পূর্ণিয়ায় জর্জ গুস্তাভুস ডুকারেলকে পাঠানোর এই ঘটনা দেওয়ানি অংশের অন্যান্য জেলায় ‘সুপারভাইজার’ পদ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নজির তৈরি করেছিল। ১৭৬৯-এর জুলাইতে ‘সিলেক্ট কমিটি’, আদৌ এই পদক্ষেপটি নেওয়া যায় কি না, সে বিষয় বিবেচনা করার জন্য গ্রহণ করে এবং ১৭৬৯-এর ১৬ই আগস্ট ভেরেলস্টের এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত সুপারভাইজার নাম আর তাঁদের আওতাধীন জেলাগুলোর নাম তুলে দেওয়া গেল –
১. মুর্শিদাবাদের সাথে যোগাযোগ রাখা কর্মকর্তাদের নাম
ঢাকা। টমাস কেলসল। তিনি ‘চিফ’ (Chief) হিসেবে অন্য ‘সুপারভাইজার’-এর তুলনায় উচ্চতর পদে ছিলেন; বস্তুত সিলেট অঞ্চলের জন্য জন সামনার নামক একজন সুপারভাইজার তাঁরই নির্দেশনায়, তাঁরই অধীনে কাজ করতেন।
হুগলি। উইলিয়াম লুশিংটন।
বীরভূম। আলেকজান্ডার হিগিনসন।
ত্রিপুরা। ওয়াল্টার উইলকিন্স।
পূর্ণিয়া। জর্জ গুস্তাভুস ডুকারেল।
দিনাজপুর। এইচ. কটরেল।
যশোর। রবার্ট উইলমট। (পরবর্তীতে জে. শেক্সপিয়ার ও ডব্লিউ. রুক তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।)
নদীয়া। জ্যাকব রাইডার।
রাজমহল ও ভাগলপুর। উইলিয়াম হারউড।
রাজশাহী ও নাটোর। সি. ডব্লিউ. বাউটন-রাউস।
রংপুর। জন গ্রোস।
২. পাটনার সাথে যোগাযোগরাখা কর্মকর্তাদের নাম
সারণ ও চম্পারণ। এডওয়ার্ড গোল্ডিং।
শাহাবাদ। চার্লস লয়েড।
তিরহুত। জেমস ইংলিশ কিলি।
রোহতাস। হেনরি পামার।
মুঙ্গের। নাথানিয়েল বেটম্যান।
সুপারভাইজারদের পথনির্দেশনার উদ্দেশ্যে ভেরেলস্ট যে ধরণের নির্দেশনামা বাস্তবায়িত করেন, সেটি বিশেষ আলোচনার দাবি পেশ করে; কারণ এগুলো কেবল এইসব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার কর্তব্যকেই সুনির্দিষ্ট করে না, বরং ওয়ারেন হেস্টিংসের গভর্নর-পদে আসার আগের সময়ে কোম্পানি কর্মচারীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ — কিংবা বলা যায় সর্বশ্রেষ্ঠ — একজন কর্মকর্তার অভিজ্ঞতার নির্যাসও এতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
১। প্রতিটি ‘সুপ্রাভাইজার’ (Supravisor)-এর দায়িত্ব ছিল তাঁর তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত ‘প্রদেশ’-এর একটি “সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” সংকলন করা; এই ইতিহাসে প্রাচীন শাসনব্যবস্থার রূপরেখাকে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে দেখানো হবে। এছাড়া এতে প্রধান প্রধান অভিজাত পরিবারগুলোর একটি ঐতিহাসিক বিবরণ থাকবে — যাতে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠিত বিশেষ অধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, “এমন প্রতিটি ঘটনা বা লেনদেনের বিবরণ এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা তাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে, অথবা যা প্রদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে।” সুপ্রাভাইজারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তাঁরা “সুজা খানের রাজত্বকালের আগের সময়ের নথিপত্র অথবা রেকর্ডপত্র বিষয়ে অহেতুক বিভ্রান্ত বা ভারাক্রান্ত না হন”; কারণ — এমনটিই মনে করা হতো — “সুজা খানের সেই সুশৃঙ্খল ও সুশাসিত যুগে দেশের প্রাচীন প্রশাসনিক বিভাজনগুলোতে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, এবং বর্তমানে যে বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান, তা মূলত সেই সময়ের পরবর্তীকালে সৃষ্টি হয়েছে।” ধারণা করা হয়েছিল যে, এই ইতিহাসগুলো সংকলনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সরকারি কাছারিগুলোয় সহজেই পাওয়া যাবে। তবে মৌখিক তথ্যের ওপর নির্ভর করার ক্ষেত্রে সুপ্রাভাইজারদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যেন তাঁরা “ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব এবং প্রকৃত সত্য বা ঘটনার বাস্তব অবস্থার” মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে অবশ্যই সক্ষম হবেন।
