এই চুক্তির অনেক আগে থেকেই ক্লাইভ আমাদের জানাচ্ছেন, পতনশীল মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বাধিনায়ক, মুঘল সম্রাট, কোম্পানিকে বাংলা ওডিসা বিহারের দেওয়ানি অধিকার নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৭৫৮-র ৩১শে ডিসেম্বর তারিখে লন্ডনের ‘কোর্ট’-এর (কোর্ট অব ডিরেক্টর্স, পরিচালনা পর্ষদের) উদ্দেশ্যে লেখা সাধারণ চিঠিতে কোম্পানির বাংলা প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিল উল্লেখ করেছেন (অনুচ্ছেদ ৯):
“বাংলায় অর্জিত সাফল্যের [পলাশী চক্রান্ত বিজয় — অনুবাদক] সুবাদে দিল্লির রাজদরবারে আমাদের কোম্পানির এমন বিপুল সুনাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, স্বয়ং উজির সাহেব বেশ কয়েকবার প্রেসিডেন্টের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন—যাতে তিনি সুবাদারের ওপর নিজের প্রভাব খাটিয়ে মুঘল সম্রাটের প্রাপ্য রাজস্ব পরিশোধ সংক্রান্ত রাজকীয় নির্দেশটি পালনে সুবাদারকে সম্মত করান। চিঠিপত্রের নথিপত্র ঘাঁটলেই আপনারা দেখতে পাবেন যে — উজিরের প্রতিনিধি, সিতাব রায়ের লেখা চিঠি থেকে যেমনটা প্রতীয়মান হয় — রাজদরবার এই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব প্রেসিডেন্টকেই অর্পণ করতে অত্যন্ত আগ্রহী; উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলা-বিহার-ওডিসার রাজস্বের বার্ষিক পরিমাণ ৫০ লক্ষ টাকা। এই পদে যিনি অধিষ্ঠিত হন—তাঁকে ‘বাদশাহের দেওয়ান’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় — তিনি রাজ্যের [আদতে বাংলা সুবার — অনুবাদক] পদমর্যাদাক্রমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তি। আপনাদের প্রেসিডেন্সির সাথে জুড়ে থাকা এমন এক উচ্চতমমর্যাদা, কোম্পানির অবস্থানকে সাম্রাজ্যের বুকে অসাধারণভাবে সুদৃঢ় করে তুলবে — যা নড়বড়ে করার সাধ্য আর অন্য কারো থাকবে না। তবে, মুঘল সম্রাটের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের কাছে বারবার এই প্রস্তাব পেশ করা হলেও, বর্তমানের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি সেই অনুরোধ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হয়েছেন; প্রেসিডেন্ট তাঁর উত্তরগুলো এমন কৌশলে সাজিয়েছেন, যাতে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট কালক্ষেপণ করা যায় এবং ভবিষ্যতে আরও অনুকূল কোনো সুযোগের অপেক্ষায় থাকা যায়। তাঁর আশংকা এই পদ গ্রহণ করলে সুবাদারের মনে ঈর্ষা বা সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে; আর ঠিক এমন এক সময়ে — যখন আমাদের স্বল্পসংখ্যক সৈন্যদল অন্য একটি রণাঙ্গনে নিয়োজিত রয়েছে — আমরা সুবাদারের অসন্তোষের কারণ হতে চাই না; বিশেষত যখন আপনারা — মহোদয়গণ — স্বদেশ থেকে অতিরিক্ত সৈন্যদল বা শক্তিবৃদ্ধির (reinforcement) ব্যাপারে আমাদের খুব সামান্যই আশা জাগিয়েছেন।”
ইংরেজদের ‘দেওয়ান’ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার এই প্রস্তাব বস্তুত ১৭৫৮ থেকেই মুঘল তরফ উত্থাপন করছিল; এবং যেমনটি পরবর্তীতে দেখা যাবে, ১৭৬১ ও ১৭৬৩-তেও ইংরেজদের কাছে এই প্রস্তাব নতুন করে জোরালোভাবে পেশ করা হয়। তবে এই ধরণের প্রস্তাব গ্রহণে লর্ড ক্লাইভের দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে — আগের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করা কারণগুলো ছাড়াও — আরও কিছু বিশেষ কারণ ছিল। বস্তুত তিনি মন্ত্রী পিটকে [একটা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ১৭৫৯-এ ক্লাইভ, এই প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীকে পেশ না করে, কেন পিটকে দিচ্ছেন? ১৭৫৯-এ গ্রেট ব্রিটেনের (ইংল্যান্ড) প্রধানমন্ত্রী ছিলেন থমাস পেলহাম-হলস, নিউক্যাসলের প্রথম