১৭৭৩-এর রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৫-এ পাস হয়ে সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার প্রতিষ্ঠিত হলে, হেস্টিংস আরও সাহসী এবং অধিকতর উপযোগী পথ অবলম্বন করবেন। এটি ৭ই ডিসেম্বরের কাউন্সিল কার্যবিবরণীতে তার লিপিবদ্ধ করা কার্যবিবরণীতে নির্দেশিত হয়েছে : —
‘সমস্ত রাজনৈতিক কৌশল সেই ক্ষমতাকে গোপন করতে পারে না যার দ্বারা এই প্রদেশগুলো শাসিত হয়, এবং সমস্ত কূটতর্কের কৌশলও এর দায়িত্ব নবাবের ওপর স্থানান্তর করতে পারবে না, যখন এ তথ্য সূর্যের আলোর মতোই স্পষ্ট যে এই অধিকারগুলো আমাদের নিজস্ব সরকারের কর্তৃত্ব থেকে উদ্ভূত হয়, এবং প্রমান করে যে নবাব একজন নিছক নামমাত্র শাসক, যার কাছে কর্তৃত্ব প্রকাশের সামান্যতম প্রতীকও নেই, এবং তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিও কোম্পানির সুপারিশ এবং তাদের নিজস্ব কর্মচারীদের সুস্পষ্ট মনোনয়নের মাধ্যমে নিযুক্ত হন। ২৯শে আগস্ট, ১৭৭১-এর কোর্ট অফ ডিরেক্টরসের আদেশে নবাবের জন্য একজন নামমাত্র মন্ত্রী নিয়োগ করা হয় এবং যার অধীনে সাম্প্রতিক ব্যবস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে, এবং সেই আদেশ হাউস অফ কমন্সের মুদ্রিত কার্যবিবরণীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইওরোপের প্রতিটি জাতির কাছে সেটি বর্তমানে উন্মুক্ত।’ (১৭৭৫-এর ১৮ই অক্টোবরে বৈঠকে ক্ল্যাভারিং, মনসন এবং ফ্রান্সিস এক মিনিট পেশ করেন। এই মিনিটে দেশীয় সরকারের দুর্বলতা এবং গুরুত্বহীনতায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল; বলা হচ্ছে ‘এই ব্যবস্থা থেকে সরে আসার ফলে যে ক্ষতিকর পরিণতি হয়েছে, তা প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল আগে থেকেই অনুমান করতেপেরেছিলেন। মন্ত্রীর পদ পূরণ করার জন্য একজন বিশ্বস্ত এবং যোগ্য ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল, যিনি আমাদের প্রভাবে, সমর্থনে এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণে থেকে নাবালক নায়েবের প্রতিনিধিত্ব ও তার পক্ষে কাজ করতে পারতেন, তার অভাবে দেশের সরকার, যাকে সমর্থন করা কোম্পানির ধারাবাহিক নীতি, এমন এক দুর্বল ও গুরুত্বহীন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, তা তার নিজের প্রজা, এমন কি বিদেশিদের কাছেও তরল রূপ ধারণ করেছে।’)
গত অর্ধশতাব্দী ধরে অ্যাংলো-ভারতীয় ইতিহাসের যে সব ছাত্র জেমস মিল এবং লর্ড মেকলের ভুল ব্যাখ্যা ও অপবাদের বিরুদ্ধে হেস্টিংসের প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তারা নানকুমারের [নন্দকুমার] মৃত্যুদণ্ড, রোহিলা যুদ্ধ, সদর দেওয়ানি আদালতে ইম্পের নিয়োগ, চৈত সিংয়ের ওপর দাবি ইত্যাদি নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার বিস্তারিত তদন্তেই নিজেদের সময় পুরোপুরি ব্যয় করেছেন। বিচ্ছিন্ন এই সব ঘটনা নিয়ে কাজ করার ফলে হেস্টিংসের যে সব নীতি বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সে সবের চরিত্র পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা সম্ভব ছিল না। [ফিলিপ] ফ্রান্সিস এবং তার বন্ধুবর্গের সম্পর্কে এই মূল্যায়ন হয়তো স্বাভাবিকও নয় এবং হয়ত পুরোপুরি অযৌক্তিকও নয়, আদতে তারা সেই সময়ে যে হিংস্র আর অনৈতিক পথ অনুসরণ করেছিলেন, এখন সেই সব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়। যে সব ব্যক্তি তৎকালীন বাংলার নথি বিশেষভাবে অধ্যয়ন করেছেন এবং ফ্রান্সিসের কাজকর্মের পদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষভাবে পরিচিতও, তারা ছাড়া অন্য কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, কাউন্সিলের বৈঠকে এই সংঘাত কীভাবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের সমগ্র কাঠামো