এভাবেই ইংরেজরা সওদাগরি কোম্পানির অত্যন্ত সাধারণ কর্মচারী হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করতে বাংলায় আসে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তাদের বাণিজ্যের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার কাজ আবশ্যিকভাবে নির্ভর করত ‘স্থানীয় শক্তিগুলোর’ সদিচ্ছা, দয়ার উপর। এই সদিচ্ছার প্রকাশ ছিল ফরমান আর পরোয়ানা মার্ফত। কেন্দ্রিয় সরকার এবং সুবার ক্ষমতাধরদের জারি করা এই নির্দেশিকাগুলোকে ব্রিটিশেরা আইনি অধিকারের সুনির্দিষ্ট ছাড় হিসেবে গণ্য করেছে। তারা মনে করত যে অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দেওয়া হয়েছে, সে সব তারা ছেড়ে দেবে না। এ কথা ভুললে চলবে না, ১৬৬১-তে [ইংলন্ডের রাজা] কোম্পানিকে দেওয়া সনদে কোম্পানি সরকারকে ‘দুর্গ নির্মাণ, সৈন্যবাহিনী তৈরি এবং অ-খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার’ ক্ষমতা দিয়েছিল। দুর্গ তৈরি করার মাধ্যমে তারা বাণিজ্য অধিকার রক্ষা করতে পারে। কোম্পানির কর্মকর্তারা এই অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা যে দিন উপলব্ধি করতে শুরু করল, বাংলায় ইংরেজদের ইতিহাস সেদিন থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে উপনীত হল [অর্থাৎ ব্রিটিশেরা যুদ্ধ করে ব্যবসা বাড়ানোর প্রবণতা বুঝল। এর সঙ্গে জুড়বে কোম্পানির বড় আমলাদের শাসকদের নিষেধ না মেনে অবাধে ব্যবসার উদগ্র ইচ্ছে – যাকে সুশীল চৌধুরী বলবেন উপউপনিবেশবাদ এবং এই উপউপনিবেশবাদই বাংলাকে পলাশীর দিকে ঠেলবে- অনুবাদক]। (ব্যবসার অনুমতিবিহীন ইউরোপীয় বণিক, যাদেরকে ব্রিটিশ খাতা-কাগজে ‘ইন্টারলোপার’ বা অবৈধ ব্যবসায়ী বলা হতো, তাদের হাতে কোম্পানির দুর্ভোগের বিষয়টি এত ব্যাপক যে এই গ্রন্থে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুঘল কর্তৃপক্ষ কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিতাড়িত করতে স্বাভাবিক অস্বীকৃতিকে কোম্পানির কর্মকর্তারা চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য করেছিলেন)
১৬৮২-তে, কোম্পানি, বাংলায় তাদের সামগ্রিক বিনিয়োগের ব্যাপক বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে এবং নিঃসন্দেহে আওরঙ্গজেবের ফরমান প্রাপ্তিতে উৎসাহিত হয়ে, বাংলা প্রশাসনকে মাদ্রাজের প্রশাসন থেকে স্বাধীন করে এবং তাদের অন্যতম পরিচালক উইলিয়াম হেজেসকে বঙ্গোপসাগরে তাদের প্রধান এজেন্ট বা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করে পাঠায়। নতুন গভর্নর, নিজের আলোচনার ক্ষমতার ওপর প্রভূতভাবে নির্ভর করে কাজে আসেন এবং কিছু সময়ের জন্য অতীতে তারা যে ফরমান আর পরওয়ানা নির্ভর ব্যবসায় আস্থা পোষণ করেছিল, সেই পরিবেশের পুনরুজ্জীবন ঘটে। যদিও ফোর্ট সেন্ট জর্জের কোম্পানি প্রশাসনের গভর্নর দুবার বাংলা সফর করে ব্রিটিশ বাণিজ্যে উদেভুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালালেও ১৬৮২-তে কোম্পানির হুগলি বাণিজ্য ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ হয়ে যায়। সেই বছরের অক্টোবরে, ‘আমাদের প্রধান কাস্টমার বুলচন্দ (বালচন্দ্র) আমাদের প্রতিদিন যে বিভিন্ন অপমান, ঔদ্ধত্য এবং দুর্ব্যবহার করছিল… সেই নিপীড়ন অসহনীয় হয়ে উঠেছে’ দেখে (উইলিয়াম হেজেস, এস্কোয়ারের ডায়েরি (পরবর্তীতে স্যার উইলিয়াম হেজেস)। আর. বার্লো কর্তৃক ভূমিকা টীকা সহ মুদ্রণের জন্য অনুলিখিত, এবং কর্নেল ইয়ুল, আর. ই., সি.বি., এলএল.