The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
প্রথম অধ্যায়
কন্সট্যান্টিনোপল উদ্ধার
১০৮১-তে ভীতিপ্রদভাবে অবস্থা খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। পেচেনেগদের আক্রমন এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ কেটে সামন্তদের বেরোনোর চেষ্টায় যে লড়াই শুরু হল, সেই লড়াইতে বল্কান অঞ্চলের আকাশবাতাসে দাউদাউ করে আগুন জ্বলল। মধ্যযুগের সব থেকে সফল, সব থেকে নিষ্ঠুর সেনাপতি রবার্ট গিসকার্ডের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইতালি থেকে নরমানদের বড় আক্রমন উঠে এল। তুর্কিরা বসফরাসের তীরে আক্রমন তুলে নিয়ে আসায় পাশের অঞ্চলটা তুর্কি আক্রমনের জন্যে হাট হয়ে খুলে গেল। ‘বাইজান্টাইনের অধিবাসীরা তীরভূমির গ্রামগুলিতে নির্ভয়ে বাধাহীনভাবে বিপক্ষের মানুষদের বসবাস শুরু করতে দেখল’ লিখছেন আন্না কোমনেনে। ‘এই দৃশ্য তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেবে; সেই মুহূর্তে তারা জানে না কী করা দরকার (২৪)’। রোমক সাম্রাজ্য একদা পশ্চিমে জিব্রাল্টারের উপসাগর থেকে পুর্বে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আজ শহরের বাইরে এই কাঠামোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন (২৫)। আন্না লিখছেন, তুর্করা এশিয় মাইনরে ঢুকে শহরগুলি ধ্বংস করছে, সাম্রাজ্যের জমি খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের রক্তে ভাসিয়ে দিছে। এই ভয়ের পরিবেশে যাদের প্রাণ রক্ষা পাচ্ছে অথবা যারা বন্দীদশা থেকে বেঁচে যাচ্ছে, তারা ‘গুহা, জঙ্গল, পাহাড়, টিলায় আশ্রয় নিচ্ছে’ (২৬)।
তুর্কিদের প্রতাপে পূর্বের প্রদেশগুলি হারিয়ে সাম্রাজ্যের হাঁটুগেড়ে বসে পড়া, অর্থাৎ বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য সঙ্কটে পড়ার কাণ্ডটা ঘটছিল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে তুর্কি আক্রমনের আশঙ্কায় পিয়াসেঞ্জায় পোপ আরবানের কাছে সাহায্য চেয়ে দূত পাঠাবার ঘটনার বহু পূর্বে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি পনের বছর আগেই এশিয়া মাইনর অঞ্চলটি তুর্কিদের হাতে পতনই ঘটে থাকে তাহলে ১০৯৫-তে কন্সট্যান্টিনোপল থেকে পোপের কাছে সাহায্যের প্রার্থনা গেল কেন? মাথায় রাখতে হবে পোপের কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং পোপের দর্শনীয়, নাটকীয় প্রতিক্রিয়া দুটোই সমকালীন রাজনীতি সঞ্জাত। বাইজান্টাইন যে পোপের কাছে আবেদন পেশ করেছিল সেটি মূলত ছিল কৌশলী রণনীতি আর এর ফলে আরবানের যে প্রতিক্রিয়া আমরা দেখি সেটা স্বস্বার্থবাহী, পশ্চিমি চার্চগুলির নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার উদ্যম। তাই প্রথম ক্রুসেডের হৃদিঅক্ষ ছিল দুর্যোগের ঘণঘটা তৈরি গল্প আর এশিয়া মাইনরের বাস্তব রাজনীতির প্রতিক্রিয়া। যে যুবকের তৈরি করা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ এই অভিযানকে বাস্তব রূপায়নের দিকে ঠেলে দিল, তিনি হলেন মানজিকার্ট যুদ্ধের দশ বছর পর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে সিংহাসনে আরোহন করা সম্রাট আলেক্সিওস কোমনেনোস।
১০৮০-র দশকের প্রথম পাদে কন্সট্যান্টিনোপল মরিয়া হয়ে এক কর্মোদ্যোগীর খোঁজ করছিল যে ঢালের দিকে গড়িয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের রাশ হাতে তুলে নিতে পারবেন। নতুন রোমকে বাঁচানোর জন্যে স্বনির্বাচিত কিছু অভিজাত সে সময় তৈরি হয়েছিলেন যেমন নিকেফোরোস ব্রায়েনিওস, নিকেফোরোস বাসিলাকোস, নিকেফোরোস বোটানিয়াটিস, নিকেফোরোস মেলিসেনোস। প্রত্যেকের নামের উপসর্গ হিসেবে নিকেফোরোস উপসর্গ ব্যবহৃত হয়েছে, এর অর্থ ‘যিনি বিজয় ছিঁড়ে আনেন’। নিকেফোরোস নামধারীরা বিভিন্ন যুগে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে আবির্ভূত হয়েছেন, যখন তার সমৃদ্ধির জন্যে যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু বাইজান্টাইন যে সমস্যার ঘুর্ণাবর্তে পড়েছিল, সেই সমস্যা থেকে উত্তোরণের উত্তর এই অভিজাতদের কাছে ছিল না। আলেক্সিওস কোমনেনোস সেই আশা জাগালেন।
