“খামার (Comar) জমিগুলোতে যেহেতু স্থানীয় প্রজা নেই, তাই এগুলোর চাষাবাদ করা হয় মূলত চুক্তির ভিত্তিতে। বিভিন্ন জেলায় এই চুক্তির রীতিনীতি আর শর্তাবলি আলাদা আলাদা ধরণের হলেও, সাধারণভাবে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়মই চালু রয়েছে। জমিদার চাষিকে অগ্রিম অর্থ অর্থাৎ দাদন দিতেন। যে অর্থ ব্যয় করে চাষি জমি উর্বর করেন এবং চাষ করে ফসল ঘরে তোলেন। চাষ করা ফসল কেটে ঘরে তোলার পর, সেই কৃষ্টি উৎপাদন সাধারণত চাষি আর জমিদারের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়; এর এক-তৃতীয়াংশ [তেভাগা] থেকে অর্ধেক অংশ [আধিয়ার] পায় চাষি, আর বাকি অংশ জমা হয় জমিদারের কাছারিতে। এরপর চাষি জমিদারের থেকে নেওয়া অগ্রিম অর্থের হিসাব চুকিয়ে দেয়। মাথায় রাখতে হবে এই অগ্রিম অর্থের ওপর জমিদার প্রায়শই চড়া হারে সুদ ধার্য করেন, কিংবা প্রতারণা করে পণ্যের বাজার মূল্যের চেয়ে ফসলের মূল্য অনেক কম নির্ধারণ করে অগ্রিমের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখান এবং সেই ফসলের মাধ্যমেই নিজের পাওনা উসুল করে নেন। আপনার অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য হলো — চাষি তার কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে চাষ করে প্রকৃতপক্ষে কী পেলেন এবং কীভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা। আপনার দ্বিতীয় কাজ হল, জমিদার মাটির উৎপাদিত ফসলের মূল্য কম দেখিয়ে সরকারের থেকে কী পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ আর গোপন করছেন — যার ফলে সরকারের প্রাপ্য আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে — এবং অন্য যেসব কৌশলের মাধ্যমে তিনি আমাদের বিভ্রান্ত করছেন এবং এই জমিগুলোতে চাষাবাদের অগ্রগতি ব্যাহত করছেন, সেই অকথিত পরিকল্পনা উদ্ঘাটন করা। আমার বিশ্বাস, এই পুরো বিষয় অনুধাবন করতে আপনার খুব বেশি একটা বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না; কেবল যদি আপনি উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ ও বাজারমূল্য নির্ণয় করেন এবং সেগুলোর সাথে জমিদার, প্রকাশ্যে সরকারের খাতায় যে আয়ের হিসাব জমা দেন, তার তুলনা করেন — তবেই সব হিসেব পরিষ্কার হয়ে যাবে। জমিদার ও চাষির হিসাবের খাতা পাশাপাশি তুলনা করলেই জমিদারের অবৈধ উপার্জনের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে; এর ফলে আপনি তার গোপনীয়তার সব কৌশল ভেদ করতে পারবেন এবং এমন একটা সূত্র খুঁজে পাবেন, যার মাধ্যমে এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংঘটিত পারস্পরিক যোগসাজশমূলক প্রতারণার পুরো জাল আপনার উন্মোচন করা সহজ হয়ে পড়বে। যেহেতু বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদের এই স্বল্পতার মূল কারণ হলো জনসংখ্যার অসম বন্টন, তাই খামার আর পতিত জমিগুলোতে মানুষকে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যাতে এই জমিগুলোকেও প্রজা-শাসিত বা রায়তি (ryotty) আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করা যায়। বড় শহরগুলো — যেখানে কেবল দারিদ্র্য ও অলসতাই বংশবিস্তার করে থাকে — সেখান থেকে নিঃসন্দেহে প্রচুর সংখ্যক কর্মঠ এবং দক্ষ জনশক্তি পাওয়া সম্ভব হবে; অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মানুষগুলো সমাজের জন্য হয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, নয়তো উপদ্রব সৃষ্টি করছে। এই মানুষগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে এবং চাষাবাদের কাজে নিয়োজিত হতে শেখাতে হবে; আর তাদের সামনে এমন সব উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার চিত্র তুলে ধরতে হবে, যা দেখে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজে সম্মতি প্রদান করে। একইভাবে, তালুক আর জাগিরগুলোতেও এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে… অনেক অলস এবং এই অকর্মণ্য শ্রমিক, যাদেরকে একইভাবে এই জমিগুলিতে এসে কৃষক হতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
“সবশেষে, আমি রায়ত্তি জমি সম্পর্কে বলব। পূর্বে সুপারিশকৃত অনুসন্ধানের পর মঞ্জুর করা বিভিন্ন পরিমাণ পাট্টা থেকে এর পরিমাপ এবং দেয় রাজস্ব উভয়ই স্পষ্ট হবে; এবং বিভিন্ন ধরনের মাটিতে প্রকৃতপক্ষে কি কি উৎপাদিত হয় তা নির্ণয় করে আপনারা প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ জানতে পারবেন, যে অংশগুলো আপনারা এই উদ্দেশ্যে নির্বাচন করতে পারেন, এবং এর মাধ্যমে সমগ্র রায়তওয়ারির উৎপাদনের একটা সাধারণ গড় বের করতে পারবেন।”
