[দুটো পর্ব ৮৪.১, ৮৪.২-তে আমরা আলোচনা করছি ৮৫ পর্বের এক টিকায় রাণী ভবানীর জমিদারি কেড়ে নেওয়ার হুমকি সূত্রে রজতকান্ত রায়ের ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’ থেকে রাণী ভবানীর ওপর যে অত্যাচার করা হয় তার চুম্বক। ৮৫ পর্বের একটই টিকায় রাণীকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘রানী ভবানী — যিনি ছিলেন ওই অঞ্চলের জমিদার—তাঁর সাথে তিন বছরের জন্য একটি বন্দোবস্ত বা ইজারা চুক্তি সম্পাদন করা হয়। … রানীকে এই মর্মে অবহিত করা হয় যে, তিনি যেন “যত দ্রুত সম্ভব সমস্ত জেলা তিন বছরের জন্য ইজারা বা ‘ফার্ম’-এ প্রদান করেন।” তাঁকে আরও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, “যদি তাঁর দেয় রাজস্ব বা ‘মালগুজারি’ পরিশোধে কোনো ঘাটতি দেখা দেয়, তবে জমিদার হিসেবে তাঁর অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।” রাজস্ব বা ‘মালগুজারি’ যেন নিয়মিত পরিশোধ করা হয় — সেদিকে “কঠোর নজর রাখার” জন্য “দুলাল রায়”-কে নিযুক্ত করা হয়’। রাজস্ব আদায়ের কাজে কোম্পানি নিয়োজিত দুই সাঁজোয়াল দুলাল রায় এবং প্রাণ বসু গোটা রাজশাহী অঞ্চলে রাজস্ব আদায়ের সূত্রে বিপুল টেররের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন যাতে কোম্পানি কর্তা ক্লাইভের প্রিয় পাত্ররা রাণী ভবানীকে উচ্ছেদ করে তার জমিদারি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারেন। রাণী ভবানীর ওপর যে অত্যাচার নাময়ে আনা হয় সেটা আমরা চুম্বকে আলোচনা করলাম সদ্য প্রয়াত ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়ের ‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’ থেকে। আগের পর্ব ৮৪.১-তে রাণীকে নিয়ে প্রথম কিস্তি আলোচনা করেছি। বর্তমান ৮৪.২-তে বাকি আলোচনায় দেখাব, সরকারি বয়ান যাই হোক না কেন, রাণীর ওপর কি ধরণের অত্যাচার নামিয়ে আনা হয়েছিল – অনুবাদক]
এই সময় রানী ভবানী তাঁর বারাণসী প্রত্যাগত বিধবা মেয়ে তারা এবং সদ্য সাবালক দত্তকপুত্র রাজা রামকৃষ্ণকে নিয়ে বড়নগরে ছিলেন। তাঁর দেওয়ান দয়ারাম রায়ও মুর্শিদাবাদ দরবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে রাজধানীতেই থাকতেন। কিন্তু যদিও দরবার থেকে দেওয়ান দয়ারামকে খেলাৎ দেওয়া হয়েছিল এবং পরে ঘটা করে তাঁকে ‘রাজা দয়ারাম রায় দেওয়ান-ই-রাজশাহী’ খেতাব দেওয়া হয়, তবু আমিলদারী বন্দোবস্তে জমিদারীর আসল কর্তৃত্ব অন্যত্র ন্যস্ত ছিল। মুর্শিদাবাদে নিম্নস্তরের সুযোগসন্ধানী স্বার্থানুসন্ধিৎসু এক একজন আমিল নাটোরের তাহুদ নিতেন। সেই রকম লোকের অধীনে জন ইজারাদারের হাতে গোটা জমিদারীর খাজনা আদায়ের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল। অথাৎ জমিদারীর মফস্বল কর্মচারী, তহসিলদার ও নায়েবদের উপর সর্বময় কর্তৃত্ব করত আমিল ও ইজারাদার। কিন্তু খোদার উপরেও খোদকারী করার লোক ছিল। ইংরাজরা শুনল, আমিলরা জমিদারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে কিছু সরকারে পাঠাচ্ছে ‘আর বাকিটা নিজেদের পকেটে পুরছে।’ তখন তাদের মনে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগল : ‘টাকাটা একজন কালা আদমির পকেটে যাবে না আমার নিজের পকেটে?’ আমিল ও ইজারাদাররা যাতে ইংরাজদের ঠকাতে না পারে সেই জন্য কোম্পানি থেকে মুর্শিদাবাদের ইংরাজ রেসিডেন্টের অধীনে জেলায় জেলায় ইংরাজ সুপারভাইজর (supravisor) নিযুক্ত হলেন। ১১৭৬ সনে Boughton Rous নামে এক তরুণ সুপারভাইজর নাটোরে পৌঁছে সেখানকার সর্বময় কর্তা হয়ে বসলেন এবং খুঁটিনাটি সব ব্যাপারে তাঁর হস্তক্ষেপের ফলে রানী ভবানীর কর্তৃত্ব ও মহম্মদ রেজা খানের প্রভুত্ব সর্বপ্রকার সংকুচিত হয়ে পড়ল।
রানীর প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে মন্বন্তরের পরের বছর থেকে কোম্পানির নির্দেশ অনুযায়ী মিস্টার রাউজ নিজেই জমিদারীর বন্দোবস্ত করলেন। তাঁর নানা কাজের বিরুদ্ধে রানী বার বার অভিযোগ করলেন, কিন্তু সে নিতান্ত বৃথা। ১৭৭৩-এ কোম্পানির নির্দেশে সুপারভাইজরদের ফিরিয়ে নেওয়ায় রাউজ নাটোর থেকে বিদায় হলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যে দুজন আমিল তাঁর আসার আগে নাটোর জমিদারী ছারখার করেছিলেন সেই কুখ্যাত প্রাণ বসু ও দুলাল রায় আবার সদর্পে ফিরে এলেন।
প্রাণ বসু অতি নীচ প্রকৃতির আমিল ছিলেন, দুলাল রায় তদধিক নীচাশয়। ইংরাজদের দেওয়ানী প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বড়ো কর্তা হয়ে আসেন নতুন রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস সাইক্স্ এবং নাটোরের আমিল নিযুক্ত হন তাঁর লোক প্রাণ বসু। এই লোকটি প্রভুর প্রসাদে রেজা খানের আপত্তি সত্ত্বেও রাজশাহীর তাহুদ হস্তগত করেন এরং তাঁর অত্যাচার ও শোষণে সেখানে এমন অবস্থা হয় যে সর্বনাশা সন ছিয়াত্তরের আগে থেকেই নাটোর রাজ্য উজাড় হয়ে যেতে শুরু করে। মন্বন্তরের বছর নাটোরে পৌঁছে রাউজ প্রথমেই লক্ষ্য করেন যে বিগত কয়েক বছর ধরে প্রাণ বসুর অত্যাচারে ভাতুড়িয়া পরগনায় বহু জমি পতিত হয়ে আগাছায় ভরে গেছে। সেই প্রচণ্ড অত্যাচারের যুগেও প্রাণ বসুর মতো অত্যাচারীকে মুর্শিদাবাদ দরবারে অসহ্য ঠেকায় তাঁকে সরিয়ে নিয়ে আবার রানী ভবানীর উপর রাজ্যভার প্রত্যর্পণ করা হয়। কিন্তু বেশি দিনের জন্য নয়। ছিয়াত্তর সনে মহম্মদ রেজা খান তাঁর নিজের লোক দুলাল রায়কে নাটোরের আমিল নিযুক্ত করেন। এই লোকটি রানী ভবানী ও মিস্টার রাউজের কাছে সমান রকম অসহ্য ছিল। মিস্টার রাউজের বর্ণনা অনুযায়ী সে ছিল ‘একটা নাচ, নিরক্ষর লোক’ — মহম্মদ রেজা খানের ‘বশংবদদের মধ্যে সবচেয়ে নীচাশয়।’ তার পিয়নরা ভাতুড়িয়া পরগনায় বহুদিন ধরে নিযুক্ত রানী ভবানীর পুরনো নায়েবকে ধরে নিয়ে গিয়ে মুর্শিদাবাদে কয়েদ করল। একজন নিম্নস্তরের আমলাকে দিয়ে সেই ছারখার পরগনার খাজনা আদায় শুরু হল।