ডিউক (Thomas Pelham-Holles, 1st Duke of Newcastle)। তিনি এই দায়ত্ব পালিন করেন ১৭৫৭ থেকে ১৭৬২ পর্যন্ত। এই সময়ে উইলিয়াম পিট (বড়) যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র এবং বিপুল ব্যয়ের যুদ্ধ নীতি নির্ধারণের কাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছিলেন, এবং স্বাভাবিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী ছিলেন – অনুবাদক] এক গজব প্রস্তাব দেওয়ার উপক্রম করেছিলেন; ক্লাইভের প্রস্তাব ছিল, বাংলা সুবার ‘দেওয়ানি’র যে অধিকার মুঘল কর্তৃপক্ষ কোম্পানিকে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেই অধিকার যেন সরাসরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের নামে না নিয়ে, সার্বিকভাবে রাজা ‘ইংরেজ জাতির’ নামেই গ্রহণ করুন, তাহলে সকলের উপকার হয়। ১৭৫৯-এর ৭ই জানুয়ারি তিনি পিটের কাছে লিখলেন : —
“মাত্র দুই হাজার ইউরোপীয় সৈন্যের আমাদের এই ক্ষুদ্র বাহিনীই মীর জাফর কিংবা মীর মিরন—উভয়ের তরফ থেকেই যেকোনো রকমের আঘাত হানার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ রাখতে যথেষ্ট ক্ষমতাধর; অধিকন্তু, যদি তারা কোনও প্রকার গোলযোগ সৃষ্টির দুঃসাহস দেখায়, তবে এই বাহিনী, তার দক্ষতা প্রয়োগ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনক্ষমতা বা সার্বভৌমত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিতে সক্ষম করবে। (এই দাবিগুলোর সঙ্গে কর্নেল জেমস মিলের ১৭৪৬-এর Scheme for an Expedition under the Imperial [i. e., the Austrian] Emperor for dethroning the Nabob of Bengal (বাংলার নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী [অর্থাৎ, অস্ট্রিয়ান] সম্রাটের অধীনে একটি অভিযানের পরিকল্পনা)-র বক্তব্যের তুলনা করা যেতে পারে। বোল্টস: কনসিডারেশনস, খণ্ড iii, পৃষ্ঠা ১৬ এবং পরবর্তী) এই ধরনের একটি ঘটনা অথবা পরিবর্তন ঘটিয়ে তোলা অপেক্ষাকৃত সহজ, কারণ স্থানীয় অধিবাসীদের নির্দিষ্ট রাজপুত্র বা শাসকের প্রতি বিন্দুমাত্র অনুরাগ বা আনুগত্য নেই; তাছাড়া বর্তমান শাসকের অধীনে থাকা মানুষদের জীবন বা সম্পত্তির বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায়, একটি স্বৈরাচারী শাসনের পরিবর্তে একটি সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়াটিই তাদের কাছে এক পরম সৌভাগ্যের বিষয় এবং আশাকরি তারা নিঃসন্দেহে এই পদক্ষেপে অত্যন্ত আনন্দিত হবে। এই পরিবর্তনের স্বীকৃতিস্বরূপ মোগল সম্রাটের থেকে ‘সনদ’ বা রাজকীয় অনুমোদন লাভে আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না; শর্ত কেবল একটাই—আমাদের রাজস্ব আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ, অর্থাৎ বছরে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা, সম্রাটকে প্রদান করতে হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে [বাংলা সুবার পক্ষ থেকে] এই অর্থ নিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হচ্ছিল না; এর মূল কারণ হলো মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে বিরাজমান চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা, যার ফলে দিল্লির রাজদরবার, সাম্রাজ্যের দূরবর্তী প্রদেশগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়াবলির প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। বস্তুত, স্বয়ং উজির আমাকে পত্র মারফত অনুরোধ জানিয়েছেন যেন আমি নবাবকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে পূর্বপ্রচলিত প্রথানুযায়ী বকেয়া অর্থ পরিশোধে সম্মত করাই। শুধু তাই নয়, দিল্লির রাজদরবার থেকে আমার কাছে সরাসরি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল—যাতে আমি