জেনারেল আইজাক গ্যাসকয়েন (General Isaac Gascoyne)
বাম্বার গ্যাসকোয়েন (সিনিয়র) এবং মেরি গ্রিনের তৃতীয় পুত্র আইজ্যাক গ্যাসকোয়েন (১৭৬৬-১৮৪১) ব্রিটিশ সেনা আমলা, টোরি রাজনীতিবিদ; এসেক্সের বার্কিংয়ে জন্ম; ফেলস্টেড স্কুলে পড়াশোনা।
জেনারেল আইজাক বাম্বার গ্যাসকয়েন ছিলেন ফিফথ রিপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকারের অন্যতম প্রধান সমালোচক। লিভারপুলের সংসদ সদস্য হিসেবে ব্রিটেনের ‘আউট পোর্টস’গুলোর (লন্ডনের বাইরের বন্দরনগরীগুলো, বিশেষ করে কারখানা নির্ভর আর দাস ব্যবসা নির্ভর বন্দর) বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতেন বাম্বার গ্যাসকোয়েন।

পঞ্চম প্রতিবেদনের কমিটি তৈরির বহু আগে থেকেই, বিশেষ করে ১৭৮০তে ম্যানচেস্টারে প্রথম সুতো তৈরির কারখানা গড়ে ওঠার সময় থেকেই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের ‘ফ্রি ট্রেড’ বা মুক্ত বাণিজ্য, অর্থাৎ ভারতের বাজারে একচ্ছত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলদারি হঠিয়ে বাঙলা লুঠের অর্থে ব্রিটেন জুড়ে গজিয়ে ওঠা কেন্দ্রিভূত কারখানার মালিকদের পণ্য বিক্রি করার অধিকারের দাবি উঠছিল তীব্র স্বরে। পুঁজিপতিদের দাবি মেনে রাষ্ট্রপতিরা দেশের বাস্তব অবস্থা, অর্থাৎ কর্পোরেটদের দাবিদাওয়া বুঝতে পার্লামেন্টারি কমিটি তৈরি করছেন। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চল থেকে এনক্লোজার আইনের ধাক্কায় উচ্ছেদ হওয়া লাখো কৃষক, তাঁতি, পশুচারক, ধীবর — যারা দাস ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে ওঠা বণিকদের আর এনক্লোজার আইনে কৃষিজমি দখল নেওয়ার পর বিপুল সম্পত্তির মালিক জমিদারদের বিনিয়োগে তৈরি মিলগুলোয় নামমাত্র শ্রম মূল্যে শ্রমিক হল, যারা আজও পরিচিত আরবান পুওর নামে, তারা দ্বিধাহীন চিত্তে এই সব কেন্দ্রিভূত কারখানাগুলোর মালিকদের ভারত বাজার খোলার দাবির পাশে দাঁড়াচ্ছে। এই দলের নাম হচ্ছে ‘ফ্রি ট্রেডার’ গোষ্ঠী। জেসন হিকেলের ভাষায় যে পুঁজিবাদ ‘এক্সট্রিম পোভার্টি’ সৃষ্টি করছে, সেই পুঁজিবাদ এক দেশে শ্রমিককে অন্য দেশের শ্রমিক কারিগরদের উচ্ছেদের দাবিতে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে।
ইন্টারেস্টিং হল যে ফ্রি ট্রেডার গোষ্ঠী অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাইরের পুঁজিপতি, তাদের শ্রমিক দল, সওদাগর, ‘আউট পোর্টস বণিক’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকা ভারতের বাজার তাদের স্বার্থে খুলে দিয়ে মুক্ত বাণিজ্য চালু করার দাবি জানাচ্ছে, তারাই আবার ভারতের, বিশেষ করে বাঙলার [আড়ংগুলোতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রবল অত্যাচারের বিরুদ্ধে টিকে থাকা] তাঁতিদের কাপড় ব্রিটিশ বাজারে বিক্রি করে তাদের বাজার হারানোর আশংকায় ভারতের কাপড়ে বিপুল শুল্ক চাপানোর প্রবল দাবিদার। আটলান্টিক পেরিয়ে আমেরিকার বড় আঁশের তুলো নির্ভর করে ১৭৮০-র পরের তিনটি দশকে, অর্থাৎ ১৮১০-এর দশকের শুরুতে যখন ফিফথ রিপোর্টের কমিটি তৈরি হচ্ছে, সে সময় তুলো নির্ভর কারখানার সংখ্যা বিপুল বেড়েছে প্রায় ১০০০, ১৮৩০-এ এই সংখ্যা হবে ১৫০০-র আশেপাশে — মিলগুলো শুধু আর সুতো তৈরি করে না, তারা কাপড় তৈরি করার ব্যবসায় প্রবেশ করেছে, ফলে তাদের আরও বড় বাজার দরকার; যে বাজারে তারা নিজেদের যন্ত্রের কলে তৈরি কাপড় বিক্রি করবে, সে বাজারে তার ক্ষুদ্র প্রতিযোগী হাতে চালানো তাঁতিদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উচ্ছেদ করুক এই কামনাও করে। অর্থাৎ মুক্ত বাণিজ্যের দাবি কর্পোরেটদের জন্য জায়েজ হলেও তাঁতিদের জন্য হারাম। এটাই ছিল ভারতকে সভ্য করতে আসা ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের মৌল চরিত্র। ফ্রি ট্রেডার গোষ্ঠীর তত্ত্ব আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষণা নির্ভর করে, অভদ্রলোকদের বিরুদ্ধে অভদ্রলোকদের লড়িয়ে দিয়ে আরও বেশি উদ্বৃত্ত তৈরি করার কর্পোরেট উদ্যমে গড়ে উঠবে বাঙলার নবজাগরণের ভিত।