প্রায় ধূলিসাৎ হবার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। সেই সংঘাতে বিশুদ্ধ ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপূরণের উদ্দেশ্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, মনে হওয়াই স্বাভাবিক, এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ফ্রান্সিস তার মহান প্রতিপক্ষকে [হেস্টিংস] ধ্বংস করে, সেই ধ্বংসস্তুপের ওপর নিজের ভাগ্য গড়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি যদি ধরেই নি ফিলিপ ফ্রান্সিসের প্রাপ্য, তা সত্ত্বেও ঐতিহাসিকের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা স্পষ্টতই পর্যাপ্ত হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত নয়। হেস্টিংস এবং ফ্রান্সিসের মধ্যে সংঘাত ছিল নীতি সম্পর্কিত, এবং সেই নীতিগুলোর মধ্যে সার্বভৌম ক্ষমতা সংক্রান্ত নীতি মোটেও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
যে কার্যবিবরণীতে হেস্টিংস নবাবকে ‘একটি নিছক পুতুল’ বলে উল্লেখ করেছেন, সেটি আমরা আগেই উদ্ধৃত করেছি। পালটা মত আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় ১৭৭৫-এ সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচারের আসা দুটো মামলার ঘটনাপ্রবাহ সূত্রে—জাল গহনার বন্ধক সংক্রান্ত নানকুমারের বিরুদ্ধে বিখ্যাত অভিযোগের শুনানির কিছুদিন পরেই এই ঘটনা ঘটেছিল। এই মামলাগুলো এখানে কেবল ততটুকুই উল্লেখ করা হচ্ছে, যতটুকু বাংলার সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পর্কিত মতামত প্রকাশ করে। মামলাগুলো হলো:
(১) জোসেফ ফোক [Joseph Fowke], ফ্রান্সিস ফোক, মহারাজা নানকুমার এবং রায় রাধা চরণ বনাম ওয়ারেন হেস্টিংস এস্কোয়্যার-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলা।
(২) রিচার্ড বারওয়েলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে জোসেফ ফাউক, মহারাজা নানকোমার এবং রায় রাধা চরন। (বিচারগুলোর রিপোর্ট দেখুন ১৭৭৬-এ ‘T. Cadell in the Strand’-এ। নন্দকুমারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর, আলেকজান্ডার এলিয়টকে (প্রথম লর্ড মিন্টোর ছোট ভাই) ষড়যন্ত্র মামলার এবং জালিয়াতির অভিযোগে নন্দকুমারের বিচারের পাণ্ডুলিপি প্রতিবেদনসহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এই প্রতিবেদনগুলো টি. ক্যাডেল জন্য মুদ্রিণ করেছিল, এবং শেষোক্ত বিচারের শিরোনাম পৃষ্ঠায় এই কথাগুলো লেখা আছে: ‘বাংলার সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকাচারের কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রকাশিত’)
১৭৭৫-এর ২১শে জুন, যখন এই বিচারগুলোর শুনানি শুরু হয়, তখন নিম্নলিখিত চিঠিটি আদালতের সামনে পেশ করা হয়েছিল : — (The Trial of Joseph Fowke, Francis Fowke, Maha Raja Nundocomar, and Roy Radha Churn, for a Conspiracy against Warren Hastings, Esq., and that of Joseph Fowke, Maha Raja Nundocomar, and Roy Radha Churn for a Conspiracy against Richard Barwell, Esq. London, 1776, p. 2। এখানে কেবল নবাবের তথাকথিত সার্বভৌমত্বের বিষয়ে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামতের চিত্র তুলে ধরার জন্য মামলাটি আলোচনা করা হয়েছে। ডাচরা ১৭৮৫-র আগস্টে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সরাসরি উত্থাপন করেছিল। See Bengal: Past & Present, vol. ix, p. 252):
রাজস্ব বিভাগ,
ফোর্ট উইলিয়াম।
২০শে জুন, ১৭৭৫।
স্যর এলিজা ইম্পে, নাইট, প্রধান বিচারপতি, এবং ফোর্ট উইলিয়ামের সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকাচারের অন্য বিচারপতির সমীপে
মহোদয়গণ,
