২৬. যেহেতু নবাবের গৃহ ও পরিবারের ভরণপোষণ এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আমাদের পূর্ববর্তী আদেশ অনুসারে আপনি যে মন্ত্রী নির্বাচিত করবেন, তার মাধ্যমে বিতরণ করা হবে, আমরা আশা করছি আপনি ঐ মন্ত্রীকে কোম্পানির পক্ষ থেকে নবাবকে দেয় বিভিন্ন অর্থ ব্যয়ের নিয়মিত ও উপযুক্ত হিসাব আপনার বোর্ডের কাছে বার্ষিকভাবে দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেবেন… আপনি এটি কঠোরভাবে পরীক্ষা করবেন এবং আমরা বিশ্বাস করি, আপনি নবাবের ভাতার কোনো অংশ মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কাজে আত্মসাৎ হতে দেবেন না, অথবা দরবারের অপ্রয়োজনীয় নির্ভরশীলদের মধ্যে তা অপচয় হতে দেবেন না, বরং সম্পূর্ণ অর্থটিই সেইসব উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হবে যার জন্য আমরা তা বরাদ্দ করেছিলাম।
হেস্টিংসের শাসনের প্রথম বছরে মুহাম্মদ রিজা খানের গ্রেফতার আর বিচারের ঘটনা তৎকালীন বিভিন্ন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, এবং এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত যে প্রাক্তন নায়েব-দিওয়ান তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণ করেছিলেন, যদিও গ্রান্টের ‘অ্যানালাইসিস অফ দ্য ফিনান্সেস অফ বেঙ্গল’-এর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যই হলো তাঁকে “মহা খেলাপী” হিসেবে প্রদর্শন করা। ১৭৭৩-এর ১২ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এই বিচারের কার্যবিবরণী বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটের পৃথক খণ্ডে সংরক্ষিত আছে, কিন্তু সমস্যা হল গবেষকেরা এই পুস্তকের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করার জন্য বিন্দুমাত্রও কষ্ট স্বীকার করতে চাননি। ১৭৭২-এর ১১ই মে কলকাতায় জারি করা ঘোষণাপত্রকে কোম্পানির রাজস্ব প্রশাসনের প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। (১৭৭৩-এর ১৬ই এপ্রিল, পরিচালকেরা লিখেছিলেন: “পরিচালকমণ্ডলীর পরিবর্তনের ফলে মহমদ রেজা খান লাভবান হওয়ার যে কোনো আশা পোষণ করে থাকতে পারেন, সেই আশা শীঘ্রই বিলীন হয়ে যাবে; কারণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের মতামত যতই আলাদা হোক না কেন, তাঁকে পদচ্যুত করার এবং কোম্পানির বিষয়াদির প্রশাসন এমন কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তাঁরা আন্তরিকভাবে একমত, যাঁরা ভারতে তাঁদের আচরণের জন্য ইংল্যান্ডে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন…। নায়েব দেওয়ানের পদ বিলোপ এবং প্রধান হিসেবে আপনাদের আত্মপ্রকাশ যদি আপনাদের ইওরোপীয় প্রতিবেশীদের কোনোভাবে শঙ্কিত করে তোলে, তবে এ কারণে উদ্ভূত যেকোনো অযাচিত ঈর্ষা দূর করার জন্য আমরা আপনাদের বিচক্ষণতার উপর নির্ভর করছি।”)
এতদ্বারা সর্বসাধারণকে জানানো যাইতেছে যে, মাননীয় পরিচালক পরিষদ (Court of Directors) নবাব মহম্মদ রেজা খানকে তাঁহার ‘নায়েব দেওয়ান’ পদ হইতে অপসারিত করিতে সদয় হইয়াছেন। ফলস্বরূপ, মাননীয় সভাপতি এবং পরিষদ নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন যে, দেওয়ান পদের দায়িত্ব আপাতত মুর্শিদাবাদের রাজস্ব-প্রধান ও পরিষদ (Chief and Council of Revenue) গ্রহণ করিবেন এবং উক্ত পদের যাবতীয় কর্তব্য সম্পাদন করিবেন। এমতাবস্থায়, সকল জমিদার, ফৌজদার, আমিল, নায়েব, তহসিলদার, সরকারি কাছারির কর্মচারী, ছোবদার, মণ্ডল, রায়ত এবং