The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
পূর্বদেশে স্থিতিশীলতা
কয়েকজন বাইজান্টাইন সেনানায়ক পূর্ব এলাকাগুলিতে নিজেরা ক্রমশ ক্ষমতা অর্জন করছিলেন — এই দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেনানায়ক ছিলেন ফিলারেটোস ব্রাক্ষামিওস নামে খুবই প্রতিভাশালী নায়ক। ১০৭১-এ চতুর্থ রোমানোস ডাওজেনিসের উত্তরাধিকারী সপ্তম মাইকেল ডউকাসকে সম্রাট হতে সাহায্য না করায় তাঁকে রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। ১০৭০-এর দশকে সাম্রাজ্য যখন একের পর এক বিদ্রোহে উত্তাল, সে সময় ফিলারেটোস বেশ কিছু শহর দুর্গ এবং অঞ্চল ধরে রেখে সেই সব অঞ্চলে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করছিলেন। আলেক্সিওস সম্রাট হওয়ার পরে তার উন্নতির পর পরিষ্কার হয়ে যায়, তাঁর উন্নতি দ্রুত ঘটতে থাকে এবং ১০৮০-র দশকের ১০৮৩-তে এডেসার নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পূর্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দুই শহর মারাশ এবং মেলিটেনির সঙ্গে সিসিলিয়ার কিছু অংশ ধরে রেখেছিলেন (৫)।
পূর্বের দেশে আলেক্সিওসের ক্ষমতায় আসার সময়কে ধরে এশিয়া মাইনরের অবস্থা নিয়ে যে সুদূরপ্রসারী এবং সমস্যাজনক ধারণা আন্না আলেক্সিয়াদে তৈরি করেছেন, সেই ধারণাটা আধুনিক সময়কে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছে। আধুনিক সময়েও একটা সাধারণ ধারণা তৈরি হয়ে যায় যে ১০৮০-র দশকের মধ্যেই পুর্বের প্রদেশগুলোর ক্ষমতা তুর্কিদের দখলে চলে যায়। আন্না কোমনেনের বয়ান নির্ভর করে মোটামুটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক মহল আজও মনে করে প্রথম ক্রুসেডের আগে বাইজান্টাইন এলাকায় অবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকে এবং ১০৯২-তে বাগদাদের সুলতানের প্রয়ানের সূত্র ধরেই এশিয়া মাইনর সাম্রাজ্য তার অবস্থা উন্নতি ঘটানোর সুযোগ পায় (৭)। আলেক্সিয়াদে যে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে তাকে আমাদের খুবই সাবধানে বিচার করতে হবে, কারন লেখকের উদ্দেশ্য ছিল ১০৮১-তে আলেক্সিওসের ক্ষমতায় আসার পরের সময়ের মাহাত্ম্য প্রচার, এবং সেই প্রচারের মূল বক্তব্য ছিল, নতুন সম্রাটই বিসর্জনে যেতে বসা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন। এছাড়াও আরেকটা গোপন উদ্দেশ্যও ছিল, সম্রাট ক্ষমতায় আসার আগে নয় বরং ক্ষমতায় বসার পরের সময়ে যে সব বিফলতার সম্মুখীন হন তিনি, সেগুলিকে সযত্নে গোপন করা। সেই বিপুল বিফলতাগুলো আন্না সুচতুরভাবে নিজের লেখা ইতিহাসে লুকিয়ে রেখেছেন।
আলেক্সিয়াদ অসাবধানতাবশত ১০৮১-তে সম্রাটের সমস্যার জায়গাগুলিও উপস্থপন করেছে সেটাও আমাদের সতর্ক হয়ে বোঝা দরকার। ক্ষমতায় এসেই নতুন সম্রাট এপিরাসে নরমান আক্রমন রুখতে বিশাল সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যের নানান এলাকা থেকে সংগ্রহ করে কন্সট্যান্টিনোপলে জড়ো করেন। এর মধ্যে ছিলেন এশিয়া মাইনরের নানান প্রদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মচারীরা — আলেক্সিওস ‘ঠিক করলেন তিনি পূর্বের অঞ্চলগুলো থেকে টোপারখেসদের [প্রবীন আমলা] অর্থাৎ যে সব শহর আর দুর্গের প্রশাসক বুক চিতিয়ে তুর্কদের প্রতিহত এবং রক্ষা করছে, তাদের খুব দ্রুত ডেকে আনবেন।’ পাফালাগোনিয়া এবং কাপাড্ডোসিয়ার মত অঞ্চলগুলিতে ন্যুনতম সুরক্ষা বলয় অটুট রেখে বাকি সৈন্য এবং যতটা পারা যায় নিরোগ মানুষকে জোগাড় করে কন্সট্যান্টিনোপলে হাজির হওয়ার জন্যে সম্রাটের নির্দেশ জারি হয়’ (৮)। এশিয়া মাইনরের অন্যান্য অঞ্চলের আমলারা, যারা তাদের অঞ্চলে তুর্কিদের বিরুদ্ধে এলাকা সামলাচ্ছিলেন তাদেরও বলা হল নরমানদের আক্রমনের বিরুদ্ধে বড় সেনাবাহিনী নিয়ে লড়াই করতে যেতে সম্রাট মনস্থ করেছেন, যথসম্ভব বড় বাহিনী নিয়ে তারা সম্রাটের সঙ্গে যোগ দিতে (৯)। যুদ্ধাভিযানের জন্যে বিপুল সংখ্যার বাহিনী জোগাড় করলেন নতুন ক্ষমতায় আসা সম্রাট। এই ঘটনা থেকে প্রমান হয় তখনও বিভিন্ন প্রদেশে বাইজান্টাইন শাসকদের নিয়ন্ত্রণ খুবই দৃঢ় ছিল।
এই সময়ে তুর্কিরা যে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সামনে সামগ্রিকভাবে প্রধান সমস্যা হিসেবে গণ্য হচ্ছিল, সেরকম কোনও ইঙ্গিত আমরা পাচ্ছি না। অবশ্যই কিছু কিছু দল চোরাগোপ্তাভাবে বিভিন্ন কমজোর বা যারা খুব বেশি পাল্টা লড়াই দিতে পারত না, সে সব প্রদেশ যেমন কাইজিকোসের মত এলাকা লুঠ করছিল (১০)। এই সব স্বার্থান্বেষী দলকে সঙ্গে নিতে সম্রাট আগ্রহী ছিলেন না। উদাহরণস্বরূপ জনৈক অভিজাত একদল তুর্ককে নিয়ে আলেক্সিওস এবং আইজাকের বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দিতে এলে তিনি তাদের সেনা দলে যোগ দিতে দেন নি, ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন (১১)।
আরও একটা ঘটনা আমরা উল্লেখ করে দেখাব, আলেক্সিওসের ক্ষমতা দখলের আগে বাইজান্টাইনের পূর্বাঞ্চল ধসে পড়েছিল, এই তৈরি ধারণার ভিত্তি নেই। এশিয়া মাইনের দক্ষিণ উপকূলের ব্যবসাকেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর ঘাঁটি আট্টালিয়া শহরটির ১০৮০-র প্রথম দিকে মাহাত্ম্য বাড়িয়ে আর্চবিশপস্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। শহরের সম্মানবৃদ্ধি থেকে প্রমান হয় শহরটা শুধু যে সবলভাবে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যেরই অংশ ছিল তাই নয়, শহরটা বিকশিত হচ্ছিল এবং গুরুত্বও অর্জন করছিল (১২)। তাছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁজ থেকে আমরা দেখি যে আলেক্সিওসের ক্ষমতায় আসার ঠিক আগের এবং তার পরের সময়েও এশিয়া মাইনরের নানান প্রদেশ এবং শহরে বিশপ, বিচারক এবং আমলাদের উপস্থিতির যে প্রমান মিলেছে, তার থেকে বলা যায় তুর্কিদের চোরাগোপ্তা আক্রমনে প্রাদেশিক সরকারগুলোর যতটা ক্ষতির বয়ান ইতিহাসে দেওয়া হয়েছে, ততটা ঘটে নি (১৩)।
আলেক্সিওস ক্ষমতায় আসার আগেই সাম্রাজ্যর পূর্বাঞ্চলের অবস্থা লক্ষ্যণীয়ভাবে উন্নতি ঘটেছে। ১০৮০-র দশকের প্রথম পাদেই এশিয়া মাইনর অঞ্চলে স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। আলেক্সিওসের পক্ষে এটা একটা প্রধান অর্জনও বটে বিশেষ করে যখন নানান সমস্যায় আলেক্সিওসের প্রথম দিককার রাজত্ব জর্জরিত হচ্ছিল। ১০৮১-তে তিনি যখন বিদ্রোহী বাহিনী নিয়ে শহরে প্রবেশ করেন, সেই বাহিনীর আনুগত্য নিয়ে বেশ সমস্যা দেখা দেয়, কয়েকজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুগত তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। তাছাড়া তার স্ত্রী আগামী দিনের রাজ্ঞী আইরিনকে তার পাশে দেখে আইরিনের পরিবারের পক্ষ থেকে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়, এই পরিবার চাইছিল না আলেক্সিওস নিজেকে স্বাধীন সম্রাট হিসেবে উপস্থাপন