The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
সংকটে ইওরোপ
নতুন জোট তৈরিতে পূব পশ্চিমের নানান ধরণের স্বার্থ সিদ্ধি কিছু ইঙ্গিতও মিলছিল। ১০৯০-এর দশকের প্রথম পাদে সান ফিলিপো ডি ফ্রাগালিয়ার গ্রিক মঠটি সুবিধে পাওয়ার ঢেউতে ভেসে যেতে শুরু করে। এি মঠকে বেশ কয়েকটি চার্চের দেখভাল করতে দেওয়া হল এবং সিসিলির কাউন্ট রজার এদের বেশ কিছু জায়গা দিলেন সন্তদের দেখভাল করার জন্যে এবং একটা ডিক্রি জারি করে জানালেন এই মঠগুলিতে লাতিন পুরোহিত, এমন কী ‘ব্যারন, স্ট্রাটাগোই’ (গ্রিক ভাষায় মিলিটারি জেনারেল — অনুবাদক), ভিসকাউন্ট এবং অন্যান্যরা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না (৩৯)’। শুধু এখানেই শেষ নয়, বেশ কিছু জায়গাতেও সম্পর্ক শোধরানোর রেশ পাওয়া যাচ্ছিল, বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে। ১৯০৯-এর দশকের প্রথম পাদে প্রথম আলেক্সিওস তার বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যে সর্বক্ষেত্রে আবেদন জানান। ক্যাম্পানিয়ায় আরবানের কাছে সাম্রাজ্যের দূত গেলে, আরবান ১০৯১-র বসন্তে আলেক্সিওসকে সক্রিয় সাহায্য করতে সেনাবাহিনী পাঠালেন ড্যানিউব থেকে থেরেস অবদি বিপুল আক্রমন শানানো স্তেপের পেচেনেগ যাযাবরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে। লেবাউনিয়নের যুদ্ধ ছিল আলেক্সিওসের সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক, তিনি এই প্রায় অপরাজেয় যাযাবর গোষ্ঠীকে পরাজিত এবং ধ্বংস করেন (৪০)।
১০৯৫ নাগাদ বোঝাযাচ্ছিল রোম আর কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে দীর্ঘকালের বিবাদ নিরসনের উদ্যোগগুলোর ফল ফলতে শুরু করেছে। আলেক্সিওস কয়েক বছর আগে যে সম্মেলনের প্রস্তাব দেন, সেটি আয়োজন করা যায় নি ঠিকই, কিন্তু সম্রাট এবং পোপ নিজেদের মধ্যে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলেন সে তথ্য নানান ঘটনায় প্রমানিত হচ্ছিল। দ্বাদশ শতকের পরের দিকের নথিপত্রে যোগ হওয়া তথ্যগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার তারা দুজনে মিলে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করছিলেন। বলা হয়, ক্রোয়েশিয়ার রাজা জোভোনিমিরের রাজদরবারে ১০৯০-এর প্রথমের দিকে আলেক্সিওস এবং আরবানের পক্ষ থেকে দূত পাঠিয়ে বাইজন্টিয়ামের চার্চগুলিকে উদ্ধার এবং জেরুজালেমে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের ওপর মুসলমানেদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে অনুরোধ করা হয়। এই তথ্যটি যদি সত্য হয় তাহলে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় ক্লেরমঁর জনসভায় পোপ যে আবেদন করেছিলেন, তার একটা মহড়া তিনি তার আগেই শুরু করেছেন — প্রাচীন আর নতুন রোমের থেকে সাহায্য চাওয়া; জেরুজালেমে গিয়ে মুক্তির লোভ দেখানো; ভক্তি আর আধ্যাত্মিকতা প্রদর্শোনে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ইত্যাদি। জোভোনিমিরের ক্ষেত্রে এসব কোনও সূত্রই বাস্তবায়িত হল না — একটি সূত্র থেকে জানতে পারছি, তৃতীয় পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতে যাওয়ার প্রস্তাবে রাজা জোভোনিমীরের নাইটেরা এতই হতবাক হয় যে তারা শেষমেশ রাজাকে হত্যা করে (যদিও অন্য সূত্রে পাওয়া যায় যে তিনি শেষ বয়সে শান্তিতে প্রয়াত হন) (৪১)।
