২১. যেহেতু আমাদের কাছে সন্দেহ প্রকাশ করার মতো আরও জোরালো কারণ রয়েছে — দেওয়ানি রাজস্বের খাতে মোহাম্মদ রেজা খান অত্যন্ত বলপ্রয়োগে ও নিপীড়ন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রকৃতপক্ষে আদায় করেছেন, যার একটা বড় অংশ তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে আত্মসাৎ করেছেন, আর বাকি অংশ তাঁর ক্ষমতাশ্রিত অনুচরবর্গ ও তাঁর নিপীড়নের হাতিয়ারস্বরূপ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন — সেহেতু ভবিষ্যতে দেওয়ানি রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাঁর হাতে ন্যস্ত রাখা হলে, কোম্পানি কিংবা জনসাধারণের কাছে আমরা নিজেদের কৃতকর্মের যৌক্তিকতা প্রমাণে সমর্থ হবো বলে মনে করি না। অধিকন্তু, অনুরূপ গুরুদায়িত্ব অন্য কোনো মন্ত্রীর ওপর অর্পণ করলেও যে এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের কোনো বিশেষ সুফল লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, এমনটি মনে করারও বিশেষ অবকাশ নেই; এমতাবস্থায়, দেওয়ানি লাভের সুবাদে আমরা যে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা প্রত্যাশা করি, সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের ভিন্ন কোনো পন্থার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। অতএব, আমাদের দৃঢ় সিদ্ধান্ত হলো — আমরা নিজেরাই ‘দেওয়ান’ হিসেবে সরাসরি দায়িত্ব গ্রহণ করব এবং কোম্পানির কর্মচারীদের মাধ্যমে রাজস্ব সংক্রান্ত যাবতীয় তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেব। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে আপনাদের সক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে, আমরা এতদ্দ্বারা আপনাদের এই মর্মে ক্ষমতা প্রদান করছি ও নির্দেশ দিচ্ছি যে — মোহাম্মদ রেজা খান এবং তাঁর দ্বারা নিযুক্ত, তাঁর সহযোগী হিসেবে কর্মরত কিংবা তাঁর প্রভাবাধীন হয়ে কাজ করা এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে অব্যাহতি প্রদান করবেন। আমরা পূর্ণ বিশ্বাস রাখি যে, ‘দেওয়ান’ হিসেবে আপনারা এমন সব বিধিবিধান ও কার্যপন্থা অবলম্বন করবেন, যা একইসাথে আমাদের জন্য সম্ভাব্য সকল প্রকার সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং রায়ত বা প্রজাদের জমিদার ও ক্ষুদ্র স্বৈরাচারী শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুক্ত করবে; উল্লেখ্য যে, যাদের প্রভাব ও কর্তৃত্ব প্রজাদের ত্রাণ ও সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত হওয়া উচিত ছিল, কেবল নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সেইসব ব্যক্তির উদাসীনতা বা প্রশ্রয়ের কারণেই প্রজারা হয়তো এতদিন ধরে এই নিপীড়নের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আসছিল।
২২. যেহেতু আমাদের সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, মহম্মদ রেজা খান তাঁর ওপর অর্পিত আস্থার অপব্যবহার করেছেন এবং নিজের দেশবাসীর প্রতি বহু সহিংস ও অন্যায়মূলক আচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন — তাই আমরা মনে করি, তাঁকে কেবল সেই পদ থেকে অপসারণ করাটাই যথেষ্ট নয়, যেহেতু পদটি অত্যন্ত দুর্নীতিমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ রাখে। অতএব, এটিই আমাদের অভিপ্রায় ও নির্দেশ যে, আপনারা কেবল রাজস্ব হ্রাসের কারণগুলোই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করবেন না, বরং দেওয়ানি রাজস্ব তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকাকালীন মহম্মদ রেজা খানের সামগ্রিক আচরণের বিষয়েও বিশদ অনুসন্ধান চালাবেন। এবং যেহেতু আপনাদের গোচরে আনা বিভিন্ন অভিযোগ ও নালিশগুলো এতটাই গুরুতর প্রকৃতির যে, কঠোরতম তদন্ত ছাড়া সেগুলোকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় — তাই আমরা আমাদের প্রেসিডেন্টকে নির্দেশ দিয়েছি যেন তিনি মহম্মদ রেজা খানকে কলকাতায় উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেন; সেখানে তাঁকে তাঁর সরকারি প্রশাসন ও ব্যক্তিগত আচরণ — উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে। এবং আমরা আপনাদের নির্দেশ দিচ্ছি যেন আপনারা অবিরাম যত্ন ও মনোযোগ সহকারে আপনাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যান; একই সাথে আমরা আপনাদের কাছে প্রত্যাশা করি যে, আপনারা কেবল সেই সমস্ত অর্থের ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারই নিশ্চিত করবেন না — যা আত্মসাৎ কিংবা যোগসাজশের মাধ্যমে সরকার বা কোম্পানির তহবিল থেকে আটকে রাখা হয়েছে — বরং তাঁর ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কিংবা তাঁর লোভের কুপ্রভাবে ব্যক্তিবিশেষ যেসকল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, সেগুলোরও উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন।
