[এই কিস্তি শুরু হয়েছে ১৭৭৩-এর সিক্সথ রিপোর্টের জমিদারের অধিকার বিবৃতি বিষয়ক তথ্য দুবছর পর ১৭৭৫-এর মিনিটে হেস্টিংসের অস্বীকার করার বয়ান দিয়ে। তার পর দুটো ইন্টারেস্টিং নথি উল্লেখ করেছেন ফিফথ রিপোর্টের সম্পাদক ফার্মিঙ্গার — প্রথমটা শোরের মিনিটস থেকে, তৎকালীন বাংলার সুবার দেওয়ান নবাব সরফরাজ খানের মোহরাঙ্কিত সনদের অনুবাদ; দ্বিতীয়টা ভেরেলস্ট উল্লিখিত বাংলার সুবার দেওয়ান নবাব আল্লা উদ দৌলা মীর মহম্মদ সাদেক খান বাহাদুর আসাদ জঙ্গের মোহর লাঞ্ছিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমির জমিদারির সনদ — খুব ইন্টারেস্টিং দুটি নথি। শেষ স্তবকটি ইন্টারেস্টিং ফার্মিঙ্গারি বিবৃতি, অর্থাৎ তাঁর তাত্ত্বিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার বিবৃতি দিয়ে শেষ হয় — অনুবাদক]
অন্যদিকে, ১৭৭৩-এর কমিটি অব সেক্রেসির সিক্সথ রিপোর্ট, ষষ্ঠ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ‘প্রতি জেলার ফৌজদারি আদালতের সাধারণ পরিচিতি ছিল ‘ফৌজদারি’; জেলার জমিদার বা রাজা এই আদালতের মূল বিচারক ছিলেন: তার এখতিয়ার সমস্ত ফৌজদারি মামলার উপর বিস্তৃত ছিল, কিন্তু….একমাত্র মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলাগুলোর ক্ষেত্রে, মুর্শিদাবাদের সরকারে মামলার প্রতিবেদন পাঠানো এবং সে বিষয়ে উপযুক্ত আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর করা যেত না। এই আদালতের কার্যধারা ছিল সংক্ষিপ্ত: শাস্তির সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি ছিল জরিমানা, বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি ধনী হতেন, এবং আদালতের ক্ষমতাবলে আরোপিত প্রতিটি জরিমানা তার জমির মালিকানার সূত্রে জমিদারের প্রাপ্য ছিল; এই পরিস্থিতির স্বাভাবিক প্রভাব, ফৌজদারি বিচারের সুষ্ঠু প্রশাসনের উপর কতটা মারাত্মকভাবে অনুভূত হয়েছিল, তা আপনার কমিটির কাছে নিশ্চই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে।’
১৭৭৫-এর ৭ই ডিসেম্বরের একটি কার্যবিবরণীতে হেস্টিংস প্রশ্ন তোলেন, ষষ্ঠ প্রতিবেদনের এই আদৌ নির্ভরযোগ্য কি না। এবং আমাদের মনে রাখা দরকার হেস্টিংস এ দেশে কর্মজীবনের শুরুতে দরবারে রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং সেই পদে থেকে দেশীয় সরকার সম্পর্কে অতুলনীয় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন বলেই আমাদের তাঁর মতকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে গ্রহণ করতে হবে। ফৌজদারি আদালতে জমিদারের তথাকথিত এখতিয়ার সম্পর্কে কমিটি অব সেক্রেসির বিবৃতির পুনরাবৃত্তি করা ক্লেভারিং, মনসন এবং ফ্রান্সিসের দাখিল করা কার্যবিবরণীর জবাবে হেস্টিংস লিখেছেন:
‘বাংলার সংবিধান অনুযায়ী জমিদারদের যে বিচারব্যবস্থা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমার চিরাচরিত ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে বাংলার সংবিধান অনুযায়ী জমিদাররা তাঁদের জেলার ফৌজদারি আদালতে যেমন সভাপতিত্ব (প্রিসাইড) করতেন না, বা মৃত্যুদণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধের বিচার বা সাজা কার্যকর করতেন না, বা বকেয়া খাজনা (রাজস্ব) পরিশোধ না করা অপরাধ ছাড়া অন্য কোনো অপরাধের বিচার করতে পারতেন না। এ কথা সত্য যে তাঁরা তাঁদের ভৌগোলিক এখতিয়ারের মধ্যে শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দায়ী ছিলেন, কিন্তু সে কাজটা তারা করতেন কেবল একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অধীনস্থ যন্ত্র হিসেবে [অর্থাৎ তাদের এবাবদেও কার্যকত স্বাধীনতা ছিল না — অনুবাদক]। ভূমি-কর্মচারী বা দেশের প্রাচীন মিলিশিয়া তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকত এবং জমিদারী জুড়ে ছড়িয়ে থাকার কারণে এই মিলিশিয়ারা জমিদারকে অভ্যন্তরীণ শান্তির উপর নজর রাখতে এবং এর যেকোনো অংশে যা কিছু ঘটত তার তথ্য পেতে সাহায্য করত, এবং এই পর্যন্ত ফৌজদারের এখতিয়ার জমিদারের কাজকর্মে নিহিত ছিল। এই নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, বাস্তবে জমিদার ফৌজদারের অধীন থাকতেন, ফৌজদার বহু জমিদারী নিয়ে গঠিত জেলার তত্ত্বাবধান করতেন এবং তার অধীনে থাকা কর্মকর্তা আর সশস্ত্র ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে থানা বা নিম্নতর কেন্দ্রগুলো থাকত; এছাড়াও প্রতিটি জমিদারীর ভূমি-কর্মচারীদের একটি অংশ তার অধীনে ছিল, বাকিরা গ্রাম পাহারা দিতে এবং রাজস্ব আদায় কার্যকর করতে নিযুক্ত ছিল। নবাবকে রায় রায়াঁর মাধ্যমে নিয়মিত খবর দেওয়া এবং ডাকাত গ্রেপ্তারে ফৌজদারকে সহায়তা করা এবং দেশের শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর করা জমিদারের কর্তব্য ছিল; কিন্তু এই কর্তব্য প্রথম এবং সরাসরি নাজিমের প্রতিনিধি ফৌজদারের অধীনে ছিল, এবং তিনিই মানুষ ন্যায়বিচার আর সুরক্ষার জন্য উদ্দিষ্ট ছিলেন, এমনকি নিজেদের প্রধানদের বিরুদ্ধাচরণের জন্য তার দিকেই তাকিয়ে থাকত। ফৌজদার জমিদারদের নিয়ন্ত্রক ছিলেন, তারা এবং ঢাকার জেলার জমিদাররা প্রায়শই—ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষক ও সহায়তা করতেন, অথচ তাদের আস্তানা আর কার্যকলাপ শনাক্ত করা জমিদারদের বিশেষ কর্তব্য ছিল। কার্যত, যে আইন বা প্রথা অনুযায়ী জমিদার তাঁর এলাকায় সংঘটিত সমস্ত ডাকাতির জন্য দায়ী থাকতেন, সেই আইনের মূল উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, মুসলিম শাসনামলে তা অবহেলায় জরিমানা নয়, বরং যোগসাজশের শাস্তি হিসেবেই কার্যকর হতো এবং বিবেচিত হতো।
(মুর্শিদাবাদের রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ পরিষদের নিম্নলিখিত পত্রটি দৃষ্টান্তস্বরূপ, (১০ই জুন, ১৭৭১-এর কার্যবিবরণী।)
মুর্শিদাবাদ, ১০ই জুন, ১৭৭১।
যশোরের সুপারভাইজার জনাব উইলিয়াম রুককে।
মহোদয়,
…. দেশের জনগণকে ডাকাতদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা ইতিমধ্যেই যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, তা সত্ত্বেও এই অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে দেখে আমরা উদ্বিগ্ন। এবং জনাব ডেনিস হল্যান্ডকে হত্যা করার ক্ষেত্রে তারা যে চরম পন্থা অবলম্বন করেছে, তা থেকে এই সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, জেলার জমিদাররা বা তাদের কর্মকর্তারা