তৃতীয় অধ্যায়।
১৬৩০-১৬৯৮
ইংরেজদের বাংলায় আগমন।
১৬২০। সুরাট থেকে ইংরেজ বণিকরা আগ্রা হয়ে পাটনা পৌঁছলেন। কিন্তু বিহারে কুঠি তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা বাতিল হল।(তথ্যটি স্টুয়ার্ট উল্লেখ করেছেন (হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, ১৮৪৭, পৃষ্ঠা ১৪০-৪১), তিনি ‘ইন্ডিয়া রেকর্ডস, ১৬২০, খণ্ড ১’-এর কথা উল্লেখ করেছেন, যা এখন যাচাই করা অসম্ভব। ইয়ুলের (হেজেস ডায়েরি, হ্যাকলুইট সোসাইটি) অনুমান ইংরেজরা যদি সত্যিই প্রাথম যুগে পাটনায় পৌঁছয়, তাহলে তারা অবশ্যই পশ্চিম উপকূল থেকে এসেছিল। মি. ফস্টার তাঁর ‘ইংলিশ ফ্যাক্টরিজ ইন ইন্ডিয়া, ১৬১৮-১৬২১’, পৃষ্ঠা ১৯১ এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে এর প্রামাণ্য দলিল দিয়েছেন) এগারো বছর পর টমাস রবিনসন বাংলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। তিনি ২৯শে জুলাই, ১৬৩১-এ মাসুলিপত্তম ছেড়ে বেরোন, কিন্তু তার জাহাজ, হোপওয়েল, উথালপাথাল আবহাওয়ার দরুন ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরের বছর টমাস উডসন ‘পার্ল’ জাহাজে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন; উদ্দেশ্য ছিল সিসা, পারদ, সিঁদুর, কাপড় ইত্যাদি পণ্যের বিনিময়ে চাল, মাখন ও কাপড় ইত্যাদি সংগ্রহ করা এবং বাংলা বাণিজ্যের জন্য কী কী সুযোগ তৈরি হতে পারে সে সব অনুসন্ধান করা, কিন্তু আবারও প্রতিকূল বাতাসের কারণে ‘পার্ল’ জাহাজটি যাত্রা সম্পন্ন না করেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। (সি. আর. উইলসন: বালেশ্বরের ইংরেজ প্রধানদের উপর টীকা, ১৬৩৩-৫০। ১৯০৬। (অপ্রকাশিত পুস্তিকা)। দেখুন ফস্টার: ইংলিশ ফ্যাক্টরিজ ইন ইন্ডিয়া, ১৬৩০-৩৩, পৃষ্ঠা ২৪৪।) ১৬৩৩-তে মাসুলিপত্তনমে কোম্পানির এজেন্ট, সেই অঞ্চলে যা কাপড় পাওয়া যায় তার থেকে বেশি পরিমাণে কাপড়ের প্রয়োজন রয়েছে বুঝে আটজন ইংরেজকে কাপড় কেনার দায়িত্ব দিয়ে দেশি জাহাজে করে ওডিসার উপকূলে পাঠালেন। উইলিয়াম বার্টনের লেখা এই যাত্রা পথের মনোরম বিবরণ অসবোর্নের ‘কালেকশনস অফ ভয়েজেস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ (১৭৫২)-এ পাওয়া যায়। কটকের দরবার সফরের বর্ণনা দেওয়ার পর বার্টন লিখেছেন: ‘৯ই মে আমরা সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম এবং রাতে কটক থেকে রওনা হলাম। ১০ তারিখে, দুপুর ২টোর সময় আমরা হরহরপুর শহরে পৌঁছে দোভাষীর বাড়িতে বিশ্রাম নিলাম। ১১তে আমরা শহরের গভর্নরের কাছে গেলাম এবং তাকে আমাদের ফরমান বা রাজার কাছ থেকে পাওয়া আদেশপত্র দেখালাম। গভর্নর সেই ফরমানটির প্রতি শ্রদ্ধাবশত বড় সালাম, অভিবাদন জানালেন এবং তিনি আমাদের জন্য যা কিছু করতে পারেন, সবকিছুতে তার সর্বোত্তম সাহায্য ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেন। সেখানে উক্ত গভর্নরকে ছোট উপহারও দেওয়া হয়েছিল। ১২ই মে মিস্টার টমাস কোলি হরহরপুরে আমাদের কাছে এলেন, এবং তার সাথে বাকি ইংরেজরাও সমস্ত মালপত্র নিয়ে এলেন; সেখানে আমরা আপাতত একটি বাড়ি ভাড়া করলাম, যতক্ষণ না কোম্পানির ব্যবহারের জন্য আমাদের নিজস্ব বাড়ি তৈরি হয়…। চৌদ্দ তারিখে, দুই বণিক বাইরে গেলেন এবং বাড়ি তৈরির জন্য একখণ্ড জমি খুঁজে পেলেন; তারপর তারা সেখানে রাজা দেয়য়ের (সি. আর. উইলসন এই শব্দটি ব্যাখ্যা করেছেন: ‘মারাঠি দুরাহি বা তেলুগু দুরাই ‘রাজার নামে একটি নিষেধাজ্ঞা যে, যতক্ষণ না তা প্রত্যাহার করা হয়, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারবে না’।’ প্রয়াত মি. উইলিয়াম আরভিন একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছেন: ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তির বহুল বিতর্কিত প্রশ্নের উপর এর প্রভাবের কারণে এই অনুচ্ছেদটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে, যখন শাসকের কিছু জমির প্রয়োজন হয়েছিল, তখন তিনি কোনো অর্থ প্রদান ছাড়াই তা দখল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’ এই দুরাই ছিল কটকের নবাব বা গভর্নর আগা মুহাম্মদ জমানের কাজ।) আদেশ জারি করে কোম্পানির ব্যবহারের জন্য জমিটি দখল করে নিলেন; এবং এই কাজের জন্য কেউ তাদের বিরোধিতা করেনি বা করার সাহসও দেখায়নি।’(সি. আর. উইলসন: আর্লি অ্যানালস অফ দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫। পাটালি বা পাটনা নদীর মোহনায় অবস্থিত হরিহরপুর কটক এবং হরিশপুরের প্রাচীন বন্দরের মাঝে অবস্থিত।)
বার্টন যে ফরমানের কথা উল্লেখ করেছেন, তার হদিস মেলে নি; সম্ভবতঃ নথিটা সম্রাটের ফরমান ছিল না, হয়ত ওডিসার সুবাদার অথবা কটকের নবাবের নির্দেশনামা ছিল। লক্ষণীয় হলো, বাংলায় প্রাথমিক দিনগুলোতে কোম্পানির কর্মচারীদের মনে এতটাই করুণ এবং ভ্রান্ত ধারণা ছেয়ে ছিল যে, তাদের মনে হয়েছিল, সুসংহত এবং সুসংগঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের ‘বাদশাহের’ (মুঘল সম্রাটকে এই নামেই ডাকত) লিখিত আদেশ সকলস্তরের সকল অধস্তনই আইন হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হবে। প্রেসিডেন্ট মেথওল্ড অবশ্য প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন প্রশাসক ছিলেন; যদি তার অধস্তনরা প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞ নির্দেশাবলী অনুসরণে পরিচালিত হতেন (যা ২৮শে এপ্রিল, ১৬৩৬ তারিখে লেখা হয়েছিল), তবে কোম্পানির অনেক খরচ এবং তার কর্মচারীরা বারবার হতাশ হওয়া থেকে রক্ষা পেত: বাদশাহের আদেশ (শব্দের অর্থ ফরমান) যে কোনও শাহজাদার আদেশের মতোই সহজে পাওয়া যায়; যেহেতু কোনো শক্তিশালী বিরোধী নেই, তাই খরচ করলেই সেই ফরমান প্রায় সহজে পাওয়া যায়। আর যখন আপনি সে সব নির্দেশ সহজে পেয়ে যান, তখন তার হাল হয় শস্তায় কেনা জিনিসের মতোই, সেগুলোর যথেষ্ট মূল্য থাকে না; এ দেশে সবাই বাদশাহকে সম্মান করে, কিন্তু কেউ তাকে মান্য করে না। আর তাই তার ফরমানটি আমাদের পিপলিতে যেতে যেমন বাধ্যও করে না, আবার হরিপুর, যেখানে আমরা নিয়মিত যাই, সেখান থেকেও আমাদের বের করে দেয় না। সুতরাং, গভর্নরের সাথে শান্তি স্থাপিত হলে, বাদশাহ আদৌ কী আদেশ করলেন বা নিষেধ জারি করলেন, সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় না, যদি না প্রতিবেশী গভর্নর আপনার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়।’(ফস্টার: দ্য ইংলিশ ফ্যাক্টরিস ইন বেঙ্গল, ১৬৩৪-৩৬, পৃ. ২০৪)
মনে হয়, ইংরেজদের মন ভ্রান্ত ধারণায় আচ্ছন্ন ছিল যে, সম্রাটের জারি করা ফরমান তাদের নিজেদের ইংরেজ রাজার দেওয়া সনদের মতোই বাধ্যতামূলকও হবে এবং একই রকম কার্যকরও হবে। তারা এমন কিছু সুবিধা আদায় করতে চেয়েছিল, যা একবার মঞ্জুর হলে তারা আর সম্রাটের ইচ্ছাধীন থাকবে না। অথচ মুঘলদের কাছে ফরমান জারি করে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করার ধারণা সম্ভবত অদ্ভুত এবং অনাকাঙ্ক্ষিতও ছিল। ইংরেজরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল অনন্য সত্তা, এবং তারা তাদের ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি আশা করে, যা এতটাই শিথিলভাবে পরিচালিত সরকারের পক্ষে দেওয়া অসম্ভব ছিল। এমনকি ইংরেজরা দুর্গ তৈরি করে বাস্তব অথবা কাল্পনিক যে কোনও আক্রমনের প্রতিরোধের উপায় অর্জন করার পরেও, ১৭১৭-য় মুঘলদের দেওয়া সুবিধা বাস্তবায়িত করতে পারে নি, কারণ মুঘল সম্রাট যা-ই আদেশ দিন না কেন, মুর্শিদাবাদের সুবাদার, কোম্পানির অধিকার আদায়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৭৬৫ পর্যন্ত ক্লাইভ সম্রাটের থেকে খুব বেশি কিছু