অষ্টম অধ্যায়।
বাংলা, বিহার ও ওডিসার দেওয়ানী অধিকার, ১৭৬৫।
“I observed to him [Lord Chatham] that it was necessary for him to determine whether it was an object for the Company or the State; for I was persuaded, if the State neglected it, the Company, in process of time, would secure it for their greater quiet and safety, exclusive of gain.” Walsh to Clive, 26th November, 1759. [আমি তাকে [লর্ড চ্যাথাম] প্রশ্ন করলাম, এই বিষয় শুধু কোম্পানি, নাকি রাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ — সেটা নির্ধারণ করা তার প্রয়োজন; আমি নিশ্চিত রাষ্ট্র যদি এই বিষয়টা অবহেলা করে, তবে সময়ের সাথে সাথে কোম্পানি শুধুমাত্র লাভের বাইরে দাঁড়িয়ে, বৃহত্তর শান্তি আর নিরাপত্তার জন্য বিষয়টা নিশ্চিত করবে – ক্লাইভকে লেখা ওয়ালসের চিঠি]
১৭৬৫-র ৩রা মে, গভর্নর হিসেবে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ পুরণ করতে লর্ড ক্লাইভ কলকাতায় পদার্পণ করলেন। তাঁর আগের সময়ের গভর্নর স্পেন্সারের মাত্র আধ-বছরের কলকাতা সরকারে শাসন আমলের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলায় আসা ক্লাইভ নিজেকে সগৌরবে “অগিয়ান আস্তাবল পরিষ্কার করার” (অর্থাৎ, গভীর ও ব্যাপক দুর্নীতি দূর করার) (গ্রিক পুরাণে অগিয়ান আস্তাবল ছিল রাজা অগিয়াসের বিশাল, নোংরা, অবহেলায় ফেলে রাখা ৩০০০ পশুর আস্তাবল, যা হারকিউলিস তাঁর পঞ্চম শ্রম হিসেবে একদিনেই পরিষ্কার করেছিলেন। আস্তাবলের মধ্য দিয়ে দুটি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে হারকিউলিস কয়েক দশকের গোবর পরিষ্কার করেন। রাজনীতি এবং ব্যবসায় গভীরভাবে প্রোথিত দুর্নীতি বা আমলাতন্ত্র নির্মূল করার প্রচেষ্টাকে বোঝাতে এই বিশেষ পরিভাষা প্রায়শই ব্যবহৃত হয়) কাজে বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলা হিসেবে গণ্য করেছেন ঠিকই—কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার, তিনি নিজের অমানুষিক কর্মক্ষমতায় ব্যক্তিগতভাবে অটল বিশ্বাস না রাখতে পারলে — কোম্পানির শাসন অঞ্চল বৃদ্ধি এবং বাংলার সুবাদারের সাথে বিশেষ উন্নততর চুক্তি সম্পাদনের যে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি কঠিনতম দরকষাকষির পর সফল পরিসমাপ্তি ঘটাতে পেরেছিলেন — সেই অবিসংবাদী কৃতিত্বের দাবিদার হত — তিনি যে পরিষদের বিরুদ্ধে লড়তে কলকাতায় পদার্পণ করেছেন, সেই সব আমলারা। ১৭৬৪-র ২৯শে ডিসেম্বর মুঘল সম্রাটের ফরমান বলে কোম্পানির হাতে “নবাব সুজা-উদ-দৌলার নিজামতের অংশ, গাজিপুর অঞ্চল এবং রাজা বলবন্ত সিংয়ের জমিদারির অবশিষ্ট অংশ যতটুকু ছিল — সব তুলে দেওয়া হল; উল্লিখিত অঞ্চলের শাসন এবং বিচার পরিচালনার অনন্য ক্ষমতাও আমরা তাদের এখতিয়ারে ন্যস্ত করলাম, ঠিক যেভাবে সেই ক্ষমতা এর আগে নবাব সুজা-উদ-দৌলার হাতে ছিল। উল্লিখিত রাজা, ইংরেজ কোম্পানির প্রধানের সাথে শর্তাবলি চূড়ান্ত করেছেন এবং সেই শর্তানুযায়ী তিনি কোম্পানিকে রাজস্ব প্রদান করবেন।”
অধিকন্তু, ১৭৬৫-র ফেব্রুয়ারিতে (মিল (তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৫০-এ) উল্লেখ করেছেন যে, মীর জাফর “কলকাতায় বেশ কয়েক সপ্তাহ অসুস্থ অবস্থায় কাটানোর পর, নানাবিধ ব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন এবং ১৭৬৫-র জানুয়ারি মাসে মৃত্যুবরণ করেন।” তবে ইতিহাস নির্ভর তথ্য হল, মীর জাফর ১৯ ডিসেম্বর, ১৭৬৪ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন এবং ২০ ডিসেম্বর তিনি নন্দকুমারকে “দেশের শাসনকার্য ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়াদি পরিচালনার” নির্দেশ দান করেন। মীর জাফর ১৭৬৫-র ৬ ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুবরণ করেন। ইম্পিরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট: ক্যালেন্ডার অফ পার্সিয়ান করেসপন্ডেন্স, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৭৭। ভ্যান্সিটার্টের শাসনকালে, নন্দকুমারের বিশ্বাসঘাতকতার ও অপরাধপ্রবণতার চরিত্র উন্মোচিত হয়”), বৃদ্ধ নবাব মীর জাফর মারা যান এবং তার পুত্র, নজম-উ-দৌলা [ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে] ২০ ফেব্রুয়ারি এক চুক্তি স্বাক্ষর করে সার্বভৌমত্ব অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে একটা তাদের হাতে তুলে দেবেন –
