রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়েও, সুপারভাইজারদের কাজ কেবল প্রতিবেদন পেশ করাই ছিল না – বরং তাদের অনুসন্ধানের ফলে যখনই কোনো ভূমি জালিয়াতি ধরা পড়ত, তখনই তাঁদের অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া ছিল। নির্দেশাবলীতে এমন বেশ কিছু উপায়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল, যার মধ্য দিয়ে দেখা গিয়েছিল যে, অধিকাংশ জমিদারর, তার জন্য বুরাদ্দ সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করেছেন (১ম খণ্ড, ইত্যাদি, পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা ২৩২)। “জমি গোপনে আত্মসাৎ করে আর পক্ষপাতদুষ্ট ‘হস্তবুদ’ (জমি জরিপ ও হিসাব)-এর মাধ্যমে জমিদার যেসব সুযোগ সুবিধে নিজের ভোগে নিশ্চিত করেছেন, সেগুলো ছাড়াও — তাকে কিছু জমির ‘ফ্রিহোল্ড’ বা নিরঙ্কুশ মালিকানা এবং কিছু আনুষঙ্গিক প্রাপ্য অথবা ‘পারকুইজিট’ ভোগ করার অধিকার দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কালক্রমে এই সবকটি ক্ষেত্রেই নানান ধরণের অপব্যবহার অনেক দূর পর্যন্ত চারিয়ে গিয়েছে। তাকে এই ধরনের একচেটিয়া অধিকার বা ভোগদখলের সুযোগ দেওয়ার মূল অর্থ এবং উদ্দেশ্য ছিল — তার আর তার পরিবারের জন্য জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং সুখ-সুবিধা বিষয়টার সরবরাহের নিশ্চিত করা। ‘নিজৌত’ (Nejaut) এবং ‘নানকর’ (Nankor) নামক যে দুটো অধিকার সে পেয়েছিল, তাতে নিশ্চিত করা হয়েছিল — কোনো নির্দিষ্ট জমিতে জমিদাররের জন্য চাল বা/এবং শস্য উৎপাদন করা হতো, আবার অন্য কোনও জমি তার পশুপালনের চারণভূমি হিসেবে বরাদ্দ ছিল; আবার কোনোও নির্দিষ্ট পুকুর থেকে মাছ আর পানীয় জল তিনি পেতেন; এবং একইভাবে, তার দৈনন্দিন ভোগের প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন সামগ্রীর সংস্থানের জন্য আলাদা আলাদা জমি বা ভূখণ্ড তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। যদিও এই বিশেষ সুযোগ কেবল উল্লিখিত উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল, তবুও এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে — জমিদারেরা তাদের দাবির পরিধি বাড়িয়েছেন এবং সুযোগ বুঝে এমন সব ক্ষেত্রে সরকারি রাজস্ব আর রায়তদের (প্রজাদের) সম্পত্তিতে হাত দিয়েছেন, যেখানে তার অধিকারের কোনো ভিত্তিই নেই, এমনকি অজুহাত দেখানোরও বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
‘নজরানা’ (Nuzzeranha) — যা বাংলায় ‘সেদি’ (Sedee) নামে পরিচিত এবং যা খাদ্যসামগ্রী ও অর্থ — উভয় রূপেই আদায় করা হয় — তা জমিদারদের এই অপব্যবহারেরই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জমিদার কিংবা তার অনুচরবর্গ — কেউই তাদের এলাকার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন না, যতক্ষণ না তারা সেখানকার অধিবাসীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক এই নজরানা আদায় করছেন না। এই প্রথা কেবল সুনির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধে এবং এমনভাবে পালনের অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল, যাতে রায়তরা অযথা আর নির্বিচারে সর্বস্বান্ত না হন; বরং এই দাবির পরিমাণ যেন কেবল যুক্তিসঙ্গত চাঁদা বা অনুদান ফেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
“জমিদারের মুনাফার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উৎস হলো — নিজের খেয়ালখুশিমতো প্রজাদের ওপর জরিমানা আরোপ করা; এটা এমন এক ক্ষমতা, যা সম্পূর্ণ লোপ করে দেওয়া উচিত। একইভাবে, তিনি বাজারগুলোকে দখল নিয়ে শুল্ক বা/এবং মাশুল আদায় করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। এছাড়া তিনি রায়তদের ওপর এমন কিছু কর্তৃত্ব ফলান, যার জেরে তিনি তাদের থেকে বিনামূল্যে বা বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দাবি করেন। ক্ষেত্রবিশেষে এই ধরনের শ্রমদাবি হয়তো অনুমোদনযোগ্য হতেও পারত — যদি না দরিদ্র শ্রমিকদের প্রায়শই এই অজুহাতে তাদের নিজেদের অতি-প্রয়োজনীয় কাজ থেকে জোর খাটিয়ে তুলে নিয়ে এসে — শুধুই জমিদারের খেয়ালখুশি মেটানোর কাজে জুড়ে দেওয়া হতো। অথচ সেই জমিদারই আবার তার এলাকার বিভিন্ন উৎপাদিত সামগ্রী থেকে বিপুল পরিমাণ উপহার বা ভেট গ্রহণ করতেন; আর সেই সামগ্রীগুলো — যা মূলত জমিদারের নিজস্ব ভোগদখলের জন্যই নির্ধারিত ছিল — তা প্রায়শই…” …যা তার নির্ভরশীলরা বিক্রি করে মুনাফা করতেন। এগুলোর পাশাপাশি, তিনি সাধারণত টাকার ওপর একটি মনগড়া মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘বাট্টা’ (অতিরিক্ত অর্থ) দাবি করতেন — এটা অবৈধ উপরি পাওনা এবং ভবিষ্যতে এই প্রাপ্তি অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। জমিদারদের ঘটিয়ে তোলা এই বিষয়গুলো এবং এজাতীয় অন্য সব বাড়াবাড়ি — যা এখানে বিস্তারিত উল্লেখ সম্ভব নয় — সে সব আপনারা কাজ এগিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে খুঁজে বার করবেন এবং আপনাদের সামনে নতুন করে উঠে আসবে — মাথায় রাখতে হবে অবশ্যই সে সব ছাঁটাই করা বা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন; এবং তার সব সুযোগ-সুবিধা বা পারিশ্রমিককে কেবল সেই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যার জন্য সেসব মূলত মঞ্জুর হয়েছিল, এবং সেখানেই তার অধিকার বিস্তৃতির পরিসমাপ্তি টানতে হবে। এবং সুপারভাইজারদের (তত্ত্বাবধায়কদের) এই মর্মে পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হলো যে, “জমিদারদের সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা কেবল সেই নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, যার জন্য সেগুলো মঞ্জুর করা হয়েছিল, এবং সেখানেই তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।” তালুক, জায়গির এবং লাখেরাজ জমির অধিকারীদের মালিকানা সংক্রান্ত দলিলপত্র দেখানোর জন্য নির্দিষ্ট যুক্তিসঙ্গত সময়সীমা দেওয়ার কথা ছিল; এই দলিল দেখিয়ে অহেতুক বিলম্বের শাস্তি হিসেবে সংশ্লিষ্ট জমি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখা হয়েছিল; এবং নবাবের স্বাক্ষর করা দলিলের মাধ্যমে অনুমোদিত নয় — এমন যেকোনো তালুক হস্তান্তরকে বাতিল বা অকার্যকর হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেই জমি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে।
বিভিন্ন প্রকার ভূমি-স্বত্ব বা ‘টেনিউর’ (tenure) সংক্রান্ত নির্দেশাবলীতে যা বলা হয়েছে, তা এখানে বিস্তারিতভাবে উদ্ধৃত করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে; কারণ এই মন্তব্যগুলো রাজস্ব প্রশাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই প্রণীত হয়েছে।
“তালুক বা তালুকের সংখ্যা বৃদ্ধি অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত এবং তা দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি ও জনসংখ্যার সুষম বিস্তারের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। একটি তালুকের প্রজারা এত অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং অন্যদের তুলনায় তাদের ওপর এমন স্পষ্ট পক্ষপাত ও নমনীয়তার সাথে কর ধার্য করা হয় যে, তালুকগুলো সাধারণত জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে, অথচ দেশের অন্যান্য অংশ জনশূন্য পড়ে থাকে। অধিকন্তু, খারাপ অবস্থা থেকে ভালো অবস্থায় যাওয়ার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি, তালুকদাররা প্রায়শই নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের জমিতে প্রজাদের সমাগম বাড়াতে সচেষ্ট হন। তারা দলাদলির মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি জবরদখল করেছেন এবং সম্ভবত মূল অনুদানের সীমার বাইরেও বিশাল ভূখণ্ডের মালিকানা ভোগ করছেন। এখন এটি মনে রাখা আবশ্যক যে, সমগ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও হিতসাধনকে কখনোই মুষ্টিমেয় — সম্ভবত অযোগ্য — ব্যক্তির বিত্তবৈভব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়নি; অথচ এই ব্যক্তিরা উল্লিখিত বিশেষ সুযোগ-সুবিধাগুলোর ওপর এমন কোনো বৈধ দাবিই উপস্থাপন করতে পারে না, যা তাদের লোভের কাছে নিজেদের সততাকে বিসর্জন দেওয়ার বিষয়টি ছাড়া অন্য কিছু প্রমাণ করে। অতএব, আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত সমস্ত বৈষম্য দূর করা, প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রতিবেশীর সমমর্যাদায় উন্নীত করা, করের বোঝা সুষম ও নিরপেক্ষ করার মাধ্যমে সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর থেকে চাপ লাঘব করা এবং বেআইনিভাবে দখলকৃত জমি সরকারের অনুকূলে প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। ‘ফকির’ বা জাগিরগুলো — যেমনটি তালুকগুলোর ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে দেখা যায় — সর্বদাই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিদানস্বরূপ প্রদান করা হয়; তবে তালুক থেকে এদের পার্থক্য হলো, এগুলো সরাসরি রাজকীয় অনুদান এবং কেবল নিজাম কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে থাকে। এই অনুদানগুলো হয় বংশানুক্রমিক হয়, অথবা প্রাপকের জীবদ্দশা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়; এগুলোর ক্ষেত্রেও হিসাব-নিকাশ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একই নিয়মাবলি প্রযোজ্য হবে….
“দান বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রদত্ত অনুদানের ক্ষেত্রে, এভাবে নির্দিষ্ট করে রাখা জমিগুলোর আয়তন, উৎপাদিত ফসল এবং আর্থিক মূল্যের ভিত্তিতে একটি প্রাক্কলন বা হিসাব প্রস্তুত করতে হবে। যদি দেখা যায় যে, জমির মূল্য বা আয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত মূলধন বা অনুদানের সীমাকে অতিক্রম করছে, তবে অতিরিক্ত অংশটি সরকারি তহবিলের আয়ে জমা করতে হবে। আর যদি দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে কিংবা সেগুলোর উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে গেছে, তবে সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে এবং সেগুলোর রাজস্ব বা আয় পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে হবে।
“যেসব ‘খাস’ জমি — অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব জমি — প্রজাস্বত্ব গ্রহণকারী বা ইজারাদারের অভাবে সরাসরি সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ ‘সদর কাছারি’-র নথিপত্রে লিপিবদ্ধ থাকে। যেহেতু এটি জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, আকস্মিক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কারণ, নাকি ওই জমিগুলোর ব্যবস্থাপকদের দুর্নীতি ও অপশাসনের ফলে সেগুলোর অবনতি বা ক্ষতি সাধিত হয়েছে — তাই আপনি এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করবেন।” যেহেতু এমন আশঙ্কা করা যেতে পারে যে — সরকারের হাতে ন্যস্ত হওয়ার পর থেকে — সরকারি কর্মকর্তাদের সময় ও মনোযোগ এদের দুর্দশা মোচন ও পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে, বরং এদের অবশিষ্ট সামান্য সম্পদটুকু আহরণ করতেই বেশি ব্যয়িত হয়েছে; তাই তাঁদের কার্যকলাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এর যথার্থ পরীক্ষার উপায় হলো — জমিগুলো ‘খাস’ (সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন) হওয়ার পূর্বে সর্বশেষ ইজারাদারের অধীনে সেগুলোর উৎপাদন কেমন ছিল, এবং খাস হওয়ার পর থেকে সেখান থেকে কী পরিমাণ আয় হয়েছে — তা নিশ্চিত করা; যা তাঁদের তত্ত্বাবধানে জমিগুলোর উন্নতি নাকি অবনতি ঘটেছে, তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করবে। আর যদি দেখা যায় যে, জমিগুলোর মূল্য বা উপযোগিতা বৃদ্ধির পরিবর্তে ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, তবে এমন ব্যক্তিদের অযোগ্যতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকবে না; এবং তাঁদের তত্ত্বাবধানে খাস জমিগুলো জনাকীর্ণ, আবাদকৃত ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে — এমন কোনো আশাও করা যায় না। জমিগুলোর বর্তমান অবস্থা যথাযথভাবে পর্যালোচনার পর, একটি সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা উচিত যে — আমরা দুই, তিন, চার বা পাঁচ বছর মেয়াদে জমিগুলো ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করতে প্রস্তুত; এক্ষেত্রে বার্ষিক খাজনার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। উক্ত মেয়াদ শেষে, জমিগুলোর খাজনার হার অন্যান্য সাধারণ জমির সমতুল্য হবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কিংবা সামগ্রিকভাবে দেশের শাসনকার্য পরিচালনার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে যেসব আদেশ জারি করা হবে, জমিগুলো সেগুলোর আওতাভুক্ত হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