| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৯ম) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৪৭৮ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

অনুবাদকের ভূমিকার শেষ কিস্তি

পরের ১০ নম্বর কিস্তি থেকে শুরু হবে ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদনের অনুবাদ

চার্টার্ড এক্ট ১৮১৩-র টানাপোড়েন

গত আটটা কিস্তিতে আমরা আলোচনা করেছিলাম পঞ্চম প্রতিবেদন, ফিফথ রিপোর্ট তৈরির প্রেক্ষিত এবং দক্ষিণ এশিয়ার ওপর পলাশীর উত্তর সাড়ে পাঁচ দশকজুড়ে দক্ষিণ এশিয়ার বানিয়া-শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক আধিপত্যের বিরুদ্ধে মেট্রোপিলিটনে ফ্রি ট্রেড আন্দোলনের কুশীলবেদের ভাষ্য। ১৭৫৭-য় পলাশীর পর বাঙলা এবং ১৮০৩-এর পরে দক্ষিণ এশিয়া লুঠ সম্পদে ইংলন্ড আমেরিকা এবং ইওরোপ জুড়ে ব্রিটিশ স্টাইলের পুঁজিবাদ বিকাশের ফলে মেট্রোপলিটনজুড়ে বাণিজ্যকেন্দ্রে আর লন্ডন শহরের বাইরের বন্দর শহরগুলোয়, নতুন নতুন বাজারে প্রবেশ করার উদগ্র ইচ্ছেওয়ালা একশ্রেণীর নব্য কর্পোরেট পুঁজিবাদী এনটিটির আবির্ভাব ঘটছিল প্রবল প্রতাপে মূলত সদ্য স্বাধীন আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দাস বাজার নির্ভর করে — কিন্তু তাদের লক্ষ্য আরও বড়, আরও লাভের, আরও প্রভাবশালী দক্ষিণ এশিয়ার অতি লাভের লুঠ বাজার — প্রথমত লুঠ অযুত ধনসম্বল যাকে পুঁজিবাদ উৎপাদনের কাঁচামাল দাগিয়ে দেয় আর দ্বিতীয় লুঠ হল পলাশীর পর ১৮১৩ পর্যন্ত ৫৫ বছর ধরে বিশিল্পায়িত দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে সেই ধনসম্বল ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রি করা বিপুল উদ্বৃত্ত। সদ্যজাত কর্পোরেট পুঁজিবাদী উদ্যমী শিল্পপতি, সওদাগরেরা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।

লুঠ কেন্দ্রে বসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, ব্রিটিশ রাষ্ট্র, সদ্য উদ্ভিন্ন কর্পোরেট কাঠামো জোরদার করার বাইরে অন্য কিছু ভাবছিল এমন নয়। সব ভাবনার ভিত্তি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, বাজার, সম্পদ, জ্ঞান, দক্ষতা। চিনেরও এই সব কটা অনেক বেশিই ছিল, কিন্তু চিনের ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না — যে রাজনৈতিক শৃঙ্খলের জোরদার পকড় ছিল দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে। চিনে তাকে প্রথম দিকে বকলমে চোরা কারবার চালাতে হয়েছে। চিন শুধুই দুধেলা গাই — যার ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শূন্য। তাছাড়া চিনের সম্পদ দখলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। ব্রিটেন ছাড়াও বহু দেশ চিন বাণিজ্যে সক্রিয় — বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় সে একা – একচ্ছত্র।

আমেরিকা নিয়ে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে রাখি, পঞ্চম প্রতিবেদন যখন লেখা শুরু হচ্ছে ১৮১০-এ, তার আধ দশকের মধ্যে আমেরিকার উত্তরপ্রান্তে শিল্পায়নের দামামা বেজে যাবে। ব্রিটেনের প্রথম প্রাক্তন উপনবেশে তৈরি হতে শুরু করবে একের পর এক কাপড় মিল। তার ইঙ্গিত ব্রিটিশ মেট্রোপলিটনের শাসক-কর্পোরেট কর্তারা পাচ্ছিলেন। ফলে অযুত ব্রিটিশ শিল্পপতি এতদিন প্রায় বিনা বাধায় আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ অন্য নতুন বিশ্বে নিজেদের পণ্য বিক্রি করেছেন, তাদের কাঁচামাল ব্যবহার করেছেন ব্রিটেনের হাজারো মিলে — তাদের কাছে দুঃস্বপ্নের বার্তা ছিল আর কর গোণা কয়েকটা বছরের মধ্যেই তারা আমেরিকায় ব্রিটিশ পণ্যের বাজার এবং অবাধে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ হারিয়ে বসার। ইংলন্ডে শুরু হবে কটন ফেমিন। ফলে তার পাখির চোখ দক্ষিণ এশিয়ার বাজার — এখানে আমেরিকার মত যেমন তুলো উৎপন্ন হয়, তেমনি শহুরে কোলাবরেটদের সাহায্যে অবাধে পণ্য বিক্রির সুযোগ অবাধ।

ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতুন কর্পোরেটদের গুরুত্ব অনেকটাই বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু প্রায় দু’শতাব্দ ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় থেকে এই ভূখণ্ডকে হাতের তালুর মত চেনা সঙ্গঠন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রাজনৈতিকভাবে নিস্ক্রিয় করা, গুরুত্ব না দেওয়া, অনেকটাই হয়ত আত্মহত্যার সামিল বলে শাসকদের মনে হচ্ছিল। তাছাড়া পলাশীর পর মাত্র আধ দশক জুড়ে দক্ষিণ এশিয়ার সম্পদ লুঠ হয়ে ব্রিটিশ মেট্রোপলিটনে সংহত হয়ে পুঁজিতে রূপান্তরিত হচ্ছে — এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াইতে সে সম্পদ জলের মত খরচ হচ্ছে। তার পক্ষ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ — প্রতি বছর দক্ষ হাতে বলপ্রয়োগে বিপুল পরিমানে ভূমি রাজস্ব আদায় করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শাসন ভার নিজের হাতে তুলে নেওয়া তখনই সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না। তাই ফিফথ রিপোর্ট যখন লেখা হচ্ছে, সে সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূমি রাজস্ব উদ্বৃত্ত লুঠ করে সেই সম্পদ বিপুল পুঁজিতে রূপান্তর করে মেট্রোপলটনে সংহত করা। একই সঙ্গে সেই ভূখণ্ডের বিপুল বৈচিত্রের অযুত পরিমান কাঁচামাল প্রায় বিনামূল্যে দখল করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট কারখানায় ব্যবহার করে, উৎপাদিত পণ্য দক্ষিণ এশিয় বাজারগুলোয় বিক্রির জন্য পাঠানো। মাথায় রাখতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোয় উৎপন্ন কাঁচামাল সহজে এবং শস্তা দরে কর্পোরেটরা মেট্রোপলিটনে আমদানি করতে পারছিল, উপনিবেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বজ্রকঠিন নিয়ন্ত্রণের ফলেই। সেই কৃষি, খনি উৎপাদনে দখলদারি বজায় রাখার জন্য দাস ব্যবসা উত্তর সময়ে দক্ষিণ এশিয় শস্তাশ্রম দখল করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বাগান, খনিগুলোয় খাটানো, বলকমে আইনি দাস ব্যবস্থা চালানো একান্তই প্রয়োজনীয় কাজ ছিল। তাছাড়া ভারতভূম ঘাঁটি করে পূর্বে চিন লুঠ, পশ্চিমে আফ্রিকা লুঠ, এবং বিপুল কর্পোরেট উদ্বৃত্ত ব্যবহার করে উত্তরে রুশ ভল্লুকের দক্ষিণ আর মধ্য এশিয়া জোড়া আগ্রাসন রোখাও ছিল তার অন্যতম মনোবাসনা।

পঞ্চম রিপোর্ট তৈরির সময়ে ভারত-চিনের সম্পদ লুঠের সম্পদে ব্রিটেন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরির পরিবেশ নির্মাণ করতে শুরু করেছে। এই কাজে তার প্রধানতম স্যাঙাত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আর বাজারে একচ্ছত্র পকড় এবং লুঠকর্ম। তাই সাম্রাজ্যের কর্তারা জানেন কোম্পানিকে দুর্বল করা সাম্রাজ্য স্বার্থের পরিপন্থী। কোম্পানির অস্তিত্বের ওপর অনেকটাই মেট্রোলপিটনের অভিজাত আর ভদ্রবিত্তের বিলাসী যাপন নির্ভরশীল। এর একটা বড় কারন শেয়ার বাজারে কোম্পানির শেয়ারের বিপুল দাম। মেট্রোপলিটনে ভদ্রবিত্ত, বুদ্ধিজীবিদের চাকরি, দালালি মোটামুটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা আর ভারত রাজস্ব উদ্বৃত্ত নির্ভর। রাষ্ট্র এবং কর্পোরেট জানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থনীতি বলে সৃষ্ট একমাত্র মেট্রোপলিটনিয় ভদ্রবিত্ত পারে এনক্লোজার আন্দোলনে উচ্ছেদ হওয়া বিপুল সংখ্যক অনিয়ন্ত্রিত অভদ্রবিত্ত আরবান পুওর, যাদের একটা বড় অংশ কর্পোরেট কারখানার শ্রমিক — তাদের সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে। মাথায় রাখতে হবে ১৮২০-তে অভদ্রবিত্ত লুডাইটদের হিংসা সামলাতে রাষ্ট্রকে কাপড়েচোপড়ে হয়ে সেনাবাহিনী রাস্তায় নামাতে হয়েছিল। তারপক্ষে ইস্ট ইস্ট অন্ডিয়া কোম্পানিকে এই মুহূর্তে ডাম্প করা কার্যত অসম্ভব।

