১৭৬১-তে, মুঘল সম্রাট শাহ আলম দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করার সময়ে সম্রাটের “শাহী অশ্বের অনুচর” (in attendance on the stirrup) হিসেবে গর্বিত সঙ্গী মেজর কার্নাক, মুঘল সম্রাটকে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, কোম্পানি যদি বাংলা সুবায় আদায় করা রাজস্বের ভাগ থেকে সম্রাটের প্রাপ্য একটা অংশ নিয়মিত দিল্লিতে পাঠানোর বিষয়টা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে সম্রাট কি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্তমানকালে যে সব অধিকার ভোগ করে চলেছে, সে সব বিশেষ অধিকার রক্ষা বিষয়ে বিশেষ অনুমোদন এবং সর্বোপরি ‘দেওয়ানি’ অধিকার পাওয়ার নিশ্চিততা দেবেন কি (Calendar of Persian Correspondence, vol. 1, Nos. 1291-92. Auber: Rise and Progress, vol. 1, pp. 82-83. Holwell: India Tracts, p. 92)? তবে একট বিষয় মাথায় রাখা অন্ত্যন্ত জরুরি, সে সময়ে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে অসামরিক এবং সামরিক আমলাদের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল; গভর্নর ভ্যান্সিটার্ট কিন্তু কার্নাকের সম্রাটকে, কোম্পানির দেওয়ানি অধিকার নিশ্চিত করার আচরণকে ‘অশোভন এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ আখ্যা দিয়েছিলেন; এবং তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, এই ধরণের মাধ্যমে, অর্থাৎ কর্নাকের সূত্র ধরে এই ধরণের কোনো রকম অনুগ্রহ অথবা সুবিধা যদি কোম্পানির কাছে আসেও, তাহলে সে সব সুবিধে কোম্পানির বাংলা প্রধান হিসেবে, তিনি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন। ১৭৬৩-র ৯ই মার্চ, ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’, বাংলা গভর্নরের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে চিঠি পাঠায়। ডরেক্টরেরা লিখলেন: “সম্রাটের পক্ষ থেকে দেওয়ানি অধিকার অর্জনের যে প্রস্তাব আমাদের আমলাকে দেওয়া হয়েছিল, আপনারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উপযুক্ত কাজটাই করেছেন; এবং সেই পদ গ্রহণ না করার পেছনে আপনারা যে ন্যায়সঙ্গত এবং বিচক্ষণ কারণগুলো দেখিয়েছেন, সেই যুক্তিতে আমরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়েছি।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৭৬২-র ১১ই মার্চ — নবাব মীর জাফরকে উচ্ছেদ করে মীর কাসিমকে নবাব হিসেবে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভ্যান্সিটার্টের পদক্ষেপের প্রতিবাদে — কূট, অ্যামিয়াট, কার্নাক, এলিস, ব্যাটসন এবং ভেরেলস্টের মত সর্বোচ্চ পদে আসীন আমলারা একজোট হয়ে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর কাছে জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, হয় সম্রাট শাহ আলমের দেওয়া দেওয়ানি প্রস্তাব অবিলম্বে গ্রহণ করা হোক, অথবা সম্রাটের কর্তৃত্বের প্রতি বিদ্রোহ করা শক্তিগুলোকে দমন করার লক্ষ্যে দিল্লিতে সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হোক। দেওয়ানি লাভের প্রথম প্রস্তাব সম্পর্কে হলওয়েলের মন্তব্য তুলে দেওয়া গেল: “দেওয়ানি লাভের প্রস্তাবের বিষয়ে বলতে গেলে, এর বিপক্ষে তুলে ধরা আপত্তিগুলো ছিল অত্যন্ত জোরালো এবং অখণ্ডনীয় — অবশ্য যদি না আমরা একই সাথে ‘সুবেদারি’ বা শাসনভার লাভের অধিকারও অর্জন করতে পারতাম।”
