ফিফথ রিপোর্ট – পার্লামেন্ট বিতর্ক
ভূমিকা, কুশীলব
আজ থেকে শুরু হবে ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদন নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৮১২-র বিতর্ক। বিতর্কে কোম্পানির পক্ষে এবং বিপক্ষের মেম্বার অব পার্লামেন্ট, এমপি যোগ দিয়েছিলেন। এই বিতর্ক থেকে কিছুটা আন্দাজ করা যাবে নব্যকর্পোরেটরা, বিশেষ করে ফ্রি ট্রেডার্স আর আউট পোর্টস অর্থাৎ লন্ডনের বাইরের জেলার বন্দরগুলোর কর্পোরেট আর বণিকদের দল কি প্রাবল্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটিয়া বাণিজ্য অধিকারের অবসান চাইছিল।
মাথায় রাখতে হবে কোম্পানির প্রশাসনিক কাজকর্ম, ব্যবসা, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি নিয়ে তদন্ত করতে পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটি ১৮১০-এ গঠিত হয়। ইন্টারেস্টিং হল অন্তত অন্তর্জালে এবং ফার্মিঙ্গারের সম্পাদিত রিপোর্টে আমি ১৮১০-এর কমিটি তৈরির নির্দেশনামা বা তার সদস্যদের নাম পাই নি। খোঁজ জারি আছে। আমি শুধু পেয়েছি হ্যান্সার্ডের পার্লামেন্টারি ডিবেট, যেটা আমি এখন উপস্থিত করতে যাচ্ছি। ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি, ১৮১০-এর কমিটির রিপোর্টের বলে বিশ্বের সব থেকে বড় কর্পোরেট কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার নাশ হল, সেই কমিটির কার্যাবলী, বিতর্ক ইত্যাদি কোনও কিছুই পাওয়া যায় না, শুধু প্রেক্ষিতহীন একদিনের পার্লামেন্টারি ডিবেট আর কেলি ফার্মিঙ্গারের সম্পাদিত ফিফথ রিপোর্টটির বাঙলা পোরশান, যার অনুবাদ আমরা কয়েক কিস্তি পরে শুরু করব। যদি কোনও পাঠক বিশদ বিবরণ পান, জানালে বাধিত থাকব।
১৮১০-এ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যাবলী তদন্তের জন্য সিলেক্ট কমিটি গঠন করে। কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল বাংলা প্রেসিডেন্সিতে কোম্পানির ভূমি রাজস্ব সংগ্রহ পদ্ধতি ও বিচার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা। তাদের তদন্তের ফলাফল ১৮১২-য় পার্লামেন্টে “পঞ্চম প্রতিবেদন” আকারে পেশ করা হয়, যা ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তো ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৮১২-তে হ্যান্সার্ডদের পার্লামেন্টারি ডিবেটের নথিকরণ সূত্রে যে কজনের নাম পেয়েছি, এক্কেবারে সেকেন্ডারি সূত্র থেকে তাদের পরিচয় বোঝার চেষ্টা করা গেল।
ফেব্রুয়ারি ১৮১২ পর্যন্ত নিম্নলিখিত সদস্যরা কমিটির অংশ ছিলেন :
মিঃ ওয়ালেস — সম্ভবত টমাস ওয়ালেস, যিনি পরে ব্যারন ওয়ালেস হয়েছিলেন এবং প্রখ্যাত টোরি রাজনীতিবিদ। ১৮১২-র বছরে কমিটির কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবটি তিনিই উত্থাপন করেছিলেন।
মিঃ হাওয়ার্থ — যতদূর সম্ভব হামফ্রে হাওয়ার্থ। তিনি লুশিংটন-সহ ফেব্রুয়ারি ১৮১২ সালে কমিটিতে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
মিঃ লুশিংটন — স্টিফেন লুশিংটন, আইনজীবী এবং সংসদ সদস্য। তিনি ফেব্রুয়ারি ১৮১২ সালে কমিটিতে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তাছাড়া আমি যে পার্লামেন্টারি রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করছি, তাতে আরও উল্লেখ আছে যে, মিস্টার হাওয়ার্থ ও মিস্টার লাশিংটন লর্ড মেলভিল (Henry Dundas) এবং স্যার জন অ্যানস্ট্রুথার, চতুর্থ ব্যারোনেটের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। অ্যানস্ট্রুথার চার্লস জেমস ফক্স (চার্লস জেমস ফক্স (১৭৪৯-১৮০৬) ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ হুইগ রাজনীতিবিদ, যিনি মূলত বিরোধী দলনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু ১৭৮৩ লর্ড নর্থের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে একটি স্বল্পস্থায়ী সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্টেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা ‘ফক্স-নর্থ কোয়ালিশন’ সরকার নামে পরিচিত। তার বিতর্কিত কাজকর্মের ফলে সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। তিনি ফরাসি বিপ্লবের প্রাথমিককালের সমর্থক এবং দাসপ্রথার বিরোধী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অদক্ষতা ও দুর্নীতি দূর করতে ১৭৮৩-তে তিনি একটা বিল, যার নাম ইন্ডিয়া বিল প্রস্তাব করেন। এই বিল কোম্পানির আঞ্চলিক ক্ষমতা ও বাণিজ্য, ব্রিটিশ সরকারের অধীনে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজা তৃতীয় জর্জ আর কোম্পানি সমর্থিত এমপিদের সক্রিয় বিরোধিতায় হাউস অব লর্ডস-এ এই বিল প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে ফক্সের জোট সরকার ভেঙে যায় এবং পিট দ্য ইঙ্গার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এই পর্ব ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়) বড় সহায়ক এবং সমর্থক ছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন, ইমপিচমেন্ট পরিচালনার জন্য নিযুক্ত ব্যবস্থাপকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তার দায়িত্ব ছিল বেনারস থেকে আসা অভিযোগের প্রমাণ সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা এবং উপহার সম্পর্কিত অভিযোগ পার্লামেন্টে তোলা। ১৭৯৭-তে তিনি বাংলার প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ১৭৯৮-তে ব্যারোনেট উপাধি লাভ করেন। ১৭৯৯ থেকে ১৮০৭ পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের সভাপতি ছিলেন। ১৮০৬-তে তিনি ব্রিটেনে ফিরে আসেন, প্রিভি কাউন্সিলে (ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের উপদেষ্টা সংস্থা, যেটা রাজা/রানীকে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে, বিশেষ করে প্রাইভেট বা গোপন বিষয়ে পরামর্শ দেয়; এটি পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য চূড়ান্ত আপিলের আদালত ছিল, যা বর্তমানে মূলত যুক্তরাজ্যের মন্ত্রী এবং সিনিয়র রাজনীতিবিদদের নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা যা রাজার নির্দেশ জারি করা এবং কিছু বিচার বিভাগীয় আপিল শোনা সহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাজ করে) শপথ গ্রহণ করেন এবং একই বছর অ্যানস্ট্রুথার বার্গস জেলার সদস্য হিসেবে সংসদে পুনরায় প্রবেশ করেন। এর থেকে বোঝা যায়, লর্ড মেলভিল ও স্যার জন অ্যানস্ট্রুথার ছিলেন ১৮১০-এ গঠিত মূল কমিটির সদস্য, তাঁরা ১৮১২-র আগেই কমিটি থেকে সরে যান। লর্ড মেলভিলকে প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট লর্ড অফ ট্রেড (১৭৮৪–১৭৮৬), স্বরাষ্ট্র সচিব (১৭৯১–১৭৯৪), ভারতীয় বিষয়ক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের, বোর্ড অব কন্ট্রোল অব ইন্ডিয়ান এফেয়ার্সের সভাপতি (১৭৯৩–১৮০১), যুদ্ধ সচিব (১৭৯৪–১৮০১) এবং ফার্স্ট লর্ড অফ দ্য অ্যাডমিরালটি (১৮০৪–১৮০৫) পদে নিযুক্ত করেন।
অন্যদের বিবরণ আমরা আগের কিস্তিতেই উল্লেখ করেছি।
পার্লামেটের বিতর্কের মূল ইংরেজি টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করেছি। উৎসাহীদের জন্য ইংরেজি টেক্সটটার লিঙ্ক দিয়ে রাখলাম — https://api.parliament.uk/historic-hansard/commons/1812/feb/06/select-committee-appointed-on-the-east
পার্লামেন্ট বিতর্ক
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