এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজস্ব সংগ্রহের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে, ১৭৬৫-র আগস্টে সশরীরে বর্ধমানে পৌঁছনোর সিদ্ধান্ত নিলেন ভেরেলস্ট। বর্ধমান জমিদারিতে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বিচার বিবেচনা করে চলতি ‘নিলাম প্রথা’ (outcry) উচ্ছেদ করে নতুন রাজস্বব্যবস্থা প্রবর্তন করেন ভেরেলস্ট। বহুকাল ধরে একটা ভুল ধারণা ইতিহাসকারদের মধ্যে প্রচলিত ছিল ১৭৭২-এর আগে কোম্পানির কর্মচারীরা প্রত্যক্ষভাবে রাজস্ব প্রশাসনে নিজেদের নিয়োজিত করেনি। বর্ধমান জমিদারির রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজার এই ঘটনা সেই বিখ্যাততম ভুল ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করা উচিৎ। যাইহোক, ভেরেলস্ট প্রকাশ্য নিলাম প্রথা বিলুপ্ত করে, “স্বচ্ছল এবং সচ্চরিত্রের ব্যক্তিদের” রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব অর্পণ করলেন এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে যে — “যদি তাঁরা রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট হন, তবে তাঁদের কখনোই এই দায়িত্ব থেকে অপসারিত করা হবে না, বরং কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁরা সর্বপ্রকার যথাযথ উৎসাহ এবং আনুকূল্য লাভ করবেন।” রাজস্ব আদায়ের মরশুম চলে আসায় তিনি সেই ব্যক্তিদের হাতে অবিলম্বে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মের গুরু দায়িত্বভার অর্পণ করেন; এবং এই দায়িত্ব পেয়ে, নবনিযুক্ত রাজস্ব সংগ্রাহকরা তার সামনে অঙ্গীকার করলেন — তাঁরা পূর্ববর্তী বছরগুলোর রাজস্ব আয়ের সমপরিমাণ অর্থ আদায় করে সরকারি কাছারিতে জমা দেবেন; দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করবেন; চতুর্থ বছরে ১১৬৭ বঙ্গাব্দের রাজস্ব আয়ের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করবেন; এবং এরপর থেকে — “প্রদেশের ওপর আরোপিত যেকোনো সাধারণ রাজস্ব বৃদ্ধি বা নতুন করের ক্ষেত্রে—তাঁরা অন্যদের মতোই সমানভাবে দায়বদ্ধ থাকবেন।”
প্রত্যক্ষ প্রশাসনের আরও একটি এবং সমগুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ‘বাজি জমি’ — অর্থাৎ যে জমি ধর্মীয় অথবা দাতব্যের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তি কিংবা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের ভরণপোষণের জন্য নিষ্কর হিসেবে প্রদত্ত — সম্পর্কে কোম্পানির কর্মচারীদের নেওয়া পদক্ষেপে। ভেরেলস্ট আমাদের জানাচ্ছেন জনাব ম্যারিয়ট খুব কম সময়ের জন্য বর্ধমানে অবস্থানকালে কিছু নিঃশুল্ক জমিতে খাজনা লাগু করার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগী পদক্ষেপ বাদ দিলে, ভেরেলেস্টের পূর্বসূরী জনস্টন, জমি ব্যবহারের উদ্দেশ্যর দিকে নজর না দিয়েই, বিঘা প্রতি ৯ আনা খাজনা বরাদ্দ করেছিলেন। ভেরেলস্ট বর্ধমানে এসে লক্ষ্য করলেন, এই জমিগুলোর মধ্যে অনেক জমিই প্রকৃতপক্ষে অনাবাদী হিসেবে পড়ে রয়েছে; আর বহু অঞ্চলের বিপুল পরিমান উর্বর জমির সম্পূর্ণ অযোগ্যদের হাতে পড়ায় সে সব জমি স্রেফ “আলস্যের আস্তানা” হয়ে উঠেছে, জমি থেকে আদায় প্রায় বন্ধ। এমতাবস্থায়, যাঁর ওপর এই ধরনের হস্তান্তরিত জমির মালিকানা পুনরায় ফিরে পাওয়ার (reversion) অধিকার ন্যস্ত ছিল, বেরেলস্ট সেই রাজার থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার আদায় করে নিলেন যথাযথভাবে প্রমাণিত দাবিগুলো মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেই। তিনি