ডি. কর্তৃক প্রচুর উদ্ধৃতি ইত্যাদি দ্বারা চিত্রিত। হ্যাকলুইত সোসাইটি, ১৮৮৭, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২।), হেজেস ঢাকায় যাওয়ার এবং শায়েস্তা খানের দরবারে অভিযোগ দায়ের করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তের পরবর্তী ঘটনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় রাজস্ব কর্মকর্তা পরমেশ্বর দাস গভর্নর এবং তার রক্ষীদের নৌবহর নিয়ে যাত্রা করার অনুমতি দিলেও, গোপনে সশস্ত্র দল পাঠিয়ে নদীর উজানে ছোট নৌবহর আটক করার নির্দেশ দেন। ইংরেজদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক সংঘর্ষ এবং পাঁচ দিন ধরে অপমানজনক বিতর্কের পর, হেজেস রাতে গোপনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাত্রাপথে তিনি আরও হয়রানির শিকার হন, কিন্তু অবশেষে ২৯শে অক্টোবর ঢাকায় পৌঁছান। রাজধানীতে হেজেস প্রায় ছয় সপ্তাহ আলোচনায় অতিবাহিত করেন এবং নিজের দরকষাকষির উদ্যমকে সফল ঘোষণা করে ফিরে আসেন:
‘প্রথমত, আমার ঢাকা যাত্রার ফলে ফরমান সংগ্রহের জন্য অনেকটাই – সাত মাস সময় পাওয়া গেছে; দ্বিতীয়ত, এই বছর এবং পূর্ববর্তী তিন বছরে আমদানি করা সমস্ত সম্পদের উপর ৫ শতাংশ শুল্কের অজুহাত সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা গিয়েছে; এছাড়াও বিগত কিছু সময় ধরে টাঁকশালে প্রদেয় ১.৫ শতাংশ শুল্কও মওকুফ করা হয়েছে; তৃতীয়ত, আমাদের সমস্ত বাণিজ্যের উপর আরোপিত সাধারণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, এবং আমাদের পণ্য এখন আগের মতই [বাংলা এবং ভারতজুড়ে – অনুবাদক] অবাধে চলাচল করছে; চতুর্থত, পরমেশ্বর দাসকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার এবং আমাদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা অর্থ ফেরত দেওয়ার আদেশ পাওয়া গেছে; পঞ্চম ও সর্বশেষ নির্দেশটা হল, নবাবকে রাজার কাছ থেকে আমাদের জন্য ফরমান সংগ্রহ করার দায়িত্ব নিতে রাজি করানো গেছে… যদি ঈশ্বর আমাকে এই ফরমানটি আমার দখলে আনার জন্য জীবনটুকু উপহার দেন, তবে মাননীয় কোম্পানিকে আর কখনও অবৈধ ব্যবসায়ীদের দ্বারা বিরক্ত হতে হবে না। ঢাকা যাত্রায় সকলের প্রত্যাশার বাইরে এই বিশাল সাফল্য লাভের জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ’। (প্রাগুক্ত)
হেজেসের এই সমস্ত প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে নিছক বিভ্রম বলেই প্রমাণিত হয়েছিল; কিন্তু নিজের তথাকথিত সাফল্যে উল্লসিত হয়ে হেজেস অনুভব করলেন, কোম্পানির পরিষেবা সম্পূর্ণ সংস্কার সাধন করার জন্য তিনি এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। ১৭৬৫-র ক্লাইভের মতোই, ১৬৬১-তে হেজেস বিশ্বাস করতেন যে তাকে একটি বিশাল আবর্জনাপূর্ণ আস্তাবল বা Augean stable [Augean stable বলতে এমন এক স্থান অথবা পরিস্থিতি বোঝায় যেখানে প্রচুর নোংরামি, দুর্নীতির পরিবেশ ছড়িয়ে রয়েছে; এই শব্দবন্ধ গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী থেকে নেওয়া। এই গল্পে হারকিউলিস রাজা অজিয়াসের বছরের পর বছর ধরে পরিষ্কার না করা আস্তাবল পরিষ্কার করেন দুটো নদীর জল সেই আস্তাবলের মধ্য দিয়ে বইয়ে দিয়ে; আজকের দিনে এই শব্দের অর্থ বিশাল, কঠিন এবং অসততা বা দীর্ঘস্থায়ী অবহেলার সঙ্গে সম্পর্কিত ঘৃণ্য দুর্ণীতিপূর্ণ কাজ সমাধা করা – অনুবাদক] পরিষ্কার করতে হবে। ক্লাইভ সত্যিই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলা থেকে লন্ডনে বিতাড়ন করলেন; কিন্তু সমস্যা হল, তার এই সফল কাজের উপজাত ফল হিসেবে তিনি দেখলেন, বাঙলা