সুলতান সুজা, মনে রাখা দরকার], সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র। দিল্লির সিংহাসন দখল নেবার জন্য তাঁর লড়াইতে, তৃতীয় ভাই আওরঙ্গজেবের হাতে তাঁর পরাজয় ঘটে। ভায়ের তাড়ায় পালিয়ে গিয়ে আরাকানিদের হাতে তাঁর হত্যার গল্প মুঘল ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। পরবর্তীকালে সুলতান সুজার সুবাহদারি সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত প্রশাসনের যুগ হিসেবে ব্রিটিশ ইতিহাসে বিবেচিত হয়েছে। যখন থেকে সুজা বাঙলা থেকে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ১৬৫৯ থেকে বাঙলা ছাড়লেন, তখন থেকে বাংলায় মুঘল শাসনের অবক্ষয়ের যুগ শুরু হল। ১৬৭৬-এর ডিসেম্বরে ওয়াল্টার ক্ল্যাভেলের লেখা হুগলির বিবরণ থেকে সম্ভবত অবক্ষয়ের সময়কাল নিয়ে আরও সুচারু তারিখ পাওয়া যায় :
গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় হুগলির ভৌগোলিক অবস্থান, ব্যবসার জন্য অত্যন্ত সুবিধেজনক ছিল। গঙ্গার শাখা নদীগুলো দূরবর্তী দেশ থেকে এসে ছড়িয়েপড়েছিল। পূর্বকালে এই অঞ্চল ছিল সম্পূর্ণ পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের সমৃদ্ধিকালে প্রতি বছর ভারত আর মালয় থেকে ৬০ থেকে ১০০টি জাহাজ পণ্য নিয়ে এই বন্দরে আসত। প্রায় ৪২ বছর আগে হুগলি মুসলমানদের দখলে চলে যাওয়ার পর থেকে এই অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে রাজার মনসবদাররা গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হতেন, তাদের নিয়োগ করতেন বাংলার নবাবরা। এবং তারা রাজমহল বা ঢাকার নবাবদের তাদের কাজকর্মের জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন। যতদিন এটি এভাবে মুসলমানরা শাসন করছিল, ততদিন ন্যায় বিচার প্রশাসন উপযুক্তভাবে পরিচালিত হতো এবং রাজার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হতো, বিশেষ করে বিদেশীদের পক্ষে বিচার পাওয়া সুবিধের ছিল। কিন্তু ১৬৬৩ বা তার কাছাকাছি সময় থেকে (আসলে ১৬৬৬ থেকে) যখন বর্তমান বাদশাহর চাচা নবাব শায়েস্তা খান বাংলার সুবা বা ভাইসরয় হন এবং হুগলিকে তাঁর জায়গিরের (অর্থাৎ তাঁর ব্যক্তিগত খরচের জন্য বরাদ্দকৃত জমির) অংশ হিসেবে লাভ করেন, এবং তাঁর কর্মচারীরা সেখানকার সমস্ত খাজনা, লাভ, উপরি পাওনা, জরিমানা, শুল্ক ইত্যাদি আদায়ের জন্য কার্যত শাসকের ক্ষমতা লাভ করে, তখন থেকেই বাদশাহর গভর্নররা শুধু নামেমাত্রই শাসক হিসেবে গণ্য হত। বেশিরভাগ সময় তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাত। আর নবাবের কর্মকর্তারা জনগণের উপর অত্যাচার করত, এমনকি পশুখাদ্যের ঘাস, বেত, জ্বালানি কাঠ, খড় ইত্যাদি সাধারণ জিনিসপত্রে একচেটিয়া দখলদারি চালায়। তারা দেশি বা বিদেশি নির্বিশেষে সব ধরনের ব্যবসায়ীর উপর অত্যাচার করারও নানা উপায় খুঁজে বের করত, কারণ তাদের বিরুদ্ধে ঢাকায় অভিযোগ করা হলেও, নবাবের স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে সবকিছু ধামাচাপা দেওয়া হত; এবং যাতে নবাবের কর্মকর্তারা কোনো বাধা ছাড়াই সেখানকার বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারে, সেজন্য ঢাকা থেকে প্রতি বছর বিশ বা চল্লিশ হাজার টাকা পাঠানো হয়, অথবা খাজনা থেকে সেই পরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখা হয়, এবং পাইকারি পণ্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। এই