আমি এই চিন্তাটি কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারছি না যে, জমিদারদের নিজ নিজ জেলার সার্বিক মঙ্গলের প্রতি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সহজাত আগ্রহ থাকে; এবং স্বভাবতই, সরকার কর্তৃক প্রেরিত যেকোনো ‘আমিল’-এর (রাজস্ব-কর্মচারী) তুলনায় জমিদারদের পক্ষেই প্রজাদের প্রতি অধিকতর উৎসাহ ও সহায়তা প্রদর্শনের সম্ভাবনা বেশি। একই সাথে আমি এ বিষয়েও পূর্ণরূপে সচেতন যে, তাঁদের অনেকের আচরণই অতীতে নিন্দনীয় ছিল এবং তাঁদের অধিকাংশই বর্তমানে চরম আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত ও সর্বস্বান্ত। এমতাবস্থায়, যে জমিদার পর্যাপ্ত জামানত প্রদানে অক্ষম, তাঁর ওপর আস্থা স্থাপন করে আমি সরকারের রাজস্বকে কোনো প্রকার ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাই না। তবে যেসব ক্ষেত্রে জমিদারগণ উপযুক্ত জামানত প্রদানে সক্ষম, আমার মতে — রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালনের সুবাদে যেসকল বাড়তি সুবিধা বা মুনাফা অর্জিত হতে পারে, তার ওপর অন্য যেকোনো পক্ষের তুলনায় জমিদারদেরই অধিকতর ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে। তথাপি, আমি চাই তাঁদের ওপর এমন প্রতিটি নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি ব্যবস্থা আরোপ করা হোক, যা যুক্তিসঙ্গতভাবে সম্ভব। তাঁদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে — প্রজাদের ওপর কোনো প্রকার নিপীড়ন বা অত্যাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তাঁরা চিরতরে তাঁদের জমিদারিস্বত্ব হারাবেন। একইভাবে, তাঁদের নিজ নিজ জেলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘হস্তাবুদ’ (রাজস্ব-তালিকা বা হিসাব) প্রস্তুত করতে হবে; এই তালিকাটি সংশ্লিষ্ট জেলায় সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করতে হবে এবং এর একটি অনুলিপি ‘খাস [খালসা] কাছারি’তে (Colcha/Khalsa Cutcherry) জমা রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা যাচাইয়ের জন্য এই নথির সহায়তা নেওয়া যায়। এমনকি, সরকারের পক্ষ থেকে এবং ‘রেসিডেন্ট’-এর অনুমোদন সাপেক্ষে একজন প্রতিনিধিকেও জমিদারদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং তাঁদের জমিদারির সার্বিক অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য প্রেরণ করা যেতে পারে। তবে যেহেতু অনেক জেলাতেই রাজস্ব আদায়ের জন্য ‘আমিল’ নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাবে, তাই আমি সুপারিশ করছি যে — আমিল নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও যত্নবান হওয়া উচিত। পাশাপাশি, এমন প্রতিটি সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা প্রজাদের ওপর কোনো প্রকার নিপীড়ন চালাতে কিংবা সরকারকে তার ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত বা প্রতারিত করতে না পারেন। আমিলদের হাতে তাঁর অধীনস্থ সব কর্মচারী নিয়োগ করার পূর্ণ ক্ষমতা তুলে দেওয়া উচিত নয়; বিশেষ করে আমিলের ঠিক পরবর্তী পদমর্যাদার যে ব্যক্তি থাকবেন, তাঁকে অবশ্যই সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি নিয়োগ করতে হবে। এই ব্যক্তির অধিকার থাকবে রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্রের অনুলিপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করার এবং প্রতিটি লেনদেন বা কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত থাকার; অধিকন্তু, পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট আশার মাধ্যমে তাঁকে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য বা সংবাদ প্রদানের কাজে উৎসাহিত করা উচিত। আমিলের আগমনের ঠিক পরপরই — জেলার আমিলকে নির্দেশ দেওয়া উচিত যেন তিনি তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীদের সহায়তায়, সরকার ও রায়তের মধ্যে সর্বাধিক