর করতে পারে। ইংরেজরা তাদের দখলি সত্ত্বকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য মুঘল সনদ ও ফরমান দেখালেও মনে রাখা দরকার কোম্পানির কর্তারা জমিদারি স্বত্বে হস্তান্তর করা জমিকে ‘ভূখণ্ড’ বা ‘সম্পত্তি’ হিসাবে উল্লেখ করে স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে মুঘল আইন প্রক্রিয়ায় পাওয়া অধিকারগুলো প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেই বজায় রাখতে হবে। যদি বলতেই হয় বাংলায় ইংরেজদের দখল, মুঘল আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছিল, তাহলে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, কোম্পানি বা [ব্রিটিশ] সাম্রাজ্যের জন্য আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব অর্জনে যুদ্ধ না হলেও, কূটনৈতিক বা আইনি নিষ্পত্তির আড়ালে দেশের একটি বাস্তব বিজয় ছিল, অর্থাৎ দেশীয় সামরিক শক্তির ওপর ব্রিটিশ সামরিক শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এই অর্থে বলা যেতে পারে যে পলাশী ও বক্সার ‘ইংল্যান্ডের জন্য বাংলা সুরক্ষিত করেছিল।’
(২) বাংলা বিষয়ে পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গি যে অন্য দুটি প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক কাজকর্মের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বোম্বাই নিয়ে খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই অঞ্চলটা ছিল প্রকৃত অর্থেই ‘সম্পত্তি’, কারণ এটি বোম্বাই ক্যাথরিন অফ ব্রাগাঞ্জার বিবাহের যৌতুকের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে এবং রাজা এই অঞ্চলটা কোম্পানির অধিকারে দিয়েছিলেন। আবার দক্ষিণ ভারতে কোম্পানি কালিকটের জামোরিন, গোলকোন্ডার রাজা, বিজয়নগর রাজাদের বংশধর ইত্যাদি শাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুদানের অধীনে জমি ধারণ করত, এবং ডাচদের সাথে প্রাথমিক লড়াই এই সম্পত্তিগুলোর অনেকগুলোকে শক্তি প্রয়োগ বা আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দখলের রূপ দিয়েছিল। পরবর্তীকালে, পরিচালকদের চোখে মাদ্রাজে ইংরেজদের অধিকার আদতে ফরাসিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ফল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