১৯শে সেপ্টেম্বর ১৭৬৬ তারিখের কার্যবিবরণী বা minute-এ ক্লাইভ ‘সিলেক্ট কমিটি’-র উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেছিলেন: “যেখানে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের পরিমান জড়িয়ে থাকে, যেখানে ক্ষমতা আর কর্তৃত্বের পরিধি এতটাই বিস্তৃত, এবং যেখানে ন্যায়বিচার আর সকলের প্রতি সমতাময় দৃষ্টির সর্বদা সতর্ক নজরদারি একান্তই বাঞ্ছনীয় হয় — সেখানে একজন গভর্নরের পক্ষে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া বিন্দুমাত্রও উচিত নয়। তাঁকে এমন প্রতিটি কাজ থেকে মুক্ত থাকা প্রয়োজন, যেখানে তাঁর নিজস্ব স্বার্থের কারণে তাঁর সার্থ আর বিচারবুদ্ধি প্রভাবিত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকে।” এই সুস্পষ্ট যুক্তির অবতারণায় এক নাটকীয় মাত্রা যুক্ত হয়েছিল, যখন লর্ড ক্লাইভ তাঁর পরিষদবর্গ পরিবেষ্টিত হয়ে ‘মেয়র্স কোর্ট’-এ উপস্থিত হন; সেখানে গভর্নর অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে একটি ‘শর্তাধীন অঙ্গীকারনামা’ বা বন্ডে স্বাক্ষর করেন — যাতে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, তাঁর সরকারি পদের জন্য নির্ধারিত বেতন, স্বীকৃত কমিশন এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা (perquisites) ছাড়া অন্য কোনো প্রকার পারিশ্রমিক বা অর্থ তিনি গ্রহণ করবেন না। [অথচ ক্লাইভ নিজের এবং সমপদে থাকা আমলা আর ব্রিটিশদের স্বার্থপূরণে একচেটিয়া সোসাইটি অব ট্রেড তৈরি করে তামাক, সুপারি আর লবণ ব্যবসা কুক্ষিগত করেন — অনুবাদক]
১৭৬৯ সালে ভেরেলস্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, গভর্নরকে ব্যক্তিগত বাণিজ্য থেকে বিরত রাখার যে নীতিটি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটা কাউন্সিলের সদস্যদের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন। ভেরেলস্ট লিখেছেন (উদ্ধৃত গ্রন্থ, পরিশিষ্ট, পৃ. ১২৪): “এটি সর্বজনবিদিত যে, অনেক সময় কোম্পানির নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের প্রতিনিধিরা রায়তদের (প্রজাদের) ওপর প্রভুত্ব খাটিয়েছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদেরও এক ধরণের ভীতি ও বশ্যতার মধ্যে রেখেছে; আর এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, অপেক্ষাকৃত অধিক সম্মানিত ব্যক্তিদের নামও একইভাবে অপব্যবহার করা হচ্ছে না। পদস্থ ব্যক্তিদের বানিয়া বা অনুচরদের তাদের ব্রিটিশ প্রভুর নামের অপব্যবহার রোধ করা ততটাই কঠিন, যতটা কঠিন হলো মানুষের স্বভাব ও রীতিনীতিকে বদলে ফেলা। শাস্তি হয়তো সাময়িকভাবে অত্যাচারীকে নিবৃত্ত করতে পারে; কিন্তু এ ধরনের ক্ষেত্রে, অত্যাচারকে সমূলে নির্মূল করার আগে জনগণের মধ্যে বিদ্যমান দাসসুলভ মানসিকতাকে দূর করা আবশ্যক। ‘পরওয়ানা’ বা সরকারি নির্দেশনামাগুলো প্রত্যাহার আর বাতিল করা হয়েছে; নিঃসন্দেহে এর ফলে চমৎকার সুফল পাওয়া যাবে; কিন্তু লোভী প্রতিনিধিরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সেই ‘নাম ও কর্তৃত্বের ধারণা’কেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকবে।” (ভেরেলস্ট: ভিউ, ইত্যাদি, পরিশিষ্ট। মিলের সেই যুক্তির প্রতি বিদ্রূপ — অধিক বেতনই সৎ ও নিষ্ঠাবান সেবার নিশ্চয়তা দেয় — কিন্তু তা বাস্তব তথ্যের সাথে খুব একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমস্যা ছিল – একটি শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্সিতেই প্রবীণ কর্মচারীদের (Senior Servants) রেখে দেওয়াটা বাঞ্ছনীয় ছিল; কিন্তু সেটা করতে গেলে তাদের কনিষ্ঠ সহকর্মীদের তুলনায় তারা এক বিরাট আর্থিক বঞ্চনার শিকার হতেন। এমতাবস্থায়, ‘সিলেক্ট কমিটি’ বা ‘কাউন্সিল’-এ পদোন্নতি পাওয়াটা তাদের কাছে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য না হয়ে বরং এক ধরণের শাস্তি হিসেবেই প্রতীয়মান হতো — যা ছিল কেবল নামসর্বস্ব পদোন্নতি। মিলের যুক্তির ওপর এইচ. এইচ. উইলসনের টীকাটি বেশ জোরালো ও যুক্তিসঙ্গত হলেও, তা বাস্তব তথ্য উপেক্ষা করেছে।) কাউন্সিলের একজন সদস্যের বেতন যখন তুলনামূলকভাবে নগণ্য ছিল এবং কোনো অধীনস্থ কেন্দ্রের প্রধানের মোট আয় যখন সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব বাণিজ্য-দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিদের ‘কাউন্সিল বোর্ড’-এ নিয়ে আসাটা ছিল এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার। একই যুক্তি ‘সিলেক্ট কমিটি’-র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল; এই কমিটির সদস্যদের — সম্ভবত ডব্লিউ. বি. সামনার-এর একক ব্যতিক্রম ছাড়া — বাকি সবাই প্রেসিডেন্সি থেকে বহু দূরে অবস্থিত বিভিন্ন স্থানে নিয়োগ লাভ করেছিলেন।
