[আগামী দুটো পর্বে আমরা অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করে ৮৫ পর্বে পঞ্চম প্রতিবেদনের অনুবাদে প্রবেশ করব। পরের একটি পর্বের একটি টিকায় আমরা দেখব রাণী ভবানীর জমিদারি কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘রানী ভবানী — যিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের জমিদার — তাঁর সাথে তিন বছরের জন্য একটি বন্দোবস্ত বা ইজারা চুক্তি সম্পাদন করা হয়। … রানীকে এই মর্মে অবহিত করা হয় যে, তিনি যেন “যত দ্রুত সম্ভব সমস্ত জেলা তিন বছরের জন্য ইজারা বা ‘ফার্ম’-এ প্রদান করেন।” তাঁকে আরও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, “যদি তাঁর দেয় রাজস্ব বা ‘মালগুজারি’ পরিশোধে কোনো ঘাটতি দেখা দেয়, তবে জমিদার হিসেবে তাঁর অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।” রাজস্ব বা ‘মালগুজারি’ যেন নিয়মিত পরিশোধ করা হয় — সেদিকে “কঠোর নজর রাখার” জন্য “দুলাল রায়”-কে নিযুক্ত করা হয়’। রাজস্ব আদায়ের কাজে কোম্পানি নিয়োজিত দুই সাঁজোয়াল দুলাল রায় এবং প্রাণ বসু গোটা রাজশাহী অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের সূত্রে বিপুল টেররের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন যাতে কোম্পানি যেমন সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করতে পারে এবং কোম্পানি কর্তা ক্লাইভের প্রিয় পাত্ররা রাণী ভবানীকে উচ্ছেদ করে তার জমিদারি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারেন। রাণী ভবানীর ওপর যে অত্যাচার নাময়ে আনা হয় সেটা আমরা চুম্বকে আলোচনা করলাম সদ্য প্রয়াত ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়ের ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’ থেকে। তার বই-এর কয়েকটি স্তবক সূত্রে আমরা দুটি পর্ব ৮৪.১ এবং ৮৪.২-তে আলোচনা করে দেখাব, সরকারি বয়ান যাই হোক না কেন, রাণীর ওপর কি ধরণের অত্যাচার নামিয়ে আনা হয়েছিল — অনুবাদক]
এবার রানী ভবানীর নাম স্মরণ করে এই ইতিহাসের উপসংহার হোক। পলাশীর যুদ্ধের পরে সনাতন বাঙালি সমাজের মধ্যে যে ভাঙন ধরে তা রানী ভবানীর উত্তর জীবনের উপরে গভীর ছাপ অঙ্কিত করে দিয়ে যায়। দেশের ভাগ্যাকাশে যে, ঘন কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছিল, রানীর সাংসারিক জীবনে তার ছায়া ঘনিয়ে এল।