যে চিঠির মাধ্যমে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ দেওয়ানি লাভের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছিলেন, সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে তাঁদের চিরাচরিত ‘পবিত্র সরলতা’র (sancta simplicitas) ছাপ স্পষ্ট। ১৭৬৬-র ১৭ই মে তারিখে লেখা সেই চিঠিতে তাঁরা এই অধিকার লাভকে অনুমোদন জানান; তাঁদের মতে, এর ফলে এমন এক পরিস্থিতির অবসান ঘটল — যে পরিস্থিতিতে কোম্পানি ক্রমশ অধঃপতনের ঢালু পথে ছুটে চলছিল, আর অন্যদিকে বাংলায় কর্মরত তাঁদের কর্মচারীরা ‘কোম্পানির সম্পত্তি নয় বলে মনে করতেন এমন সবকিছুর ওপরই ব্যক্তিগত অধিকার আর লাভের লক্ষ্যে হাত বাড়াচ্ছিলেন”। তবে তাঁরা এ-কথাও স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, এই নতুন ও অতিরিক্ত দায়িত্বভারের কথা ভেবে তাঁরা বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা লিখেছেন:
“বাদশাহের দেওয়ান পদের কার্যপরিধি ও ক্ষমতা সম্পর্কে আপনারা যে বিবরণ দিয়েছেন, আমরা তা লক্ষ্য করেছি। পূর্ববর্তী কালে এই পদের মূল কাজ ছিল — ‘সমগ্র রাজস্ব সংগ্রহ করা এবং সেনাবাহিনী পরিচালনার ব্যয়ভার ও নিজামত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করার পর, অবশিষ্ট অর্থ দিল্লিতে প্রেরণ করা।’ আপনারা এই পদের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা ঠিক সেই ধরনের দায়িত্ব আমরা স্বয়ং পালন করতে খুব একটা ইচ্ছুক নই। বর্ধমান প্রদেশে আমরা ইতিপূর্বে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের একটা বিষয় নিশ্চিত করেছে — রাজস্ব সংগ্রহের মতো গুরুদায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে একজন ইংরেজ কর্মচারী কতটা অনুপযুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে, স্থানীয় অধিবাসীদের নানান ধরণের সূক্ষ্ম এবং চাতুর্যপূর্ণ কৌশল ধরে ফেলার ক্ষেত্রে ইংরেজরা একেবারেই অদক্ষ—যেসব কৌশলের মাধ্যমে দেশিয় ব্যক্তিরা নিজেদের দেশের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ গোপন করে এবং রাজস্ব পরিশোধ নিয়ে নানা জটিলতা নির্মাণ করে আর সম্পদ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে। অতএব, সুবার (প্রদেশের) মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে আপনারা যে প্রাচীন শাসন ব্যবস্থাটিই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা তার পূর্ণ অনুমোদন জানাচ্ছি।”
১৪. আমরা মনে করি, দীউয়ানের দপ্তরের দায়িত্ব কেবল রাজস্ব সংগ্রহ ও তার ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত; যদিও এই ক্ষমতা কোম্পানির ওপর ন্যস্ত রয়েছে, তবুও দাপ্তরিকভাবে এর কার্যসম্পাদন হতে হবে দরবারে — গভর্নর এবং ‘সিলেক্ট কমিটি’-র নিয়ন্ত্রণাধীনে। এই নিয়ন্ত্রণের সাধারণ পরিধি রাজস্ব সংগ্রহের তত্ত্বাবধান এবং নবাবের কোষাগার থেকে অর্থ গ্রহণ করে তা দেওয়ানি বা কোম্পানির কোষাগারে স্থানান্তরের বাইরে আর কোনো বিষয়ে প্রসারিত হওয়া উচিত নয়। আমাদের মতে, এই প্রক্রিয়া মোটেও কঠিন অথবা জটিল আকারের নয়; কারণ বার্ষিক ‘পুণ্যাহ’ (Poonah) অনুষ্ঠানে সরকার প্রতিটি জমিদারের সাথে পরবর্তী বছরের মাসিক কিস্তির অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং, প্রতিটি জমিদারের মাসিক কিস্তির অর্থ জমা দেওয়ার সময় আর পরিমান কঠোরভাবে নজরদারি করা অতিআবশ্যক; যদি কোনো ক্ষেত্রে অর্থের ঘাটতি দেখা দেয়, তবে কোম্পানিকে অবশ্যই অনুসন্ধান করে বের করতে হবে যে — কোন নির্দিষ্ট প্রদেশের রাজা কিংবা জমিদার তার মাসিক কিস্তির অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয়েছেন। অথবা, যদি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আরও কিছুটা প্রসারিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে বার্ষিক ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানটি — যার মাধ্যমে আমরা সেই সময়কালকে বুঝি যখন প্রতিটি ভূস্বামী পরবর্তী বছরের রাজস্ব জমা দেওয়ার জন্য তাদের চুক্তি সম্পাদন করেন — সেটা যেন দেওয়ান অথবা কোম্পানির সম্মতিক্রমে সম্পন্ন করা হয়। বিচার প্রশাসন, বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ, জমিদারি সংক্রান্ত নানান বিষয় — সংক্ষেপে বলতে গেলে, বেসামরিক প্রশাসনের (Civil Administration) আওতাভুক্ত যা কিছু রয়েছে, তার সবকিছুই নবাব অথবা তাঁর মন্ত্রীদের হাতেই ন্যস্ত থাকবে বলে আমরা মনে করি।’
Court of Directors-এর কল্পনা ছিল, তাদের কর্মচারীদের একমাত্র করণীয় হলো গাছের নিচে শুয়ে থাকা এবং গাছপাকা ফলগুলোকে আপনাআপনিই তাদের হাঁ-করা মুখের ভেতর খসে পড়তে দেওয়া। তারা জনগণের শ্রমলব্ধ ফসল গ্রহণ করবে, অথচ বিনিময়ে জনগণের প্রতি কোনো প্রকার অবিচার ও নিপীড়ন থেকে তাদের সুরক্ষাদানে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ থাকবে। আমাদের জাতীয় সম্মানের সৌভাগ্যবশত, পরিচালক সভা এমন এক অসম্ভব বস্তুই দাবি করছিল। ইংরেজরা শীঘ্রই এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে — যদি তাদের রাজস্ব গ্রহণ করতেই হয়, তবে দেশের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদেরই গ্রহণ করতে হবে।
জেমস মিল ইতিহাস লিখতে গিয়ে দেখেছেন, ইংরেজদের ‘দেওয়ানি’ লাভের ফলে শাসনব্যবস্থার যে দ্বৈত পদ্ধতি সাময়িকভাবে বাংলা সুবায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা ছিল মূলত “ক্লাইভের অত্যন্ত প্রিয় একটি নীতি; তাঁর মানসপটে এক ধরণের জটিল রবং কুটিল চাতুর্য অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই গভীরতর এবং দক্ষতম রাজনীতির রূপ ধরে প্রতিভাত হতো।” এই দ্বৈত শাসনব্যবস্থা ক্লাইভের কাছে একভাবে এবং ভেরেলস্টের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রতিভাত হয়েছিল। যেখানে ভেরেলস্ট আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন, প্রাচীন শাসন-প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে সেগুলোর মাধ্যমে জনহিতকর কাজ সম্পাদন করা সম্ভব; সেখানে ক্লাইভ নবাবের কর্তৃত্বকে কেবলই একটি “নামসর্বস্ব ও ছায়াসম সত্তা” হিসেবে গণ্য করতেন। আর যখন তিনি “মুখোশ খুলে ফেলার” (অর্থাৎ, কোম্পানিকেই প্রদেশগুলোর প্রকৃত সুবাদার হিসেবে ঘোষণা করার) কথা বলতেন, তখন তিনি প্রকারান্তরে নিজেই স্বীকার করে নিতেন যে, তাঁর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত চাতুর্য আর কপটতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। নবাবের ক্ষমতা আর বিত্তবৈভবের প্রসঙ্গে ক্লাইভ সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন যে, ইংরেজরা — বলতে গেলে — সেই কমলালেবুর রস পুরোপুরি নিংড়ে নিঃশেষ করে ফেলেছে; কিন্তু তিনি এমনটিই কল্পনা করতেন, সেই কমলালেবুর যতটুকু খোসা আর শাঁসের অংশ টেবিলের ওপর অবশিষ্ট পড়ে আছে, সেইটুকু বাংলার অন্য বিদেশি অতিথিদের বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট হবে — যাতে তারা ভেবে বসে, ইংরেজরা এখনো পর্যন্ত উদরপূর্তি করা সম্ভব খাদ্যগুলোর সবকিছু গিলে নেয়নি।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