সুবিধা আদায় করতে পারেননি, অথচ সেই সময়ে বাংলার সামরিক আধিপত্য ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, কার্টরাইট হরিহরপুর ও বালেশ্বরের কুঠি স্থাপনের পরের বছর, অর্থাৎ ১৬৩৪-তে, সুরাটের ইংরেজরা শাহজাহানের থেকে এমন এক ফরমান লাভ করেছিল, যা তাদের বণিকদের বাংলায় বাণিজ্য করার অনুমতি দিলেও, তাদের জাহাজ পিপলি বন্দর পর্যন্ত যাত্রাতেই সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। (এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য সম্ভবত হুগলিতে ইংরেজদের অতিরিক্ত শক্তিশালী হওয়া থেকে বিরত রাখা ছিল; এখান থেকে ১৬৩২-এ শাহজাহান পর্তুগিজদের তাড়িয়েছিলেন। মিঃ ফস্টার দেখিয়েছেন ১৬৩৪-এ শাহজাহানের ফরমান সম্পর্কে ডঃ উইলসনের সংশয় অমূলক। ১৬২১-তে সম্রাট যখন শাহজাদা খুররম, সে সময় পিপলি পরিদর্শন করেন এবং নাম দেন ‘রাজকীয় বন্দর, শাহ বন্দর’। সেই শহর এখন সম্পূর্ণরূপে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।)
১৬৫০-তে হুগলি কুঠি প্রতিষ্ঠিত হল। গ্যাব্রিয়েল বাউটনের মনোমুগ্ধকর উপাখ্যান – সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় কন্যা, অগ্নিদগ্ধ রাজকুমারী জাহানারা বেগমের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে তাঁর সেবাদান, এবং কোম্পানির বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার জন্য তাঁর নিঃস্বার্থ দাবি এবং পিঠেপিঠি পুরস্কার প্রাপ্তি খুব একটা যে বিশ্বাসযোগ্য বয়ান এমন নয়; কিন্তু মিস্টার ফস্টারের সাম্প্রতিক গবেষণা (ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকোয়ারি, খণ্ড ৪০, অংশ ডিএক্সআই, সেপ্টেম্বর, ১৯১১, প্রবন্ধ ‘ Gabriel Boughton and the Grant of Trading Privileges to the English in Bengal’ লিখেছেন ডব্লিউ. ফস্টার) থেকে এখন এই বিষটা অত্যন্ত সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে – হলেও হতে পারে; হয়ত বাউটনের পৃষ্ঠপোষক সুলতান সুজার উপর তাঁর প্রভাবের কারণেই ১৬৫১-তে হুগলির ফ্যাক্টরেরা সুলতান সুজা থেকে নিশান লাভ করেন। সুলতান সুজা তখন বাংলার সুবাহদার হিসেবে রাজমহলে অবস্থান করছিলেন (সুলতান সুজা তাঁর রাজধানী গৌড় থেকে রাজমহলে (বা আকবরনগরে) স্থানান্তর করেছিলেন। দেখুন স্টুয়ার্ট: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫৬), এবং তিন হাজার টাকা পেশকাশ দিয়ে পাওয়া নিশানের শর্তানুযায়ী ইংরেজদের শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতি দেয় (নিশানটির একটি অনুলিপি ইন্ডিয়া অফিসের সনদ ও চুক্তি সংক্রান্ত পাণ্ডুলিপি সংগ্রহে, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৫-৮-এ পাওয়া যাবে। একটি অনুবাদ স্টুয়ার্ট, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পরিশিষ্ট নং ২, এবং স্যার আর. টেম্পল, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১-এ দেওয়া হয়েছে। স্ট্রেয়নশাম মাস্টারের ডায়েরিতে প্রাপ্ত অনুলিপিতে প্রদত্ত তারিখটি হলো ‘হিজরি এক হাজার ছেষট্টি বছর (এপ্রিল, ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ), সম্রাট শাহজাহানের গৌরবময় রাজত্বের ২৮তম বছরে।’ তবে, তারিখ সম্পর্কে ডঃ সি. আর. উইলসনের যুক্তিটি মিঃ ফস্টারের গবেষণায় খণ্ডন করা হয়েছে)। পল ওয়াল্ডগ্রেভ বালেশ্বর থেকে মসলিপত্তন যাওয়ার পথে ডাকাতদের কবলে পড়েন এবং এই মূল্যবান দলিল হারিয়ে যায়, কোম্পানির সমস্ত সম্পত্তি লুট হয়ে যায়। এই অপরিহার্য দলিলের অভাব পূরণের জন্য, ‘মিস্টার বিল্ডেজ’ রাজমহলে রাজকুমারের দরবারে যান এবং ‘মিস্টার বাউটনের কর্মচারী জেমস প্রাইস’-এর সহায়তায় নিশান লাভ করেন, যার শর্তাবলী চুরি হওয়া নিশানটির মতোই ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