রাজাকে বললেন, জমির বর্তমান ভোগদখলকারীর মৃত্যুর ফলে যেসব নিষ্কর জমি রাজার মালিকানায় ফিরে আসবে, সেগুলোর ওপর থেকে কর মওকুফের সুবিধাটি তিনি (ভেরেলস্ট) নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবেন; এবং এই প্রক্রিয়া ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না সমগ্র জমির মোট মূল্যের অর্ধেক পরিমাণ অর্থ উঠে আসে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, এই সংগৃহীত অর্থ একটি তহবিল হিসেবে রাখা হবে, এবং এই সম্পদটা “কোম্পানির সেবায় নিয়োজিত থাকাকালীন যাঁরা পঙ্গু বা অক্ষম হয়ে পড়েছেন — কিংবা ভবিষ্যতে পড়তে পারেন — এমন সিপাহি ও অন্য অন্য ব্যক্তির ভরণপোষণের কাজে ব্যবহৃত হবে।”
জমির সনদ অধিকারের পরীক্ষা এবং একসঙ্গে নানান ধরণের দাবি-দাওয়ার যাচাই এবং একই সঙ্গে জমির ন্যায্য মূল্যায়ন চালানোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ জারি করা হলেও, সেই নির্দেশ বাস্তবে কখনোই কার্যকর করা হয়নি; কারণ সে সময় মনে করা হতো—জনসাধারণের কাছে নিলামের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের অধিকার হস্তান্তরের প্রচলিত ব্যবস্থার প্রধান গুণই ছিলো পুরোনো নথিপত্র নিয়ে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম এবং কষ্টসাধ্য অনুসন্ধান এবং জমির নিখুঁত পরিমাপের মতো শ্রমসাধ্য কাজ থেকে সরকারকে অব্যাহতি দেওয়া। জনস্টোন এই ‘ফার্মিং সিস্টেম’ বা ইজারা ব্যবস্থার প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী এই ‘নিলামের ডাক’ বা ‘আউটক্রাই’-এর মাধ্যমেই জমির প্রকৃত মূল্য পাওয়া যাবে; কারণ ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে, কোনো ব্যক্তিই লোকসান দিয়ে কোনো জমির রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব নেবে না। তবে বর্ধমানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সূত্রে প্রমাণ করা গেল — এবং পরে ওয়ারেন হেস্টিংসের ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হবে — নিছক অনুমান অথবা ফটকাবাজি (speculation) কখনোই বিচক্ষণতা বা বিবেচনাবোধের নির্ধারিত সীমার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে না। তবে কোম্পানির কর্মচারীদের প্রতি সুবিচারের খাতিরে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, এই ইজারা ব্যবস্থা কিন্তু স্থানীয় রাজস্ব দপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁদের কাছে সুপারিশ করেছিলেন; আর এই স্থানীয় কর্মকর্তাদেরই সুপ্রশিক্ষিত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। ভেরেলস্ট লিখেছেন, “এই বর্ধমান প্রদেশের প্রধান প্রধান ইজারাদারদের (farmers) পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে আমি দেখলাম যে, জমির এক বিশাল অংশই ‘মুৎসুদ্দি’দের ইজারায় রয়েছে — এবং সেই জমিগুলোও হলো সবচেয়ে উর্বর ও মূল্যবান জমি, যা তাঁরা নিজেরাই বেছে নিয়েছেন। এই লোকগুলোর মাধ্যমেই আমরা দেশের প্রকৃত অবস্থা, রাজস্বের পরিমাণ এবং রাজস্ব আদায়ের রীতিনীতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকি। অথচ তাঁরা যেহেতু এত বিপুল পরিমাণ জমির ইজারাদার, তাই তাঁদের স্বার্থও সেখানে অত্যন্ত গভীর; আর এ কারণেই তাঁরা আমাদের অজ্ঞ করে রাখার পাশাপাশি — সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতেও আমাদের প্রতারিত করার জন্য তাঁদের সাধ্যমতো সব কিছুই করে থাকেন। তাছাড়া, তাঁরা নিজেরা যেহেতু অত্যন্ত ধূর্ত ও সক্ষম এবং