২. প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুপ্রাভাইজারদের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট এলাকার জমির অবস্থা, উৎপাদন ক্ষমতা এবং সামগ্রিক সামর্থ্য সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা; এই প্রতিবেদনটি হতে হবে “প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগৃহীত এবং তাঁদের নিজস্ব সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাইকৃত ও নিশ্চিতকৃত।” এমনটিই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, এই গুরুদায়িত্ব পালনে ব্রতী হয়ে তাঁরা প্রতিটি ‘সদর’ বা প্রধান কাছারিতে নিঃসন্দেহে এমন এক বা একাধিক নথিপত্রের সন্ধান পাবেন, যা ‘সাধারণ ও বিশেষ হস্তবুদ’ (Hustabood) নামে পরিচিত — অর্থাৎ একটি রাজস্ব-তালিকা বা ‘রেভিনিউ-রোল’, যাতে আদি জরিপ অনুযায়ী জমির পরিমাণ (বিঘা বা অন্যান্য পরিমাপের এককে) লিপিবদ্ধ থাকে। তবে তাঁদের এই মর্মে সতর্ক করে দেওয়া হল যে, এই ধরণের নথিপত্র “সন্দেহ নিরসন করার পরিবর্তে বরং কৌতূহলকেই আরও উসকে দেবে”; “কারণ এই নথিপত্রের বিষয়বস্তুগুলো একান্তভাবেই জমিদারদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়ে থাকে। এগুলোর প্রতিটি অংশ এমনভাবে অস্পষ্ট এবং কেন্দ্রিয়ট শাসনে বসে থাকা মানুষদের গুলিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি তথ্যে ভর্তি; এবং এটা সুপরিকল্পিতভাবে জমিদারদের প্রস্তাবনা এবং সরকারের কাছে পেশকরা হিসাব-নিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে; আর এই পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছে অত্যন্ত শিথিলভাবে, অবিশ্বস্ততার সাথে এবং চরম পক্ষপাতদুষ্টতার প্রতি আশ্রয় নিয়ে।” বস্তুত, বর্তমানে প্রচলিত এই ‘হাস্তাবুদ’ নথিপত্রগুলো থেকে “জমির বর্তমান বিভাজন ও খণ্ড-বিখণ্ডকরণের ক্রমবিকাশমূলক ইতিহাস ছাড়া আর বিশেষ কিছুই জানা যায় না; বরং এগুলো থেকে কেবল সেই চরম শোষণের মাত্রা সম্পর্কেই একটি ধারণা পাওয়া যায়, যা রাজস্ব-সংগ্রাহক ও প্রশাসনিক ব্যয়ের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে প্রজাদের (রায়তদের) ওপর সময়ে সময়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
বিদ্যমান ‘হস্তবুদ’ (রাজস্ব-তালিকা) সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়ার পর, সুপারভাইজার একটি নতুন ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে অগ্রসর হবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি স্বয়ং প্রতিটি বিভাগ পরিদর্শন করবেন এবং সেখানকার জমিদার কিংবা স্থানীয় প্রধান সংগ্রাহকের সাথে সাক্ষাৎ করবেন; তারপর আবশ্যিকভাবে প্রধান জমি ব্যবস্থাপকদের (land authorities) নিকট প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়ার পর, তিনি উপবিভাগগুলোতে যাবেন এবং অধীনস্থ কার্যালয়গুলো পরীক্ষা করবেন। (প্রতিটি সুপারভাইজারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তিনি যেন প্রতি মহকুমা থেকে “প্রতি রায়তকে (প্রজার) দেওয়া পট্টার তালিকা” সংগ্রহ করেন — যে তালিকায় প্রতি রায়তের দখলে থাকা জমির পরিমাণ এবং সেই জমির ওপর ধার্য করা খাজনার পরিমাণ উল্লেখ করা রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এর ফলে, “তিনি এই বিষয়টা যাচাই করতে সক্ষম হবেন যে, প্রধান বিভাগগুলোর কালেক্টরদের দাখিল করা ‘হস্তবুদ’ (জমির হিসাবের বিবরণী) বা নথিপত্রগুলো, প্রধান বিভাগ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম মহকুমা পর্যন্ত — নিচের স্তরের বিভাগগুলোর হস্তবুদের সাথে ঠিক কতটা আলাদা।” তাছাড়া, “কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের যে কোনো সংখ্যার পট্টার সমষ্টি নির্ণয় করে এবং সেই পট্টাগুলোয় উল্লেখ থাকা অর্থের পরিমাণকে হস্তাবুদ বা নথিপত্রে উল্লিখিত অর্থের সাথে তুলনা করে,” তিনি “সেখানে তালিকাভুক্ত জমি ও রাজস্বের ক্ষেত্রে কোনো উদ্বৃত্ত অথবা ঘাটতি রয়েছে কি না, সে সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন। এবং সেই অনুযায়ী — হিসাবপত্রের মধ্যে কোনো ত্রুটি বা অসংগতি দূর করার প্রয়োজনে — আপনি বিভিন্ন স্থানের জমির কিছু অংশের সঠিক পরিমাপ করাবেন, যাতে সেই আনুপাতিক অংশগুলোর ভিত্তিতে সমগ্র পরিস্থিতির ওপর একটি উপযুক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়।” জমিদারদের পারস্পরিক যোগসাজশ বা আঁতাত রোধ করার উদ্দেশ্যে, তাদের সামনে “জমিদারি বা চাকরি হারানোর ভয়” তুলে ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল; আর যদি সুপারভাইজার জমিদারদের কোনো শক্তিশালী ও অনমনীয় জোটবদ্ধ প্রতিরোধের সম্মুখীন হন, তবে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পাওয়ার পর গভর্নর এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, যাতে “প্রতিটি অপরাধী বা দোষী ব্যক্তি এটি মর্মে উপলব্ধি করতে বাধ্য হন যে — যেখানে সমস্ত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে যোগসাজশমূলক নিপীড়ন অব্যাহত রাখা হয়, সেখানে কোনো প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।”) এই কার্যক্রম চলাকালীন, সুযোগ বুঝে রায়তদের মনে — ”অত্যন্ত জোরালো ও বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে” — এই বিষয়টি গেঁথে দিতে হবে যে: “আপনাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্যই হলো রায়তদের স্বস্তি ও লাঘব বিধান করা; এই পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো প্রকার বিরোধিতা করা মানে হলো নিজেদেরই শৃঙ্খলকে আরও দৃঢ় করা এবং অত্যাচারীদের ওপর নিজেদের দাসত্ব ও নির্ভরশীলতাকে পাকাপোক্ত করা; আমাদের উদ্দেশ্য মোটেই খাজনা বৃদ্ধি করা কিংবা দাবির বোঝা বাড়িয়ে তোলা নয় — বরং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, বৈধ দাবিগুলোকে নির্দিষ্ট করে এবং প্রতারণামূলক ও অননুমোদিত দাবিগুলোকে ব্যাখ্যাপূর্বক বাতিল করার মাধ্যমে, কেবল তাদের বর্তমান অভিযোগগুলোর প্রতিকার করাই নয়, বরং তাদের সম্পত্তির ওপর যেকোনো প্রকার অনধিকার হস্তক্ষেপ থেকে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।”
এই শ্রমসাধ্য অথচ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত পরিদর্শনের সুবাদে, তত্ত্বাবধায়ক (Supervisor) নিজেকে এমন একটি অবস্থানে দেখতে পেতেন, যেখান থেকে তিনি “তার তদন্তের ফলাফল সরাসরি জমিদারের সামনে তুলে ধরতে” সক্ষম হতেন। তাই, এই নির্দেশাবলিতে নবনিযুক্ত জেলা কর্মকর্তাদের হাতে এমন কিছু সাধারণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল, যা জমিদারেরা তাদের ভূসম্পত্তি থেকে গোপনে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, সেগুলোর সাথে সম্পর্কিত ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