দ্বিতীয়ত, আগামী মৌসুমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে আপনারা যে পদ্ধতি বা কার্যপ্রণালীটি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক — সেই বিষয়টি, সুপারভাইজারেরা সেই বিভাগে কতটুকু গভীরভাবে জুড়ে থাকতে চাইবেন, তাঁদের হাতে কী পরিমাণ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে, এবং সুপারভাইজারদের সাথে থাকার জন্য আপনারা ‘কান্ট্রি গভর্নমেন্ট’ বা দেশীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি আদৌ নিয়োগ করবেন কি না — যদি এই পদক্ষেপ সমীচীন বলে বিবেচিত হয়, তবে উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন, তাঁদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা এবং শাসনব্যবস্থায় তাঁদের কী ভূমিকা বা অংশ থাকবে — এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শহরে এমন সব নথিপত্র বা রেকর্ড খুঁজে বের করতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট ভদ্রমহোদয়দের তাঁদের অনুসন্ধানের কাজে সহায়তা করবে এবং যা নির্দেশাবলির সাথে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, মন্ত্রীদের আমাদের এই পরিকল্পনায় আন্তরিকভাবে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা দরকার — যা আমি এই পরিকল্পনার সাফল্যের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য বলে মনে করি। মন্ত্রীদের ওপর নির্ভরশীল অধিকাংশ ব্যক্তিই যে আমাদের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার জন্য সর্বপ্রকার কৌশল অবলম্বন করবে — এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই; কিন্তু মন্ত্রীরা — বিশেষ করে স্বয়ং নবাব — যদি আমাদের এই উদ্দেশ্য সাধনে আন্তরিক হন, তবে তাঁদের সেই প্রচেষ্টা হবে দুর্বল এবং নিষ্ফল। দরবারে থাকাকালীন সময়ে আমি নবাবকে এমন সব পদক্ষেপে সম্মতি দিতে রাজি করিয়েছি, যা প্রকারান্তরে তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাকেই হ্রাস করার নামান্তর ছিল। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, বর্তমান ক্ষেত্রেও আমি অনুরূপ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হব — যদি তাঁকে এই পরিকল্পনার যৌক্তিকতা সম্পর্কে বোঝানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় এবং তাঁর প্রতি যথোপযুক্ত সৌজন্য ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হয়। আমি মনে করি, এতে কোম্পানির স্বার্থ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এবং আমাদের সংস্কার পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়েই — মুহাম্মদ রেজা খানের প্রতি সম্ভাব্য সকল প্রকার সম্মান প্রদর্শন করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিচক্ষণ পদক্ষেপ। অধিকন্তু আমি মনে করি, তিনি যে অদম্য পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে চলেছেন এবং কোম্পানির জন্য যে অসামান্য সেবা প্রদান করেছেন — তারই স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই সম্মানের দাবিদার।
“সুপারভাইজারেরা কেন বর্তমান বছরের রাজস্ব আদায়ের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত — কিংবা আগামী এপ্রিল মাস না আসা পর্যন্ত — জেলাগুলোতে তাঁদের কার্যক্ষেত্রে যাত্রা করবেন না, তার সপক্ষে বহুবিধ যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে। আমি আশা করি, নিচে বর্ণিত কয়েকটি যুক্তিই আপনাদের — ভদ্রমহোদয়গণ — কাছে এই বিলম্বের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট হবে।