তাই ফিফথ রিপোর্টের বাহানায় ১৮১৩-র চার্টার্ড এক্ট প্রণয়ন করে বিপুল বড় কর্পোরেট এনটিটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নব্য কর্পোরেট এনটিটিগুলোর সঙ্গে একটা সমঝোতায় এল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য; কোন সাম্রাজ্য? যে সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ার সম্পদ খরচ করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিজিত হয়ে ইওরোপে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই সনদে তৈরি হল মাঝামাঝির একটা সমঝোতা সূত্র। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ব্রিটেন ভূমের অন্য কোনও সংগঠনই দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা চেনেনা — সেখানে তারা ১০০ বছর সওদাগরী ভূমিকা পালন করেছে আর গত পাঁচ দশক হাইব্রিড মোডে সওদাগরি আর সরকার চালিয়ে বিপুল সম্পদ লুঠের কাজ তারা দক্ষ হাতে করে চলেছে। কোলাবরেটরদের সাহায্যে নিত্যনতুন লুঠের ফ্রন্ট খুলছে; তারা তাদের ব্যবসায় সহযোগিতা করছে, চাকরি দিচ্ছে; এবং স্বাভাবিকভাবে ভদ্রবিত্ত কোলাবরেটরেরা উপনিবেশের গণহত্যা ঘটানো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পারসেপশন বদল করার জন্য সক্রিয় হয়েছে; ফকির সন্ন্যাসী সহ হাজারো আন্দোলন সফলভাবে দমন করেছে; বিশ্বজয়ী লবণ, বস্ত্র, নৌশিল্পের কোমর ভেঙে বিশ্ব বাজার থেকে তার পণ্য তাড়িয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ফাঁকা করেছে এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়াকে শুধু বলপ্রয়োগেই নয়, অনেকটাই বৌদ্ধিক সূত্রে বদলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় একটা বড় কোলাবরেটর শ্রেণী তৈরি করে তাদের উপনিবেশিক লুঠে অংশ নেওয়ার কাজে সক্রিয়ভাবে জোটানো গিয়েছে।

তাই সমঝোতা হল একদিকে কোম্পানির সওদাগরী উদ্যমের ডানা ছেঁটে নব্য কর্পোরেটদের জন্য ভারত উপনিবেশের বাজার খুলে দেওয়া হবে — শুধু তার হাতে থাকবে চিন বাণিজ্য আর চা। বদলে কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে অক্ষুণ্ণ রাখবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। হয়ত তখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিজের হাতে দক্ষিণ এশিয়া সাম্রাজ্য পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেনি। শে ইওরোপের ভূরাজনীতি সামলাতেই জেরবার। তাই ১৮১৩-য় তার ভারত নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হল না — সেটা হতে আরও ৫০ বছর বাকি।

১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট ও দক্ষিণ এশিয়ার ওপর তার প্রভাব

১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুড়ি বছর অন্তর সনদ নবায়ন আইনের শেষতম উদ্যম। এই আইন দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতি আর চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনে। আমরা এই আইনের প্রধান কয়েকটা ধারা অনুযায়ী তার কি প্রভাব এই ভূখণ্ডের ওপর পড়েছিল, সেটা এই কিস্তিতে বোঝার চেষ্টা করব।

প্রধান ধারা ও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব:

১. ভারতের সাথে বাণিজ্যে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার বিলুপ্তি: এই আইনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতের সাথে বাণিজ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ সরাসরি বাতিল করা হল (চিন বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার ১৮৩৩ পর্যন্ত বহাল থাকবে)

