প্রাথমিকভাবে কাসিমবাজারের প্রধানের দরবারের রেসিডেন্ট (নবনির্মিত দপ্তরটির প্রথম কর্ণধার ছিলেন ফ্রান্সিস সাইকস, যাঁকে পরে ব্যারন উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর দপ্তরে কোম্পানি বরাদ্দ বেতনের পাশাপাশি, দু’বছরে রাজস্বের উপর কমিশন হিসাবে ৩৫,৭৫৭ পাউন্ড ১৮ শিলিং, মথট বা অতিরিক্ত কর থেকে প্রায় ৬৬,২০০ পাউন্ড এবং পূর্ণিয়া পর্বের সময় সৌজন্যমূলক অনুদান (additional cesses) হিসাবে প্রায় ২,০০০ পাউন্ড লাভ করেন। তিনি ৪,৪৫০ পাউন্ডের একটি বিলাসিতা ভাতা (sumptuary allowance) এবং মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠে মাইদাপুরে একটি বাসভবন ভোগ করতেন। তিনি বৃহৎ পরিসরের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীও ছিলেন (রেসিডেন্টের মাসিক ১,০০০ টাকার বিলাসিতা ভাতার জন্য দেখুন লং: সিলেকশনস, নং ৮০১) এবং একই সঙ্গে লাভজনক পদটিও অলঙ্কৃত করতেন; কিন্তু ১৭৬৭-র ২০শে নভেম্বর কোর্ট নিম্নোক্ত আদেশটি প্রেরণ করে:
আমরা যেহেতু দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত যে, প্রতিটি বিভাগের কাজের গুরুত্ব আর ব্যাপ্তির প্রেক্ষিতে, ‘দরবারের রেসিডেন্ট’ এবং ‘কাশিমবাজারের প্রধান’ — এই দুটি পদের দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব নয়; তাই আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে, এখন থেকে এই পদ দুটিকে পৃথক করা হোক এবং কাউন্সিলের অন্য কোনো সদস্যকে উক্ত প্রধানের পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। আমরা এই বিধি প্রবর্তন করছি কোনোভাবেই সাইকস মহাশয়ের দায়িত্ব পালনে মনোযোগের অভাবের কারণে নয় — কেননা তাঁর কার্যপদ্ধতি ও আচরণে আমরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। অধিকন্তু, ‘দরবারের রেসিডেন্ট’ হিসেবে সেই গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে অনিবার্যভাবেই যে অসাধারণ পরিশ্রম ও মনোযোগ ব্যয় করতে হয়, তার স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে — তাঁকে সাড়ে চারটি ‘শেয়ার’ বা অংশ (অর্থাৎ, রাজস্ব আদায়ের ওপর ধার্য ২.৫ শতাংশ কমিশনের অংশবিশেষ) (১ নং টিকা দেখুন) প্রদান করা হোক; তবে এটি অবশ্যই চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হবে — এবং কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তাঁর পদমর্যাদা অনুযায়ী, কিংবা ‘নির্বাচক কমিটির’ (Select Committee) সদস্য হিসেবে তাঁর জন্য উপরে উল্লিখিত যেসকল শেয়ার বা অংশ বরাদ্দ ছিল, এই নতুন বরাদ্দটি সেগুলোরই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়াবলির সাধারণ তত্ত্বাবধান ছাড়াও, দরবারের রেসিডেন্ট মুর্শিদাবাদের বিচারালয় পরিদর্শন করতেন। রেসিডেন্ট এবং নবাব জেলা আদালতগুলো থেকে আপিল গ্রহণ করতেন, প্রয়োজনীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতেন এবং পরিশেষে তাঁদের সম্মুখে উপস্থাপিত মামলাগুলোর রায় দান করতেন। মনে হয়, সাইকস মুর্শিদাবাদে বিচারালয়ের সংখ্যাও বাড়িয়েছিলেন। ১৭৭০-এর অক্টোবর মাসে, দরবারের রেসিডেন্টের সাথে মিলিত হয়ে মুহাম্মদ রেজা খান বিচার প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ও ‘কাউন্সিল’-এর নির্দেশিকা