‘IV. আমি কোম্পানিকে তাদের সৈন্য বাহিনী প্রতিপালনের সাধারণ খরচ মেটানোর জন্য বর্ধমান, মেদিনীপুর এবং চট্টগ্রামের চাকলা — যা পূর্বে আমার পিতা তাদের অধিকারে দিয়েছিলেন — একটা নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদ বরাদ্দ নিশ্চিত করছি। বাহিনীর ভরণপোষণের উদ্দেশ্যে প্রতি মাসে পাঁচ লক্ষ সিক্কা টাকা আমার বাবা তাদের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছিলেন এবং আমি আমার কোষাগার থেকে বর্তমানে সেই পরিমান অর্থ দিতে সম্মত হলাম, যতক্ষণ না পর্যন্ত এত বড় একটি সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা অব্যাহত থাকে। পরিস্থিতি কোম্পানির পক্ষে অনুকূল হলে এবং তাদের সৈন্যবাহিনীর পেছনে ব্যয় করা খরচ কমানো সম্ভব হলে, গভর্নর এবং তাঁর কাউন্সিল এই বরাদ্দ থেকে আমার প্রাপ্য ততটুকু অংশ [কেটে নেওয়া থেকে] — প্রদেশগুলোর প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ বাহিনী মোতায়েন রাখতে গিয়ে সৃষ্ট বর্ধিত ব্যয়ের প্রেক্ষিতে যতটুকু অব্যাহতি দেওয়া সম্ভবপর হবে। এবং যেহেতু আমি কোম্পানির সৈন্যদের আমার নিজস্ব সৈন্যের মতোই সমকক্ষ ও আপন রূপে গণ্য করি, তাই আমি কেবল সেই সংখ্যক সৈন্যই পোষণ করব, যারা আমার ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সমগ্র প্রদেশ জুড়ে রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একান্ত অপরিহার্যরূপে গণ্য হবে।‘
দ্বিতীয় শর্ত ছিল মুহাম্মদ রেজা খানকে নায়েব সুবাহর পদ প্রদান করে তাঁর ওপর সুবাহদারির ব্যবস্থাপনার ভার ন্যস্ত হল এই আস্থার ভিত্তিতে কোম্পানির সম্মতি ছাড়া তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না।
মে মাসে ক্লাইভের আগমনের সময় পরিস্থিতি ঠিক এমনই ছিল। তাঁর সংস্কারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার—‘সিলেক্ট কমিটি’ (এই কমিটির হাতে এ রকম এক সংকটকালে বিপুল ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল। ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটিকে সরকারের স্থায়ী সংস্থায় পরিণত করেন। দেখুন মিল: হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৭৫: (পঞ্চম সংস্করণ) ১৮৫৮।)—সচল করে তোলার পর, ২৫শে জুন ক্লাইভ up-country (“আপ-কান্ট্রি” বলতে উপনিবেশিক লব্জে দেশের ভিতরের অংশ মূলত উপকূল থেকে দূরে অথবা উত্তরের গ্রামীণ, পার্বত্য বা স্বল্পোন্নত এলাকা বোঝায় — অনুবাদক) পরিদর্শনে যাত্রা শুরু করলেন। ক্লাইভ রাজধানীতে উপস্থিত হলে নবাব তাঁর সঙ্গে একদফা সাক্ষাৎ করতে আসেন। ক্লাইভ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নবাবের কাহিনী শুনলেন—কীভাবে নবাবের সিংহাসন আরোহণ করার ঠিক আগে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল, বিশেষ করে ইংরেজ কর্মকর্তাদের উপঢৌকন দিতে গিয়ে ‘নায়েব সুবা’ মুর্শিদাবাদের রাজকোষ প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন — সেই গল্পাদি। মাথায় রাখতে হবে ক্লাইভের রাজধানী মুর্শিদাবাদে আসার উদ্দেশ্য ছিল না মন দিয়ে নবাবের সাথে আলাপ আলোচনায় ব্যপৃত থেকে তার অভাব অভিযোগ শোনা, বরং নবাবের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেসামরিক শাসনক্ষমতার সম্পূর্ণ থাকবন্দী কার্যত ইংরেজ কোম্পানির হাতে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া।
