মাননীয় স্যার এলিজা ইম্পে, নাইট,
রবার্ট চেম্বারস স্টিফেন লেমাইস্ট্রে জন হাইড
এস্কার্স, সুপ্রিমের বিচারকগণ বিচার আদালত।
ফোর্ট উইলিয়াম, ৩রা জুলাই, ১৭৭৫
ফোর্ট উইলিয়াম,
৩রা জুলাই, ১৭৭৫-
মাননীয় মহাশয়গণ,
আমরা আপনার অবগতির জন্য নবাব মুবারক উদ দৌলার থেকে সদ্য পাওয়া এক চিঠির অনুবাদ পাঠাচ্ছি; এই চিঠি থেকে বোঝা যাবে যে, তিনি নিজেকে এই প্রদেশগুলোর সুবাহদার এবং রায় রাধা চরণকে তাঁর উকিল বলে মনে করেন। বিচারকের আসন থেকে প্রকাশ্যে নবাবের সার্বভৌমত্ব অস্বীকৃতির ঘোষণা আমরা কোন দৃষ্টিতে বিবেচনা করব, সে বিষয়ে অনুগ্রহ করে আমাদের অবহিত করবেন, যাতে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা স্বাক্ষর বিষয়ে কোনো পরিস্থিতি উদ্ভূত হলে আমরা কীভাবে কাজ করব, সেটা জানতে পারি, অথবা বিদেশি কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে ফরাসি জাতিকে, কী উত্তর দেব, সেটা বুঝতে পারি। ফরাসিরা তাদের স্বাধীনতার দাবি আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সেই একই যুক্তি উপস্থাপন করছে, যা স্যার এলিজা ইম্পে ব্যবহার করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি, যে এই দেশে দ্বৈত শাসন নেইফলে, প্যারিস চুক্তি বলে নির্ধারিত অঞ্চলের বাইরে বাস করা তাদের প্রজাদের বিরুদ্ধে জারি করা দেওয়ানি আদালতের কার্যক্রম হলো ফরাসি জাতির বিরুদ্ধে ইংরেজ জাতির প্রত্যক্ষ আক্রমণের সামিল।
যদি সত্য সত্যই সুপ্রিম কোর্ট মুবারক উদ দৌলার সার্বভৌমত্বের অধিকার আদৌ স্বীকার না করে; সেই প্রেক্ষিতে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে চাই, প্রধান বিচারপতি এবং মহামান্য রাজার অন্য বিচারকেরা নিশ্চই বুঝবেন, কেবল দেশে শান্তি আনার জন্যই নয়, সম্রাট এবং দেশে বসবাসকারী ইওরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে চলতি শান্তির পরিবেশ বজায় রাখার জন্য, দেশের সার্বভৌমত্বের অধিকার কার হাতে ন্যস্ত হবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আমাদের সন্দেহ দূর করুন। আমরা বুঝতে পারছি, সাম্প্রতিক কালে সংসদের প্রণীত আইন বলে, সেইসব স্থানীয় অধিবাসীরা ব্রিটিশ আইনের এখতিয়ারে আসবে, যারা তাদের বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ বা নালিশ উত্থাপিত হওয়ার সময় কোম্পানির বা ব্রিটিশ প্রজাদের চাকরিতে নিযুক্ত ছিল বা রয়েছে। আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, যদি বিশেষভাবে বর্ণিত ব্যক্তিদের ওপর রাজার সার্বভৌমত্ব প্রসারিত হয়েছে বলে স্বীকারও করা হয়, তবুও আমাদের ধারণা, এর ফলে বাংলা, বিহার এবং ওডিসার বাকি স্থানীয় অধিবাসী অন্তর্ভুক্ত হবে না।
আমরা, মাননীয় মহাশয়গণ,
আপনাদের একান্ত অনুগত সেবক, জে. ক্ল্যাভারিং,
জিও. মনসন,
পি. ফ্রান্সিস।
রায় রাধা চরণের বিচার ১৭৭৫-এ বাংলায় সার্বভৌম ক্ষমতার প্রশ্ন নিয়ে অন্তত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, ফিলিপ ফ্রান্সিসের তৎকালীন অবস্থান স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে। পরের বছর, ফ্রান্সিস বাংলার রাজস্ব আদায় নিয়ে জন্য তাঁর বিখ্যাত পরিকল্পনা পেশ করেন। এই পরিকল্পনায়, তিনি নৈতিক দিক থেকে এবং প্রয়োগের দিক থেকে চলতি সমস্যাগুলোর রাষ্ট্রনায়কোচিত সমাধানের পথে যে বহু বৈচিত্র্য রয়েছে তার উপর আলোকপাত করেন। একদিকে “দেওয়ান হিসাবে রাজস্ব আদায় এবং শুল্ক প্রদানের উপর জোর দেওয়ার