কন্সট্যান্টিপোলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার মাধ্যমে আরবান নিজেকে একচ্ছত্র খ্রিষ্টিয় বিশ্বের নেতা হিসেবে উপস্থিত করার সুযোগ পেয়ে গেলেন, পোপের পদকে নিয়ে বহু বছর ধরে তীব্র টানাহেঁচড়া, প্রতিযোগিতা এবং বিভেদ তৈরি হচ্ছিল, সেই প্রচার কিছুটা পর্দার পিছনে চলে যাবে। সে সময়ের অনামা পঞ্জিকাকার বলছেন, একাদশ শতকের শেষে চার্চ বিশৃঙ্খলার আবর্তে হাবুডুবু। চারত্রেসের ফুলচের লিখছেন ‘ইয়োরোপজুড়ে হিংসা ছড়িয়ে শান্তি, সততা এবং বিশ্বাসকে মাড়িয়ে চলেছেন চার্চের ভেতরের আর বাইরের ক্ষমতাধরেরা এবং কখনও কখনও সাধারণেরাও। এইসব শয়তানির শেষ হওয়া জরুরি’(৪২)। এই পরিবেশের মধ্যেই আরবান নিজেকে খ্রিষ্টিয় বিশ্বের কেন্দ্রিয় পরিচালক হিসেবে দেখতে সক্রিয় হয়ে উঠলেন। অথচ তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন ইওরোপিয় বৃহত্তর জগতে পোপিয় প্রভাব তৈরির কথা দূরস্থান, গ্রিক চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে যে সফলতা পেয়েছেন সেইটুকু অর্জন দিয়ে রোমের কেন্দ্রে বসে থাকা তৃতীয় ক্লিমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াইএর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়।
১০৯০-এর মাঝের দিক থেকে অবস্থা একটু একটু করে বদলাতে লাগল। প্রথমটি পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মত। জার্মানিতে এমন অসাধারণ সুযোগ উপস্থিত হল, যাকে অবলম্বন করে আরবান এন্টিপোপ এবং তার পৃষ্ঠপোষক চতুর্থ হেনরিকে মাত করে দেওয়ার অবস্থায় চলে যাবেন। দুর্বব্যহারে ক্ষুব্ধ হয়ে হেনরি শিবির থেকে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ অভিজাত আরবানের পক্ষে চলে আসায় আরবানের অবস্থা বেশ জোরদার হয়। এই দলে ছিলেন হেনরির সুন্দরী যুবতী স্ত্রী (কিয়েভের ইউপ্রাক্সিয়া, বিবাহের পরে এডিলেড — অনুবাদক)। ইউপ্রাক্সিয়া পোপের কাছে অভিযোগ করে জানান হেনরি তাকে ‘বহু মানুষের বল্লভা হতে প্ররোচিত করেছেন, তাকে বারবার অস্বাভাবিক নোংরা ব্যভিচারে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে, সে জন্যে এমন কী তাঁর শত্রুরাও তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তার সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তাতে প্রত্যেক ক্যাথলিকের তার ওপর করুণা হওয়া উচিত (৪৩)।’ এই সব ঘটনায় সে সময় খুবই উত্তেজকর পরিবেশ সৃষ্টি হতে থাকে। পোপের সমর্থকেরা কোনও ছোট ঘটনা পল্লবিত করে সেটিকে সম্রাটের সম্মানহানির কাজে ব্যবহার করার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকত। ফলে ইউপ্রাক্সিয়ার ঘটনার মত রসালো গুজবকে ব্যঙ্গ কবিদের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে অকাতরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিল পোপের সমর্থকেরা (৪৪)। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল চতুর্থ হেনরির পুত্র এবং তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকারী, গুরুগম্ভীর যুবক কনরাড, চার্চের অন্তহীন দ্বন্দ্ব এবং উত্তর ইতালিতে বাবার বেশ কয়েকটা সামরিক ব্যর্থতায় নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পিতাকে ত্যাগ করে তার কিছু অধীনস্থ জমিদার নিয়ে আরবানের পক্ষে দাঁড়ালেন।
