১৬৮৬-তে জব চার্নকের হুগলী থেকে পলায়নের পরিকল্পনা আন্দাজ করে তাকে আটকানোর জন্য মুঘল প্রশাসন কাশিমবাজার বাড়ির চারপাশে প্রহরী মোতায়েন করে। চার্নক সতর্ক সশস্ত্র মুঘল পাহারাদার বাহিনী ফাঁকি দিয়ে হুগলি পৌঁছান। সেখানেই কোম্পানির বে-অঞ্চলের প্রধান পদে তাকে বসানো হয়। বছর শেষ হওয়ার আগেই ইংল্যান্ড থেকে প্রায় তিনশ সৈন্য বাংলায় এসে পৌঁছালে হুগলির আশেপাশে বাহিনীর ছাউনি ফেলা হয়। পাঠানো নৌবহরে ছিল ছ’টা জাহাজ। প্রতিটা জাহাজেই সৈন্যদল বিপুল পরিমান গোলারুদ ভর্তি ছিল; কিন্তু এই জাহাজগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটি বে-অঞ্চলে এসে পৌঁছায়— বিউফোর্ট জাহাজে ক্যাপ্টেন জন নিকলসনের নেতৃত্বে ৭০টি কামান ও ৩০০ নাবিক-সেনা, নাথানিয়েল জাহাজে ক্যাপ্টেন মেসনের নেতৃত্বে ৫০টি কামান ও ১৫০ নাবিক-সেনা এবং রশেস্টার জাহাজে ১২টি কামান ও বিশজন নাবিক-সেনা। ভারতের কোম্পানি কর্তারাও নদীযুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বেশ কয়েকটি জাহাজ ব্যবস্থা করে নোঙর করে রাখা ছিল। এই যুদ্ধ অভিযানে ইংলন্ড থেকে পাঠানো সৈন্যবাহিনীর পাশাপাশি, কোম্পানির হুগলিতে স্থানীয় খ্রিস্টান ও মিশ্র পর্তুগিজ সহ বিভিন্ন জাতির মিশ্র যোদ্ধা দল ইতিমধ্যেই ছাউনি ফেলে অবস্থান করছিল— স্থানীয় মানুষ এই স্থানীয় যোদ্ধাদের ‘তোপাজ’ নামে চিনত। তাছাড়া ছিল রাজপুত আর দেশীয় পেয়াদা। অন্যদিকে, নবাব শহর পাহারা দেওয়ার জন্য তিন হাজার অশ্বারোহী এবং তিনশ পদাতিক সৈন্য পাঠান এবং গভর্নর আবদুল-গনি অবিলম্বে নদীতে ইংরেজ জাহাজগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য এগারো কামানের একটি ব্যাটারি স্থাপন করেন। ২৮শে অক্টোবর, তিন ইংরেজ সৈন্যের সাথে দুর্ব্যবহারের ঘটনা আদতে যুদ্ধের দিকে মোড় নেয়। এই ঘটনা কেন্দ্র করে ঘোরতর শত্রুতার সূত্রপাত হয়; তিন জনের একটা দল বাজারে গিয়েছিল। সেখানে তাদের মারধর করা হয়। লড়াই শুরু হয়ে যায় সেই দিনেই। প্রথম দিনের লড়াই ইংরেজদের পক্ষেই গিয়েছিল, যদিও ব্যাটারি আক্রমণে অনেকে আহত হয়েছিল, তবুও মাত্র একজন নিহত হয়; আহত হয় নি। শত্রুপক্ষের প্রায় ষাটজন নিহত হয় এবং ব্রিটিশদের মন্তব্য আতঙ্কিত আবদুল-গনি ছদ্মবেশ ধারণ করে পালিয়েছিলেন।
তবে মুঘলেরা ইংরেজদের কুঠি পুড়িয়ে দিয়েছিল। আসল সংঘাত শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই হুগলি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা চার্নক বুঝতে পারলেন ২৮ তারিখের সংঘর্ষের পর উভয়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, সেটা ছিল শুধুই সাময়িক শান্তির পরিবেশ। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এই সময়ের মধ্যে তার পশ্চাদপসরণের প্রস্তুতি নিতেই হবে। ৩০শে ডিসেম্বরের আগে ইংরেজরা হুগলি ত্যাগ করেনি এবং তাদের জাহাজে করে নদীপথে সুতানুটিতে যাত্রা করে। রি স্থানটা আজকের কলকাতার উত্তরে অবস্থিত। ব্রিটিশদের কেউ কেউ মনে করছিলেন শান্তি আলোচনায় একজন প্রতিনিধি পাঠানো হলে, প্রশাসক শায়েস্তা খান তাদের দাবি মেনে নেবেন। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মসেই স্পষ্ট হয়ে যায় নবাব স্পষ্টভাবে ইংরেজদের চিরতরে বাংলা থেকে বিতাড়িত করার জন্য প্রস্তুতি চালানোর উদ্দেশ্যে সময় নিচ্ছিলেন। ৯ই ফেব্রুয়ারি চার্নক মুঘল লবণ গুদামগুলো পুড়িয়ে দেন এবং ১১ই ফেব্রুয়ারি নদীর একপাশে খিদিরপুরের সামান্য নিচে থানা দুর্গ এবং অন্যপাশে শিবপুরের [থানা মাকুয়া। এখনকার বোটানিক্যাল গার্ডেন অঞ্চল। ‘হাওড়া’-য় তারাপদ সাঁতরা লিখছেন, ১৬৫১ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় ইংরেজ বণিদের প্রথম বাণিজ্যকুঠি স্থাপিত হয় হুগলীতে। কিন্তু বাংলার তৎকালীন সুবেদার