অর্থ শহরের হিন্দু বণিকদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বিতরণ করা হয়, যার জন্য তারা বার্ষিক পঁচিশ শতাংশ সুদ দিত। কিন্তু ছয় বা আট মাস পরেই তাদের হিসাব চুকিয়ে দিয়ে এক বছরের সুদসহ আসল টাকা পরিশোধ করতে চাপ দেওয়া হত। এত ঘন ঘন আসল ও সুদ আদায় করার ফলে কখনও কখনও বণিকদের নবাব ও গভর্নরদের বছরে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হইয়েছে। এর ফলে নবাব আর তার মন্ত্রীদের সাথে এই দুর্ভাগ্যজনক বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা তাদের অন্যান্য ব্যবসা থেকে অর্জিত সমস্ত লাভ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এবং যেন তাদের নিঃস্ব করার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল না, গভর্নরের হাতে কোনো পণ্য আসে, তখনই তিনি তলব করেন এবং বাজারের তৎকালীন মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি দামে নিজের ইচ্ছামতো পরিমাণে তাদের বিতরণ করেন, আর তারা নগদ টাকায় মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এমনকি এছাড়াও তারা নবাবের কর আদায়কারীকে বা গভর্নরকে সব ধরণের উৎসবে, তার বা তার ছেলের জন্মদিনে, খতনা অনুষ্ঠানে, বিয়েতে, অথবা তার ঢাকা যাওয়া-আসার সময়, হিসাব মেলানোর সময় এবং তার অপকর্মের জন্য আপস করার সময় ছোটখাটো উপহার দেওয়া থেকে রেহাই পায় না। শুধু তাই নয়, আমার সময়ে এমনও ঘটেছে যে, যখন নবাব এবং তার কর্মকর্তারা ঢাকায় তাদের অনেক শোষণ করেছে, এবং তারপরও অনেকেই সৌভাগ্যবশত পূর্বের পদে ফিরে এসে খরচ হওয়া অর্থ জোগাড়ের জন্য গোপনে পুরো সরকারের উপর আবওয়াব আরোপ করেছে, মেনে নিতে এক বা দুজন ভীতু ব্যক্তিকে রাজি করানো হয়েছে, এবং এরপর বাকিরা এর বিরোধিতা করার সাহস করেনি। (The Diaries of Streynsham Master, 1675-80, and other contemporary Papers relating thereto. (Indian Records series, 1911), স্যার রিচার্ড কারনাক টেম্পল, বার্ট. কর্তৃক সম্পাদিত, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৯-৮১। ক্ল্যাভেল ১৬ই মে, ১৬৬৮-এ লন্ডনে পৌঁছান। ১৬৭০-এ তিনি ‘বে অঞ্চলের প্রধান’ হন এবং ৩রা আগস্ট, ১৬৭৭-এ বালেশ্বরে মারা যান। আমি এই অনুচ্ছেদের বানান আধুনিকীকরণ করেছি এবং একটি বাক্যে স্যার আর. সি. টেম্পল কর্তৃক প্রস্তাবিত অধিক যুক্তিসঙ্গত পাঠটি গ্রহণ করেছি।)
এই অনুচ্ছেদে বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। রাজা এবং নবাবের কর্মকর্তাদের পরিচালিত শাসনের মন্দ দিকটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে; এবং এতে উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তাদেরকে নীতিহীন ও অত্যাচারী বণিকের চরিত্রও প্রকাশ হয়েছে। বাণিজ্যের প্রতি নবাবদের আগ্রহ প্রমানে একটি ঘটনা উল্লেখই যথেষ্ট, এবং এটা শাহজাদা আজিম-উশ-শানের ক্ষেত্রে লিপিবদ্ধ আছে। স্টুয়ার্ট লিখেছেন, ‘শাহজাদা বাংলায় আগত সমস্ত ইউরোপীয় ও বিদেশি পণ্যের একমাত্র খরিদ্দার হতে চেয়েছিলেন; তাই তিনি সব কটা বন্দরে প্রতিনিধি নিয়োগ করেন; তাদের আগত প্রতিটি জাহাজের পণ্য কম দামে কিনে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল; এবং পরবর্তী কালে সেই পণ্য বণিকদের কাছে যথেষ্ট লাভে বিক্রি করা হয়েছে। এই ধরনের বাণিজ্যকে ‘সৌদাই খাস’ বা ‘সৌদাই আম’ অর্থাৎ বিশেষ ও সাধারণ ক্রয় নামে অভিহিত করা হতো।’ (স্টুয়ার্ট: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ২১৮। সৌদাই সৌদা, ট্রাফিক। ‘আম’ শব্দটি ‘খাস’ অর্থাৎ অভিজাতদের বিপরীতে সাধারণ জনগণকে বোঝায়।)