এই দুষ্কর্মগুলিতে ডাকাতদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই অনুমানের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি; এবং যেহেতু এটি করার জন্য জমিদারকে দায়ী করার দেশীয় প্রথা অবলম্বন করা প্রয়োজন, তাই আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে, যদি তিনি অবিলম্বে হত্যাকারীদের হাজির না করেন, তবে আপনি তাকে বন্দী করে শহরে (অর্থাৎ মুর্শিদাবাদে) পাঠিয়ে দেবেন। এর সাথে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি ঘটনাস্থল থেকে যতটা সম্ভব বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পাঠাবেন। একই সাথে আপনি এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন যাতে জমিদারের অনুপস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের কাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে…
আমরা আছি,
(ইত্যাদি)
এছাড়াও দেখুন, লং, সিলেকশনস, ৮৪৩ নং)
এমন অনেক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায় যেখানে জমিদাররা অন্য ক্ষমতাও প্রয়োগ করে ব্যভিচার এবং অন্য নানা অজুহাতে প্রজাদের থেকে সীমাহীন জরিমানা আদায় করছেন। সমস্ত স্বৈরাচারী সরকারের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে, বিশেষ করে যেগুলোতে ঘন ঘন বিপ্লব ঘটেছে (frequent revolutions); কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—এবং আমার বিশ্বাস করার সত্যই যথেষ্ট কারণ আছে—যে বাংলার সাধারণ পুলিশের সাংবিধানিক ক্ষমতাগুলো ঠিক তেমনই ছিল যেমনটি আমি বর্ণনা করেছি… বর্ধমানের জমিদারকে নাযিমের কাছ থেকে একটি বিশেষ সনদের মাধ্যমে ফৌজদারি এখতিয়ার প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি এমন আর কোনো উদাহরণ নেই, এবং এটি আমি যে ব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছি তার একটি ব্যতিক্রম না হয়ে বরং তার অস্তিত্বের একটি প্রমাণ; অন্যথায় একটি বিশেষ সনদের প্রয়োজন হতো না।’ (G. W. Forrest: Selections from the Letters, Despatches, and other State Papers, preserved in the Foreign Department of the Government of India, 1772-1785, Calcutta, 1890, vol. ii, pp. 454-55। ক্লাভারিং প্রমুখ, হেস্টিংস এবং বারওয়েলের একটি নতুন বন্দোবস্তের প্রস্তাবের ১৮তম অনুচ্ছেদে একটি আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী বিবৃতি পেশ করে এর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, ২২শে এপ্রিল, ১৭৭৫। দেখুন ফরেস্ট, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৫০৫। কিন্তু ফ্রান্সিস এতে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলে মনে হয়। ১৭৮২-এ হাউস অফ কমন্সের সিলেক্ট কমিটি কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদের সময় (ষষ্ঠ প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ১১) ফ্রান্সিস ১৭৭৫-এর আলোচনার কথা উল্লেখ করেন এবং যোগ করেন: “পরবর্তী অনুসন্ধানের ফল তাকে কিছুটা সন্তুষ্ট করেছে যে, জমিদাররা যে ধরনের ফৌজদারি বিচারই করুক না কেন, তা ছোটখাটো অপরাধের বাইরে যেত না; তিনি বিশ্বাস করেন যে এই বিচার জীবন বা অঙ্গহানির ক্ষেত্রে কার্যকর হত না।” তবে, এই বিষয়গুলিতে, মিস্টার ফ্রান্সিস নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে সাহস করেননি।)