দুই দিক থেকে বিপদ এল। পলাশীর বিপ্লবের ফলে কোম্পানির সাহেবদের বেসরকারী বাণিজ্যে (private trade) একেবারে নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠায় উত্তর বঙ্গের গঞ্জে গঞ্জে তাঁদের গোমস্তারা রাতারাতি কুঠি বানিয়ে চারপাশে অভাবনীয় দৌরাত্ম্য শুরু করল। রায়ত, ব্যাপারী ও জমিদারের আমলারা ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়তে লাগল। মিস্টার সেভালিয়ার, মিস্টার টেক্সিরা এবং কয়েকজন ইংরাজ সাহেবের গোমস্তা রানী ভবানীর জমিদারী জুড়ে যেমন খুশি নৌকা আটক করে, দেশী সওদাগরদের বেচাকেনা থামিয়ে, চড়া দামে নিজেদের পণ্য প্রজাদেরকে কিনতে বাধ্য করে, এমন অবস্থার সৃষ্টি করল যে দিকে দিকে রায়তরা পালাতে লাগল, ফলে খাজনা আদায় ব্যাহত হল।
ঠিক ঐ সময়ে মীরকাশিম ইংরাজদের সহায়তায় শ্বশুর মীরজাফরকে হটিয়ে নিজে মসনদে বসলেন। ইংরাজদের টাকার দাবি মেটাতে তিনি জমিদারদের খাজনা বাড়াতে বাধ্য হলেন। ১৭৬১ খ্রীস্টাব্দে রাজশাহীতে হস্ত-ও-বুদ (পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান ও খাজনা বৃদ্ধি) পরিচালনা করতে একজন আমিন পাঠানো হল। তিনি ‘আবিষ্কার’ করলেন ঐ জমিদারীতে এক কালে দশ লাখ টাকা কিফায়েৎ (লাভ) বাড়ানো যেতে পারে। এতেও ক্ষান্ত না হয়ে পরের বছর নবাব সরকার থেকে প্রভুরাম নামে আর একজন আমিন পাঠানো হল, তিনি আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করে বের করলেন যে জায়গায় জায়গায় মিলে আরো এক লক্ষ টাকা কিফায়েৎ বাড়ানো সম্ভব। পলাশীর যুদ্ধের সময় রাজশাহী জমিদারীর খাজনা ছিল বিশ লক্ষ টাকা। ১৭৬১-র হস্ত-ও-বুদ বা অনুসন্ধান অনুযায়ী নবাব মীরকাশিম ৩১ লক্ষ টাকা খাজনা আদায়ের সংকল্প করলেন। রানীর অবস্থা সহজেই অনুমেয়। তাঁকে দিয়ে প্রজাদের কাছ থেকে এত খাজনা আদায় করা চলে না। অতএব টাকা আদায় করতে নবাবের রায় রায়ান রানী ভবানীর জমিদারী চার ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগে একজন আমিলদার লাগালেন। পুরনো জমিদারী কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করা হল।
নবাব সরকার থেকে রাজশাহীর খাজনার একাংশ ইংরাজদের টাকা মেটাবার জন্য আলাদা করা হয়েছিল। তখন এক দিক থেকে ইংরাজদের তেলেঙ্গা সেপাইরা রাজশাহী থেকে প্রেরিত বাইশ হাজার মুদ্রার ‘পগোয়া’ (প্রথম ফসল) টাকা ছিনিয়ে কাশিমবাজারের কুঠিতে নিয়ে তুলল, অন্য দিক থেকে রায় রায়ানের আমিলদাররা ইংরাজদের খাতে রানী ভবানী যে এক লক্ষ টাকা যোগাড় করেছিলেন তা ছিনিয়ে নিয়ে গেল। রানী কোন দিক সামলে কোন্ দিক রাখেন? তিনি রায় রায়ানের কাছে লিখলেন, কাশিমবাজারের বড়ো সাহেব, মিস্টার ব্যাটসনকে বলে ঐ বাইশ হাজার টাকা উদ্ধার করা হোক, আবার মিস্টার ব্যাটসনের কাছে লিখলেন, রায় রায়ানের লোকেরা লক্ষ টাকা সুদ্ধ তাঁর কর্মচারীদের ধরে নিয়ে যাওয়ায় ইংরাজদের টাকা মেটাতে দেরি হবে। রানী নবাব মীরকাশিমের কাছেও আবেদন করলেন খাজনা বাকির দায়ে যেসব জমিদারী কর্মচারী বন্দী হয়েছে, তাদের ছেড়ে দিতে। ব্যাটসনকেও রায় রায়ানের কাছে বুঝিয়ে ঐ হতভাগাদের ছাড়িয়ে আনবার অনুরোধ করলেন যাতে তারা কোম্পানির টাকা শীগগির আদায়ে লাগাতে পারে।