কোম্পানির অধিকার (যে সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসা সম্ভব নয়) পেয়েছে সম্রাটের ফরমান সূত্রে। তারা তাঁর নামে মুদ্রা তৈরি করলেও, নিজেদের নামে শান্তি চায়, যুদ্ধও করে।” (Original Minutes of the Governor-General and Council of Fort William on the Settlement and Collection of the Revenues of Bengal, with a Plan of Settlement, recommended to the Court of Directors, in January, 1776. By Philip Francis, Esq. London, pp 27-28.)। On the other “we have a Supreme Court of Judicature resident at Calcutta whose writs run through every part of the three provinces in His Majesty’s name, indiscriminately addressed to British subjects, who are bound by their allegiance, or to the natives, over whom no right of sovereignty on the part of the King of Great Britain has yet been claimed or declared.” (অন্যদিকে, আমাদের কলকাতায় অবস্থিত সুপ্রিম কোর্ট অফ জুডিকেচার রয়েছে যার আইনি ক্ষমতা বলে জারি করা আদেশ মহামান্য সম্রাটের নামে তিন প্রদেশের প্রতিটি অংশে কার্যকর হয়; এই আদেশগুলো আনুগত্যের দ্বারা আবদ্ধ নির্বিচারে ব্রিটিশ প্রজাদের প্রতি জারি করা হয়, অথবা স্থানীয়দের প্রতিও এই আদেশ কার্যকর হয়, অথচ তাদের উপর গ্রেট ব্রিটেনের রাজার সার্বভৌমত্বের অধিকার এখনও দাবি বা ঘোষণা করা হয়নি।)।’ এরপর তিনি জোর দিয়ে বলেন:
“While these contradictions are permitted to subsist, the actual government of these provinces must continue to be an arbitrary succession of acts of power without right, flowing from different sources and excluding every idea of unity, regularity, or system. It would be absurd to propose a plan for the internal govern-ment of the country, without taking it for granted in the first instance that ere long it will be determined, whether the natives of Bengal are to acknowledge one Sovereign, and be subject to one Government; or whether they are to be left in their present state, divided between their native prince, claiming the rights of Subadar, whose government they tell us ‘they are engaged by solemn stipulation to support’ — the Emperor, whose rights, as Lord Paramount, inherent in the constitution of the Empire, have been for a number of years acknowledged by the Company; — the Presidency of Fort William, who hold by the sword by agreement with the Nabob, as they do the purse by grant from the Emperor; and lastly a Court of Judicature, exercising an unlimited jurisdiction through the provinces, in the name of the King of Great Britain.” (ফ্রান্সিস : গভর্নর-জেনারেলের কার্যবিবরণী, ইত্যাদি, পৃষ্ঠা ২৮। নবাবের তথাকথিত সার্বভৌম অধিকার সংক্রান্ত বিতর্কের সাথে জড়িয়ে থাকা আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল। হেস্টিংস নবাবকে প্রাপ্তবয়স্ক ঘোষণা করার মুহূর্তে ১৭৭৫-এ ক্লেভারিং, মনসন এবং ফ্রান্সিসের ভোটে নিযুক্ত হওয়া মহম্মদ রেজা খানকে নায়েব সুবার পদ থেকে অপসারণ করেন। আমি মূল লেখায় এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা আবশ্যক মনে করিনি, কারণ রায় রাধা চরণ মামলার উদ্ধৃতি দিয়েই ফ্রান্সিস পক্ষের অবস্থান তুলে ধরার ফলে আমার উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এই ঘটনার সূত্রেই বার্ক, ধরেই নিচ্ছিই তিনিই ১৭৮২-র সিলেক্ট কমিটির নবম প্রতিবেদনের লেখক, এক অনুচ্ছেদ লিখেছেন যা ১৭৭৫-এ ফ্রান্সিসের পক্ষে নবাবের জন্য দাবি পেশ করার সাথে সম্পর্কিত, বেশ তাৎপর্যপূর্ণও বটে: ‘বাংলার দেওয়ানি (বা রাজস্বের সার্বজনীন সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা) কোম্পানির হাতে আসা, এবং একই সঙ্গে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে, নবাব বা গভর্নর নির্ভরশীল নবাব নয় বরং প্রজার স্তরে নেমে আসেন। তবুও, তার এতটাই অধীনতা সত্ত্বেও তার ক্ষমতা রক্ষা, এবং একই সাথে ফৌজদারি বিচার আর জনশৃঙ্খলার দায়িত্ব যুক্ত রাখা বুদ্ধিমান এবং প্রশংসনীয় নীতি। এর ফলে সরকারের একটি অংশ স্থানীয়রা সম্মান দিয়েই রেখেছিল; এবং অবস্থার পরিবর্তনের সময় এই সম্মান বোধ তাদের শান্ত রেখেছিল, এবং সেই বিশাল রাজ্যকে একটি বিজিত দেশের বিপজ্জনক রূপ ধারণ করা থেকে, এবং তারও বেশি, ভয়াবহ অবস্থায় অধঃপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল।’)
এত কিছুর পর এখন প্রমাণিত হয়েছে যে হেস্টিংসের সময় প্রচলিত ধারণা ছিল ‘দিল্লির সম্রাটের দানের ভিত্তিতে, তার রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল পদ এবং এখতিয়ারের প্রকৃতি অনুসারে’ কোম্পানি সম্পত্তি ধারণ করত। শাহ আলমের সাথে লর্ড ক্লাইভের চুক্তি অনুসারে সম্রাটের রাজস্বের অংশ হিসেবে প্রাপ্য বার্ষিক ছাব্বিশ লক্ষ টাকা সম্রাটকে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ১৭৭৪-এ হেস্টিংস অস্বীকার করেন (এই অস্বীকৃতি ছিল ১৭৬৮-র ১১ই নভেম্বরের বাংলা সুবায় পাঠানো এক সাধারণ চিঠিতে কোর্ট অফ ডিরেক্টরসের নির্দেশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সম্রাট মারাঠাদের হাতে পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন)। তাদের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, ফ্রান্সিস এবং তার মিত্ররা এই প্রত্যাখ্যানকে নিজের মধ্যে আলোচনায় অন্যায্য এবং এর পরিণতিতে নিষ্ঠুর বলে নিন্দা করেছিলেন।
কাউন্সিল বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা নবাবের সার্বভৌম অধিকারের পক্ষে জোরালোভাবে তোলা মত থেকে বোঝা যায় যে, ইংরেজরা সামরিক শক্তিতে দেশ জয়ের ব্যাপারে কতটা অসচেতন ছিল। ফ্রান্সিস এবং তার দলবল বাস্তবে ভেরেলস্টের ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গিই অনুসরণ করেছিলেন, অন্যদিকে হেস্টিংসের সমগ্র প্রশাসনই ভেরেলস্টের এই দাবির একটি প্রকাশ্য অস্বীকৃতি ছিল যে, ‘আমরা সুচিন্তিত নীতির অনুমতির চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর হতে পারি না।’ হেস্টিংসের এই স্বীকারোক্তির চেয়ে আর কিছুই স্পষ্ট হতে পারে না যে, ১৭৭২-এ বিচার ব্যবস্থার তার গঠনমূলক সংস্কারগুলো ‘উক্ত নবাবের সাথে পরামর্শ না করেই বা তার সম্মতি না নিয়েই’ করা হয়েছিল। যদি ‘বিজয়’ বলতে এক সামরিক শক্তির দ্বারা অন্য সামরিক শক্তিকে প্রতিস্থাপন করার ফলস্বরূপ সার্বভৌম অধিকারের হস্তান্তর বোঝায়, তবে বাংলার ইংরেজ শাসনকে একটি বিজয়ের ফলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলাটা ভাষার অপপ্রয়োগ হবে না।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