তবে ১৭৭২-এ, পরিচালকরা বলে পাঠালেন যাতে সুপারভাইজাররা (Supravisors) তাদের নিজ নিজ জেলায় কোনো প্রকার অযাচিত প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন। সে বিষয়ে কলকাতার কর্তারা যেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই লক্ষ্যে ২৮শে জানুয়ারি তাঁরা নির্দেশ জারি করে বললেন : “রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো সুপারিনটেনডেন্টকেই কোনো নির্দিষ্ট জেলার দায়িত্ব, টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে পালন করার অনুমতি দেওয়া যাবে না; এবং উক্ত পদে বহাল থাকাকালীন সময়ে, তাঁর ওপর ন্যস্ত সেই নির্দিষ্ট জেলায় কোনো প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায়, তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকতে পারবেন না কিংবা সেই ব্যবসা বাণিজ্যে তাঁর কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না।” অবশ্য ১৭৭৩-এর ৭ই এপ্রিল, ‘কোর্ট’ (পরিষদ) নিম্নোক্ত বার্তাটি প্রেরণ করেন:
“৪৫. যেহেতু আমাদের অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মচারীদের ‘সুপারভাইজার’ হিসেবে বিভিন্ন প্রদেশে প্রেরণ করার বিষয়টি আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে — বরং এর ফলে তারা দেশের সমগ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য (monopoly) প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে — তাই আমরা নির্দেশ দিচ্ছি, যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের সেই পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক। এমতাবস্থায়, প্রতিটি জেলার প্রকৃত মূল্যমান সম্পর্কে অবগত হওয়ার এবং সেখানকার অধিবাসীদের দুর্দশা লাঘব করার লক্ষ্যে — বিকল্প কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব আমরা আপনাদের ওপরই ন্যস্ত করছি; আর এই ব্যবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যতক্ষণ না আমরা আমাদের এই দপ্তরের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা আপনাদের নিকট প্রেরণ করতে সক্ষম হই — যা বর্তমানে আমাদের সক্রিয় বিবেচনার অধীনে রয়েছে।”
অধ্যায় ১০
জন কার্টিয়ের-এর প্রশাসন, ১৭৬৯-১৭৭২
“২৪শে ডিসেম্বর (১৭৬৯), বছরের শেষ ফসল ঘরে তোলার পর, মিস্টার ভেরেলস্ট তাঁর পদত্যাগ পত্র পেশ করেন; অথচ আসন্ন দুর্ভিক্ষের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একটি বারও ইঙ্গিত দেননি।” (অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল, পৃ. ২২) — এভাবেই ভেরেলস্টের সময়কে সমালোচনা করে লিখেছেন স্যার উইলিয়াম হান্টার। বস্তুত, কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বরই ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-কে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, “শস্যের অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘাটতির কারণে বাংলা আর বিহার প্রদেশের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে”; এবং ২৩শে নভেম্বর তাঁরা উল্লেখ করলেন, “শস্যের অভাবে সর্বব্যাপী দুর্দশার যে সব বিষাদময় দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে” — সেই সব পরিস্থিতির কথা, বিশদে। তাঁরা আরও বললেন, “যেহেতু এই দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে — এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর কোনো আশু প্রতিকার করা সম্ভব যে নয় এ বিষয়টি নিশ্চিত — তাই আমরা নির্দেশ দিয়েছি যেন আমাদের সেনাবাহিনীর সেই সময়ের প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত শস্য উপযুক্ত গুদামঘরে মজুদ করে রাখা হয়। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের ফলে দরিদ্র অধিবাসীরা যে শোচনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে বাধ্য, তা থেকে তাঁদের ত্রাণ দিতে আমরা আমাদের সাধ্যমতো প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব; তবে আমরা এই ভ্রান্ত ধারণায় নিজেদের প্রবোধ দিতে পারছি না যে, আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এর অত্যন্ত মারাত্মক কুফলগুলো অনুভূত হওয়া থেকে ঠেকানো যাবে, কিংবা কোনো মানবিক পদক্ষেপ দ্বারা এর সর্বনাশা প্রভাবকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে।” ২৩শে নভেম্বরের এই চিঠির প্রসঙ্গে স্যার উইলিয়াম হান্টার উল্লেখ করেছেন, “এই বয়ানে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর নেই, বরং কাউন্সিলের দ্বিতীয় পদাধিকারী — যিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছিলেন — সেই মিস্টার জন কার্টিয়ারের স্বাক্ষর রয়েছে।” স্যার উইলিয়াম হান্টার অনুমান করেন, “মিস্টার ভেরেলস্টের স্বাক্ষর না করার বিষয়টি সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ছিল; কারণ তিনি এই কার্যবিবরণীতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং একই তারিখের অন্য এক চিঠিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন।” (জনাব পি. ডায়াস বর্তমান লেখককে জানিয়েছেন যে, ইম্পেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে সংরক্ষিত চিঠির যে অনুলিপিটি রয়েছে, তাতে ভেরেলস্টের স্বাক্ষর বিদ্যমান।) ১৭৬৯-এর ২৩শে অক্টোবর, সরকারের সচিব (এড. বাবর) কালেক্টর-জেনারেলকে (জ্যাস. আলেকজান্ডার) উদ্দেশ্য করে লেখেন: “প্রবল খরাজনিত কারণে শস্যের অভাবে দেশে যে চরম দুর্দশা বিরাজ করছে, সে সম্পর্কে মাননীয় প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক সংবাদ পেয়েছেন; তাছাড়া এই দুর্দশা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে — এমন এক বিষাদময় সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আসন্ন ভয়াবহ পরিণামগুলো প্রতিহত করার লক্ষ্যে তাঁদের সাধ্যমতো প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে শস্যের একচেটিয়া মজুদদারি বা ‘মনোপলি’র চেয়ে ভয়াবহ আর কিছুই হতে পারে না; এবং প্রবল আশঙ্কা রয়েছে যে, অসাধু চক্র হয়তো ঠিক এই কাজটিরই অপচেষ্টা চালাবে। অতএব, মাননীয় প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিলের নির্দেশক্রমে আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে, তাঁরা বিশেষভাবে আপনাকে অনুরোধ করেছেন যেন আপনি আপনার সর্বশক্তি নিয়োগ করে — এবং আপনার ক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে — এমন একটি ভয়াবহ অপতৎপরতাকে শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার জন্য যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালান।” এই চিঠির অনুলিপিগুলো বিভিন্ন জেলার রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। অবশ্য, ভেরেলস্টের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ আদৌ কার্যকর করা সম্ভব ছিল না। যেহেতু ভেরেলস্ট তখন তাঁর দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন (ভেরেলস্ট ১৭৬৯-এর ২৬শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন), তাই এমনটা হওয়া অসম্ভব নয় যে — আসন্ন দুর্ভিক্ষের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণের দায়িত্ব তিনি শুরু থেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর উদ্দেশ্যে লেখা একটি সাধারণ চিঠিতে তাঁর স্বাক্ষর না থাকাটা হয়তো নিছকই একটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বা বিস্মৃতির ফল হতে পারে। তাছাড়া, এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, কাউন্সিলের কার্যপদ্ধতির একটি প্রায়-অব্যতিক্রমী রীতি ছিল এই যে — কোনো সদস্য চাইলে একটি পৃথক ‘মিনিট’ বা টীকা লিখে নিজের ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারতেন; কিন্তু সর্বসম্মতির একটি বাহ্যিক রূপ বজায় রাখার স্বার্থে, তিনি মূল সাধারণ চিঠিতে স্বাক্ষর করতেন — চিঠির বিষয়বস্তু তাঁর সম্পূর্ণ অনুমোদন পাক বা না পাক। এমনটা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ যে, আলোচ্য ঘটনার ক্ষেত্রে কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এমন একটি চিঠি দেশে (ইংল্যান্ডে) পাঠানোর ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন, যা স্বয়ং গভর্নরের অনুমোদন পায়নি; তবে স্যার উইলিয়াম… হান্টারের তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে এটাই নির্দেশ করে যে, কার্টিয়ার পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছিলেন — যা ভেরেলস্ট বিরস বদনে উপেক্ষা করেছিলেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