আলেক্সিওস কোমনেনোসের জন্ম বাইজান্টিয়ামের এক সম্ভ্রান্ত এবং সমাজের উচ্চঅভিজাত পরিবারে। তার দেহে কিছুটা হলেও সাম্রাজ্যকে সেবা করা পরিবারের রক্ত প্রবাহিত। দু-বছর ১০৫৭-৫৯ সাম্রাজ্য শাসন করার পরে কাকা আইজাক কোমনেনোসকে কয়েকজন প্রবীন আমলা ব্যক্তিগত স্বার্থপূরণে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই পটভূমি সূত্রে আমরা কোমনেনো পরিবারের সঙ্গে সাম্রাজ্য সংযোগ খুঁজে পেলেও কিন্তু একটি সূত্র বলছে অধিকাংশ জনগণ আন্দাজই করতে করতে পারে নি, একদা তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে জনগণকে অনুরোধ উপরোধ করা, দাড়ি না গজানো এক যুবা সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করে একাদিক্রমে ৩৭ বছর শাসন করবেন এবং আগামী এক শতকের জন্যে তার পরিবারের উত্তরাধিকারীরাই বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিরাপদ শাসক হয়ে উঠবেন (২৭)।
তবে দূরদৃষ্টি ছিল বটে আলেক্সিওসের মায়ের। বলিষ্ঠ, সঙ্কল্পবদ্ধ আন্না ডালাসিনে সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পুর্বজরা বহুকাল ধরে সাম্রাজ্যের নানান সামরিক বেসামরিক প্রশাসনিক সেবা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্না ৫ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্চাশা পোষণ করতেন। জৈষ্ঠ পুত্র ম্যানুয়েল অস্বাভাবিক দ্রুততায় সেনাবাহিনীর প্রধান হলেও, দুর্ভাগ্যর শিকার হয়ে চতুর্থ রোমানোস ডিয়াওজেনেসের রাজত্বে, একটি যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। আন্নার অন্য দুই পুত্র আইজাক এবং আলেক্সিওসের অসামান্য ধুমকেতুসম উত্থান আটকানো যায় নি।
বাইজান্টিয়াম ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় রাজত্বের প্রতি অনুগতদের কাজ দেখাবার জন্যে বেশ কিছু শূন্যতার তৈরি হয়েছিল। এই অবস্থার সুযোগ নেন কোমনেনো ভায়েরা। দুই বড় ভাইএর মধ্যে আইজাক প্রথমে পূর্বের প্রদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে মনোনীত হন, পরে এন্টিওক শহরের প্রশাসক হন। অন্যদিকে আলেক্সিওসও দ্রুত উঠে আসছিলেন ১০৭০-এর দশকে এশিয়া মাইনর এবং পশ্চিম বলকান এলাকায় বিদ্রোহীদের দমন করার সাফল্য সঙ্গী করে।
সেই দশকের শেষে দুইভাই-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কন্সট্যান্টিনোপলের অভিজাতদের ঘনিষ্ঠ মহলে নিয়মিত আলাপআলোচনা চলছিল। দুইভায়ের প্রতি সম্রাট তৃতীয় নিকেফোরোস এবং তার স্ত্রীর রাজ্ঞী মারিয়ার পৃষ্ঠপোষণের মনোভাব তাদের দুজনেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। মারিয়া আর আলেক্সিওসের সম্পর্ক নিয়ে গুজবের পর গুজব রাজ্যজুড়ে দাবানলের মত প্রবাহিত থাকে কারণ দৃষ্টিনন্দিত রাজ্ঞী ছিলেন, ‘সাইপ্রাস গাছের মত সুউচ্চ; তার ত্বক হিমের মত সাদা, মুখাবয়ব লম্বাটে, তার বর্ণের সঙ্গে তুলনা চলে শুধু বসন্তের ফুলের অথবা গোলাপের (২৮)।’ বিপরীতে সম্রাট ছিলেন জরাগ্রস্ত প্রবীণ যিনি ফ্যাশানের বিষয়ে খুবই শওকিন ছিলেন এবং আইজাক তাকে সিরিয়া থেকে মিহি বস্ত্র এনে দিলে তিনি উচ্ছল হয়ে উঠতেন (২৯)।
ভাইদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার গুজব সত্য প্রমান হল ১০৮০ নাগাদ। দুইভাই মিলে আন্দাজ করতে পারছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে সিংহাসন দখলের সময় সমাসন্ন প্রায়। বিশেষ করে দরবারি অভিজাতরা রাজা-রাণীর সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কটুক্তি করতে থাকায়, তাদের মনে হচ্ছিল সিংহাসন দখলের উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। নিকেফোরোস মেলিসেনোসের মত গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত নিজেকে সাম্রাজ্যের শাসক ঘোষণা ক’রে, স্বনামে মুদ্রা জারি করতে শুরু করে এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজের তৈরি একটি পাঞ্জা ব্যবহার করতে থাকে, যেখানে লেখাছিল আপোষহীন এই প্রবাদবাক্যটি, ‘রোমানদের সম্রাট নিকেফোরোস মেলিসেনোস (৩০)।’ মেলিসেনোস এমনভাবে নিজেকে সাম্রাজ্যের প্রধান হিসেবে তুলে ধরার কাজে এগোতে থাকেন যে, সম্রাট তাঁকে সন্তুষ্ট করতে উত্তরাসূরী ঘোষণার কথা চিন্তাভাবনা করতে থাকেন (৩১)।
আইজাক এবং আলেক্সিওস বুঝতে পারছিলেন ঘটনাক্রম দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাদের খুব তাড়াতাড়ি সময়ের লাগাম নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া দরকার। যদিও আলেক্সিওস দুইভায়ের মধ্যে কনিষ্ঠ, কিন্তু নিজেদের মধ্যে তারা ঠিক করে নেন সফল বিদ্রোহ সংগঠিত করে সিংহাসন দখল করতে পারলে আলেক্সিওসই সম্রাট হবেন। সিনহাসন দখলের পথ সুগম করতে তিনি বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাশালী, ডাউকাস পরিবারে বিবাহ করলেন। ফলে সিংহাসন দখলের দৌড়ে অভিজাতদের সমর্থন পাওয়ার দৌড়ে তিনি অনেকটা এগিয়ে যেতে পারলেন। তলে তলে সিংহাসনে আরোহনের সময় পেকে উঠছিল। এক সময় কন্সট্যান্টিনোপলে খবর এল নরমানেরা বড়ভাবে সাম্রাজ্যের পশ্চিম ক্ষেত্র এপিরাস আক্রমন করেছে। সেই মূহূর্তে সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলেন এই অভিযান বিফল করতে তিনি আলেক্সিওস কোমনেনোসকেই বিশাল সেনা বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে আহ্বান করবেন। কিন্তু রোমান শাসকেরা যে বিষয়কে সব থেকে বেশি ভয় করতেন, সেটাই ঘটল, কোমনেনোস বাহিনী নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমনে না গিয়ে রাজধানীর দিকে অভিযান করলেন (৩২)।
যদিও কন্সট্যান্টিনোপল শহরের সুরক্ষা খুবই মজবুত ছিল; কিন্তু কোমনেনোস যে তার বিশাল বাহিনী নিয়ে রাজধানীর দিকে পালটা অভিযান করবেন এমন সম্ভাবনার কথা কেউ ভুলেও ভাবতে পারেন নি। শহরের অন্যতম প্রধান প্রবেশ পথ খারিসিওস দরজায় পাহারা থাকা জার্মান ভাড়াটে সেনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল বিদ্রোহী দল। শর্ত নিয়ে দরকষাকষি ঠিক হওয়ার পর খারিসিওসের কাঠের দরজা কোমনেনোসদের বাহিনীর জন্যে হাট করে খুলে গেল, বিশাল বিদ্রোহী বাহিনী পশ্চিমের দরজা দিয়ে শহরে বন্যার মত প্রবেশ করল (৩৩)। সম্রাটের শহর প্রতিরক্ষা বুদবুদের মত উবে যাওয়ায় বিদ্রোহীরা শহরের মূল রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল লুঠের কাজ হাত পাকাতে। বাবার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর শহরে ঢুকেপড়ার এবং তারপরের ঘটনাবলীর বর্ণনাটি লিখতে গিয়ে আন্না কোমনেনে তার আতঙ্ক লুকিয়ে রাখতে পারেন নি, ‘শহরে সেই দিনগুলোয় ঘটে চলা হিংস্র ঘটনা যে কোনও শক্তিশালী লেখক, সমাজ উৎসুক লেখকের পক্ষে সে সব ঘটনা বর্ণনা করা খুবই কঠিন — চার্চ, পবিত্রস্থান, জন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি সার্বিকভাবে লুণ্ঠ হল, শহরজুড়ে কান্নাররোলে মানুষের কানে তালা লাগল। [ঘটনাক্রম না জেনে] হঠাৎ ঢুকে পড়া মুসাফিরের মনে হতে পারে শহরে হয়ত ভূমিকম্প ঘটেছে (৩৪)।’ (চলবে)