পরবর্তী একটি চিঠিতে (২৪শে নভেম্বর, ১৭৭২) ‘কোর্ট’ (পরিষদ) সেইসব কাউন্সিল সদস্যদের আচরণের প্রশংসা প্রকাশ করেল, যারা আদতে ‘সিলেক্ট কমিটি’-র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কাউন্সিল সদস্যদের অধীনস্থ কুঠির প্রধান কুঠিয়ালের দায়িত্ব পালনের যে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল — যা ছিল অত্যন্ত পিছিয়ে পড়ার মত মনে হয় একটা পদক্ষেপ — সেটা নিশ্চয়ই সেইসব ব্যক্তির কাছে অত্যন্ত প্রীতিকর মনে হয়েছিল, যারা ছিল বড় মাপের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী (রিচার্ড বারওয়েল তাঁদের মধ্যে অন্যতম নেতা) : —
“৯. ১৭৭০-এর ২৩শে মার্চের চিঠির ১৭৯তম অনুচ্ছেদে লেখা আমাদের সেই নির্দেশাবলি আমরা নতুন করে পর্যালোচনা আর গভীরভাবে বিবেচনা করেছি, যার মাধ্যমে কাউন্সিল সদস্যদের বাসস্থান কেবল প্রেসিডেন্সির সদর দপ্তরেই সীমাবদ্ধ রাখার এবং (দরবারের রেসিডেন্ট ছাড়া) বোর্ডের অন্য কোনো সদস্যকে অধীনস্থ কুঠিগুলোর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছিল। আমরা লক্ষ্য করছি যে — যদিও উল্লিখিত বিধানগুলো প্রবর্তনের সময় আমাদের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সৎ — তবুও আমরা তখন যে সব সুফল আশা করেছিলাম, বাস্তবে সে সব অর্জিত হয়নি। এমতাবস্থায়, আমরা আর কালক্ষেপণ না করে পূর্বোক্ত নির্দেশাবলি প্রত্যাহার করছি এবং এতদ্দ্বারা তা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, এর ফলে বাংলায় সরকারের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং এদেশের বুকে যে অসহনীয় একচেটিয়া কারবার (monopolies) চলছে — যা স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং আমাদের রাজস্ব ও বিনিয়োগের (বিশেষ করে কাঁচা রেশম বা raw silk-এর ক্ষেত্রে) জন্য ক্ষতিকর — তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে যাবে।
“১০. আমাদের পূর্বোক্ত নির্দেশাবলি বাতিলের প্রেক্ষিতে এবং জনাব রিচার্ড বারওয়েল ‘বাউলিয়া’-তে অবস্থানকালে ও অন্য সময়ে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা এতদ্দ্বারা নির্দেশ দিচ্ছি যে — যদি তিনি নিজে এই পদটি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হন — তবে তাঁকে ঢাকার প্রধানের পদে নিযুক্ত করা হোক।
“১১. এবং যেহেতু ১৭৭০ সালে ‘ল্যাপউইং’ (Lapwing) জাহাজের মাধ্যমে পাঠানো ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’-এর নির্দেশাবলি যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে জনাব রিড (Reed) ও জনাব লেন (Lane)-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তাই আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে — এই চিঠি এবং তার প্রতিলিপিগুলো আপনাদের হাতে পৌঁছানোর পর অধীনস্থ কুঠিগুলোর প্রধানের পদ যখনই শূন্য হবে, তখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁদের সেইসব পদে নিযুক্ত করতে হবে। এই চিঠির মাধ্যমে আমরা আমাদের সেই অটল সংকল্পের প্রমাণ রাখতে চাই যে, আমরা সবসময় সেইসব ব্যক্তিকেই বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতে আগ্রহী, যারা আমাদের নির্দেশাবলি যথাযথভাবে ও নিষ্ঠার সাথে পালনের ক্ষেত্রে নিজেদের সততা ও কর্তব্যপরায়ণতা বজায় রাখেন।” ১৭৭২-এ কার্টিয়ার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কর্নেল থমাস ডিন পিয়ার্স — যাঁকে “বাংলার গোলন্দাজ বাহিনীর জনক”ও বলা হয় — সেই প্রয়াত গভর্নর