এইসব ঘটনা পোপকে তাৎক্ষণিক এবং জোরালো উৎসাহ দিতে থাকে। আরবান ঘোষণা করলেন, তিনি ১০৯৫-তে একদা চতুর্থ হেনরি এবং তৃতীয় ক্লিমেন্টের অক্ষহৃদয় আর্চবিশপদ রাভেন্নার কর্মকেন্দ্র পিয়াসেঞ্জায় কাউন্সিল বৈঠকের আয়োজন করবেন। কাউন্সিল বৈঠকে হেনরির শিবির বদল করা স্ত্রী উপস্থিত হলেন স্বামীর প্রতি নিন্দাপ্রস্তাব নেওয়ার জন্যে, সেখানে এন্টিপোপকে কষে নিন্দা করার আগে যে সব পুরোহিত অতীতে সম্রাটের পাশে ছিলেন তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা হল। কাউন্সিল বৈঠকের শেষ হওয়ামাত্র যুবক কনরাড ক্রেমোনায় পোপের সঙ্গে দেখা করলেন এবং শ্রদ্ধা এবং প্রকাশ্যে নম্রতা প্রদর্শনের আচার হিসেবে পয়েন্টিয়েফের ঘোড়ার লাগাম ধরলেন (৪৫)। কয়েক দিন পরে দ্বিতীয় বৈঠকে কনরাড পোপ, পোপের দপ্তর, পোপের সম্পত্তি সুরক্ষা দেওয়ার শপথ নিলেন। প্রতিদানে পোপ কনরাডের সিংহাসনের দাবি স্বীকার করলেন (৪৬)। পোপ, কনরডের সঙ্গে তার নতুন জোট সঙ্গী এবং ইতালিতে তার সব থেকে বড় পৃষ্ঠপোষক সিসিলির কাউন্ট রজারের কন্যার বিবাহ প্রস্তাব উত্থাপিত হল। পোপ রজারকে চিঠি লিখে জানালেন এই বিবাহকে পারিবারিক সম্মান হিসেবে গ্রহন করতে এবং দেখালেন ভবিষ্যতে বিবাহযোগটি রজারকে বহুধা সুযোগ তৈরি করে দেবে। বিপুল জাঁকজমকের মধ্যে পিসায় বিবাহ আয়োজিত হল, করনার্ডকে তার ধনী শ্বশুর নানান উপহারে ভরিয়ে দিলেন (৪৭)। রাজকীয় বিবাহ আয়োজনের ঘটনা আরবানকে আরও বড় সাম্মানিক উচ্চতায় পৌঁছে দেবে, একদা যে এন্টিপোপ রোমে উৎসবে অংশ নিতে না পেরে, দেওয়ালের বাইরে অক্ষম অবস্থায় হতাশ হয়ে বসেছিল, হঠাত দেখাগেল সেই অসহায় পোপ হঠাৎ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে ইওরোপের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
পিয়াসেঞ্জায় আরও কিছু ঘটনা পোপের অবস্থান চিরতরে বদলে দেবে। কাউন্সিল বৈঠকে ধর্মচর্চা, চার্চ সংক্রান্ত নানা বিষয় আলোচনার জন্য তোলা হল যেমন ধর্মবিরোধীর সংজ্ঞা, ব্যাভিচারের অভিযোগে ফ্রান্সের সম্রাটের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ চ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন, পুরোহিতদের নানান বিষয় ইত্যাদি। আলোচনার মধ্যে কন্সট্যান্টিনোপল থেকে দূতেরা উপস্থিত হলেন (৪৮)। তারা কাউন্সিলের সামলে হৃদয়বিদারক সংবাদ উপস্থিত করলেন — বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যততাড়াতাড়ি সম্ভব সেখানে সাহায্য পাঠানো দরকার। আরবান বুঝলেন এই সুযোগে চার্চের মধ্যে একতার বোধ তৈরি করার উদ্যম নিতে হবে। তিনি বার্তা দিলেন উত্তর প্রদেশগুলি ভ্রমনে যাওয়ার।
ক্রুসেড বিষয়ক যেসব মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক ঐতিহাসিক তাদের লেখনি শুরু করেছেন, আরবানকে অনুসরণ করেছেন এই বিন্দু থেকে। কিন্তু পূর্বে কী ধরণের বিপর্যয় নেমে এসেছিল? কেন গুরুতরভাবে সাহায্য চাওয়া হল? বাইজান্টইয়ামে কী সমস্যা দেখা গিয়েছিল? আমাদের ক্রুসেডের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে ফ্রান্সের পাহাড়ের তলার ঘটনাবলী নয় বরং সাম্রাজ্য শহর কনস্ট্যান্টিনোপলেরর সমস্যার মধ্যে। (চলবে)