শায়েস্তা খাঁর সঙ্গে বিরোধের ফলে হুগলী-কুঠির ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী জোব চার্নক সসৈন্যে ভাগীরথীর পূর্ব তীরে সুতানুটিতে এসে আশ্রয় নেন। কিন্তু মোগল সৈন্যবাহিনী সেখানেও তাঁদের পিছু ধাওয়া করলে তাঁরা পালিয়ে যান হিজলীর দিকে। এই পশ্চাদপসরণের সময় ইংরেজরা মোগলদের অধিকার থেকে এই তানা দুর্গ দখল করে নেয় এবং ভাগীরথীর দুই তীরে অবস্থিত মোগলদের বহু শস্য ও লবণ গোলায় আগুন ধরিয়ে দেয় ও সেইসঙ্গে বেশ কিছু রণতরী ও বাণিজ্য জাহাজও ধ্বংস করে দেয়। ১৬৮৭ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসের মাঝামাঝি হিজলীতে শায়েস্তা খাঁর সৈন্যদলের সঙ্গে এক প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ইংরেজদের সঙ্গে যে চুক্তি হয় তাতে ইংরেজরা হিজলী থেকে সরে এসে উলুবেড়িয়াতে জাহাজ সারানোর কারখানা নির্মাণের অনুমতি পেলেও তাদের তানা দুর্গে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। এই চুক্তি অনুসারে চার্নক ১৬৮৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ই জুন উলুবেড়িয়াতে এসে পৌঁছান এবং সেখান থেকেই মোগল শাসন কর্তাদের অনুমতি নিয়ে ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আবার সুতানুটি এসে পৌঁছান। এ বিষয়ে ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হাওড়া জেলা গেজেটিয়ারে মিঃ ব্রম-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে যে, চার্নকের রণতরী এমনই বিপর্যস্ত হয়েছিল যে, সেগুলি মেরামতের জন্যে তাকে তিন চার মাস ঐ উলুবেড়িয়াতেই থাকতে হয়েছিল। যাই হোক, উলুবেড়ে থাকাকালে চার্ণক প্রথমেই সুপারিশ করেন যে, উলুবেড়িয়াতেই ইংরজ ঘাঁটি তৈরী হোক। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুতানুটিকে যোগ্যতর মনে করায় জোব চার্নক শেষ অবধি ১৬৯০ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে অগাষ্ট সদলে সুতানুটিতেই ফিরে আসেন। বলতে গেলে, এই তারিখটিই হল কলকাতা মহানগরীর ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠার দিন। সুতরাং জোব চাণকের সুতানুটিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর না হলে হয়তো কলকাতার বদলে উলুবেড়িয়াই হত সে সময়ের ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের রাজধানী। — অনুবাদক] দুর্গগুলো দখল করেন। চার্নক যখন এই কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখন নিকলসন হিজলি দ্বীপ দখল করে নিয়েছিলেন।
এই দ্বীপের আশ্রয়স্থল থেকে ইংরেজরা গুরুত্বপূর্ণ শহর বালেশ্বর লুণ্ঠন করে। মার্চ-এপ্রিলের কঠিন মাসগুলো সাহসে ভর দিয়ে সব কিছু সহ্য করা হচ্ছিল; কিন্তু মৃত ও মুমূর্ষুদের সংখ্যা বাড়ছিল, এবং জানা যাচ্ছিল মুঘল বাহিনী জোরদার মৈত্রীজোট তৈরি করে চারদিকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে শায়েস্তা খানের সেনাপতি আবদুস সামাদ প্রায় বারো হাজার সৈন্য হুগলির আশেপাশে পৌঁছলেন। ২৮শে মে প্রায় সাতশো মুঘল অশ্বারোহী এবং দু’শো গোলন্দাজ রসুলপুর নদী পার হয়ে ইংরেজ দুর্গ আক্রমণ করে। অত্যন্ত মরিয়া যুদ্ধের পরেই ইংরেজরা শত্রুদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ১লা জুন ক্যাপ্টেন ডেনহামের নেতৃত্বে ইউরোপ থেকে আসা সত্তর জন নতুন সৈন্য এসে পৌঁছায় এবং পরের দিন দুর্গ থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আক্রমণ চালিয়ে তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে। এই নতুন বাহিনীর আগমনে শত্রুরা বিচলিত হয়েছে দেখে চার্নক চতুর পরিকল্পনা করেন। তিনি গোপনে কয়েকজন নাবিককে জোড়ায় জোড়ায় দুর্গ থেকে বাইরে পাচার করেন এবং তারা অবতরণস্থলে একটি সুসজ্জিত ছোট দলে একত্রিত হলে, ঢাকের বাদ্যি বাজাতে বাজাতে ও পতাকা ওড়াতে ওড়াতে তাদের দুর্গের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান, যাতে দেখে মনে হয় যেন সমুদ্র থেকে জাহাজযোগে আরও একদল নতুন সৈন্য আনা হয়েছে। এই কৌশল সফল হয় এবং ৪ঠা জুন আবদুস সামাদ যুদ্ধবিরতির পতাকা প্রদর্শন করেন। জিম্মি বিনিময় করা হয় এবং ইংরেজ জিম্মিদের নবাবের কাছে ইংরেজদের দাবিগুলো জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর, ১৮ই জুন জব চার্নকের ছোট সেনাবাহিনী তাদের সমস্ত যুদ্ধ সরঞ্জামসহ, ঢাকের বাদ্যি বাজাতে বাজাতে ও পতাকা ওড়াতে ওড়াতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে। হিজলিতে কাটানো সেই তিন মাসের ইতিহাস এমন এক গৌরবগাথা, যা নিয়ে আমাদের জাতি গর্ব করতে পারে।
হিজলি থেকে চার্নক এবং তার দল নদীপথে উলুবেড়িয়া যান, যেখানে তারা আবদুস-সামাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য তিন মাস অপেক্ষা করেন। সেপ্টেম্বরে তারা “খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্য এবং বর্ষাকাল কাটানোর উদ্দেশ্যে” সুতানুটিতে ফিরে আসেন এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে যে, “নবাব এই শেষ শর্তগুলো নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে আমাদের বিরুদ্ধে উদ্ভূত হতে পারে এমন কোনো ক্ষতিপূরণের দাবির বিরুদ্ধে আমাদের নিরাপত্তা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা বসতি স্থাপন বা বাণিজ্য করব না।”
ক্রমশঃ চার্নকের যুদ্ধ ইত্যাদি কার্যকলাপের খবর ইংল্যান্ডের রাজদরবারে পৌঁছল। ১৬৮৮-র শুরুতে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হিথকে দশ-এগারোটি জাহাজের বহরসহ বাংলায় পাঠানো হয়। হিথকে যে নির্দেশাবলী দেওয়া হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল যে তিনি বে-অঞ্চলে অঞ্চলে যাবেন, চার্নকের থেকে দায়িত্বভার বুঝে নেবেন এবং চট্টগ্রাম দখল করবেন। ২০শে সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন সুতানুটিতে পৌঁছান এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাউন্সিলকে তার আদেশের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করেন। দাম্ভিক ক্যাপ্টেন হিথের নেতৃত্বে বাংলার ফ্যাক্টরি কর্মকর্তাদের ঘুরেবেড়ানোর কাহিনী বাস্তব ইতিহাসের চেয়ে বরং একটি কিশোরদের অ্যাডভেঞ্চার বই বা বেশিকরে ‘হাউন্টিং অফ দ্য শার্ক’ গ্রন্থের গদ্যে লেখা কোনো অধ্যায়ের গল্পগাথার মতোই মনে হয়। ৮ই নভেম্বর ইংরেজরা আবার সুতানুটি ছাড়ে এবং ১৬ই নভেম্বর বালেশ্বরে পৌঁছায়, যেখানে হিথ পালাক্রমে যুদ্ধ ও আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। ১৮ই জানুয়ারি বাহিনী চট্টগ্রামে পৌঁছায়, যেখানে ক্যাপ্টেনের কার্যকলাপে সততা এবং সাধারণ জ্ঞান দুটোই অনুপস্থিত ছিল। গভর্নরকে জানান তিনি মুঘলদের সাথে চুক্তি অনুসারে আরাকান রাজকে দমন করার কাজে সহায়তা দেওয়ার জন্য এসেছেন, কিন্তু তার গভর্নরকে বিনীতভাবে বন্ধু আর সঙ্গী হিসেবে সম্বোধন করার আসল উদ্দেশ্য ছিল শহরের ওপর আক্রমণ শানানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে কাউন্সিলের পরামর্শ নেওয়া। এরপর তিনি আরাকানের রাজার কাছে তার পরিষেবা দেওয়ার জন্য যাত্রা করেন, কিন্তু রাজা সেই বীর ক্যাপ্টেনের পরিষেবা নেওয়ার বিন্দুমাত্রও প্রয়োজন বোধ করেননি। এই ধরণের নির্বোধ অভিযানে পাঠানো এক দুর্ভাগ্যবান দূতকে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে হিথ মাদ্রাজ অভিমুখে যাত্রা করেন। এইভাবে হিথের অর্থহীন অভিযান শেষে অংশ না নিতে পারা এবং ক্ষুব্ধ দর্শক হিসেবে চার্নক এবং তার কাউন্সিলকে বাংলা থেকে ফোর্ট সেন্ট জর্জে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