প্রার্থনা করেন। এর প্রত্যুত্তরে গভর্নর ও কাউন্সিল তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করে জানান যে, বিচার প্রশাসন ব্যবস্থা “আগের মত একই ভিত্তিতে” অব্যাহত রাখা উচিত; তবে “প্রয়োজনবোধে নিয়ন্ত্রণ পরিষদের (Council of Control) হস্তক্ষেপ করা বাঞ্ছনীয়।” তাঁরা আরও সংযোজন করেন যে, “সরকার সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ই পরিশেষে কাউন্সিলের সম্মুখে উপস্থাপিত হওয়া উচিত।” এমতাবস্থায়, মুর্শিদাবাদের নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (Murshidabad Council of Control) নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে:
“এই মর্মে বিধান রাখা হলো যে, সমগ্র প্রদেশে সংঘটিত সকল ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে, দণ্ড কার্যকর করার পূর্বে বিচারের নথিপত্র তাদের (উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের) অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করতে হবে; যে, ভূমি-সম্পত্তি ও রাজস্ব সংক্রান্ত সকল মামলার বিচার দেশের (প্রাদেশিক) সরকারি আদালতসমূহে সম্পন্ন হবে; এবং যে, দেশের আদালতসমূহের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা ও সেগুলোর ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানের লক্ষ্যে ‘কন্ট্রোল কাউন্সিল’ কর্তৃক দুটি আদালত প্রতিষ্ঠা করা হবে — যা কাউন্সিলের সকল সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে।” (Proceedings of Murshidabad Comptrolling Council, October, 1770.)
সুতরাং, এমনকি ‘দেওয়ানি’ সংক্রান্ত অংশের ক্ষেত্রেও লর্ড ম্যাকলের সাথে সুর মিলিয়ে একথা বলা সম্ভব নয় যে, “পুলিশি ব্যবস্থা, বিচার প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব” সম্পূর্ণরূপে “নবাব সুবাদারের” ওপর ন্যস্ত ছিল। তবে জেমস মিলের সাথে একমত হয়ে একথা বলাও অত্যুক্তি হবে যে, “দিওয়ানি লাভের ফরমান — যা কোম্পানির ইতিহাসের অন্যতম এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত” (জেমস মিল: হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, খণ্ড ৮, পৃ. ২৮৬। ১৭৬৭-র ২৯শে ডিসেম্বর, সিলেক্ট কমিটি দরবারে রেসিডেন্টকে লিখেছিল: “আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, এই প্রবিধানগুলিতে আপনি মাননীয় কোম্পানিকে সরকারের সহযোগী করেছেন, অথচ আমাদের অভিপ্রায় সর্বদাই ছিল কোম্পানিকে প্রধান হিসেবে স্বীকার করা এবং বাংলায় বাণিজ্যরত অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলির মতো তাদের অধীনে আমাদের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেই সন্তুষ্ট থাকা। আমরা এখন এই কথাটিই পুনর্ব্যক্ত করছি এবং কামনা করছি যে, ভবিষ্যতে সরকারের কোনো পদক্ষেপ বা কর্মকাণ্ডে কোম্পানিকে প্রধান হিসেবে দেখানোর কোনো মাধ্যম আপনি হবেন না।” বোল্টস: কনসিডারেশনস, পরিশিষ্ট ক, খণ্ড ৩, পৃ. ১৬৮।) — তা “তাদেরকে নামমাত্র ও দায়িত্বের দিক থেকে, এবং সেই সাথে ক্ষমতার দিক থেকেও, এত বিশাল এক সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।”
১ নং টিকা
এই কমিশনের ইতিহাস নিম্নরূপ: ১৭৬৭ সালের ২০শে নভেম্বর, কোর্য় অব ডিরেক্টর্স তাদের কর্মচারীদের দেশীয় বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করে এবং তাদের লবণের একচেটিয়া ব্যবসার নিন্দা জানিয়ে, এর একটিটা নির্দিষ্ট শতাংশ ভাতার নির্দেশ দেয়। লবণ ব্যবসায় তাঁর অংশ ছেড়ে দেওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে গভর্নর এতদিন পর্যন্ত দেওয়ানি রাজস্বের উপর যে কমিশন পেতেন, তা ১৭৬৭-র ১লা সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। আদালত আরও জানায় : যেহেতু আমাদের কর্মচারীদের ব্যবসা শুধুমাত্র আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যেগুলিতে কোম্পানির বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ব্যাপক চাহিদা তাদের যথেষ্ট প্রভাবিত করবে এবং আমাদের প্রধান কর্মচারীরা যে বিপুল পরিমাণ ব্যবসায় অনিবার্যভাবে নিযুক্ত, যা তাদের সর্বোচ্চ যত্ন ও মনোযোগ দাবি করে, তা বিবেচনা করে, আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, তাদের নিজ নিজ বিভাগে উদ্যম ও তৎপরতার সাথে কাজ করার জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত উৎসাহ প্রদান করা হবে, কিন্তু এটিকে তারা তাদের নিয়োগকর্তাদের প্রধানের পক্ষ থেকে বার্ষিক একটি বিনামূল্যের উপহার হিসেবেই দেখবে, যতক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান রাজস্ব কোম্পানির কাছে থাকবে এবং তাদের আচরণ এই ধরনের পুরস্কারের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। দেওয়ানী থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বার্ষিক হিসাব আপনি প্রস্তুত করবেন, যেখান থেকে রাজা ও নবাবকে প্রদেয় নির্ধারিত অর্থ এবং নবাবের মন্ত্রীদের ভাতা বাদ দেওয়া হবে; এছাড়াও বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম প্রদেশ এবং কলকাতা পরগনার রাজস্বের হিসাবও করতে হবে, যেখান থেকে লর্ড ক্লাইভের জায়গির এবং আদায়ের সাধারণ খরচ বাদ দেওয়া হবে। উক্ত নিট রাজস্বের উপর আপনাকে ২ শতাংশ কমিশন তোলার অনুমতি দেওয়া হলো।” এইভাবে প্রাপ্ত অর্থ ১০০টি ভাগে বিভক্ত করা হবে, যা নিম্নরূপে বন্টন করা হবে : —

কাসিমবাজার, পাটনা, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের প্রধানদের কোনো অংশ পাওয়ার কথা ছিল না। আদালত অবশিষ্ট অংশগুলোর বণ্টনের অধিকার নিজেদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছিল, যে সংরক্ষণটি সিলেক্ট কমিটি অগ্রাহ্য করেছিল। এই কমিশনের সুবিধাভোগীদের মধ্যে প্রধান সামরিক কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সম্পূর্ণ বিষয়টি ১৭৭৩ সালের গোপনীয়তা কমিটির চতুর্থ প্রতিবেদনে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই সুযোগে আমি বলতে চাই যে, মিঃ পি. ই. রবার্টস (দ্য কেমব্রিজ মডার্ন হিস্ট্রি, খণ্ড ৬, পৃ. ৫৬৬) ভেরেলস্টের বেতন ও কমিশন সম্পর্কে যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা তিনি কীভাবে পেয়েছেন তা আমি বুঝতে পারছি না। আদালতের এই চিঠি অনুসারে, ভেরেলস্টের বেতন ছিল বছরে ৩,০০০ পাউন্ড, মিঃ রবার্টসের উল্লিখিত ৪,৮০০ পাউন্ড নয়, এবং কমিশনে ভেরেলস্টের অংশ অবশ্যই তাঁর উল্লিখিত ৬৪৫,৮০০-এর চেয়ে বেশি ছিল। (টিকা শেষ)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