২৩. যেহেতু মহম্মদ রেজা খানের প্রশাসনের কার্যপদ্ধতিতে দুর্নীতির এমন সব লক্ষণ ফুটে বেরিয়েছে এবং সে সব আমরা প্রত্যক্ষ্য করেছি, সে সব দর্শনে আমাদের মনে শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে — নবাবের অধীনে অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তিনি হয়তো একইভাবে অবিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন; তাই আমরা আপনাকে আরও নির্দেশ দিচ্ছি যে — ১৭৬৫-র চুক্তির শর্তানুসারে, পরবর্তী নবাবদের পারিবারিক ভরণপোষণ এবং তাঁদের মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত সিপাহীদের ব্যয় নির্বাহের জন্য বার্ষিক বৃত্তি বাবদ যে বিপুল পরিমাণ অর্থ তাঁর (মহম্মদ রেজা খানের) হস্তগত হয়েছিল, সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে আপনি একটি পূর্ণাঙ্গ এবং কঠোর তদন্ত পরিচালনা করবেন। এবং যদি তদন্তে এমনটি প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত অর্থের কোনো অংশেরই তিনি যথাযথ হিসাব প্রদান করেননি, তবে আমরা আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি যে — তিনি যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন কিংবা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করেছেন, সেই সমুদয় অর্থ ‘সরকার’-এর (কোম্পানির) স্বার্থে তাঁর নিকট থেকে দাবি করে আদায় করে নেবেন।
২৪. যদিও আমাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, রাজস্ব তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে আপনাদের দক্ষতা প্রয়োগ এবং আমাদের কর্মচারীদের যত্ন এবং অধ্যবসায়ের ফলে, কোনো ‘নায়েব দেওয়ান’-এর মাধ্যমে কাজ চালানোর চেয়ে কোম্পানির জন্য অধিক লাভজনক ও স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য অধিক স্বস্তিদায়কভাবে রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হবে; তবুও আমরা আজ পূর্ণরূপে উপলব্ধি করছি যে, নবাবের দরবারে কোম্পানির স্বার্থরক্ষাকারী এমন একজন দৃশ্যমান বা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীকে সমর্থন করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যে মানুষটা সরকারের রাজনৈতিক বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করবেন এবং কোম্পানি আর অন্য কোনো ইউরোপীয় শক্তির প্রজাদের মধ্যকার এমন সকল বিবাদ বা ঘটনায় মধ্যস্থতা করবেন, যেখানে তারা আমাদের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করতে পারে কিংবা আমাদের কর্তৃত্বের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। এবং যেহেতু মহম্মদ রেজা খানকে আমরা আর এমন এক ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতে পারি না, যার ওপর নিরাপদে এই ধরনের ক্ষমতা ন্যস্ত করা যেতে পারে; তাই আমরা আপনার স্থানীয় জ্ঞানের ওপর আস্থা রেখে, এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচনের দায়িত্ব আপনার ওপর অর্পণ করছি — যিনি সরকারি কার্যপরিচালনায় সুশিক্ষিত এবং যোগ্য আর কোম্পানির প্রতি যার অসীম আনুগত্য সম্পর্কে আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারবেন। মহম্মদ রেজার স্থলাভিষিক্ত হয়ে সরকারের মন্ত্রী এবং নবাবের মন্ত্রিপরিষদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আপনি নবাবের কাছে এমন এক ব্যক্তির নাম আবশ্যিকভাবে সুপারিশ করবেন; এবং আমরা দৃঢ় বিশ্বাস করি যে, নবাব আপনার এই সুপারিশকে যথাযথ গুরুত্ব দেবেন এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদান করবেন।
২৫. যেহেতু এই ধরনের এক মন্ত্রী নিয়োগের ফলে কোম্পানি যে সুফল লাভ করবে, তা নির্ভর করবে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নে এবং আমাদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে তাঁর সদিচ্ছা ও তৎপরতার ওপর; তাই আমরা তাঁকে এমন উদার এবং সম্মানজনক পারিতোষিক প্রদান করতে ইচ্ছুক, যা সহজেই তাঁর কর্মোদ্দীপনা জাগ্রত করবে এবং কোম্পানির প্রতি তাঁর অসীম আনুগত্য নিশ্চিত করবে। অতএব, আমরা আপনাকে এই ক্ষমতা প্রদান করছি যে, আপনি যাকে এই গুরুদায়িত্ব পালনের যোগ্য বলে মনে করবেন, তাঁকে বাৎসরিক অনধিক তিন লক্ষ টাকা ভাতা মঞ্জুর করবেন; আমরা মনে করি, এই অর্থ কেবল কোম্পানির প্রতি তাঁর সেবার জন্য একটি উদার পুরস্কারই নয়, বরং তাঁর পদমর্যাদা ও আভিজাত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবনযাপন করার জন্যও যথেষ্ট। এবং পরিশেষে আমরা এটুকুও যোগ করতে চাই যে — নবাব সরকারের একজন সক্রিয় মন্ত্রী হিসেবে যাকে আপনি নির্বাচন করবেন, সেই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা আশা ও বিশ্বাস রাখি যে — আপনি কেবল জনকল্যাণ এবং কোম্পানির নিরাপত্তা ও স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হবেন; অন্য কোনো ব্যক্তিগত বা স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। এর মাধ্যমেই আপনারা আমাদের সেই আস্থার যোগ্য প্রমাণ দেবেন, যা আমরা আপনাদের ওপর স্থাপন করেছি।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