দেশের সাধারণ অধিবাসীগণকে জানানো যাইতেছে যে — রাজস্ব-প্রধান ও পরিষদ অদ্যই তাঁহাদের পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছেন। এতদ্বারা কঠোর নির্দেশ জারি করা হইতেছে যে, দেওয়ানি সংক্রান্ত যে-কোনো বিষয়ে তাঁহাদের নিকটই আবেদন পেশ করিতে হইবে; কারণ, সাময়িক সময়ের জন্য উক্ত বিভাগে পূর্ণ ক্ষমতা তাঁহাদের ওপরই ন্যস্ত করা হইয়াছে। দেওয়ান পদের আওতাভুক্ত কার্যসমূহ সম্পর্কে কোনো ব্যক্তির অজ্ঞতার অজুহাত খণ্ডন করিবার উদ্দেশ্যে, রাজস্ব-প্রধান ও পরিষদ উক্ত কার্যসমূহের একটি বিস্তারিত তালিকা এই বিজ্ঞপ্তির সহিত সংযুক্ত করিতে সদয় হইয়াছেন। তাঁহারা এখন জানাইতেছেন যে, এই বিজ্ঞপ্তি ও আদেশের প্রতি যেন সর্বোচ্চ মনোযোগ ও পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করা হয় — তাঁহারা তাহাই প্রত্যাশা করেন; এবং এখানে বর্ণিত বিধিবিধান হইতে কোনো প্রকার বিচ্যুতি ঘটিলে, তাহা সরকারের কঠোরতম রোষের কারণ হইবে।
দেওয়ানি পদের আওতাভুক্ত বিভিন্ন কার্যবিভাগের তালিকা
মফস্বল এলাকায় আমিল নিয়োগ।
বিভিন্ন জেলার রাজস্ব সংগ্রহ এবং তৎসংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়।
পরগনাসমূহের বন্দোবস্ত (রাজস্ব নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা)।
নাজিমের স্বাক্ষরিত দেওয়ানি সনদসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা — যাহা তালুক, নিষ্কর ভূমি এবং ধর্মীয় বা সেবামূলক অনুদান যেমন — ব্রহ্মোত্তর (ব্রাহ্মণদের ভরণপোষণের জন্য প্রদত্ত নিষ্কর ভূমি), দেবোত্তর (দেব-বিগ্রহ, মন্দির ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রদত্ত নিষ্কর ভূমি) ইত্যাদির সহিত সম্পর্কিত।
বিভিন্ন জেলার ‘হস্তাবুদ’ (রাজস্ব-হিসাব বা খতিয়ান) প্রস্তুত ও তদন্ত করা।
এক জেলার সহিত অন্য জেলার সংযুক্তি অথবা এক জেলাকে বিভাজিত করিয়া অন্য জেলার সৃষ্টি।
নাজিমের সম্মতিক্রমে জমিদার নিয়োগ ও বরখাস্ত।
দেশের কৃষি-উন্নয়ন এবং রাজস্ব বৃদ্ধির সহায়ক যাবতীয় কার্যক্রম।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ আমলে লওয়া। …বিশেষ করিয়া আমিল ও জমিদারদের এমন সব দাবিদাওয়া, যা রায়তদের ভিটেমাটি ছেড়ে পলায়নে বাধ্য করে।
প্রতিটি জমিদারির সীমানা নির্ধারণ এবং মৃত্যুদণ্ডযোগ্য নয় — এমন বিবাদমান পক্ষগুলোর অভিযোগ নিষ্পত্তি করা।
তালুকসমূহ সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনা এবং তালুকদারদের অধিকার বিন্যস্ত করা।
রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘পরওয়ানা’ জারি করা; এবং নিপীড়িত প্রজাদের অভিযোগের ভিত্তিতে মফস্বল থেকে লোক তলব করা।
যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ঘোষণাপত্রটিই ইংরেজ প্রশাসনের প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে। এই অধ্যায়ের ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে কোম্পানি এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে — তাদের প্রভাবাধীন বিশাল ভূখণ্ডের রাজস্বের কেবল একজন নিষ্ক্রিয় প্রাপক হিসেবেই বহাল থাকা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। দুর্ভিক্ষের সেই ভয়াবহ বছরে, মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থা এক অর্থে তার দায়িত্ব পালন করেছিল — যা নিম্নোক্ত সরকারি পরিসংখ্যানগুলোতে অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে: —
<ছবি>