করুন। তাদের ভয়ের হুমকি কিছুটা কাজ দিল, আইরিন ক্ষমতায় আরোহন করলেন এক সপ্তাহ পরে (১৪)। এর সঙ্গে আরও সমস্যা হল নতুন সম্রাটের রাজধানী দখল নেওয়া বাহিনী যেভাবে রাজধানী দাপিয়ে বেড়িয়েছে তার বিরুদ্ধে কন্সট্যান্টিনোপলের প্রখ্যাত উচপদস্থ ক্লারজিরা প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং প্রায়শ্চিত্ত করার দাবি জানাচ্ছিল (১৫)। ১০৮০-র দশকে আমরা দেখেছি বাইজান্টিয়ামের পশ্চিমাঞ্চলটা দুর্যোগের মুখে পড়েছিল নরমানেরা বড়কর এপিরিয়াস আক্রমনের পরিকল্পনা করায় এবং উত্তরের বল্কানে পেচেনেগেরাও আক্রমন নামিয়ে আনায়।
এশিয়া মাইনরের ক্ষেত্রে সম্রাট তুর্কদের নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। বরং তার আগের দশকে বাইজান্টাইন অভিজাতরা যেভাবে বিদ্রোহের পর বিদ্রোহের ঝড় নামিয়ে আনছিল সম্রাটের বিরুদ্ধে, তার প্রভাব নতুন সময় কী হবে, সেটা সম্রাটকে অনেক বেশি ভাবিয়ে তুলছিল। পূর্বের প্রদেশগুলো বাইজান্টিয়ানের বড় ভূস্বামীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল; এবং মানজিকার্টের যুদ্ধের পরে এই অঞ্চল বিদ্রোহের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে থাকে। নতুন সম্রাটের চেষ্টা ছিল, তিনি যখন কন্সট্যান্টিনোপল থেকে নরমান বা পেচেনেগেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দূরে থাকবেন, তখন যেন সাম্রাজ্য কেন্দ্রে নতুন করে বিদ্রোহ প্রবণতা ঘনিয়ে না ওঠে। সিংহাসনে আসীন হওয়ার প্রথম সপ্তাহেই আলেক্সিওস পূর্বাঞ্চলের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন। আলেক্সিয়াদ সূত্রে পাচ্ছি, তিনি বিথিনিয়ায় বাহিনী পাঠান তুর্কিদের দূর করে দেওয়ার জন্যে এবং তিনি বাহিনীকে নির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে বলেন কীভাবে জলে আওয়াজ না করে বৈঠা বাইতে হবে এবং বিভিন্ন পাহাড়ি গলিঘুঁজিতে শত্রু লুকিয়ে থাকলে তাদের কীভাবে আক্রমন করতে হবে (১৬)।
অঞ্চলে স্থায়িত্বের জন্যে আলেক্সিওস এমন একজন মানুষের দ্বারস্থ হলেন যার সঙ্গে তিনি এর আগে কাজ করেছেন। আলেক্সিওস বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অভিজাতদের ওপর সামরিক নির্ভরতার বিষয়ে মোটেই বিশ্বাস করতেন না। তিনি নিজেই তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন — তাকে যখন এই ধরণের এক সামরিক দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তিনিই সাম্রাজ্যের বাহিনীকে উল্টোমুখে ঘুরিয়ে রাজধানীর দিকে অভিযান চালিত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। আলেক্সিওস অন্যধরণের পরিচয়ওয়ালা এক মানুষের সঙ্গে জোট করতে পরিকল্পনা ছকলেন। তাঁর নাম সুলেইমান। তুর্কি সর্দার। সুলেইমান ১০৭০-এ এশিয়া মাইনরে এসেছিলেন কাজের সুযোগ আর বরাত খোলার লক্ষ্য নিয়ে। খুব দ্রুত তিনি দুটোই পেয়ে গেলেন। কন্সট্যানিটোপল তাকে বেশ কয়েকবার কাজে লাগাল বিদ্রোহী অভিজাত দমনে এবং প্রত্যেকবারই তিনি উপযুক্তভাবে পুরষ্কৃত হলেন (১৭)। আলেক্সিওস তার সঙ্গে প্রথম কাজ করে, সিংহাসনে আরোহনের আগে। পশ্চিম বল্কানে একটি বিদ্রোহ দমনের কাজে সুলেইমান তাকে সেনা দিয়ে সাহায্য করেন। তার অধীনস্থ তুর্কি বাহিনী আনুগত্য, সাহস এবং অত্যান্ত কার্যকরী প্রমাণিত হয় এবং সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এমন কী বিদ্রোহী নেতাদের তারা গ্রেফতারও করে (১৮)। (চলবে)