পিয়ার্সকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে: “তিনি ছিলেন সচ্চরিত্র এবং অত্যন্ত অমায়িক ব্যক্তি;” তবে তিনি এর এসঙ্গে এটাও যোগ করেছেন, “এমন অযোগ্য, নিষ্ক্রিয় এবং দৃঢ়তার অভাবের অসক্রিয় গভর্নর আগে কখনো দেখা যায়নি। আমার প্রবল আশঙ্কা, দেশের বর্তমান দুর্দশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এমনকি মিস্টার হেস্টিংসের পক্ষেও তা সামাল দেওয়া বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।” (“মেমোয়ার্স অফ কর্নেল টি. ডি. পিয়ার্স,” বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩১৭। গ্র্যান্ড (ন্যারেটিভ, পৃষ্ঠা ৩৩) উল্লেখ করেছেন “সেই শান্ত-শিষ্ট মিস্টার কার্টিয়ারের কথা — যিনি তখন গভর্নর ছিলেন এবং তাঁর পরিষদ বা কাউন্সিলও ছিল তাঁর মতোই অদক্ষ ও অকার্যকর।”)
কার্টিয়ারের শাসনকাল মূলত দুটি বিশেষ ঘটনা ঘটার জন্য বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে: প্রথমত, সেই ১৭৭০-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং তার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়গুলো; এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর সরকারের দুটি প্রধান অঙ্গ — ’সিলেক্ট কমিটি’ এবং ‘কাউন্সিল’ — এর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সংঘাত। এ বিষয়টাও বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, যোগাযোগ ব্যবস্থা যখন ছিল অত্যন্ত ধীরগতির এবং প্রায়শই বিঘ্নিত হতো, সেই সময়ে প্রেসিডেন্সি বা সদর দপ্তর থেকে এত দূরে দুটি ‘রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’ (Comptrolling Councils of Revenue) প্রতিষ্ঠা করার ফলে গভর্নরের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে ফোর্ট উইলিয়াম প্রশাসনের দুর্বলতা এবং সেখানে একটি সুসংহত ব্যবস্থার অভাবের বিষয়টি ভেরেলস্ট আগেই সকলের নজরে এনেছিলেন। ১৭৬৯-এর শেষের দিকে, নিজের পরিষদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি বিদায়ী পত্রে তিনি লিখেছিলেন:
“এই সরকারের কার্যপরিচালনায় যে বিশৃঙ্খলা ও পদ্ধতির অভাব বিরাজ করছে, সে সম্পর্কে আপনারা মোটেও অপরিচিত নন। কাজের সমগ্র ভার বা দায়িত্ব কেবল দুটি বিভাগের ওপর ন্যস্ত — ’কমিটি’ এবং ‘কাউন্সিল’। ফলে, আমাদের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় আমাদের সামনে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা, নথিপত্র প্রস্তুত করা এবং নির্দেশাবলি প্রদানের কাজে। এর ফলে আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং সরকারের কার্যপ্রণালী বা গতিশীলতা শিথিল হয়ে পড়ে। আমাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপর অহেতুক অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়; অথচ এই দুটি বিভাগের কোনোটিরই কার্যপরিধি বা দায়িত্ব সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত কিংবা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না… এমনকি ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ বা পরিচালক পর্ষদও ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না যে, এই দুটি বিভাগের কাজের সুনির্দিষ্ট সীমারেখাটি কোথায় টানা হয়েছে; কখনো কখনো তাঁরা ‘কমিটি’র আওতাভুক্ত বিষয়গুলো ‘কাউন্সিল’-এর ওপর চাপিয়ে দেন, আবার কখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা পার্থক্য বিবেচনা না করেই এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ভদ্রমহোদয়গণ, প্রশাসনের সুষ্ঠু পরিচালনা এবং দাপ্তরিক কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি উন্নততর পরিকল্পনা গ্রহণ করার বিষয়টি আপনাদের গভীর বিবেচনার দাবি রাখে। এটি কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন বর্তমানে একটি একক সংস্থার ওপর ন্যস্ত কাজের বিশাল বোঝাটিকে সরকারের বিভিন্ন পৃথক পৃথক বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে এবং আলোচনার জন্য উপস্থাপিত প্রতিটি বিষয়কে একটি সুসংহত ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হবে।” “যদি বোর্ডের সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ষোলো করা হতো, দাপ্তরিক কাজসমূহ বিভিন্ন জেলা কমিটির মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো, এবং এই নিম্নস্তরের বিভাগগুলোতে যা-কিছু প্রস্তুত করা হতো, তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিলের কাছে পাঠানো হতো — তবে এ থেকে যে কী বিপুল উপযোগিতা ও সুবিধা অর্জিত হতো, তা সহজেই অনুমেয়। গভর্নর — যিনি সকল বিভাগের প্রধান এবং যাঁর সমগ্র ব্যবস্থার তত্ত্বাবধান করার কথা — তিনি সেই জটিল ও বিচিত্র বিষয়াবলির ভার থেকে মুক্তি পেতেন; কারণ বর্তমান কার্যপদ্ধতি অনুযায়ী, তাঁকে সেই সমস্ত বিষয় এক নজরেই আয়ত্ত করতে হয় — এবং সচরাচর এমন এক সময়ে, যখন এই অঞ্চলের জলবায়ুতে দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে তাঁর শারীরিক স্বাস্থ্যের ইতিপূর্বেই অবনতি ঘটে থাকে।” (ভেরেলস্ট : ভিউ, ইত্যাদি; পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ১২৪।)
সেই একই চিঠিতে, ভেরেলস্ট ইংরেজ প্রশাসনের একটি দুর্বলতম দিক — সদস্যদের বাণিজ্যিক স্বার্থান্বেষী মনোভাব — ঠিক চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন। কাউন্সিলের সদস্যদের সরকারি বেতন নগণ্য হলেও, কোনো অধীনস্থ কুঠির প্রধানের পদটি ছিল এমন এক পদ, যা পদাধিকারীকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল বিত্ত অর্জনের এক সহজ সুযোগ করে দিত। ফলে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে মনোনীত হতেন, তখনও তাঁরা দূরবর্তী কুঠিগুলোতে নিজেদের পদে বহাল থাকতেন এবং কদাচিৎ কাউন্সিলের সভায় উপস্থিত হতেন; আর তাঁদের অনুপস্থিতিতে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত নিতেন প্রেসিডেন্সিতে অবস্থানরত অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। একই সময়ে, প্রেসিডেন্সিতে অবস্থানরত কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা — স্পষ্টতই কিছু বিশেষ কারণে — কুঠিগুলোতে কর্মরত তাঁদের প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আচরণের বিরুদ্ধে কাউন্সিলে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিচার করতে অনিচ্ছুক থাকতেন; কারণ তাঁরা আশা করতেন যে, সময়ের ব্যবধানে তাঁরাই ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লাভজনক পদগুলোর উত্তরাধিকারী হবেন। ১৭৭০-এর মার্চ মাসে, কোম্পানির ডিরেক্টররা নির্দেশ জারি করলেন যে — দরবারের রেসিডেন্ট বা প্রতিনিধি ছাড়া — কাউন্সিলের অন্য কোনো সদস্যকে আর দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত কুঠিগুলোর প্রধানের পদে বহাল রাখা যাবে না; কিন্তু ১৭৭২-এর নভেম্বর মাসে, যেমনটি আমরা দেখেছি, এই নির্দেশটি বাতিল করে দেওয়া হয়।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