তদ্বারা আমরা নবাব মুবারক উদ দৌলার উকিল রায় রাধা চরণের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে পেশ করা একটি স্মারকলিপির অনুলিপি আপনাদের কাছে প্রেরণ করার সম্মান লাভ করছি, যেখানে তিনি জানিয়েছেন যে সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকাচারে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
যেহেতু এই ব্যক্তি এই প্রদেশগুলোর সুবার উকিল বা সরকারি প্রতিনিধি, তাই আমরা মনে করি যে তিনি আন্তর্জাতিক আইন এবং ইংল্যান্ডের সংবিধিবদ্ধ আইন দ্বারা রাজপুত্রদের প্রতিনিধিদের জন্য অনুমোদিত অধিকার, বিশেষাধিকার এবং দায়মুক্তি পাওয়ার অধিকারী। অতএব, আমরা তার পক্ষে সেই অধিকারগুলো দাবি করছি; এবং আমরা চাই যে তার বিরুদ্ধে প্রক্রিয়াটি বাতিল করা হোক, এবং যারা এই ধরনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ও কার্যকর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। (অবশ্যই গভর্নর-জেনারেলের এই শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না, এবং এই ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কার্যকর করার ব্যক্তিরা ছিলেন আদালতের বিচারপতিবর্গ! বিচারপতিরা গভর্নর জেনারেল এবং কাউন্সিলের কাছ থেকে এই মর্মে একটি হলফনামা চেয়েছিলেন।)
আমরা আপনাদের বিশ্বস্ত ও অনুগত সেবক,
জন ক্ল্যাভারিং, জর্জ মনসন, ফিলিপ ফ্রান্সিস।
এই চিঠিটি প্রদানের পর আবারও নিয়মিত পদ্ধতির কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২৮শে জুন, নবাবের সার্বভৌম ক্ষমতা হিসেবে তার অবস্থান এবং তার উকিলের জন্য দাবি করা দায়মুক্তি প্রসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কোম্পানির আইনজীবী মিঃ ফেরার বলেন–
আমি প্রমাণ করব যে নবাব মুবারক-উদ-দৌলা সার্বভৌম শাসক, এবং যে সকল বিষয়ে ইংল্যান্ডের আইন তার অবস্থা [অধিকার] পরিবর্তন করেনি, সেগুলো বিষয়ে তিনি অবশ্যই সার্বভৌম শাসক আছেন। তিনি সমগ্র রাজ্যে ফৌজদারি বিচারকার্যবিধি পরিচালনা করেন এবং এই সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডাদেশে স্বাক্ষর করেন। তিনি স্মরণাতীত কাল থেকে রাষ্ট্রদূত প্রেরণের অধিকার প্রয়োগ করে আসছেন। তার একটি রাজকীয় টাকশাল আছে এবং তিনি মুদ্রা তৈরি করেন। তিনি একটি সৈন্যদলকে বেতন দিয়ে রাখেন। এই সমস্ত পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি সার্বভৌম শাসক। আমি প্রধান বিচারপতির সেদিনকার একটি মন্তব্যের কথা আরও উল্লেখ করতে চাই, ‘একজন শক্তিশালী শাসকের রাষ্ট্রদূত তার ক্ষমতার কারণে অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন না।’ অতএব, আরও জোরালোভাবে বলা যায়, সুবার বর্তমান দুর্বলতা এই যুক্তির কারণ হতে পারে না যে তার রাষ্ট্রদূতরা বিশেষাধিকার পাবেন না; বরং সেই কারণেই মহামান্য রাজার বিচারালয় থেকে তাদের সুরক্ষা পাওয়া উচিত। যদি নবাব সার্বভৌম না হন, তবে আমি জানতে চাইব কে সার্বভৌম। অন্য ইওরোপীয় বসতিগুলো নবাবের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে; এবং আমাকে বলা হয়েছে যে, প্রদেশগুলোর মধ্যে সংঘটিত কোনো অসদাচরণের জন্য জনৈক ফরাসি বর্তমানে কারারুদ্ধ রয়েছে। নবাব সার্বভৌম নন—এই দাবি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির জন্ম দেবে। এছাড়া এই সাবি সম্ভবত আমাদের এবং প্রদেশগুলোয় বসতি স্থাপনকারী বিভিন্ন ইওরোপীয় জাতির মধ্যে যুদ্ধের কারণ হবে। যদি সার্বভৌমত্ব কোম্পানির ওপর ন্যস্ত থাকে, তবে প্রদেশগুলোর মধ্যেকার সমস্ত বিরোধ অবশ্যই আমাদের নিষ্পত্তি করতে হবে। নবাব যে স্বশাসিত সার্বভৌম শাসক, সেই বিষয়টি হলফনামা দিয়ে প্রমাণ সম্ভব না; যদি তার প্রজা তাকে সার্বভৌম হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সেটাই যথেষ্ট। (উদ্ধৃত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৬ এবং ৭)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