কার্টিয়ের প্রশাসনের সময়কালে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৭৭১-এর মার্চ মাসে, বাংলা আর বিহারে কোম্পানির যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে একটি ‘হিসাব নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ (Comptrolling Committee of Accounts) এবং পাশাপাশি একটি ‘বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ (Comptrolling Committee of Commerce) (The proceedings of this body are preserved complete at the Bengal Secretariat Record Room) নিয়োগ করা হয়। মুর্শিদাবাদ আর পাটনায় ‘রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ পরিষদ’ (Comptrolling Councils of Revenue) গঠনের বিষয় ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৭১-এর ১লা এপ্রিল, প্রেসিডেন্সিতে একটি ‘রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ প্রথমবার বৈঠকে বসে এবং ১৭৭২-এর ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়; পরবর্তী অধ্যায়ে যেমনটি আমরা দেখব, ঐ উল্লিখিত তারিখটিতে ওয়ারেন হেস্টিংসের তৈরি প্রথম ‘রাজস্ব বোর্ড’ (Revenue Board) এই কমিটির স্থলাভিষিক্ত হয়। প্রেসিডেন্সিতে এই ‘রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ গঠনের ফলে ‘কালেক্টর-জেনারেল’ পদের বিলুপ্তি ঘটে; উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান এবং বর্ধমান ও মেদিনীপুরের রেসিডেন্টগণ এতদিন পর্যন্ত এই কালেক্টর-জেনারেলের সাথেই দাপ্তরিক যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন।
১৭৭১-এই নায়েব দেওয়ান মুহাম্মদ রেজা খানের প্রতি পরিচালকদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে। এর আগে এক সময়ে, এই গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী সম্পর্কে ইংরেজদের সুধারণা এমন সব স্নেহসূচক শব্দে প্রকাশ করা হতো — যা অনেকটা ডিকেন্সের ‘অলিভার টুইস্ট’ উপন্যাসের ইহুদি চরিত্র ‘ফ্যাগিন’ নিজের সম্পর্কে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল। মনে হয়, দরবারে নিযুক্ত একের পর এক ‘রেসিডেন্ট’ অর্থৎ প্রতিনিধির পূর্ণ আস্থাভাজন ছিলেন মুহাম্মদ রেজা খান; এবং দেখে মনে হয়, শেষ পর্যন্ত পরিচালকরা তাঁদের দেশে পাঠানো কিছু অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টার বিরূপ প্রতিবেদনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই ২৯শে আগস্ট (সূত্র: Bengal: Past & Present, খণ্ড XI, পৃষ্ঠা ২২৮), পরিচালকরা নায়েব দেওয়ানের আচরণের তীব্র নিন্দা লিপিবদ্ধ করেন এবং তাঁদের চিঠির ২১তম অনুচ্ছেদে সেই বিখ্যাত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন — “দেওয়ান হিসেবে স্বয়ং দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং কোম্পানির কর্মচারীদের মাধ্যমে রাজস্ব সংক্রান্ত সমগ্র তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়া হোক।” চিঠির ১৩তম অনুচ্ছেদে লবণ বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে মুহাম্মদ রেজা খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়; ১৮তম অনুচ্ছেদে দুর্ভিক্ষের সময় শস্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির (cornering) যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তা ইতিপূর্বেই উদ্ধৃত করা হয়েছে; এবং ১৯তম অনুচ্ছেদটি ঢাকা বিভাগের রাজস্বের বকেয়া হিসাব সংক্রান্ত — যা অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সময় থেকেই অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে ছিল, যখন মুহাম্মদ রেজা খান সেখানে ‘নবাব’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরপর চিঠিটি এভাবে এগিয়ে চলে:
২০. আমরা যখন প্রত্যাশা করেছিলাম যে, কোম্পানির প্রভাব ও সুরক্ষা সমগ্র বাংলা প্রদেশে এমন সুফল বয়ে আনবে যা দেওয়ানি রাজস্বে আমাদের জন্য এক উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে — তখন সেই যুক্তিসঙ্গত প্রত্যাশায় নিজেদের হতাশ হতে দেখে এবং বর্তমানে সেই রাজস্বের ব্যাপক হ্রাস — বিশেষত বিহার প্রদেশে — ঘটার ফলে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি, তা দেখে আমরা গভীরভাবে ব্যথিত না হয়ে পারি না। বস্তুত, যখন আমরা বর্ধমানের সমৃদ্ধ অবস্থা এবং আমাদের কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেই প্রদেশের ক্রমবর্ধমান রাজস্বের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে পারি না যে — দেওয়ানি রাজস্বের এই হ্রাস নিশ্চয়ই সেই ব্যক্তিদের অসদাচরণ ও অর্থ-আত্মসাতের কারণেই ঘটেছে, যাঁদের ওপর রাজস্ব আদায়ের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