অন্যান্য পরগনায় ঘন ঘন নায়েব বদল হল। সেইসব ক্ষণস্থায়ী আমলারা প্রত্যেকে জুলুম করে রায়তদের কাছ থেকে যা পারে লুটে নিল। এতদিন যেসব পুরাতন জমিদারী কর্মচারী রানী ভবানীর রাজ্যের বিভিন্ন কাছারীতে নিযুক্ত ছিল, তাদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ায় এমন কেউ রইল না যে রায়ত ও ইজারাদারদের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রজাদের বাঁচায়। তখন রাজ্য জুড়ে প্রজাদের মধ্যে ভারি ক্রন্দনের রোল উঠল। উত্তরোত্তর খাজনা বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেক প্রজা নতুন খাজনা আদায়কারীদের উপর অভিশাপ বর্ষণ করতে লাগল।
দুলাল রায়ের ইজারাদার ও তালুকদাররা ছিয়াত্তর সনে তিন বছরের ইজারা নিয়েছিল। পুরনো জমিদারী বন্দোবস্তে জমিদারের মফস্বল কর্মচারীরা খাজনা আদায় করে নাটোরের সদর কাছারীতে পাঠাত, সেখান থেকে মুর্শিদাবাদের দেওয়ানী খাজাঞ্চীখানায় রাজস্ব প্রেরণ করা হত। এই বন্দোবস্তে নাটোর জমিদারীর সদর কাছারীতে খাজনা সংগৃহীত না হয়ে আমিলের তত্ত্বাবধানে ইজারাদাররা সরাসরি মুর্শিদাবাদে খাজনা পাঠাতে লাগল। অর্থাৎ খাজনা আদায় সংক্রান্ত সমস্ত কাজের সঙ্গে জমিদারের আর কোনো যোগ রইল না, এমন কি মফস্বল পরগনাগুলিতে কি আদায় হচ্ছে কি হিসাব চলছে সে খবর পর্যন্ত জমিদারের কাছে আসা বন্ধ হয়ে গেল।
এই অবস্থায় নাটোরে পৌঁছে রাউজ দুলাল রায়ের কর্তৃত্ব ঘুচিয়ে দিলেন। তিনি নিজেও কিছু ধোয়া তুলসীপাতা নন। তাঁর মনেও কিছু প্রাপ্তির আশা জ্বলজ্বল করছে। নায়েব নাজিমের আমিল ও ইজারাদাররা যাতে পাই পয়সা সরাতে না পারে সে জন্যে সব হিসাবপত্র তলব করে প্রত্যেক কাগজে ও পর্চায় তাঁর সই লাগবে এই হুকুম দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে মহম্মদ রেজা খানের লাঠালাঠি লেগে গেল। মাঝখান থেকে নিরুপায় রানী নিস্পন্দ হয়ে তাঁর প্রজাদের দুর্গতি দেখতে লাগলেন। এরই মধ্যে আরো একটি কারণে নাটোর রাজ্য উচ্ছন্নে যেতে বসেছিল। কয়েক বছর ধরে ইংরাজরা রাতারাতি নবাব বনবার ধান্দায় জোর করে পরগনায় পরগনায় একচেটিয়া কারবার ফাঁদছিল। সে এক সর্বগ্রাসী আয়োজন। শুধু নাটোর রাজ্য নয়, সারা সুবাহ্ জুড়ে দেশের স্বনির্ভর বাণিজ্যে ভাঙন ধরেছিল। চট্টগ্রাম, হুগলী, বালেশ্বরের বন্দর, বীরভূম, দিনাজপুর, কৃষ্ণনগর রাজ্য, রংপুর, সিলেট, পূর্ণিয়ার ফৌজদারী, ঢাকা ও পাটনার সুবৃহৎ নগরকেন্দ্র, দেশের কোটি কোটি প্রজার সংসার বিপর্যয়ের মুখে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঐ একই কারণে মীরকাশিমের সঙ্গে ইংরাজদের লড়াই বাধে এবং লড়াইয়ে হেরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব দেশ থেকে বিতাড়িত হন। অন্যান্য জমিদারীর মতো নাটোর জমিদারীতেও যে উৎপাত শুরু হয়, তারও মূলে অবাধ শুল্কহীন বাণিজ্যের সর্বসংহারী বিস্তার।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