থেকে বিতাড়ন করা লোকজন ইংল্যান্ডে শুধু আরোপিত অভিযোগ থেকে মুক্তিই পেল না, উপরন্তু তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট হয়ে নিজের দুর্বিনীত, দুষ্কর্মগুলোকে ব্যবহার করে অন্যদের [অর্থাৎ বিরোধীদের – অনুবাদক] অবিরাম ব্যস্ত এবং অসম্ভব হয়রানি করার পরিবেশ তৈরি করার মতো অবস্থানে পৌঁছেগিয়েছিল। সমস্যা হল, বাংলায় দায়িত্বে আসা হেজেসের, লর্ড ক্লাইভের মতো পদমর্যাদা অথবা ব্যক্তিগত ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না। তিনি অধস্তন কর্মচারীদের পদচ্যুত করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মচারীদের গায়ে হাত দেওয়ার বিন্দুমাত্রও সাহস পাননি, বিশেষ করে যে সব উচ্চপদস্থ কর্মচারী তাদের নামের সাথে জড়িয়ে থাকা ব্যাপক স্থানীয় কেলেঙ্কারিতে বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও ইংল্যান্ডে কোম্পানির আস্থাভাজন হিসেবে সুপরিচিত হলেন। কোম্পানির ব্যবস্থাকে বিশৃঙ্খল করে ফেলার পর, ১৬৮৪-র ১৭ই জুলাই হেজেস জানলেন তাকেই বরখাস্ত করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে কোম্পানির কর্তারা ধীরে ধীরে মুঘল প্রশাসনের জারি করা ফরমান-নিশানের মত কাগজে-কলমে তাদের পূর্বে আস্থার অসারতা বুঝতে শুরু করছিল [এবং সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ভাবনা ভাবছিল – অনুবাদক]। কয়েক বছর আগে হেজেস তাদের বলেছিলেন যে, যেহেতু মুসলিম কর্তৃপক্ষের সাথে বিবাদ অনিবার্য, তাই তাদের উচিত হবে উপসাগরে এক বছরের বাণিজ্য ক্ষতি স্বীকার করেও সাগর দ্বীপে দুর্গ নির্মাণে সক্রয়ভাবে উদ্যমী হওয়া। ১৬৮৩-র ২১শে ডিসেম্বরের হেজেসকে বরখাস্ত করার আদেশের চিঠিতে, কোম্পানির কর্তারা বললেন, বিষয়টা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গঙ্গা ও “ব্রেসেস”-এর মনোরম দ্বীপগুলোর মধ্যে একটি দখল করে দুর্গ স্থাপন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল পরিকল্পনা এবং তাদের এই পদক্ষেপ ডাচদের, মুঘল প্রশাসনকে সামরিক সাহায্যে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দেবে। মুঘলদের ওপর আক্রমণ বাংলা থেকে শুরু না করে বোম্বে থেকে শুরু করলে সেটা আরও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু তারপরেও যদি বাংলাতে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, তবে চট্টগ্রাম দখল করা হবে না কেন? তবে কোম্পানির কর্তারা এই প্রস্তাব নিছক তাত্ত্বিক পরামর্শ হিসেবেই দিয়েছিল। কয়েক বছরের মধ্যেই, কোম্পানির পরিচালন পর্ষদে একটি জঙ্গি মনোভাব গড়ে ওঠে এবং ১৬৮৬-তে দ্বিতীয় জেমসের অনুমতিতে তারা বোম্বের গভর্নরকে সুরাট এবং অধীনস্থ কুঠিগুলো থেকে সরে আসতে এবং তাদের জাহাজগুলোকে মুঘল বাহিনীর জাহাজ দখল করার নির্দেশ দেয়। কোম্পানির বাংলা প্রধান ও কুঠিয়ালদের (ফ্যাক্টর) বালেশ্বরে পিছিয়ে যেতে বলা হল, ভারতের দিকে আসা এক শক্তিশালী নৌবহর সেখান থেকে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে নেবে। নির্দেশ ছিল, যেহেতু ঢাকায় নবাব সম্ভবত তাকে পাঠানো চূড়ান্ত বার্তার উত্তর দেবেন না, তাই প্রয়োজনে সৈন্যদের শক্তি প্রয়োগ করে চট্টগ্রাম শহর, দুর্গ এবং অঞ্চল দখল করতে হবে এবং এরপর ‘আমাদের লেফটেন্যান্ট-কর্নেল জব চার্নককে আমাদের দখল করা চট্টগ্রাম দুর্গ, শহর এবং অঞ্চলের গভর্নর’ হিসেবে নিযুক্ত করতে হবে। (উইলসন: আর্লি অ্যানালস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯০)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