বর্তমান তদন্তে জমিদারদের দায়িত্ব কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং তাই সমান্তরাল কলামে দুটি জমিদারি সনদের পাঠ্যের প্রাসঙ্গিক অংশটি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে : (উল্লেখ্য, ১৩ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৭৬-এ হেস্টিংস সরকার, রাজা ধৈর্যেন্দ্র নারায়ণকে কোচবিহারের জমিদারির জন্য একটি সনদ প্রদান করে। এই সনদের শর্তাবলী উপরের পাঠ্যে উদ্ধৃত সনদগুলোর শর্তাবলীর সাথে প্রায় অভিন্ন। দেখুন আইচিসন: কালেকশন অফ ট্রিটিজ, ইত্যাদি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৩।)
(শোরের কার্যবিবরণী থেকে, এপ্রিল, ১৭৮৮)
বাংলার সুবার দেওয়ান নবাব সরফরাজ খানের মোহরাঙ্কিত একটি সনদের অনুবাদ, যা মহামান্য মোহাম্মদ শাহের রাজত্বের ১৭তম বর্ষের রমজান মাসের ২৭ তারিখে, অর্থাৎ ১৭৩৫-৩৬ খ্রিস্টাব্দে জারি করা হয়েছিল।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের কার্যনির্বাহী মুতসদ্দিগণ (লেখক বা কেরানি) এবং সরকারি লেনদেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ, এবং বাংলার সুবা, যা রাজ্যসমূহের স্বর্গস্বরূপ, তার অন্তর্গত রাজশাহী পরগনা ইত্যাদির কানুনগো, মুকদ্দম (গ্রামের প্রধান প্রতিনিধি) ও কৃষকগণকে জানানো যাচ্ছে যে, মহিমান্বিত ও রাজকীয় শুজা উদ দৌলা, মোহতিমুন উল মুলুক, শুজা উদ দীন, মোহাম্মদ খান, বাহাদুর, আসাদ জং, সুবার নাজিম কর্তৃক স্বাক্ষরিত ফর্দ-ই-সেওয়াল-এর (আবেদনপত্র) ফলস্বরূপ, এবং তদনুসারে ফর্দ-ই-হকিকত (পরিস্থিতি সম্পর্কিত স্মারকলিপি বা প্রতিবেদন) ও মোচলকা (প্রতিজ্ঞাপত্র।)-ও স্বাক্ষরিত হয়েছে (যার সমস্ত বিষয়বস্তু এতে লিপিবদ্ধ আছে), রামজীবনের মৃত্যুর পর থেকে, এবং পেশকাশ ইত্যাদি ও বকেয়া এবং উপরোক্ত পরগনার বার্ষিক জমা, সংযুক্ত অনুমোদন অনুসারে, তার সমসাময়িকদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি, উক্ত ব্যক্তির দত্তক পুত্র রাম কান্তকে উপরোক্ত পরগনার জমিদারীর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে; এই উদ্দেশ্যে যে, তিনি সেই সেবার কর্তব্য ও দায়িত্বে যথাযথভাবে মনোযোগ দেবেন এবং অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের ক্ষুদ্রতম অংশেও যেন কোনো ত্রুটি না করেন; তিনি কিস্তিবন্দী (কালেক্টরের হাতে থাকা দলিল, যাতে বার্ষিক করের অংশ, পরিশোধের তারিখ ইত্যাদি দেখানো থাকে) অনুসারে রাজকোষে পেশকাশ ইত্যাদি এবং বকেয়া পরিশোধ করবেন; এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী মজকুরত (রাজস্ব আদায়ে জমিদারের খরচ মেটানোর জন্য অনুমোদিত কর্তন; স্বীকৃত ফি, ধর্মীয় অনুদান ইত্যাদি), নানকার ইত্যাদির জন্য পাওনা বাদ দিয়ে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে ও মেয়াদে প্রাপ্য খাজনা পরিশোধ করবেন; তিনি রায়ত ও সাধারণ জনগণের প্রতি প্রশংসনীয় আচরণ করবেন; এবং অবাধ্যদের বিতাড়িত ও শাস্তি প্রদানে