এর প্রভাব — এই অধিকারের বিলুপ্তি ভারতের বাজারকে কর্পোরেট এবং ব্যক্তি ব্রিটিশ বণিকের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এই ধারা ব্রিটিশ শিল্পপতিদের (যেমন ম্যানচেস্টার) জন্য বড় জয় ছিল, যারা ভারতকে কাঁচামালের (যেমন তুলো) উৎস এবং তৈরি পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। এর ফলে ভারতের বিশিল্পায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

২. খ্রিস্টান মিশনারিদের দক্ষিণ এশিয়ায় কাজ করার অনুমতি: এই আইন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে খ্রিস্টান মিশনারিদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অঞ্চলে ধর্মপ্রচার ও মিশন স্থাপনের অনুমতি দেয়। এতে ‘উপযোগী জ্ঞান’ ও ‘ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নতি’-এর বিধান রাখা হয়।

এর প্রভাব: এই ধারাটা ছিল ব্রিটেনে ইভানজেলিক্যাল আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল — এর উদাহরণ আমরা উইলবারফোর্সকে নিয়ে আলোচনার সময় দেখেছি। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বিপুল সংখ্যক মিশনারির (যেমন শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন) আগমন ঘটে। তারারা স্কুল প্রতিষ্ঠা, বাইবেল অনুবাদ এবং ভারতীয় ধর্মসমূহের সমালোচনা শুরু করে। এর ফলে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৩. পার্লামেন্টের আধিপত্য ও শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ: এই ধারায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্জিত ভারতীয় অঞ্চলের উপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব জোরালোভাবে ঘোষণা করা হয়। সার্বভৌমত্বের ধারা স্পষ্ট করে দেয় যে ভারত শাসন করছে ব্রিটিশ রাষ্ট্র, শুধু একটি বাণিজ্যিক কোম্পানি নয়। এছাড়া প্রতি বছর ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় ‘ভারতের বিদ্যাচর্চার পুনরুজ্জীবন ও উন্নতি এবং শিক্ষিত ভারতীয়দের উৎসাহিত করার’ জন্য। শিক্ষার ধারাটি ছিল পশ্চিমা শিক্ষা প্রচলনের দিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রথম পদক্ষেপ। এটি ভারতীয় ক্লাসিক না পশ্চিমা বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হবে — এই ’প্রাচ্যবাদী বনাম পাশ্চাত্যবাদী’ বিতর্কের সূচনা করে, যা পরে মেকলের মিনিট (১৮৩৫) দ্বারা ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে নিষ্পত্তি হয়।

৪. প্রশাসনিক ও বিচারিক পরিবর্তন: এই ধারায়কোম্পানির প্রশাসনের উপর ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এবং কোম্পানির বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক হিসাব আলাদা করা হয়। মাথায় রাখতে হবে এটা পিটের ইন্ডিয়া অ্যাক্টে (১৭৮৪) শুরু হওয়া কোম্পানির ওপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা অব্যাহত রাখে; কোম্পানির কাজে পার্লামেন্টের তত্ত্বাবধান বাড়ানো হয় এবং কোম্পানিকে একটি বাণিজ্যিক সত্তা থেকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সরাসরি প্রশাসনিক যন্ত্রে রূপান্তরের পথ প্রস্তুত করে।

১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট ছিল সেই সময়ের ব্রিটেনের বিজয়ী অবস্থানেরই প্রতিফলন:

* ব্রিটেনের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস একচেটিয়া অধিকার বাতিলের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে ভারতকে শিল্পবিপ্লবের জন্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের বাজার হিসেবে দেখা হয়।

* ব্রিটেনের নৈতিক ও আদর্শিক উদ্দীপনা (নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গড়ে উঠা) মিশনারি ধারার মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা এক নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের সূচনা করে।

নেপোলিয়নিক যুদ্ধের আর্থিক বোঝা পার্লামেন্টকে মূল্যবান ভারতীয় উপনিবেশ থেকে নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফা অর্জনের জন্য আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।

এই আইনটি আধুনিক ব্রিটিশ রাজের প্রকৃত সূচনা চিহ্নিত করে — একটি বাণিজ্যিক ও শোষণমূলক উদ্যোগ থেকে একটি ‘সভ্য করার মিশন’ সহ একটি আঞ্চলিক সাম্রাজ্যে রূপান্তর, ভারতকে ব্রিটিশ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংযুক্ত করা এবং একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সূচনা করে যার প্রভাব আজও বর্তমান। এটি ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘মুকুটের মণি’ হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev