“২৬. ১৭৬৮-র ১৬ই মার্চের পত্রে আমরা এ বিষয়ে আপনাদের যে সব কথা লিখেছিলাম, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বহুকাল ধরে চলে আসা প্রথার সংস্কার সাধন করা — যে প্রথাটি মুর (Moorish মুসলমান) শাসনামলে প্রচলিত ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছিলাম। সেই প্রথা অনুযায়ী, সরকারের সেবায় কোনো এক সময়ে নিয়োজিত থাকা মৃত ব্যক্তিদের সমগ্র সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নবাবের ব্যবহারের জন্য আত্মস্থ করে নেওয়া হতো। আমাদের অনুমান নিশ্চই ভুল নয়, এই প্রথার উদ্ভব হয়েছিল মূলত এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে — যেহেতু এই কর্মকর্তারা তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনকালে নিশ্চিতভাবেই তাঁদের ওপর অর্পিত আস্থার অপব্যবহার করতেন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে নিজেদের বিত্তবৈভব গড়ে তুলতেন, তাই সরকার জানত, তাঁদের মৃত্যুর পর সরকারি কাজে থেকে আত্মস্যাৎ করা সেই বিপুল পরিমান অর্থ, পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়াটাই ছিল সরকারের ন্যায়সঙ্গত নীতি।
“২৭. এই প্রথা — যতটুকু এলাকা জুড়ে প্রচলিত ছিল — ততটুকু এলাকাতেই নানা ধরণের অবিচার আর নিপীড়নের জন্ম দিত; এবং যেহেতু এই প্রথা স্বভাবতই মানুষকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ, সঞ্চয় করে গোপনে লুকিয়ে রাখতে প্ররোচিত করত — এবং তারা এই সম্পদ এমনভাবে লুকিয়ে রাখত যে, হয়তো সেই সব সম্পদ আর কোনও দিনই জনসমক্ষে প্রকাশিত হওয়া বাস্তবিকভাবেই সম্ভব ছিল না; ফলে সেই ব্যবস্থা সমাজের সামগ্রিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল; তাই আমরা চেয়েছিলাম, এই প্রথা যেন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়। আমরা চেয়েছিলাম, সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সমগ্র দেশবাসীকে এ বিষয়ে অবহিত করা হোক যে — আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো ব্যক্তির সম্পত্তিতে হাত দেওয়া হবে না; যদি কোনো ব্যক্তি সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে ধরা পড়েন এবং দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তাঁকে কঠোরতর শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাঁকে অবশ্যই আত্মসাৎ করা অর্থের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ রাজকোষে জমা দিতে বাধ্য করা হবে; কিন্তু কোনো মন্ত্রীর খেয়ালখুশি অথবা স্বেচ্ছাচারী ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে যেন এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছিত না।
“২৮. আমরা আশা করি, এই ধরনের একটি নিশ্চয়তা হয়তো গোপনে সঞ্চিত অর্থের কিছু ভাণ্ডার উন্মুক্ত করার মাধ্যম হয়ে উঠবে এবং এর ফলে দেশের মুদ্রার প্রচলন ও প্রবাহে সহায়তা করবে।”
“২৯. এই প্রসঙ্গ শেষ করার পূর্বে আমরা মন্তব্য না করে পারছি না যে, আমাদের দৃষ্টি বলে, রাজস্ব আদায়-ব্যয় সংক্রান্ত ক্ষমতা এবং বিচার দেওয়া সংক্রান্ত ক্ষমতা — উভয়ই যদি একই ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত থাকে, তবে তাতে প্রভূত বিপদ তৈএরি হয় এবং অনুচিত আচরণ প্রকাশের অবকাশ থেকে যায়। ফৌজদারি বিভাগের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক এমনই বলে মনে হচ্ছে এবং আমাদের ধারণা অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলার অধিকাংশ সরকারি দপ্তরের ক্ষেত্রেই সম্ভবত একই অবস্থা চালু আছে। এটা এমন একটি বিষয় যার আরও গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান পরিচালন করার দাবি রাখে; এবং যদি পরিস্থিতি আমাদের ধারণামতোই হয়ে থাকে, তবে এই ক্ষমতাগুলোকে পৃথক করা এবং এদের কার্যপরিধির মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
* * * * * *
“৩৫. প্রতিটি দপ্তরেই ব্যয়ের বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছে। এমন একটা বিষয়কে সংস্কারের জন্য অসাধারণ ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। একইভাবে, দেওয়ানি রাজস্ব আদায়ের একটি উন্নততর পদ্ধতি প্রবর্তন করাও সমানভাবে জরুরি—কেবল এই কারণে নয় যে এটি সরাসরি কোম্পানির স্বার্থের সাথে জড়িত, বরং এই কারণেও যে এটি জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য, তাদের সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধানের জন্য এবং ফলস্বরূপ কৃষি ও শিল্পোৎপাদনে উৎসাহ প্রদানের জন্য অপরিহার্য।
“৩৬. এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা এযাবৎ যে নির্দেশাবলি প্রদান করেছি, তার জবাবে আমরা বহু যুক্তি-তর্ক পেলেও কার্যত কোনো সুফল বা ফলাফল খুব কমই পেয়েছি। যেহেতু কার্য সম্পাদনের এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা প্রয়োজনীয় বিধিবিধানগুলো কখনোই হয়তো কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারব না, তাই আমরা এমন কয়েকজন ‘কমিশনার’ নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাঁরা অবিলম্বে ভারতে গমন করবেন এবং কালবিলম্ব না করে আমাদের নির্দেশাবলি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন।”
৩৭. সেই অনুযায়ী, আমরা হেনরি ভ্যানসিটার্ট, লুক স্ক্রাফটন এবং ফ্রান্সিস ফোর্ড—এই তিন ভদ্রবিত্তকে আমাদের আলোচিত উদ্দেশ্য পূরণে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করেছি। তাঁদের এই নিয়োগপত্রে (Commission) তাঁদের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে, যা তাঁদের আগমনের পরপরই আপনাদের অবহিত করা হবে। তবে, এই ব্যবস্থার সাধারণ রূপরেখা সম্পর্কে আপনাদের সম্যক ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যে জানানো যাচ্ছে — আমাদের সব কটা বসতি এবং উপনিবেশের শাসনব্যবস্থা তার চিরাচরিত নিয়ম এবং চলতি ধারাই বহাল থাকবে; কিন্তু এই কমিশনারদের ওপর সমগ্র শাসনব্যবস্থার তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে—যেন আমরা, অর্থাৎ ‘পরিচালক পর্ষদ’ (Court of Directors), স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করছি। তাঁরা এক প্রেসিডেন্সি থেকে অন্য প্রেসিডেন্সিতে পরিভ্রমণ করবেন এবং সেখানে প্রয়োজনীয় আদেশ ও বিধিমালা প্রণয়ন করবেন। যেসব বিষয় সম্পর্কে তাঁদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে কিংবা যেসব বিষয় তাঁরা স্বীয় বিবেচনায় পর্যালোচনার উপযুক্ত মনে করবেন—সেসব ক্ষেত্রে, তাঁরা যতটুকু প্রয়োজন মনে করবেন, ততটুকু আপনাদের সাথে পরামর্শ করবেন। যেহেতু প্রতিটি বিষয়ে আমাদের মনোভাব ও অভিপ্রায় সম্পর্কে তাঁরা পূর্ণরূপে অবগত আছেন, তাই তাঁরা আমাদের পরিকল্পনা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো আপনাদের নিকট আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—আপনারা তাঁদের ব্যাখ্যার যৌক্তিকতায় নিশ্চিতভাবে আস্থাশীল হবেন এবং স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করবেন; ফলে, তাঁদের ওপর ন্যস্ত বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো প্রয়োজনই তাঁদের হবে না।
৩৮. সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত বর্তমান চুক্তির আওতায় রাজস্ব বণ্টনের মাধ্যমে জাতি ও কোম্পানির স্বার্থের যে সংহতি স্থাপন করা গিয়েছে — এর ফলে আমাদের কার্যকলাপের বিষয়ে আমরা জনসাধারণের কাছে আরও একটু বেশি পরিমাণে দায়বদ্ধ হয়ে পড়িয়াছি — সেই প্রেক্ষাপটে এই অসাধারণ কমিশন নিয়োগের ব্যাপারে আমাদের অভিপ্রায় সম্পর্কে মহামহিম সম্রাটকে অবহিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল; এবং আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্টির সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমরা এই কাজে সম্রাটের রাজকীয় অনুমোদন লাভ করেছি — যার সঙ্গে এই মর্মে জোরালো সুপারিশও জুড়ে দেওয়া ছিল যে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থসমূহের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং চালু থাকা নানান অনিয়ম এবং ত্রুটিবিচ্যুতিসমূহ সংশোধনের লক্ষ্যে আমরা যেন সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
আগের অনুচ্ছেদগুলোতে উল্লিখিত কমিশনারগণ যে এইচ.এম. ফ্রিগেট ‘অরোরা’-তে আরোহণ করেছিলেন, সেটি ১৭৬৯-এর সেপ্টেম্বর মাসে ‘কেপ’-এ এসে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে ২৭শে ডিসেম্বর—সেন্ট জনস ডে-তে — পুনরায় যাত্রা শুরু করে। দেখে মনে হয় যে, জাহাজের ক্যাপ্টেন ‘লি’ (Lee), ভ্যানসিটার্টের আপত্তি অগ্রাহ্য করে, বছরের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সময়ে ‘সোফালা উপসাগর’-এর দিকে অগ্রসর হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ‘কেপ’ ত্যাগের পর, সেই ফ্রিগেটটির আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। (কমিশনারদের সাথে সাথেই প্রাণ হারিয়েছিলেন রেভারেন্ড উইলিয়াম হার্স্ট—একজন অত্যন্ত উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তি (দ্রষ্টব্য: Hyde: Parochial Annals of Bengal, পৃষ্ঠা ১৩৩-৩৪); মিডশিপম্যান পিটকেয়ার্ন — যিনি নিজের নামাঙ্কিত দ্বীপটি আবিষ্কার করেছিলেন; ফ্যালকনার — যিনি ‘দ্য শিপরেক’ (The Shipwreck) নামক কবিতাটির রচয়িতা; এবং আর্থার ভ্যানসিটার্ট — যিনি ছিলেন প্রধান কমিশনারের পুত্র। দ্রষ্টব্য: Grand: Narration of the Life of a Gentleman long Resident in India (Calcutta Historical Society’s reprint, 1910, pp. 35 and 276; Gentleman’s Magasine, vol. xli. (1771) chronicle. p. 190) ডিরেক্টরদের নির্দেশাবলির শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, সেই কাহিনীটি এমন একটি অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে গভর্নর কার্টিয়ারের শাসনব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