সুতরাং, ১৭৭২-এ হেস্টিংস যেমনটি উল্লেখ করেছিলেন — “প্রদেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসীর প্রাণহানি এবং ফলস্বরূপ আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও, ১৭১১-এর নিট রাজস্ব সংগ্রহ এমনকি ১৬৬৮-এর সংগ্রহকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।” সংকটকালে, কঠোর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজস্বের পরিমাণকে সমৃদ্ধির সময়ের মানের সমপর্যায়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে সেই পুরনো প্রশাসনিক কাঠামোটি হয়তো সাময়িকভাবে কাজে আসত; কিন্তু এরই মধ্যে সমগ্র দেশটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছিল। তাই, একটা যান্ত্রিক সরকারি ব্যবস্থার নিছক যন্ত্রবৎ কার্যপদ্ধতির পরিবর্তে, সেখানে দায়িত্বশীল মানব-প্রতিনিধিদের নিয়োগ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। “দিওয়ান হিসেবে স্বয়ং দায়িত্ব গ্রহণ করা” — ছিল এমন একটি পরিস্থিতিরই যৌক্তিক পরিণতি, যে পরিস্থিতিকে ভেরেলস্ট কেবল অসম্পূর্ণভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন; যেমনটি তিনি লিখেছিলেন ১৬৬৯-এ : —
“অভিজ্ঞতাই এমনকি চরমতম কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তিকেও এ কথা মানতে বাধ্য করবে যে — বিশাল ভূসম্পত্তির অধিকারী হয়েও নিছক বণিকদের ন্যায় আচরণ করা এবং মুনাফাকেই আমাদের প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করা; বিপুল পরিমাণ রাজস্ব গ্রহণ করা সত্ত্বেও যে সব প্রজা সেই রাজস্ব প্রদান করে, তাদের ওপর পর্যাপ্ত সুরক্ষার ক্ষমতা প্রয়োগ না করা; এবং প্রকৃতপক্ষে সমগ্রের কল্যাণ — অর্থাৎ এক মহৎ এবং উদার লক্ষ্যের প্রতি আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও সংকীর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সাধনে ব্রতী হওয়া — এগুলো এমন কিছু স্ববিরোধিতা, যা কোনোভাবেই সমন্বয়যোগ্য নয়। এ বিষয়গুলো আমাদের জাতীয় চরিত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, এমনকি সুদৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত কোনো শাসনব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক এবং তা কার্যত অমানবিকতারই নামান্তর। প্রজারা আমাদের তাদের কায়িক শ্রম প্রদান করে, আর বিনিময়ে তাদের সুরক্ষা বিধান করা আমাদের কর্তব্য। সাধারণ বিচক্ষণতা এবং সমাজের নিয়ম — উভয়েরই দাবি হলো, এই পারস্পরিক দায়বদ্ধতাগুলো হতে হবে দ্বিপাক্ষিক; অন্যথায়, আমাদের মধ্যকার এই বন্ধন অচিরেই ছিন্ন হবে। কারণ, যে কোনো সরকারের সবচেয়ে সুদৃঢ় নিরাপত্তা হলো প্রজাদের ভালোবাসা এবং অনুরাগ; আর সেই ভালোবাসা অর্জনের ক্ষেত্রে, সম্ভবত বাংলার মাটিতে ইংরেজরা বর্তমানে যে সুযোগ ও ক্ষেত্র লাভ করেছে, তার চেয়ে অধিক অনুকূল পরিবেশ আর কখনোই কোথাও উপস্থিত হয়নি। আমাদের সরকারের যে সহৃদয় ও কোমল রূপ — যা যদি এই প্রদেশজুড়ে যথাযথভাবে প্রসারিত করা যায় — তবে তা মুসলিম স্বৈরতন্ত্রের ঠিক বিপরীতধর্মী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিভাত হবে; আর এর মাধ্যমেই প্রজারা চিরকালের তরে আমাদের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের সাথে একাত্ম হয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়বে।” (ভেরেলস্ট : উল্লিখিত গ্রন্থ, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ১২২
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