নিপীড়নের অভিযোগ সত্ত্বেও ইংরেজদের বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলো ক্রমশঃ সমৃদ্ধি লাভ করায় তারা হুগলি থেকে বণিকদের দেশের ভিতরে পাঠাত। ‘পণ্য সংগ্রহের’ জন্য ব্রিটিশদের বণিকদের পাঠিয়ে স্থানীয় কারিগরদের অগ্রিম অর্থ দেওয়া হত, এবং কোম্পানির অভিজ্ঞতা শীঘ্রই দেখাল প্রত্যেকজন অগ্রিম গ্রাহকের ওপর অবিরাম নজর রাখা আবশ্যক। অধিকাংশ সময় তাঁতিরা ইংরেজদের কাছে আসত না, ইংরেজরা তাঁতিদের খোঁজে যেতে বাধ্য হতো। ১৬৫৮-র আগেই কাশিমবাজারের কুঠি খোলা হয়েছিল। ১৬৫৯-তে ইংরেজরা আবারও পাটনার কাছাকাছি ছিল (জন মার্শালের ১৬৭৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর লিখিত ” Accompt of Pattana ” দেখুন: “সম্মানিত কোম্পানির এখানে কোনো কুঠি নেই, ভাড়া করা হয়েছে; কুঠিয়াল সাধারণত সেখানে থাকেন না, কারণ নবাবের প্রাসাদ শহরে অবস্থিত, এবং তার কর্মচারীরা ও কর্মকর্তারা ক্রমাগত কোনো না কোনো জিনিস চেয়ে থাকে, যা যদি না দেওয়া হয়, তবে তারা যা চায় তা না পেলেও সন্তুষ্ট হয় না বরং ঝামেলা সৃষ্টি করে; আর যদি তাদের চাওয়া জিনিস দেওয়া হয়, তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। এই অসুবিধাটি সিঙ্গি গ্রামে বসবাস করে এড়ানো যায়, যা পাটনার উত্তরে গঙ্গার ওপারে প্রায় দশ বা বারো মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটি একটি মনোরম কিন্তু স্বাস্থ্যকর নয় এমন জায়গায় অবস্থিত, কারণ এর বেশিরভাগই সোরামাটির এলাকা, তবে এই কারণেই এটি সুবিধাজনক, কারণ শোরা প্রস্তুতকারীরা এর কাছাকাছিই বাস করে।” স্ট্রেয়নশাম মাস্টারের ডায়েরি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৮৯। ইউল (উইলিয়াম হেজেসের ডায়েরি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪১) সিঙ্গি গ্রামটিকে লালগঞ্জের কাছে অবস্থিত সিংঘিয়ার সাথে শনাক্ত করেছেন। পাঠ্যের তারিখগুলোর জন্য দেখুন Ibid খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৪-৯৫।)। কোম্পানি তার ৪ঠা জানুয়ারি, ১৬৫৮-র চিঠিতে ঢাকায় কুঠি খোলার অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু যদিও জ্যাঁ দ্য থেভেনো ১৬৬৬-তে ঢাকা শহরে ব্রিটিশ কুঠির উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত ঢাকা কুঠি ১৬৬৯ পর্যন্ত আলাদা কুঠিয়াল নিয়োগের মর্যাদা অর্জন করে নি। যেহেতু কোম্পানি দামি ধাতু রাজমহলের টাকশালে মুদ্রা তৈরির জন্য পাঠাত, তাই কাছাকাছি একটা কুঠি তৈরির প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। ১৪ই অক্টোবর, ১৬৭৬-এ স্ট্রেয়নশাম মাস্টার ডায়েরিতে লিখছেন: ‘মিঃ রিচার্ড এডওয়ার্ডস এখন মাননীয় কোম্পানির সম্পদ নিয়ে রাজমহলের টাঁকশালে যাচ্ছেন, তাই মনে করা হচ্ছে যে, তিনি যখনই সেই কাজটি সম্পন্ন করে মালদায় যাবেন এবং পূর্বে উল্লিখিত সব ধরনের পণ্যে সেই অর্থ বিনিয়োগ করবেন, এবং সেই স্থানের বাণিজ্য সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করবেন, এবং কাউন্সিলকে লিখিতভাবে তার হিসাব দেবেন।’ মিঃ এডওয়ার্ডস এই সমস্ত কাজ সম্পন্ন করেছিলেন, কিন্তু ১৬৮০ সালের আগে মালদায়, বা এর কাছাকাছি সময়ে কুঠিটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