বাম্বার গ্যাসকোয়েন ছিলেন সেই শক্তিশালী ফ্রি ট্রেডার গোষ্ঠীর অন্যতম নেতা, যাদের যুক্তি ছিল কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার দেশের অন্যান্য বণিক ও শিল্পপতিদের জন্য ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশে অন্যায়ভাবে বাধা সৃষ্টি করছে, এর ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। মাথায় রাখতে হবে গ্যাসকোয়েন শিল্পোন্নত শহর লিভারপুলের এমপি। ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্যের জন্য যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর শহরের সমৃদ্ধি কাপড়, চিনি ও দাস বাণিজ্য নির্ভরশীল ছিল। তো এই “আউট পোর্টস বণিকরা কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য নীতিকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছিলেন। জেলার বন্দরগুলোর স্বার্থের প্রতিনিধি করা বাম্বার দাবি করলেন “লন্ডনের বাইরের সব বন্দর এই দাবি নিয়ে [কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার] তীব্র আলোড়িত হচ্ছে” “all the out ports were violently agitated on this point”। শুধু লিভারপুল নয়, ব্রিস্টল, গ্লাসগো, ম্যানচেস্টারের মতো শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রের কর্পোরেট উদ্যমীদের অসন্তোষ তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপস্থাপন করতেন প্রবল প্রতাপে। বাণিজ্যিক ন্যায়বিচারের দাবি তুলে তিনি বলেন কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার দেশের অন্য অঞ্চলের বণিকদের সাথে অবিচারপূর্ণ আচরণ করছে। ভারতের বাজারকে জাতীয় সম্পদ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সম্পদের দ্বার সকলের জন্য খুলে দেওয়া উচিত, শুধুমাত্র লন্ডনভিত্তিক একটিমাত্র কোম্পানিকে বন্ধক দেওয়ার জন্য সাম্রাজ্য তৈরি হয়নি। এই যুক্তিতে কোম্পানির বিশেষাধিকারের নৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈধতা সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। জাতীয় স্বার্থ বনাম কোম্পানি স্বার্থ নিয়ে তিনি এবং অন্য ফ্রি ট্রেডাররা তীবে প্রচার চালিয়ে তারস্বরে বলতেন, কোম্পানির স্বার্থ (মুনাফা) সমগ্র ব্রিটিশ জাতির অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি কোম্পানিকে সরাসরি মৃত্যুদশাগ্রস্ত সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন দুই শতকের বেশি বয়সী জরাগ্রস্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখল করা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দেশের মানুষের জন্য অশেষ ক্ষতিকর — তাই একে উচ্ছেদ করা দরকার। তারমত নব্য কর্পোরেট প্রতিনিধিরা কোম্পানিকে “জাতীয় সম্পদের শত্রু” হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। তাদের এই বক্তব্য জনমানসে কোম্পানির বিরুদ্ধ মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এই প্রচারের ফল আমরা দেখি ১৮১৩র কোম্পানির সনদ পুনর্বিবেচনা করার আইনে।