“প্রথমত : প্রস্তাবনাটি হলো এই যে, সংশ্লিষ্ট ভদ্রমহোদয়গণ রাজস্ব আদায়ের প্রত্যক্ষ কাজে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবেন না; বরং এই নির্দেশাবলির আলোকে তাঁরা রাজস্ব বিভাগের প্রতিটি শাখা বা ক্ষেত্র সম্পর্কে কেবল অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করবেন। কিন্তু এই অনুসন্ধান কাজ তাঁদের পক্ষে সম্পন্ন করা অসম্ভব — যতক্ষণ না রাজস্ব আদায়ের যাবতীয় নথিপত্র ও হিসাব-নিকাশ তাঁদের সামনে উপস্থাপন করা হয়; এবং যতক্ষণ না রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাঁদের নিজ নিজ হিসাবের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আর এই ব্যাখ্যা প্রদানের কাজটি তাঁদের পক্ষে করা সম্ভব নয় — যদি না তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ দায়িত্বে থাকা রাজস্ব সংক্রান্ত কার্যাবলি বা কর্তব্য পালনে সাময়িক অবহেলা বা বিরতি দেন।”
দ্বিতীয়ত : যেসব ব্যক্তি বর্তমান বছরের রাজস্ব পরিশোধের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন — যাদের অধিকাংশই অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন — তারা রাজস্ব পরিশোধ এড়াতে কিংবা নিজেদের চুক্তি বাতিল করতে সম্ভাব্য প্রতিটি সুযোগই কাজে লাগাবেন। জেলাগুলোতে সাহেবদের (Gentlemen) আগমন তাদের জন্য এমন একটি সুযোগ তৈরি করে দেবে; কারণ এর ফলে অনিবার্যভাবেই ক্ষমতার বিভাজন ঘটবে এবং তারা এই অজুহাত দাঁড় করাবেন যে, তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিদের চুক্তির শর্ত পালনে বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষমতা তাদের নেই। জেলার অধিবাসীরা স্বভাবতই ধূর্ত প্রকৃতির; তাই রাজস্ব আদায়ের ভরা মৌসুমে সাহেবদের আগমনের সুযোগ নিয়ে তারা সুপারভাইজারদের (Supravisors) কাছে অসংখ্য অভিযোগ পেশ করে নিজেদের রাজস্ব পরিশোধ এড়ানোর চেষ্টা করবে। এই অভিযোগগুলোর যৌক্তিকতা বা অযৌক্তিকতা বিচার করার মতো উপযুক্ত বিচারক সাহেবরা হতে পারবেন না, কারণ রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা বা জানাশোনা নেই। এমতাবস্থায় নিশ্চিতভাবেই নানাবিধ অসুবিধার সৃষ্টি হবে এবং আমার আশঙ্কা, এর ফলে রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত : বর্তমানে জেলাগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিরা সুপারভাইজারদের সন্দেহের চোখে দেখবেন এবং যথাসম্ভব সব ধরনের তথ্য গোপন রাখবেন। অথচ, আসন্ন মৌসুমের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করে এবং তাদের ভালো আচরণের বিনিময়ে পুরস্কার এবং সম্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উৎসাহিত করলে, তারা সাহেবদের তদন্তকাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করতে পারতেন। সাহেবগণ, কেবল এই কারণগুলোই আমার কাছে এতটাই গুরুত্ব বহন করে যে, উল্লিখিত সময়কাল পর্যন্ত সুপারভাইজারদের জেলাগুলোতে পাঠানো স্থগিত রাখার পক্ষে মতামত দিতে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছি না। আমার বিশ্বাস, এই বিলম্বের ফলে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই; বরং এই মধ্যবর্তী সময়টিকে এমন সব প্রস্তুতি গ্রহণের কাজে সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে, যা এই পরিকল্পনাটির সাফল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্বাধিক সহায়ক হবে।
আমি অনেক আগেই আমার এই ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিলাম যে — এই প্রদেশগুলোর প্রতিটি জেলাকেই ‘ইজারা’ (farm) পদ্ধতিতে প্রদান করা হোক এবং কোম্পানি-সেবায় নিয়োজিত সাহেবদের তত্ত্বাবধানে রাখা হোক; সংক্ষেপে বলতে গেলে — পরিস্থিতি যতদূর অনুকূল হবে, সমগ্র দেশটিকেও যেন যত দ্রুত সম্ভব বর্ধমান জেলার সমপর্যায়ে বা একই প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা যায়। নদীয়া, রাজশাহী এবং পূর্ণিয়া জেলাগুলোকে ইজারা পদ্ধতিতে প্রদানের সুপারিশ করার মাধ্যমে আমি এই ধরনের একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পথ সুগম করার প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আসন্ন মৌসুমে, আমি ইজারা-পরিকল্পনাটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে — ইতিমধ্যে