‘আমাদের পরবর্তী মনোযোগের লক্ষ্য ছিল দেশের শাসনব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। আমরা লক্ষ্য করলাম মোহাম্মদ রেজা খানের ওপর যেহেতু আমরা পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা অর্পণ করেছি, ফলে আমাদের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নবাব অত্যন্ত অসন্তুষ্ট (বর্তমান লেখকের অধিকারে থাকা ভেরেলস্টের ‘ভিউ’-এর একটা বই-এর মার্জিনে এই সময়ের ঘটনাবলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা আর্চিবল্ড সুইন্টন, উপরোক্ত অনুচ্ছেদদের পাশে নিজের হাতে লিখছেন: “নিঃসন্দেহে তিনি (নবাব) চরমতম ক্ষুব্ধ হয়েছেন; কিন্তু পররের সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর অসন্তুষ্টির আরও অনেক বড় কারণ ঘটাবে”); কারন উল্লিখিত চুক্তির বলে মোহাম্মদ রেজা খানই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে হয়ে উঠেছিলেন শাসন ব্যবস্থার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। একজন মাত্র ব্যক্তির হাতে এই অসীম ক্ষমতা ন্যস্ত করা সে সময়ের নাজুক শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার কাজে অত্যধিক বিপজ্জনক হয়েউঠেছিল এই তথ্যটা বুঝে, এই শাসন কাঠামোর প্রতিটা সিদ্ধান্ত গভর্নর আর তার কাউন্সিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হওয়া, এবং সেই প্রশাসনিক প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের কাছে সমীচীন মনে হল। চুক্তির মূল ভিত্তি, এবং নীতিমালা নস্যাৎ না করেই, নবাবের চোখে পড়েছে, এমন বেশ কিছু ত্রুটিসংশোধন করা ছিল ন্যায়সংগত উদ্যম; বলা দরকার আমাদের এই সুচিন্তিত পদক্ষেপ নবাবের নিজস্ব অনুমোদনও লাভ করেছিল (সুইন্টন প্রশ্ন তোলেন: “কে সেই ব্যক্তি, যিনি নবাবের ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিপরীতে, অর্থাৎ নবাবের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে, তাঁর নামেই নবাবের কোষাগার বিলিয়ে দিয়ে নিজেকে পূর্ণ ক্ষমতাবান করেতুলবেন!”)। আমাদের দৃষ্টিতে, এই কাজ সম্পন্ন করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল মন্ত্রীদের প্রভাব ও ক্ষমতাকে সমভাবে বিভাজন করা। যেহেতু মোহাম্মদ রেজা খানের মাত্র কয়েক বছরের প্রশাসন ছিল সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও প্রশ্নাতীত, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে—তাঁর ক্ষমতার একটি অংশ তাঁর হাতেই বহাল রাখব; একই সাথে আমরা তাঁর সহযোগী হিসেবে এমন কিছু ব্যক্তি নিযুক্ত করলাম যাঁরা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং সচ্চরিত্রের অধিকারী। এর ফলে, তাঁদের প্রত্যেকেই একে অপরের ওপর একটি নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হলেন। সেই অনুযায়ী—আমাদের কার্যবিবরণীতে উল্লিখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে — আমরা জগৎ শেঠ এবং রায় দুর্লভকে এই পদের জন্য নির্বাচন করলাম। এখন আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে আপনাদের জানাচ্ছি যে, সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্তমানে পূর্ণ ঐকমত্য, অদম্য উদ্দীপনা এবং দ্রুততার সাথে পরিচালিত হচ্ছে।‘(ক্লাইভ এবং সিলেক্ট কমিটি কর্তৃক কোর্টের উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্র, ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৭৬৫। হেস্টিংস (পরামর্শলিপি, ১১ জুলাই, ১৭৭২)-এ “নাইব সুবাহ” বা “নাইব নিজাম”-এর পদের সংজ্ঞা এভাবে প্রদান করেছেন: “এর মূল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, (এই পদের আওতাভুক্ত বিষয়সমূহ হলো) তাঁর (নবাবের) শিক্ষার তত্ত্বাবধান, তাঁর গৃহস্থালির ব্যবস্থাপনা, তাঁর ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ, তাঁর প্রতিনিধিত্ব, বিচারব্যবস্থার প্রধান পরিচালনা, প্রদেশের শাসন ও পুলিশি ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত যাবতীয় আদেশ জারি ও পদক্ষেপসমূহের নির্দেশনা প্রদান, সমস্ত সরকারি আলাপ-আলোচনা বা কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং কোষাগারের কার্যনির্বাহ—এক কথায়, নির্বাহী সরকারের প্রতিটি শাখাই এর অন্তর্ভুক্ত।”)
মাত্র দশ বছর আগেও কোম্পানি “দেশের সরকার নিয়ন্ত্রণ” করার ধারণাটাই প্রত্যেক কোম্পানির কর্মচারী পাগলের স্বপ্ন দাগিয়ে উড়িয়ে দিত।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