সমালোচনার ফল
গ্যাসকয়েনের মতো ফ্রি ট্রেডারদের অব্যাহত চাপ এবং ফিফথ রিপোর্টের মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক পরিবেশ সরাসরি ১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পেশ করেছে। তাদের প্রধান দাবি পূরণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের সাথে বাণিজ্য করার একচেটিয়া অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় — শুধু চা আর চীন বাণিজ্য বাদ রাখা হয়েছিল। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভূমে ‘ফ্রি ট্রেডার’-দের আন্দোলনের বড়তম জয়। সংক্ষেপে, জেনারেল আইজাক গ্যাসকয়েন ছিলেন ফিফথ রিপোর্ট সমালোচনা আর চাটার্ড আইনের নীতিমালা প্রণয়নের পেছনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তার যুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে শুধু লিভারপুল নয়, গোটা ব্রিটেনের শিল্প ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষোভকে কণ্ঠ দিয়েছিল, এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানির বাণিজ্য ভিত্তি ধ্বংস করতে সহায়তা করেছিল।
জেমস গ্র্যান্ট — কোম্পানির পক্ষের সাংসদ। তিনি যুক্তি দেন যে কমিটি ইতোমধ্যে সনদ নবায়নের বিতর্কের জন্য দরকারী তথ্য তৈরি করেছে এবং পুরনো সমালোচনামূলক রিপোর্টগুলি (যেমন ১৭৮৩-র সনদ রিনিউয়ালে বার্কের সমীক্ষা) এখন অপ্রাসঙ্গিক।
উইলিয়াম উইলবারফোর্সের মত মিশনারি নেতৃত্বের ভূমিকা ও অবস্থান
উইলিয়াম উইলবারফোর্স (William Wilberforce) (১৭৫৯-১৮৩৩) ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, জনহিতৈষী ও সমাজ সংস্কারক – মূলত আটলান্টিক দাস বাণিজ্য বিলোপ আন্দোলনের প্রধান নেতা। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮০৭-এ দাস বাণিজ্যের অবসান হয় এবং ১৮৩৩-এ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যজুড়ে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে, লক্ষ লক্ষ মানুষ মুক্তি পায়। তিনি ‘ক্ল্যাপহ্যাম সেক্ট’-এর সদস্য ছিলেন এবং অন্য সামাজিক সংস্কারেও ভূমিকা পেশ করেছেন। তিনি ‘এবং সরব ভূমিকা যে ছিল সেটা আমরা পরের আলোচনায় দেখব।

উইলবারফোর্স বিশ্বাস করতেন ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য বর্তমান। তারা মনে করতেন শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, ব্রিটেনের নৈতিক দায়িত্ব ভারতীয়দের “সভ্য” করা, খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা এবং তাদের নৈতিক ও বৌদ্ধিক উন্নতি সাধন করা। তিনি এবং তার গোষ্ঠী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে “অন্যায় ও অত্যাচারী” আখ্যা দিয়ে অতিকঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। তাদের মতে, মুনাফালোভী বণিক কোম্পানির পক্ষে কোটি কোটি ভারতীয় মানুষের কল্যাণকামী শাসক হওয়া সম্ভব নয়। উইলবারফোর্স ছিলেন ভারতে খ্রিস্টান মিশনারিদের অবাধ প্রবেশাধিকারের সবচেয়ে জোরালো প্রবক্তা। মাথায় রাখতে হবে কোম্পানি ধর্মীয় হস্তক্ষেপ এড়াতে মিশনারি উদ্যম সীমিত বা নিরুৎসাহিত করত। তিনি ভারতীয় সমাজের সংস্কারের লক্ষ্যে ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান চালুর পক্ষে ওকালতি করেন। তার মতে, এটিই ছিল ভারতীয়দের “অন্ধকার” ও “কুসংস্কার” থেকে মুক্ত করার উপায়।
