The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
পূর্বদেশে স্থিতিশীলতা
সুলেইমানের হাতে নিকাইয়া শহরের প্রশাসন তুলে দেওয়ার ঘটনা সাম্রাজ্যে স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। তবে শহর হাতবদলের নীতি সাম্রাজ্যের পক্ষে খুব একটা সমস্যা খাড়া করে নি। সমস্যা তৈরি হল ১০৯০-এর দশকে সুলেইমানের মৃত্যু এবং তার উত্তরাধিকারী আবু কাশেম অন্য ধরণের চরিত্রের মানুষ প্রমানিত হওয়ায়। ফলে কবে এবং কীভাবে নিকাইয়া তুর্কিদের কবলে গেল এই চর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সম্রাটের সম্মান অটুট রাখতে। তবুও মাথায় রাখা দরকার, নিকাইয়ার দখল হারানোর হাহাকার আমরা লক্ষ্য করি আলেক্সিওস যাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিলেন যেই আলেক্সিয়াদে, যেখানে বারবার বলা হয়েছে আলেক্সিওস ক্ষমতায় আসার আগেই সমগ্র এশিয়া মাইনর সাম্রাজ্যের হাত ছাড়া হয়েছিল।
সত্যের ওপর ঘোমটা টানার উদ্যম সফল হয়েছিল, কারন একাদশ এবং দ্বাদশ শতকে বাইজান্টিয়ামকে ঘিরেই ইতিহাস লেখা হয়েছে। দুটো ব্যতিক্রমী সাহিত্য আলেক্সিওসের ক্ষমতায় আসার শেষের সময়ে অথবা পুত্র দ্বিতীয় জনের ক্ষমতায় আসার পরের সময়ে লেখা হয়েছে (৩৩)। আলেক্সিওসের প্রয়াণের পরেও তাঁকে নিয়ে লেখালিখি করা সমস্যার বিষয় ছিল, এবং সময় প্রমান ঐতিহাসিকেরা সে চেষ্টা করেন নি। এর একটা বড় কারন হল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আলেক্সিওসের পরিবার সম্রাটের সম্মান আর ভাবমূর্তি রক্ষার কাজে তীব্রভাবে সক্রিয় থেকেছে এবং সে সময়ের লেখালিখির ওপরে নজরদারি চালিয়েছে (৩৪)।
তবুও নিকাইয়া নিয়ে আলেক্সিওসের তৎকালীন ভূমিকার ওপরে পুরোপুরি পর্দা ফেলা যায় নি, বিশেষ করে তথ্য সন্ধানী পশ্চিমিদের লেখালিখি থেকে সে সময়ের একটা ছবি উঠে আসে। পঞ্জিকাকার আচেনের এলবার্ট জানতেন নিকাইয়া আলেক্সিওসের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, যদিও তিনি এই বিষয়টা খুব বিশদে জানতেন না। তার লেখাপত্র সূত্রে আমরা দেখছি, তিনি মনে করতেন আলেক্সিওসকে তুর্কিরা ঠকিয়েছিল (৩৫)। অবার এক্কেহার্ড বলছেন সম্রাট শহরটা তুর্কিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তিনি বিতশ্রদ্ধ হয়ে এলেক্সিওসের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলে বলছেন, সম্রাট তীব্র দুষ্কর্ম করেছেন, খ্রিষ্ট বিশ্বের অলঙ্কার এই শহর হাতবদল করেছেন। তবে এক্কেহার্ড সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা বুঝতে চরম ব্যর্থ হয়েছেন — তিনি মনে করতেন ১০৯৭-এর পরের সময়ে আলেক্সিওস নিকাইয়া শহরের হাত বদল করেন, কিন্তু বাস্তব হল সম্রাট এই শহরটি তুর্কিদের হাতে তুলে দেন ১০৮১-তেই (৩৬)।
সমস্যা শুরু কিন্তু নিকাইয়াতে হয় নি, অথবা এশিয়া মাইনরের পশ্চিম প্রান্তেও ঘটে নি, প্রাথমিক ধাক্কার সূত্রপাত হয়েছিল আরও পূর্বপ্রান্তে এন্টিওক অঞ্চল ঘিরে। এই ঘটনার প্রভাব সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেয়। নিকাইয়ার মতই এন্টিওক বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের পুর্বপ্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ রণনৈতিক অবস্থানের শহর। এর সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি শহরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অসামান্য ছিল। তার সামরিক অবস্থান আর রাজনৈতিক সম্মান এতটাই আকাশ ছোঁয়া যে এই শহরের চার্চ নিয়ন্ত্রণ করতেন প্যাট্রিয়ার্ক পদমর্যাদার পুরোহিত এবং এই শহরের প্রশাসক ছিলেন সাম্রাজ্যের উচ্চকোটির পদাধিকারী আমলা (৩৭)। নিকাইয়ার মত এন্টিওক শহর দেখাশোনার ভার দেওয়া হত সাধারণত সম্রাট অনুগত সামরিক আমলার ওপর, ধরে নেওয়া হত, তিনি আলেক্সিওসের ব্যস্ততার ফায়দা উঠিয়ে বিদ্রোহ সংগঠিত করার রাস্তায় হাঁটবেন না। এই পদে নিযোগ করা হল পূর্ব সীমান্তে বারবার নিজেকে প্রমান করা সেনানায়ক ফিলারেটোস ব্রাক্ষাহিমোসকে। সমস্যা হল অনেকের কাছেই ফিলারেটোস মানে একজন লক্ষহীন এবং সমস্যাজনক চরিত্রের প্রশাসক। তাঁর চরিত্রের সংবাদ রাখা অনামা বাইজান্টাইন ঐতিহাসিক লিখলেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি, কিন্তু সমস্যাসঙ্কুল মানুষ, তিনি কারোর নির্দেশই পরোয়া করেন না (৩৮)।