“আপনারা নিঃসন্দেহে সহজেই কাছারিতে নথিভুক্ত থাকা পতিত অথবা অনাবাদী জমির হিসাব পাবেন; কিন্তু এখানে আপনারা সম্ভবত একটি বড় ধরনের যোগসাজশের ক্ষেত্র খুঁজে পাবেন; কারণ যে জমিগুলো একবার এই খাতে রাজস্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অল্প সময়ের জন্য পরিত্যক্ত হলেও, খুব কমই পুনরায় সরকারি খাতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।” বিভিন্ন সময়ে নথিভুক্ত পতিত জমিগুলোর হিসাব গ্রহণ করে এবং তা থেকে সেগুলোর ক্রমিক বৃদ্ধি বা হ্রাস লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। স্থানীয় অনুসন্ধানের চেয়ে ভালোভাবে ওই জমিগুলোর বর্তমান অবস্থা আর অন্য কোনও পদ্ধতি মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় না। আপনি সম্ভবত দেখে থাকবেন যে, এই জমিগুলো জমিদার বা কালেক্টরের জন্য তাদের অনুচর বা নির্ভরশীলদের একটি তহবিলস্বরূপ, যারা এই নামে অভিহিত অনেক সমৃদ্ধ ও উর্বর ভূখণ্ড ভোগ করে; এই সমস্ত জমি অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করা উচিত।
বিভিন্ন ‘সুপারভাইজার’-দের (Supravisors) সাথে তাঁদের প্রধান — দরবারের ‘রেসিডেন্ট’-এর যে পত্রালাপ, তা দৃশ্যত কখনোই সেই যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ এটাই তার প্রাপ্য ছিল; ইংরেজ শাসনের সূচনালগ্নে বাংলার ইতিহাসের উপাদান হিসেবে এই পত্রাবলীতে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য-উপাত্তের বিশাল ভাণ্ডার নিহিত রয়েছে। শুরু থেকেই দেশীয় রাজস্ব সংগ্রাহকেরা সুপারভাইজারদের কাজকর্মে নানা ধরণের বাধা তৈরি করছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে; সংগ্রাহকরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইংরেজ কর্মকর্তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো মূলত রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত অথবা বন্ধ করারই একটা কৌশল। জনাব বেচার — যিনি এই পরিকল্পনার প্রতি অনুমোদন জানিয়েছিলেন — তিনিও দৃশ্যত এই অভিযোগ বা বক্তব্যগুলোরয় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৭৬৯-এর ১০ই অক্টোবর, তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার পক্ষে যুক্তি দিলেন : —
মাননীয় হ্যারি ভেরেলস্ট, এস্কোয়ার,
প্রেসিডেন্ট ও গভর্নর, এবং ‘সিলেক্ট কমিটি’-র সদস্যবৃন্দ সমীপে।
কলকাতা,
১০ই অক্টোবর, ১৭৬৯।
মহোদয়গণ,
গত ১৬ই আগস্ট আপনাদের বোর্ডের কার্যবিবরণী প্রসঙ্গে আমার সুচিন্তিত মতামত বিস্তারিতভাবে আপনাদের গোচরে আনার দুঃসাহস আমি করছি; তবে আমি মূলত সেই কারণগুলোর ওপরই আলোকপাত করব, যার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন — অন্ততপক্ষে যেসব জেলায় ‘আমিল’ (রাজস্ব কর্মকর্তা) নিযুক্ত রয়েছেন, সেসব জেলায় — বর্তমান বছরের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা বাঞ্ছনীয়। মহোদয়গণ, আপনারা যদি আমার এই মতের সাথে একমত হন, তবে নির্দেশনামূলক পত্রে আরও বিস্তারিত ও বিশদ টীকা সংযোজনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে; তবে এই মুহূর্তে আমাকে অকপটে এ কথা ঘোষণা করার অনুমতি দিন যে — আমার মতে, এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত চমৎকার এবং এর নির্দেশাবলি অত্যন্ত নিপুণ ও দক্ষ হাতে প্রণীত হয়েছে; আর যাঁরা এই পরিকল্পনাটি প্রণয়ন ও প্রস্তুত করেছেন, তাঁদের সুনাম ও কৃতিত্ব বৃদ্ধিতে এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল ভূমিকা রাখবে। আমার পক্ষ থেকে আপনারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে — আপনাদের এই মানবিক ও মহৎ উদ্দেশ্যটি যেন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে, তার জন্য আমার পূর্ণ সমর্থন ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সর্বদা নিয়োজিত থাকবে।
এই উদ্দেশ্যটি সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু বিষয় বা দিক বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি —
প্রথমত, বাংলাকে বিভিন্ন ‘জিলা’ বা জেলায় যথাযথভাবে বিভক্ত করা প্রয়োজন, যাতে এর প্রতিটি অংশ কোনো না কোনো সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানের আওতাভুক্ত হতে পারে; বর্তমানে যেভাবে এই পদ তৈরি করা হয়েছে অথবা নিয়োগগুলো বিন্যস্ত রয়েছে, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান — যেখানে সরেজমিন তদন্ত বা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম — সেগুলো এই তত্ত্বাবধানের আওতা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে বাংলার যে ধরনের বিভাগ বা বিন্যাস যথাযথ বলে মনে হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ বর্তমানে প্রস্তুত করা হচ্ছে; শীঘ্রই তা আপনাদের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য আপনাদের সমীপে পেশ করা হবে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