উইলবারফোর্সের নেতৃত্বাধীন ক্ল্যাপহ্যাম সেক্টের চাপ ফিফথ রিপোর্ট তৈরির রাজনৈতিক পরিবেশ গঠনে সহায়তা করেছিল। তবে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট-এর ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করা।
উইলিয়াম উইলবারফোর্স ফিফথ রিপোর্টের প্রত্যক্ষ তদন্তকারী না হলেও, তার নৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বিপুল রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যার ফলে কোম্পানি নিয়ে পার্লামেন্টের গভীর তদন্ত অরক্রিয়া চালানো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তার প্রচেষ্টার সরাসরি ফল ছিল ১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্টের মিশনারি ধারা আর শিক্ষা ধারা। এভাবে, তার ভূমিকা কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার শেষ করার পাশাপাশি, ব্রিটিশ ভারতীয় নীতিতে একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় হস্তক্ষেপের যুগ এর সূচনা করে।’
ফিফথ রিপোর্টের গুরুত্ব
১. কোম্পানির পক্ষে অনুকূল ফল : বিপুল আলোচনা আর গভীর তদন্তক্রিয়া সত্ত্বেও, চূড়ান্ত প্রতিবেদন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বিধাহীনভাবে প্রশাসনিক ভূমিকার পক্ষে দাঁড়ায়। এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ১৮১৩-র সনদ আইন (Charter Act of 1813)-কে প্রভাবিত করে। ১৮১৩র সনদ আইনের ফলে কোম্পানি তার বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার হারালেই ব্রিটিশ রাজা আর সাম্রাজ্যের পক্ষে ভারত শাসনের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
২. শাসন ব্যবস্থার ওপর কেন্দ্রীভূত তদন্ত : কমিটি তার তদন্ত শুধুমাত্র রাজস্ব ও বিচার বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত করেছিল। তাদের মূল কাজ ছিল ১৭৬৫-তে বাংলার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভের পর থেকে চালু করা রাজস্ব ও ন্যায় বিচার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করা।
৩. একটি অমূল্য ঐতিহাসিক আর্কাইভ : রিপোর্টের সবচেয়ে বড় অবদান হলো এটির অ্যানেক্সার্স বা পরিশিষ্টে সংকলিত মূল দলিলাদির সংগ্রহ। এগুলোর মধ্যে লর্ড কর্নওয়ালিস ও জন শোরের মিনিট, জেমস গ্র্যান্টের বাংলার আর্থিক বিশ্লেষণ, জেলাভিত্তিক বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের রিপোর্ট উল্লেখযোগ্য। এই নথিগুলো বাংলায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কেমন করে গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল, তার একটি প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরে। এজন্যই এই রিপোর্টকে বাংলার প্রারম্ভিক ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের একটি অপরিহার্য উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিতর্ক ও প্রতিবেদনের ফল : ফিফথ রিপোর্ট সেই যুগের অন্যতম মূল কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছিল — ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য সম্পদ, নাকি বোঝা। সমালোচকরা একে ঋণে জর্জরিত জরাগ্রস্ত ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলেও, রিপোর্টের ফল শেষ পর্যন্ত এর প্রশাসনিক ভূমিকার সপক্ষে যায়। ১৮১৩-র সনদ আইন ছিল এমন এক রাজনৈতিক সমঝোতা — যা কোম্পানির ব্যবসার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে প্রশাসনিক অধিকার বজায় রাখতে দ্বিধা বোধ করে নি।
এই তালিকায় ফিফথ রিপোর্ট ১৮১৩র সনদে কি প্রভাব ফেলেছিল তার সংক্ষিপ্তসার