ন্যায়সঙ্গত শর্তের ভিত্তিতে একটি ‘হস্তবুদ’ (রাজস্ব নির্ধারণ তালিকা – ঐতিহাসিক ফারসি শব্দ, যার অর্থ জমিদারির মোট আয়ের বিবরণ বা প্রজার বাৎসরিক খাজনার হিসাব (Rent-roll) রাখা। এটা মূলত রাজস্ব বিষয়ক দলিল, যাতে ভূমির বর্তমান ও অতীত আয় বা জমার হিসাব রেকর্ড করা হয় – অনুবাদক) প্রস্তুত করেন; এই হস্তবুদের একটা নকল শহরে পাঠিয়ে ‘খলসা কাছারি’-তে জমা রাখতে হবে। অধিকন্তু, এর বিষয়বস্তু সমগ্র জেলাজুড়ে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রচার করতে হবে, যাতে প্রত্যেক রায়ত স্পষ্টভাবে জানতে পারেন যে তাঁকে ঠিক কত টাকা পরিশোধ করতে হবে; এর ফলে তাঁরা অতিরিক্ত দাবির ক্রমাগত ভীতি থেকে মুক্তি পাবেন — যা নিঃসন্দেহে কৃষিকাজ ও পরিশ্রমের স্পৃহাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করে। মহোদয়, আপনি লক্ষ্য করবেন যে —
প্রতিটি মৌসুমে যে রাজস্ব বন্দোবস্ত (bunderbust) নির্ধারিত হয়েছে, তা প্রকৃত আদায়ের তুলনায় বহু লক্ষ টাকা বেশি; এবং অবশিষ্ট পাওনা হিসেবে যা জমা ছিল, তার অতি সামান্য অংশই আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এমতাবস্থায়, কার্যত এই বন্দোবস্তটি নিছকই একটি অলীক কল্পনা মাত্র। আমি আপনার বিবেচনার জন্য এই প্রস্তাবটি পেশ করছি যে — রাজস্ব বন্দোবস্তের হারটি কমিয়ে এমন একটি স্তরে নির্ধারণ করা অধিকতর শ্রেয় হবে না কি, যা আমাদের দেওয়ানি লাভের পর থেকে যেকোনো একটি মৌসুমে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া অর্থের সমতুল্য? আমার ধারণা, এই ধরণের একটি বন্দোবস্ত আমাদের পক্ষে সম্ভব করে তুলবে যে — জনসাধারণের স্বস্তির স্বার্থে এমন কোনো নির্দিষ্ট করের হার কমিয়ে দেওয়া, যা বর্তমানে তাদের ওপর অত্যধিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে, যথাযথ তদারকি এবং রাজস্ব আদায়ের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের কার্যকলাপের প্রতি অবিরাম নজর রাখার মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য জালিয়াতি রোধ করা গেলে — আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, কোম্পানি এই দেশ থেকে পূর্বের তুলনায় অধিকতর প্রকৃত আয় লাভ করতে সক্ষম হবে; এবং এর পাশাপাশি দেশেরও সমৃদ্ধি ঘটবে। তাছাড়া, আসন্ন মৌসুমে পূর্ববর্তী আমিলদের (রাজস্ব সংগ্রাহকদের) নিকট থেকে বকেয়া অর্থ আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারব — এমন আশা পোষণ করারও যথেষ্ট অবকাশ আমার রয়েছে। এ লক্ষ্যে আমার প্রচেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকবে না; এবং আমি অকপটে স্বীকার করছি যে, এই পন্থায় যদি আমি সুনাম বা কৃতিত্ব অর্জন করতে পারি, তবে তা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হবে। আমি আপনার বিবেচনার জন্য আরও একটি বিষয় পেশ করছি — বিভিন্ন জমিদার প্রমুখের নিকট যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া পড়ে আছে, তার কিয়দংশ পরিশোধের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে কোম্পানি সম্মান ও ন্যায়বিচারের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ঠিক কতটুকু দায়বদ্ধ বলে আপনি মনে করেন? এই বিষয়ে আমার মতামত সম্পর্কে আপনি পূর্ব থেকেই অবগত আছেন; কারণ বর্ধমানের রাজার ঋণের প্রসঙ্গে আমি ইতিপূর্বেই আমার সেই মতামত ব্যক্ত করেছিলাম। বর্তমানে বহু পরিবার চরম দুর্দশার শিকার হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে; এই বকেয়া অর্থের সামান্য অংশ পরিশোধের জন্যও যদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হয়, তবে সেই পরিবারগুলো নিশ্চিতভাবেই চরম দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবে। আমার বিশ্বাস, এই পদক্ষেপটি কোম্পানির সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধিতেও প্রভূত সহায়তা করবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