ইজারাভুক্ত জেলাগুলোর সাথে আরও কিছু এলাকা যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিলাম। আমি এখনও আশা পোষণ করি যে, সেই পরিকল্পনাটিই বাস্তবায়িত হবে; কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে — আমাদের নিয়োগকর্তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য এবং এই উর্বর জনপদটিকে এর প্রাপ্য সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য — এটিই হলো সর্বাধিক উপযুক্ত ও শ্রেয়তর পরিকল্পনা। আপনাদের নির্দেশাবলির মূল সুর এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুপারভাইজারদের (তত্ত্বাবধায়কদের) ওপর আরোপিত বিধিনিষেধগুলো দেখে মনে হচ্ছে, আপনারা তাঁদের নিয়োগকে সাময়িক হিসেবেই গণ্য করছেন। মহোদয়গণ, এই বিশেষ বিষয়ে আপনাদের মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করার অনুমতি আমাকে প্রদান করুন। আমি মনে করি, তাঁদের নিয়োগ স্থায়ী হওয়া উচিত; এবং যেহেতু আমরা একবার জেলায় জেলায় ইংরেজ ভদ্রব্যক্তিদের প্রেরণের পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেছি, তাই তাঁদের সেখানেই বহাল রাখা উচিত। তাঁদের এমন মাত্রার ক্ষমতা প্রদান করা প্রয়োজন, যা রাজস্ব আদায়ের সুষ্ঠু পরিচালনা, দেশের বাণিজ্যকে সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়া এবং নবগৃহীত পরিকল্পনার অন্যান্য সুমহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হবে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুপারভাইজারদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সপক্ষে অনেক যুক্তিই উপস্থাপন করা যেতে পারে; এই ভদ্রব্যক্তিগণ যদি সম্পূর্ণভাবে স্বার্থহীন হয়ে কাজ করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আমরা যেভাবে চাই, ঠিক সেভাবেই তাঁদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হলে, তাঁদের সামনে নিজেদের আর্থিক অবস্থার যুক্তিসঙ্গত উন্নতির একটি লক্ষ্য থাকা আবশ্যক। এই আর্থিক সুবিধা হয় নির্দিষ্ট ভাতার মাধ্যমে আসবে, নতুবা বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা থেকে অর্জিত হবে; আমার ধারণা, এই দুটির মধ্যে দ্বিতীয় বিকল্পটিকেই অধিকতর উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হবে। তাছাড়া, সুপারভাইজার হিসেবে নিযুক্ত এই ভদ্রব্যক্তিদের সুপ্রতিষ্ঠিত ও নির্মল চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, তাঁরা একচেটিয়া বাণিজ্যের (monopolies) লোভে পড়বেন না; বরং তাঁরা একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফাতেই সন্তুষ্ট থাকবেন — যা তাঁদের তত্ত্বাবধীনাধীন জেলাগুলোর জন্যও কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। এই ভদ্রব্যক্তিগণ যদি তাঁদের দায়িত্ব থেকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পান, তবে তাঁরা পূর্ণ উদ্যম ও নিষ্ঠার সাথে নিজেদের কর্তব্য পালনে সর্বতোভাবে উৎসাহিত হবেন। তাঁদের ওপর অর্পিত আস্থার যথাযথ ও সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাঁরা কতখানি সুনাম ও মর্যাদা অর্জন করতে পারেন, তা কি সহজেই অনুমেয় নয়? হাজার হাজার মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব, তাঁদের যত্ন ও মানসিক প্রশান্তির বিধান এবং যে সমাজের সেবা করছেন, সেই সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে অবদান রাখার মতো আনন্দদায়ক কাজ — কোনো মহৎ হৃদয়ের মানুষের কাছে আর কী হতে পারে? এমন মহৎ উদ্দেশ্য ও অনুপ্রেরণা দ্বারা যিনি প্রভাবিত হন না, তাঁকে কোনো বিধিনিষেধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা আপনাদের পক্ষেও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে; তবে আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে, আমাদের মাঝে এমন কোনো ব্যক্তিই নেই।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