এই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করি; এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘বাদশাহের দেওয়ান’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং পদমর্যাদা ও ক্ষমতার দিক থেকে তিনি ‘সুবাদার’-এর ঠিক পরের স্তরেই অবস্থান করেন। তবে আপাতত আমি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদটি গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছি; কারণ আমি সুবাদারের মনে কোনো প্রকার ঈর্ষা বা সন্দেহের উদ্রেক করতে চাই না। বিশেষত, আমি এমন কোনো সম্ভাবনা দেখছি না যে, কোম্পানি আমাদের পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তা প্রদান করবে — যা ছাড়া এত বড় একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এক্ষুণি কোনওভাবেই সম্ভবপর নয়; অথচ এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমেই ভবিষ্যতে সুবাদারি পদটি (প্রাদেশিক শাসনক্ষমতা) নিজেদের দখলে নেওয়ার পথ সুগম হতে পারত। এই পদক্ষেপ মোগল সম্রাটের কাছে যে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই; কারণ যেসব মানুষের হাতে বর্তমানে এই প্রদেশগুলোর শাসনভার ন্যস্ত রয়েছে—এবং যাদের সম্পর্কে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে সম্রাটের এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, শাহী ফৌজ বা রাজকীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণের ভয় না দেখালে তারা কখনোই রাজস্বের নির্ধারিত অংশ পরিশোধ করবে না, তাই তাদের হাতে শাসনক্ষমতা ন্যস্ত থাকার চেয়ে, একটি বিশ্বস্ত এবং সততার জন্য সুখ্যাত জাতির (অর্থাৎ ইংরেজদের) অধীনে এই অঞ্চলগুলো শাসিত হওয়াটা সম্রাটের নিজস্ব স্বার্থের জন্যই অধিকতর মঙ্গলজনক।
“তবে এত বিশাল এক সার্বভৌম অঞ্চল সম্ভবত আমাদের মত এক সওদাগরি প্রতিষ্ঠানের [ক্লাইভের ভাষায় মার্কেন্টাইল কোম্পানি] পক্ষে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া আদতে অতিরিক্ত ব্যাপক ঝামেলা কাঁধে তুলে নেওয়ার মত বিষয় বলেই আমার মনে হচ্ছে; এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, জাতির সহায়তা ব্যতিরেকে—কেবল নিজেদের সামর্থ্যে — এত বিস্তৃত এক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর নাও হতে পারে। তাই, মহাশয়, আমি এই বিষয় আপনার সমীপে উপস্থাপন করার এবং আপনার বিবেচনার জন্য পেশ করার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করছি — যাতে আপনি বিচার করতে পারেন যে, এমন একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন — যা ভবিষ্যতে আরও বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে — সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নেওয়ার যোগ্য কি না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং নিজেকে এই ভেবে আশ্বস্ত করছি যে, আমি আপনার কাছে বিষয়টি বেশ স্পষ্ট করেই তুলে ধরতে পেরেছি যে — এই সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে খুব সামান্যই বা আদৌ কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না; এবং তা-ও আবার স্বয়ং মোগল সম্রাটের সম্মতিক্রমে—কেবল শর্ত হিসেবে এই রাজ্যগুলোর মোট রাজস্বের এক-পঞ্চমাংশের চেয়েও কম পরিমাণ অর্থ তাঁকে প্রদানের বিনিময়ে। এখন আমি আপনার বিচার-বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার যে—দুই মিলিয়ন স্টার্লিংয়েরও অধিক আয়ের নিশ্চয়তা এবং সেই সাথে প্রকৃতি ও শিল্পের সবচেয়ে মূল্যবান সম্ভারে পরিপূর্ণ এই প্রদেশগুলোর মালিকানা লাভ করা — জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কি না; এবং এমন একটি অর্জনকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জাতির জন্য লাভজনক বা সার্থক হবে কি না — যে অর্জন, একজন অত্যন্ত দক্ষ ও নিঃস্বার্থ মন্ত্রীর ব্যবস্থাপনায়, এই রাজ্যের জন্য অঢেল সম্পদের উৎস হয়ে উঠবে এবং কালক্রমে যার আয়ের কিয়দংশ একটি তহবিল হিসেবে বর্তমানের সেই গুরুভার ঋণ লাঘব করার কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে, যার চাপে আমরা বর্তমানে জর্জরিত।” (‘দ্য লাইফ অফ রবার্ট ক্লাইভ’, লন্ডন, ১৮৩৬, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২১ এবং পরবর্তী অংশ, অর্থাৎ রবার্ট ক্লাইভের জীবনী পুস্তক লেখার সময়, লেখক মেজর-জেনারেল স্যার জন ম্যালকম, G.C.B., F.R.G.S.-কে — আর্ল অফ পাউইস-এর [পলাশী চক্রান্ত সফল করার পরে পাওয়া ক্লাইভের পরিবারের অভিজাত উপাধি] পারিবারিক নথিপত্র থেকে এই উদ্ধৃতি সরবরাহ করা হয়েছিল, তিনি সেসবগুলো তার পুস্তকে সন্নিবেশ করেছেন। ক্লাইভের এক আত্মীয়, জনৈক ওয়ালশ, ক্লাইভ-পিটের আলোচনার নথি ম্যালকমের হাতে তুলে দেন। নথিটা হল পিটের (Pitt) সাথে ক্লাইভের কথাবার্তার বিবরণ, যেটা ১৭৫৯-এর ২৬শে নভেম্বরের চিঠিতে রয়েছে। পিট, ক্লাইভের এই প্রস্তাবকে “অত্যন্ত বাস্তবসম্মত” হিসেবে গণ্য করেও এই প্রস্তাবের প্রকৃতিকে “অত্যন্ত সংবেদনশীল” হিসেবে অভিহিত করলেন। “তিনি উল্লেখ করলেন, কোম্পানির সনদ বা চার্টারের মেয়াদ আগামী বিশ বছরের মধ্যে শেষ হচ্ছে না; এবং সাম্প্রতিক কোনো লেনদেনের ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়নি যে — কোম্পানির বিজয়লব্ধ অঞ্চল এবং অর্জিত সম্পদ প্রকৃতপক্ষে কোম্পানির নিজস্ব সম্পত্তি, নাকি রাজার (Crown) অধিকারভুক্ত। বিচারকদের অভিমত দেখে মনে হয়েছিল যে, এগুলোর মালিকানা কোম্পানিরই প্রাপ্য। তবে পিট মন্তব্য করেন — এ সম্পদের মালিকানা কোম্পানির হাতে থাকা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজার হাতে থাকাটাও সমীচীন নয়; কারণ এই বিপুল পরিমাণ রাজস্বের মালিকানা রাজার নিয়ন্ত্রণে গেলে সেটা আমাদের নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। তিনি আরও বলেন, আপনি (ক্লাইভ) এই রাজস্বকে জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত করার মাধ্যমে আপনার প্রজ্ঞারই পরিচয় দিয়েছেন।” তিনি আরও বলেন—কর্নেল ক্লাইভের মতো একজন অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তির নেতৃত্বে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়; কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কারণ, এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ যে—ক্লাইভের পরবর্তী উত্তরসূরিরা এই গুরুদায়িত্ব পালনে তাঁর সমকক্ষ হবেন।” “আমি তাঁকে (পিটকে) এই বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে — এই প্রকল্পটি কোম্পানির আওতাভুক্ত হবে, নাকি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে — সে বিষয়ে তাঁর একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম যে — যদি রাষ্ট্র এই বিষয়টি উপেক্ষা করে, তবে সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিই শেষমেশ এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেবে। এমনকি আমি নিশ্চিত ছিলাম যে—কেবল মুনাফার লোভে নয়, বরং নিজেদের অধিকতর শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থেই কোম্পানি একসময় এই কাজটা করতে বাধ্য হবে।” “মনে হলো তিনি আমার এই যুক্তিটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন; কিন্তু সেই মুহূর্তে আমাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, তা থেকে আমি যতটুকু অনুমান করতে পেরেছি — তা হলো, শেষ পর্যন্ত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোম্পানির ওপরই ছেড়ে দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।”)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