নিঃসন্দেহে তাঁদের হিসাবপত্রে বড় ধরনের জালিয়াতির দায়ে দোষী, তাই নিজেদের জালিয়াতি ধরা পড়া থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে তাঁরা অন্যদের জালিয়াতি দেখেও না দেখার ভান করতে বা তাতে প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হন। এই যুক্তিগুলো কীভাবে তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হতে পারে, সে সম্পর্কে তাঁরা অত্যন্ত সচেতন; আর ঠিক এই কারণেই তাঁরা নিজেদের ইজারায় ঠিক কোন কোন জমি রয়েছে—তা প্রকাশ করার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন এবং পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন সদস্যদের নামে সেই জমিগুলোর জামানত বা ‘সিকিউরিটি’ দেখিয়ে রাখেন। এটি কেবল প্রধান কর্মকর্তাদেরই প্রথা নয়, বরং প্রতিটি দপ্তরের প্রতিটি সামান্য ‘মুহুরি’ও এই প্রথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এর বাইরেও, প্রকাশ্য নিলামে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে জমি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁরা যেসব কুখ্যাত ও জঘন্য অপকৌশল অবলম্বন করেন, তা সর্বজনবিদিত।” প্রকাশ্য নিলামের এই ব্যবস্থাটি বড়জোর কেবল সেই জমিগুলোর মূল্যই প্রকাশ করতে পারত, যেগুলোর মূল্য সম্পর্কে সরকার ইতিমধ্যেই অবগত ছিল। তবে, “বিভিন্ন মুতাসাদ্দীদের দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ জমি সমগ্র প্রদেশের মধ্য থেকে এমনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে সেগুলোই সর্বাধিক লাভজনক হিসেবে গণ্য হয়; এই জমিগুলোতে আবাদযোগ্য ভূমির পরিমাণ ছিল অনেকটাই বেশি এবং এগুলোর মুনাফার হারও ছিল অধিকাংশ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। জমির প্রকৃত মূল্য যাতে কারো কাছে প্রকাশ না পায়, সেজন্য তারা সর্বদা এই জমিগুলো নিজেদের দখলেই রেখে দিত।” (ভেরেলস্ট: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ২১৭-১৮। ভেরেলস্ট সুপারিশ করেছিলেন — (i) যে, “যেসব মুতসাদ্দি (কর্মকর্তা) বিপুল পরিমাণ জমির মালিক, তাঁদের সেই জমি অথবা তাঁদের পদ — উভয়ের যেকোনো একটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা উচিত; এবং কোনো পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকে জমি ইজারা বা পত্তন গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া উচিত নয় — কেবলমাত্র তাঁদের নিজস্ব গৃহ ও পরিবারের সুবিধার্থে অতি সামান্য পরিমাণ জমি গ্রহণ করা ছাড়া।” (ii) যে, “প্রতিটি পরগনায়—এবং এর অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি গ্রাম, হাট ইত্যাদিতে—সেখানকার মোট রাজস্ব বা ‘জমা’-র একটি হিসাব প্রস্তুত করা উচিত; পাশাপাশি সেখানকার জমির সঠিক পরিমাপও নির্ণয় করা প্রয়োজন। এই পরিমাপের কাজটি—যতটা সম্ভব—’বোর্ড’-এর নিযুক্ত জরিপকারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা উচিত।” হাট (বিকৃত উচ্চারণে “haut”) : একটি বাজার যা নির্দিষ্ট সময়ে বসে।) ১৭৫৮ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলায় এক নতুন ভূস্বামী শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে; এই শ্রেণীর বিত্তবৈভবের মূল উৎস ছিলেন এমন সব প্রতিষ্ঠাতা, যাঁরা একসময় কোম্পানির রাজস্ব-কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন কিংবা কোম্পানির কর্মকর্তাদের ‘বানিয়ান’ (বা স্থানীয় প্রতিনিধি) হিসেবে কাজ করতেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