কেউ কি একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? কলকাতায় কলেজস্ট্রিটে ভারতের প্রথম বইমেলা যখন চলছে, তখন জীবনানন্দ দাশ ঢিলছোঁড়া দূরত্বে প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি অনার্সের ক্লাসে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র! এই বহুমুখী বইমেলা কতটা প্রভাবিত করেছিল তাঁর নবীন সৃজনশীল মননকে? তিনি কি এই বইমেলার কথা কোথাও লিখে গেছেন, কোনও লেখায়, কোনও কবিতার পঙক্তিতে? জানা নেই।
বাঙালির তো আবার বারো মাসে তেরো পার্বণ। তার সঙ্গে বইমেলা যোগ করলে হয় চোদ্দো পার্বণ। বইয়ের সঙ্গে বাঙালির নাড়ির যোগ। কলকাতার প্রথম বইমেলাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১০৫ বছর আগে। কলেজ স্ট্রিট চত্বর ঘিরে বসেছিল বইয়ের প্রদর্শনী।
তখন স্বদেশির যুগ। বিদেশি পণ্য বয়কট করে স্বদেশি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে দেশের নানা প্রান্তে। আর তার সঙ্গেই উদ্যোগ চলছিল স্বদেশি শিক্ষাব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলার। সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছিল ‘বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ’, ১৯০৬ সালে। সেই পরিষদের উদ্যোগেই ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে কলেজ স্ট্রিট চত্বরে শুরু হয় ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ’। সেই অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসাবে ছিল দুটি প্রদর্শনী। একটি শিল্প প্রদর্শনী, অন্যটি পুস্তক প্রদর্শনী।
‘প্রদর্শনী’ নামে শুরু হলেও, তাতে যোগ দিয়েছিলেন দেশের নানা স্বদেশি প্রকাশক। তাদের মধ্যে যেমন ছিল বেনারসের ‘মতিলাল বেনারসীদাস পাবলিশার’, তেমনই কলকাতার ‘বসুমতী প্রকাশন’ও হাজির ছিল সেখানে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আনন্দদেব মুখার্জি মতে, ‘বইমেলা’ নামে ঘোষিত না হলেও সেটিই কলকাতার প্রথম বইমেলা। সম্ভবত ভারতেরও প্রথম।
এই পুস্তক প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালা লাজপত রাই, গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, সতীশ মুখার্জি, নীলরতন সরকার, চিত্তরঞ্জন দাশ, অরবিন্দ ঘোষের মতো জাতীয় নেতৃবৃন্দ। জাতির বৌদ্ধিক উন্নতির জন্য গ্রন্থকারদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান অরবিন্দ ঘোষ। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তাদের প্রতি আশীর্বাদবাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও।
সে-ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে ১০২ বছর। বইমেলার এই দিনগুলোয়, বাংলা তথা ভারতের ‘প্রথম বইমেলা’র ঘটনাটিকে ফিরে দেখা আসলে এক স্মৃতিরই তর্পণ।
আবার একটু কেঁচে গণ্ডূষ করা যাক। এক ভূয়োদর্শী লেখকের মতে ১৯০৬ সাল নাগাদ প্রতিষ্ঠা হলো জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। ১৯১৮ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের হাত ধরে কলেজ স্ট্রিটের বুকে ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা। কলেজ স্ট্রিট তো বইয়ের আঁতুড়ঘর। আর ঠিক সেখানেই অনুষ্ঠিত হলো কলকাতার প্রথম পুস্তকমেলা। অবশ্য একে ঠিক মেলা বলা যায় কিনা সে নিয়ে অনেকের মতভেদ আছে, মেলার থেকে প্রদর্শনী বলাই ভালো। হ্যাঁ, জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ১৯১৮ সালের এপ্রিল মাসে আয়োজন করল শিল্প প্রদর্শনী এবং একই সাথে পুস্তক প্রদর্শনীর। প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছিলেন বহু নামীদামি প্রকাশক। নীলরতন সরকার, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখের মত ব্যক্তিত্বরা জড়িয়ে ছিলেন কলেজ স্ট্রিটের এই পুস্তক প্রদর্শনীর সঙ্গে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাকি সাফল্য কামনা করে আশীর্বাদ করেছিলেন প্রদর্শনীর কর্মকর্তাদের।
অর্থাৎ এ কথা বলা চলে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষেই প্রথম পথ চলা শুরু করে বইমেলা। অবশ্য তাতে ব্রিটিশদের অবদান কতটুকু তা জানা যায় না, কিন্তু ভারতীয়রা ছিলেন পুরোভাগে এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। আজকের বইপ্রেমী কলকাতা কি মনে রেখেছে কলকাতার বুকে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম এই বইমেলাকে? যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকবি থেকে বিপিনচন্দ্র পালের মতো ব্যক্তিত্ব!
আমার জ্ঞাতব্য, জীবনানন্দের কোনও লেখায় এই বইমেলা বা পুস্তকপ্রদর্শনীর কথা উল্লিখিত হয়েছে কিনা। তবে এই বইমেলার সময়ই তিনি লিখেছেন জীবনের প্রথম কবিতা।
জীবনানন্দ ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স সহ বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন৷ ওই বছরেই ব্রহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়৷ কবিতার নাম ছিল বর্ষ আবাহন৷ কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয়নি, কেবল সম্মানসূচক শ্রী কথাটি লেখা ছিল৷ তবে পত্রিকার বর্ষশেষের নির্ঘণ্টসূচিতে তাঁর পূর্ণ নাম ছাপা হয় : শ্রীজীবনানন্দ দাস, বি.এ৷
জীবনানন্দ তখন থাকতেন হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সী বোর্ডিং-এ। কলেজ স্কোয়ারের বইমেলা ছিল তাঁর মেস থেকে করমর্দন-দূরত্বে। তিনি বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে সেখানে গিয়ে বইপত্তর নেড়েচেড়ে দেখেননি, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই মনে হয় জীবনানন্দের কাব্যপ্রতিভার উন্মেষ ঘটাতে এই বইমেলা অনুঘটকের কাজ করেছিল। তাঁর কাব্যচেতনার সলতে পাকানোর কাজটি হয়তো সম্পন্ন হয়েছিল এই ‘প্রথম’ বইমেলাতেই!