সচেষ্ট থাকবেন; এবং তিনি তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন যাতে তার সীমানার মধ্যে চোর, ডাকাত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে; যে তিনি প্রজাদের তুষ্ট ও উৎসাহিত করবেন এবং কৃষিকাজের উন্নতি, দেশের সমৃদ্ধি ও উৎপাদন বৃদ্ধি করবেন; তিনি রাজপথগুলোর বিশেষ যত্ন নেবেন, যাতে পথিক ও যাত্রীরা সম্পূর্ণ নির্ভয়ে যাতায়াত করতে পারে; এবং যদি কোনো সময় কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি চুরি বা লুণ্ঠিত হয়, তবে তিনি চোর ও ডাকাতদেরকে তাদের লুঠ করা সম্পত্তির সাথে হাজির করবেন; এবং সম্পত্তি মালিককে ফেরত দিয়ে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করবেন; যদি তিনি তাদের হাজির করতে না পারেন, তবে তিনি নিজেই সম্পত্তির জন্য দায়ী হবেন; তিনি সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন যাতে তার জমিদারির সীমানার মধ্যে কেউ মদ্যপান বা অসদাচরণে লিপ্ত না হয়; তিনি শাহী দরবার কর্তৃক নিষিদ্ধ আবওয়াব বা অতিরিক্ত কর আদায় থেকে বিরত থাকবেন; এবং তিনি প্রথা অনুযায়ী নিজে ও সুবার কানুনগোদের স্বাক্ষরিত প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র সরকারের দফতরখানায় জমা দেবেন।
অতএব, উল্লিখিত ব্যক্তিদের কাছে এটি প্রত্যাশিত যে, তারা উপরোক্ত রাম কান্তকে পরগনা রাজশাহী ইত্যাদির অনুমোদিত জমিদার হিসেবে গণ্য করবেন।
(ভেরেলস্টের দৃষ্টিকোণ থেকে।)
সম্মানিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমির জমিদারির জন্য সনদ, যা বাংলার সুবার দেওয়ান নবাব আল্লা উদ দৌলা মীর মহম্মদ সাদেক খান বাহাদুর আসাদ জঙ্গের মোহর দ্বারা প্রদত্ত।
মীর, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কার্যনির্বাহী মুতাসাদ্দিগণ, এবং চৌধুরী ও কানুনগো, এবং জাতিসমূহের স্বর্গস্বরূপ বাংলা সুবার অন্তর্গত সরকার সাতগাঁও (প্রাচীন হিন্দু সপ্তগ্রাম (সাতটি গ্রাম) এবং পর্তুগিজদের পোর্তো পিকেনো [সরস্বতী নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সপ্তগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়ে। ফলে পর্তুগিজরা দক্ষিণে হুগলিতে নতুন কেন্দ্র স্থাপন করে। গলি নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, “ছোট বন্দর” নামে পরিচিত হয় (চট্টগ্রামকে বলা হতো ‘পোর্তো গ্রান্দে’ বা বড় বন্দর দ্রুত বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠলেও ১৬৩২-এ মুঘল বাহিনীর কাছে পর্তুগিজরা পরাজিত হলে বন্দরটি ধ্বংস হয়ে যায়। রালফ ফিচের বিবরণ অনুযায়ী, এই বন্দরটা ছিল তৎকালীন বাংলা অঞ্চলের একটি অন্যতম প্রধান ইউরোপীয় বসতি – অনুবাদক]। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডি. জি. ক্রফোর্ডের প্রবন্ধ দেখুন: ‘Satgaon and Tribeni’, বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, তৃতীয় খণ্ড) ইত্যাদির কিসমত পরগনা (রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বৃহত্তর বিভাগ যেমন তালুক বা পরগনা থেকে বিচ্ছিন্ন জমির একটি অংশকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে যদি এটি একটি ভিন্ন এখতিয়ারের অধীন হয়।’ উইলসন: শব্দকোষ।) কলকাতা ইত্যাদির বাসিন্দা ও কৃষকগণকে জানানো যাইতেছে যে, অভিজাত ও প্রশাসনের গৌরব, সুবার নিজাম শুজা উল মুলুক হোসাম উদ দৌলা মহম্মদ জাফর খান বাহাদুর মহাবত জঙ্গ কর্তৃক স্বাক্ষরিত ফের্দ সওয়াল এবং তদনুযায়ী স্বাক্ষরিত ফের্দ হকিকত ও মুচলকার ফলস্বরূপ; যার বিবরণ এখানে সম্পূর্ণরূপে বর্ণিত আছে। উপরিউক্ত পরগনাগুলোর জমিদারির পদটি, সাম্রাজ্যিক সরকারের কাছে বিশ হাজার একশত এক টাকা (২০, ১০১) পেশকশ (ফি) ইত্যাদির বিনিময়ে, পৃষ্ঠলেখ অনুযায়ী, বাংলা সন ১১৬৪-র পৌষ মাস থেকে, সর্বশ্রেষ্ঠ বণিক ইংরেজ কোম্পানিকে প্রদান করা হইল, যাহাতে তাহারা ইহার অধিকার ও রীতিনীতির প্রতি যথাযথভাবে মনোযোগ দেয়, এবং কোনো অবস্থাতেই ইহার প্রতি প্রাপ্য সতর্কতা ও যত্নের অবহেলা বা ত্রুটি না করে; এবং তাহারা যথাসময়ে সরকারের খাজনা কোষাগারে জমা দেয়; তারা যেন অধিবাসী ও নিম্নশ্রেণীর লোকদের সাথে এমনভাবে আচরণ করে, যাতে তাদের সুব্যবস্থাপনায় উক্ত পরগনাগুলো সমৃদ্ধ ও উন্নত হয়; তারা যেন তাদের এলাকার মধ্যে কোনো ডাকাত বা সিঁধেল চোরকে থাকতে না দেয় এবং বাদশাহের রাজপথগুলোর এমন যত্ন নেয়, যাতে পথিক ও যাত্রীরা কোনো প্রকার অসুবিধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারে; যদি (আল্লাহ না করুন) কোনো ব্যক্তির মালপত্র লুট বা চুরি হয়, তবে তারা যেন লুটেরা ও চোরদেরকে মালপত্র-সহ খুঁজে বের করে হাজির করে এবং মালপত্র মালিকদের কাছে ফেরত দেয় ও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়, অন্যথায় তারা নিজেরাই উক্ত মালপত্রের জন্য দায়ী থাকবে; তারা যেন বিশেষ যত্ন নেয় যে, তাদের জমিদারির সীমানার মধ্যে কেউ কোনো অপরাধ বা মদ্যপানে লিপ্ত না হয়; বছরের শেষে তারা যেন প্রথা অনুযায়ী অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করে এবং প্রতি বছর নির্ধারিত ছক অনুযায়ী তাদের জমিদারির হিসাব সরকারের দফতর খানায় (দফতর) জমা দেয়; এবং তারা যেন বাদশাহী দরবার (জগতের আশ্রয়স্থল) কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো জিনিস দাবি করা থেকে বিরত থাকে।
উক্ত কোম্পানিকে সেই স্থানগুলোর প্রতিষ্ঠিত ও বৈধ জমিদার হিসেবে গণ্য করা এবং সেই পদের সাথে যা কিছু সংশ্লিষ্ট বা সংযুক্ত আছে, তা তাদের অধিকার হিসেবে মেনে নেওয়া উক্ত মুতাসাদ্দিদের কর্তব্য; এই বিষয়ে তারা যেন কঠোরভাবে সময়ানুবর্তী হয়।
রাজত্বের তৃতীয় সনের (এটি পঞ্চম সন হওয়ার কথা — ভেরেলস্টের টীকা) রবিউস সানি মাসের (‘রাবিয়া-উস-সানি’ (Rabi’ al-Thani) কে ইসলামিক বছরের ৪র্থ মাস) প্রথম তারিখে জারি করা হলো।
অনুমোদিত বিষয়টি লেখা হোক।
এই শর্তাবলী পূরণের জন্য সনদ আবেদনকারী মুচলেকার মাধ্যমে এক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন, যা সনদটির উপরেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং উপরে উদ্ধৃত শর্তাবলী হুবহু পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল। লক্ষ্য করা দরকার, সনদটি জমিদারকে চোর ধরার দায়িত্ব দিলেও, চুরির বিচার করার ক্ষমতা জমিদারকে দেয়নি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