[আমরা এই পর্বে নতুন এক আলোচনায় প্রবেশ করলাম। ফার্মিঙ্গার মূলত হেস্টিংসের প্রবল বিরোধীপক্ষ ফিলিপ ফ্রান্সিসের আইনইআকবরির পাঠ এবং মুঘল আমল নিয়ে ফ্রান্সিসের ধারণা সার্বিকভাবে বুঝতে চেষ্টা করছেন। তিনি বলছেন ফ্রান্সিসের মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে ভাবনাটা সরাসরি সাম্রাজ্য স্বার্থ বিরোধী। ১৭৭৬-এ ফিলিপ ফ্রান্সিস কোন আইনি আকবরির সংস্করণ দেখেছিলেন জানি না – অন্তত কেলি ফার্মিঙ্গার জানেন না। ফ্রান্সিস মুঘল আমল নিয়ে ব্যাপক বৈপ্লবিক উক্তি করছেন। আমি বলতে চাইছি আমাদের সামনে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে যে নির্মাণ উপস্থাপন করা হয়েছে ফিলিপ ফ্রান্সিস তার অনেকটাই উল্টো ভাবনা ভাবছেন। হাবিব-তপন-মুসভি তো মুঘল রাষ্ট্রকে লেভিয়াথান, লুঠেরা পর্যন্ত আখ্যা দিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ফ্রান্সিস গ্ল্যাডউইনের আইনইআকবরি (মূলত ভাবানুবাদ) ১৭৮৩-৮৬র আগে প্রকাশিত হয় নি। অর্থাৎ ফিলিপ ফ্রান্সিস অন্য কোনও সংস্করণ দেখেছিলেন। কোনটা? কৌতুহল রইল।
ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদনের এই বিশতম পর্বে দেখুন, ফিলিপ ফ্রান্সিসের মুঘল আমল নিয়ে বক্তব্য আর ফার্মিঙ্গারের সমালোচনা – চলবে পরের কিস্তি পর্যন্ত। আমি ফ্রান্সিসের মিনিট Minutes of the Governor General and Council, etc. এর আগে পড়িনি। কেন পড়িনি অনেকটা বিদ্বেষ বশে – উপনিবেশিক ইতিহাসে ফ্রান্সিসকে মূলত ভিলেন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, ফিফথ রিপোর্ট ব্যতিক্রম নয় – এর আগে প্রথম যুগের উপনিবেশ বোঝার চেষ্টায় আমিও অন্য কিছু ভাবি নি। এই অনুবাদটা শেষ হলে সময় নিয়ে ফ্রান্সিসের মিনিট নিশ্চিতভাবে পড়ব এবং আবশ্যিকভাবে অনুবাদও করব। অন্তত মুঘল আমল নিয়ে তার নতুন ভাবনায় ফিলিপ ফ্রান্সিস, আমাদের বাধ্য করেন, এই ছয় দশক কিছু শিখেছি এই উপনিবেশিক পড়াশোনায়, তার সব কিছু এই বুড়ো বয়সে বসে আনলার্ন করতে উদ্যোগী হতে। কেলি ফার্মিঙ্গারের যুক্তি ফিলিপকে ভুল বোঝানো হয়েছে, বা তিনি ফারসি জানতেন না বলে ভুল বুঝেছেন।
আদতে ফার্মিঙ্গার ফ্রান্সিসের যে উদ্ধৃতি তুলছেন হিরো হেস্টিংসের কাজকর্ম প্রতিষ্ঠা করে ফিলিপ ফ্রান্সিসকে বদনাম করার জন্য, সে উক্তি চরম বৈপ্লবিক, এবং মুঘল সময় নিয়ে আমাদের বর্তমান জ্ঞানের বিপরীত। ১৯১০এ কলকাতায় বসে ফার্মিঙ্গারকে দেখাতেই হবে বেনিভলেন্ট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তুলনায় মুঘলেরা ছিল ভয়ঙ্কর অত্যাচারী। ফিলিপ ফ্রান্সিসের মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কাঠামো নিয়ে এই ধারণা সত্য হলে তার ফিফথ রিপোর্ট সম্পাদনার প্রজেক্ট ডিরেলড হয়ে যায় – অনুবাদক]
১৭৭৬-এ ফিলিপ ফ্রান্সিস আকবরের নীতিকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে আশা করেছিলেন এই মুঘল প্রশাসনিক কাঠামো ইংরেজরা বাংলায় সার্বিকভাবে গ্রহণ করবে। তিনি কোন আইন-ই-আকবরী সংস্করণ দেখেছেন এবং সেি পুথি থেকে মন্তব্য উল্লেখ করেছেন, এই অনুবাদক পর্যন্ত জানে না। ফেলি ফার্মিঙ্গারের বক্তব্য সেই বই সম্পর্কে ফ্রান্সিসের জ্ঞান সম্ভবত পরোক্ষ এবং অসম্পূর্ণ ছিল, কারণ অনুমান করা যায় যে তিনি ফারসি জানতেন না, এবং মাথায় রাখতে হবে আবুল ফজলের সেই গ্রন্থটির গ্ল্যাডউইনকৃতঅনুবাদ (স্রেফ ভাবানুবাদ), একটিমাত্র পাণ্ডুলিপির ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল, এবং ১৭৮৩-এর আগে প্রকাশিত হয়নি। আকবরের বঙ্গ বিজয়ের গভীরতা প্রমাণকারী ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে তিনি স্বাভাবিকভাবেই অনবহিত ছিলেন। ভারতের ভূমি রাজস্ব কৃষকের শস্যক্ষেতের ফসলের একটি অংশে শাসকের বহু প্রাচীন অধিকারকে প্রতিনিধিত্ব করে, এবং ভারতীয় ভূমি রাজস্বকে বিজয়ের অধিকার বলে দাবি করা ‘খাজনা’ হিসেবে গণ্য করে – এই বিষয়টি উপেক্ষা করে ফ্রান্সিস বললেন ভূমি রাজস্বের হার নির্ধারণ সরকারের প্রকৃত ব্যয়ের অনুমানের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত, জমি বা তার উৎপাদনের স্থির, এমনকি আনুমানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নয়। এই রাস্তায় তিনি যুক্তি দিলেন:
‘মহম্মদীয় শাসকদের আরোপিত রাজস্ব ব্যবস্থা বিষয়ে সংযম এবং তাদের রাজস্ব সংগ্রহের সরল পদ্ধতির ফলে তারা তাদের বিজিত অঞ্চলগুলো সহজেই দখলে রাখতে পারতেন। যদিও তাদের সরকারের রূপ ছিল স্বৈরাচারী; কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে, এই সরকারের নীতি বিজিত জনগণের ওপর নিপীড়নমূলক ছিল না। সাধারণভাবে, তারা সরকারে এসে সেনাবাহিনী এবং সার্বভৌম শাসকের নাম ছাড়া অন্য কোনো পরিবর্তন আনেননি। রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়ে, বর্তমান সরকারের পদ্ধতি নীতিগতভাবে যা হওয়া উচিত তার সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে; এবং, আমি বিশ্বাস করি, অন্য কোনো সরকার কখনও এই পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। জমির প্রাকৃতিক মালিকদের হাতে জমি পরিচালনার ভার ছেড়ে দেওয়া এবং তাদের থেকে উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ দাবি করার পরিবর্তে, আমাদের নিজেদের জমি পরিচালনার ভার নেওয়া উচিৎ এবং কৃষকদের হাতে কর তুলে দিই। সরকার জমিদারের স্থলাভিষিক্ত হতে হবে।’ (Francis: Minutes of the Governor General and Council, etc., pp. 30-31। ফ্রান্সিস লিখেছেন: ‘মুঘল সরকারের নীতি ও বিচারব্যবস্থায় আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হওয়া উচিৎ, এবং এই কাঠামো আমাদের অনুসরণ করা উচিত ছিল। দেখা যাবে যে, মুসলিম বিজেতা তাঁর বিজিত জনগণের ওপর নিজের শাসন ক্ষমতা সীমিতভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন; তিনি তাদের থেকে নির্দিষ্ট কর দাবি করতেন; যা প্রথমদিকে পরিমিত ছিল এবং কখনও পরিবর্তিত হয়নি; এর মাধ্যমে তিনি তাঁর মন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের লোভ থেকে কৃষকদের সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন; এবং দিল্লিতে মুসলিম সরকার টিকে থাকা পর্যন্ত এটি একটি প্রকৃত নিরাপত্তা ছিল। প্রকৃতপক্ষে, এটি শাহজাদাদের প্রতারণার বিরুদ্ধে এবং জনগণের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমান এক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জমিরা মালিকেরা জানত তাদের কত পরিমান রাজস্ব দিতে হবে, এবং শাসক জানত তাকে কী পেতে হবে।’ পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৫।)