| ফিফথ রিপোর্ট-এ আলোচিত চাপ/সমালোচনার বিষয় | ১৮১৩ র চার্টার অ্যাক্ট-এ সংশ্লিষ্ট ধারা | প্রভাব ও ফলাফল |
| বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার ও শাসনের দ্বন্দ্ব | একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার রদ: ভারতের সাথে বাণিজ্যে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার তুলে নেওয়া হয় (চা ও চীন বাণিজ্য বাদে)। | রিপোর্টে উত্থাপিত মূল অভিযোগ মুনাফালোভী কোম্পানির ভারত শাসন—এর উত্তরে, কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখা হলেও তার বাণিজ্যিক স্বার্থকে আলাদা করে ফেলা হয়। ব্রিটিশ ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত হয়। |
| মিশনারি ও নৈতিক সংস্কারকদের দাবি | মিশনারি কর্মকাণ্ডের অনুমতি: আইনের ১৩ নং ধারা (মিশনারি ধারা) অনুসারে মিশনারিদের ভারতে প্রবেশ ও বসবাস আর ধর্মপ্রচারের অনুমতি দেওয়া হয়। | রিপোর্ট তৈরিতে যেসব গোষ্ঠী চাপ দিয়েছিল, তাদের একটি সরাসরি জয়লাভ করে। এটি ভারতীয় সমাজে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় হস্তক্ষেপের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। |
| শাসনের জন্য রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ধারণা | শিক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল: ৪৩ নং ধারা (শিক্ষা ধারা) অনুযায়ী, বছরে কমপক্ষে ১ লক্ষ টাকা ভারতীয়দের শিক্ষা, সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। | এটি একটি যুগান্তকারী বিধান, যা প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ রাষ্ট্রকে ভারতীয় শিক্ষার জন্য দায়ী করে। এটি প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্কের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের পথ সুগম করে। |
| কোম্পানির উপর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা | কম্পট্রোলার বোর্ডের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রভুত্বের দাবি: পার্লামেন্টে কোম্পানির সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা কমিটি – ‘বোর্ড অফ কন্ট্রোল’-এর ক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো হয় এবং ভারতের উপর ব্রিটিশ রাজার চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব দাবি করা হয়। | এটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে ক্ষমতা সরিয়ে নিয়ে সরকারের প্রত্যক্ষ দায়িত্বের দিকে একটি পদক্ষেপ ছিল। রিপোর্টের মাধ্যমে সংগৃহীত বিশদ তথ্য এই বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করে। |
ফিফথ রিপোর্টের উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল এর দ্বৈত ও আপাত-বিরোধী চরিত্র। রিপোর্ট কোম্পানির তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষিতে তৈরি হলেও, এর বিশদ অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত কোম্পানিকে ভাল প্রশাসনিক সংস্থা হিসাবে শংসাপত্র দিতে দ্বিধা করে নি। রিপোর্টের এই “অনুকূল” সিদ্ধান্তই ১৮১৩-র সনদে মূল সমঝোতা সম্ভব করেছিল : ১) কোম্পানি তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখায় (প্রশাসক হিসেবে)। ২) কিন্তু কোম্পানি তার বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার হারানোয় (বণিক হিসেবে)। এভাবে, এই রিপোর্ট কোম্পানির শাসন কাঠামো ভেঙে না দিয়ে, তাকে পুনঃসংজ্ঞায়িত ও নিয়ন্ত্রিত করে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