এর মধ্যে ইংরাজদের সঙ্গে নবাবের যুদ্ধ বেধে যাওয়ায় রানীর সৌভাগ্যক্রমে হস্ত-ও-বুদের টাকা আর আদায় হল না। রানী ভবানী ও তাঁর দেওয়ান দয়ারাম রায় প্রথমে মীরকাশিমের পক্ষ অবলম্বন করলেন। ইংরাজদের অবাধ বাণিজ্যের অত্যাচারে তারা তিষ্ঠোতে পারছিলেন না। তা ছাড়া নবাব যতই অত্যাচার করুন রাজদ্রোহ ভবানীর চরিত্রে ছিল না। নবাব সরকারের ফৌজদার এবং দেশের জমিদারদের কাছে মীরকাশিমের পরোয়ানা গেল দিকে দিকে ইংরাজদের আমদানী রপ্তানী আটক করতে হবে। সেই হুকুম অনুযায়ী দেওয়ান দয়ারাম রায় রামপুর বোয়ালিয়ার কুঠি থেকে কাশিমবাজার কুঠিতে পাঠানো একশো মন রেশম আটক করলেন।
কিন্তু নবাব মীরকাশিম যুদ্ধে হেরে বাংলা থেকে বিতাড়িত হলেন। মীরজাফর আবার নবাব হলেন। মন্ত্রী হলেন নন্দকুমার। নন্দকুমারকে ঘুষ দিয়ে আগের নবাবের হস্ত-ও-বুদ ও কিফায়েতের ব্যাপারটা ধামা চাপা দেওয়া হল।
কিন্তু রানীর নিস্তার ছিল না। বাংলা ১১৭২ সনে (ইং ১৭৬৫) গভর্নর ক্লাইভ বাদশাহ শাহ আলমের কাছ থেকে সুবাহ্ বাংলা বিহার ওড়িশার দেওয়ানী হস্তগত করলেন। নন্দকুমারের রাজত্ব ঘুচে গেল। দেওয়ানী কার্য পরিচালনার জন্যে ক্লাইভ মহম্মদ রেজা খানকে নায়েব দেওয়ান পদে এনে মুর্শিদাবাদে বসালেন। রেজা খান পাকা লোক। তিনি বুঝলেন মীরকাশিমের হস্ত-ও-বুদ অনুযায়ী খাজনা আদায় করা অসম্ভব ব্যাপার, সেটা ধামাচাপা দেওয়াই ভালো। কিন্তু তাই বলে রানী ও অন্যান্য জমিদারদের ছেড়ে দিলে তাঁর নায়েবী টিকবে না। অতএব রাজশাহী জমিদারীতে তিনি এক ধাক্কায় খাজনা বাড়িয়ে ২০ লক্ষের জায়গায় ২৪১/২ লক্ষ করলেন। অন্যান্য জমিদারীতেও তথৈবচ। ইংরাজদের অপরিচিত অর্থক্ষুধা মিটাতে জমিদার ও প্রজাদের উপর নিত্য নতুন উৎপীড়ন শুরু হল। এই ভাবে দ্বৈত শাসনের মধ্যে দিয়ে ইংরাজ আমল শুরু হল:
অপূৰ্ব্ব শুনহ সবে স্বর্গের যতেক দেবে
বিলাতে হইলা সাহেব রূপী।
ছাড়িলা আহ্নিক পূজা পরিধান কুর্তি মুজা
হাতে বেত শিরে দিলা টুপী॥
বাঙ্গালার অভিলাষে আইলা সদাগরবেশে
কৈলকাতা পুরাণ কুঠি আদি।
গতামল সুভেদারী শুভ সন বাহাত্তরী
আংরেজ আমল তদবধি।
‘শুভ সন বাহাত্তরী’ রানী ভবানী ও তাঁর লক্ষ লক্ষ প্রজাদের ভাগ্যাকাশে বড়ো ভয়ংকর সংকেত সঞ্চার করে গেল। চার বছর যেতে না যেতে খরা মহামারী ও মন্বন্তরের করাল আকৃতি প্রকাশ পেল। চারিদিকে রব উঠল : ‘অন্ন দে গো অন্ন দে গো অন্ন দে,’ ‘আমার জঠরের জ্বালা আর সহে না,’ ‘লুণ মেলে না আমার শাকে।’ অন্যান্য জমিদারীর মতো নাটোর রাজ্যেও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পশ্চাতে অনাবৃষ্টি ছাড়া আরো দুটি কারণ কার্যকরী হয়েছিল, যার প্রভাবে অনাবৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাদের হাতে কোনো সঞ্চয় ছিল না। একটি কারণ মহম্মদ রেজা খানের আমিলদারী বন্দোবস্ত, অপর কারণ স্বাভাবিক বাণিজ্যের গতি রোধ করে গোমস্তাদের মাধ্যমে সাহেবদের ক্রমর্বদ্ধমান একচেটিয়া কারবারের দৌরাত্ম্য। ইংরাজরা যখন দেওয়ানী হাতে পেল তখন তাদের প্রথম লক্ষ্য হল দেশ থেকে যত পারা যায় খাজনা আদায় করে নেওয়া। সুবাহ্ বাংলার গোটা খাজনা কোম্পানির ইনভেস্টমেন্ট ও ফৌজী খরচা বাবদ বাঁধা পড়েছিল বলে খাজনা তখন না বাড়ালেই নয়। মীরকাশিমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রেজা খান আমিলদারী বন্দোবস্ত চালু করলেন। জমিদারেরা অত টাকা নিরুত্তরে সরবরাহ করতে অনিচ্ছুক দেখে তিনি জায়গায় জায়গায় আমিল পাঠাতে লাগলেন। এইসব আমিলরা মুর্শিদাবাদ দরবারে একটা থোক টাকা দিয়ে এক এক জমিদারীর খাজনা আদায়ের তাহুদ নিত, যে সবচেয়ে বেশি টাকা দিত তাকেই তাহুদ নিতে দেওয়া হত। তাহুদ মানে নিতান্ত সাময়িকভাবে, এক বছর বা তারও কম কোনো একটা কিস্তির জন্য খাজনার আদায়ের অঙ্গীকার করা। এই ব্যবস্থা জমিদার ও প্রজাদের সর্বনাশের সূচনা করল। আমিলদের কোনো স্থিতি ছিল না, তাই জমিদারীর রক্ষণাবেক্ষণেও তাদের কোনো স্বার্থ ছিল না। তারা মৌজায় মৌজায় তরফে তরফে ইজারাদার লাগিয়ে ফসলী সনের মধ্যে যা পারে তাই আদায় করে নেবার পূর্বনির্ধারিত সঙ্কল্প রেখে তাহুদ নিত। তাহুদ এমনি এমনি মেলে না, সে জন্য তাদের অনেক টাকা ঘুষ দিতে হত। দরবারের রেসিডেন্ট মিস্টার সাইক্স সেইসব লোককে মনোনীত করতেন যারা তাঁকে টাকা দিয়ে খুশি করত। আমিলদের নিষ্ঠুর পেষণে কি জমিদার কি রায়ত সবাই ত্রাহি ত্রাহি করতে লাগল। আমিলদের তদারক করবার ছলে মুর্শিদাবাদের রেসিডেন্ট মিস্টার সাইক্স ও তাঁর বেনিয়ান কান্তবাবু তেরো লক্ষ টাকার ‘সেলামী’ পকেটস্থ করলেন। নির্লজ্জভাবে সাইক্স এ কথাও জানালেন যে তাঁর তদারকিতে যা আদায় হচ্ছে মীরজাফরের আমলে তার অর্ধেকও হত না। এই বিষম অমঙ্গলজনক ব্যবস্থার কুফলগুলি দেওয়ানী লাভের পর দু বছর যেতে না যেতে এমনভাবে প্রকট হয়ে উঠল যে কোম্পানির বড়ো কর্তারা নিজেদের ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে তার ইঙ্গিত না দিয়ে পারলেন না। বারওয়েল সাহেব ১৭৬৭-র পয়লা জানুয়ারী লিখলেন :
‘The enhancing the revenue of the country which appears the great aim of Lord Clive will be found, I believe, in a year more the cause of its being diminished, for the country has been absolutely plundered by those who have been appointed to make the collections.’ বস্তুতপক্ষে নবাব আলিবর্দি খানের আমলে মুর্শিদাবাদের খাজাঞ্চীখানায় দেশ থেকে যত টাকা আসত, রেজা খানের আমিলদারী বন্দোবস্তে তার চেয়ে ঢের বেশি টাকা আসতে লাগল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