ফ্রান্সিসের বিশ্বাস ছিল আকবর ‘জমিদারদের, জমিদারদের, প্রাচীন জমিদারদের অধিকার’ স্বীকার করেছিলেন এবং টোডরমল ‘সমস্ত হিন্দুস্তানের জমিবন্দী (জামাবন্দী) বা খাজনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার নীতি ছিল জমি মালিকদের, জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া উচিৎ এবং তাদের প্রত্যেকের সরকারকে পরিশোধ করার জন্য মধ্যপন্থী স্থায়ী জুম্ম বা খাজনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা দরকার।’ (ঐ)
এই তত্ত্বের সাথে জড়িয়ে থাকা অনুমানের ভিত্তিতে, আমরা কল্পনা করতে পারি যে বিদ্রোহী বাহিনীর পরাজয়ের পর আকবর বা তার ভাইসরয় বাংলার স্থানীয়ূ শাসকদের মুঘল সাম্রাজ্যে অন্তর্ভূক্ত করলেন এবং ভূমি রাজস্ব পরিশোধের শর্তে তাদের পূর্বে অধিকৃত জমির পূর্ণ আইনি দখল দেবেন। সে সময়ে বাস্তবে আদৌ কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে প্রয়াত বি. এইচ. ব্যাডেন পাওয়েল তার একটি ভিন্ন এবং সম্ভবত আরও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে দেওয়া গেল: ‘বাংলার স্থানীয় রাজাদের পরাজয়ের ফলে, কমবেশি কিছু হিন্দু রাজ্য, যে অঞ্চলের প্রধানদের হয় বন্দী করা হয়েছিল অথবা যুদ্ধে নিহত করা হয়েছিল, সরাসরি বিজেতারা অধিগ্রহণ করে এবং এগুলো খালিসা বা রাজস্ব ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়। এইসব জমিদারী ছাড়াও, আধা-বশীভূত গোষ্ঠীপতিদেরও জমিদারী ছিল; এই ব্যক্তিরা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের অধিকারে কায়েম রেখেছিল এমন কিছু অধিকার নিয়ে যেগুলো অন্তত ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সার্বভৌম ক্ষমতার অপরিহার্য উপাদান, যেমন কর আরোপ এবং বিচার প্রশাসন পরিচালিনা করার অধিকারের কথা মনে করিয়ে দিতে পারি। বিজেতা নিজের জন্য ভূমি রাজস্বের অধিকার নিশ্চিত করলেন। খালিসা জমির ক্ষেত্রে, স্থানীয় ভূস্বামীদের হস্তক্ষেপ ছাড়াই রাজস্ব আদায় হতো; আর জীবিত গোষ্ঠীপতিদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী রাজস্বের একটি বড় তারা অংশ মুঘল কোষাগারে জমা দিতেন। এইভাবে, এই সর্দারদের জমিদারীর অধিকার ছিল বিজেতা মুঘলদের থেকে অর্পিত একটি ক্ষমতা, অথচ মুঘল শাসকদের সাম্রাজ্যের সব থেকে বড় জমিদার হিসেবে গণ্য করা দরকার ছিল। সুতরাং, রাজস্ব রাজনীতিতে এই গোষ্ঠীপতিদের পরবর্তীকালের ‘ফার্মার’, চুক্তিবদ্ধ কৃষক বা ইজারাদারদের মতোই গণ্য করা হয়েছে; অর্থাৎ, তারা নিজের জেলায় আদায় করা রাজস্বের নির্দিষ্ট পরিমান ফিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। কৃষকদের থেকে তারা যা আদায় করতেন আর সার্বভৌম শাসকের সাথে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যে অর্থ প্রদান করতেন, তার মধ্যকার পার্থক্যই ছিল তাদের লাভ।(এশিয়াটিক কোয়ার্টারলি রিভিউ, জুলাই, ১৮৯৪। বি. এইচ. ব্যাডেন-পাওয়েল: ‘Is the State the Owner of all Land in India?’)
বাংলার হিন্দু রাজাদের সাথে আকবরের রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রকৃত লেনদেনের চরিত্র অস্পষ্ট। দেশের ভৌগোলিক অঞ্চলকে বিভিন্ন সরকারে বিভক্ত করার উদ্যমে মুঘলেরা প্রাচীন হিন্দু রাজ্য বা রাজত্বগুলোর অস্তিত্ব উপেক্ষা করেছে। আমরা জানি তোডরমলের আমলে বাংলায় এই ধরনের রাজত্ব ছিল; আইন-ই-আকবরীতে নদীয়াকে মহাল হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সেখানে নদীয়া রাজ বিষয়ে তথ্য নেই। আওরঙ্গজেবের সময়ে হিন্দু রাজাদের দেওয়া জমিদারি সনদ আর অর্থ মূল্য পরিশোধের সনদ পাওয়া যায়, কিন্তু তোডরমলের সঙ্গে বিষ্ণুপুর, পাঞ্চেত, ত্রিপুরা ইত্যাদি শাসকদের আদৌ কোনো সরাসরি লেনদেন ছিল, তার কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। অন্যদিকে, এটা নিশ্চিত যে ১৫৭৫-এ দাউদের পরাজয়ের সময় থেকে আকবরের রাজত্বের শেষ আমল পর্যন্ত বাংলায় রাজস্ব কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছিল এবং ক্রমশ বিশাল বিশাল জমিদারীর অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বাংলার বিখ্যাত বীর প্রতাপাদিত্যের রাজত্ব, যিনি ছিলেন ‘বাংলার বারো ভুঁইয়ার’ অন্যতম। এই রাজত্বের উৎপত্তি হয়েছিল সেই দুঃসাহসী শাসকের পিতা বিক্রমাদিত্যের বিদ্রোহ থেকে, যিনি দাউদকে গৌড় থেকে অপসারণের কিছুকাল আগে যশোরের জলাভূমিতে নগরী স্থাপন করেছিলেন। যশোর বা চাঁচড়ার বর্তমান রাজারা ভবেশ্বর রায় নামক একজন হিন্দুর বংশধর, যিনি ১৫৮২-তে আজিম খানের সাথে বাংলায় এসেছিলেন এবং প্রতাপাদিত্যের থেকে কেড়ে নেওয়া পরগনাগুলোর অধিকার লাভ করেছিলেন। প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের একটি বড় অংশ পরবর্তীকালে ২৪ পরগনায় ছিল ঠিকই, এবং সেই পরগনাগুলোর কয়েকটা আইন-ই-আকবরীতে উল্লিখিত হলেও তোডরমলকে যে সব মানুষ তথ্য সরবরাহ করেছিল, তাদের কাছে জেলাটির অস্তিত্বই অজানা ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