সাম্রাজ্য শুরুর সময় সম্রাট, ফিলারেটোসকে হাতে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তার কাজ শুরুর সময়ে তাকে লম্বাচওড়া উপাধি আর তাঁর পদের উপযুক্ত দায়িত্ব দিয়ে (৩৯)। কিন্তু ফিলারেটোস শুধুই সম্রাটের তোয়াজে পথ ভুলে অন্য পথ ধরেন নি, তিনি মুসলমান বিশ্ব থেকেও শিবির পাল্টানোর সদর্থক বার্তা পাচ্ছিলেন। পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূসম্পত্তি নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুর্কি আর ফিলারেটোসের মধ্যে সমঝোতা হয়ে যায় সম্রাটকে অন্ধকারে রেখেই। ফিলারেটোস ১০৮৪ নাগাদ বাইজান্টিয়াম কর্তৃত্ব এবং খ্রিষ্টিয় বিশ্বাস থেকে থেকে সরে গিয়ে ‘তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রথা মেনে সুন্নত করানোরও প্রস্তাব দেন। তার ছেলে বাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তিনি কারোর সুবচনে কান দেওয়ার মানুষ ছিলেন না (৪০)’। অন্য এক লেখক আরও আরও স্পষ্টভাবে তাঁর ঘেন্না প্রকাশ করে লিখছেন, ‘ফিলারেটোস অপবিত্র এবং দুষ্ট প্রকৃতির প্রধান প্রশাসক, তিনি শয়তানের পুত্র… খ্রিষ্টবাদের অন্যতম শত্রু… যার অন্তরে রাক্ষসী এবং দানবীয় চরিত্র লুকিয়ে আছে… খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কররেছেন কারন তিনি ওপরে ওপরে খ্রিষ্ট বিশ্বাসী (৪১)।’
ফিলারেটোসের শিবির পালটানো আলেক্সিওসের কাছে দুঃস্বপ্নের থেকেও বেশি কিছু ছিল। ফিলারেটোস যে বিনা প্রতিবাদে খলিফা আর সুলতানের কর্তৃত্ব স্বীকার করবেন, এই ভাবনাই আতঙ্কের ছিল, তিনি খবরটা শুরুতে বিশ্বাসই করেন নি — সব থেকে আশংকার বিষয় হল মেলিটেনি, এডেসা এবং এন্টিওক ফিলারেটোসের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তিনি যদি সেই সব শহর আর অঞ্চল তুর্কদের হাতে তুলে দেন, সাম্রাজ্যের পক্ষে সেটা বিশাল সংকটের কারন হয়ে দাঁড়াবে, তুর্কিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠোবে। আলেক্সিওস সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে শিবিরত্যাগী সেনানায়কের বদলে নতুন অনুগত প্রশাসকের হাতে সেই সব এলাকা আর শহরের শাসনভার তুলে দিলেন। জনৈক তোরোস অথবা থিওডোর যার দরবারি উপধি কাউরোপালাটিস, ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি সম্রাটের অনুগত সেবক হয়ে এডেসার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলেন (৪২)। শ্বশুর জিব্রাইল মেলিটেনির প্রশাসক নিযুক্ত হলেন (৪৩)। অঞ্চলের প্রাসাদ, দুর্গ এবং অন্যান্য সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্রাটের অনুগত সেনানায়কেরা দখলে নিল (৪৪)।
তবে এন্টিওক দখল করতে এবং শহরের সুরক্ষাজাল তৈরি করতে সুলেইমানের দক্ষতা কাজে লাগাতে হল। একটি সূত্র বলছে তার নেতৃত্বে তুর্কিরা একটি ‘গোপন রাস্তা’ ধরে সবরকম বাধা এড়িয়ে যতদূরসম্ভব জনৈক বাইজান্টাইন পথ নির্দেশকের সাহায্যে ১০৮৫-তে কাউকে জানতে না দিয়ে খুব দ্রুত শহরে ঢুকে পড়ে। তিনি শহরে কোনও রকম বাধা ছাড়াই শহরের দখল নেন, একজন প্রজার গায়েও একটিও আঁচড় পড়ে না। প্রত্যেক অধিবাসীর সঙ্গে উত্তম সম্পর্ক তৈরি করেন – ‘নতুন করে শান্তি স্থাপিত হল, প্রত্যেকেই অক্ষত অবস্থায় নিজের জায়গা ফির পেলেন (৪৫)’। আরবি সূত্রেও সুলেইমানের এন্টিওকের জনগণের প্রতি দয়া দেখানোর উদাহরণ পাচ্ছি (৪৬)।
শান্তিপূর্ণভাবে এন্টিওক দখলের তুলনায় কয়েক বছর পরে আমরা দেখব ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতায় পশ্চিমি নাইটেরা শহর কীভাবে দখল নিচ্ছেন। প্রাকৃতিক এবং মানুষের সৃষ্ট ভয়ঙ্কর নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা এন্টিওক ছিল দুর্ভেদ্য শহর। কিন্তু সুলেইমান শহর দখল করতে শক্তি প্রয়োগ করেন নি। শহরের অধিকাংশ গ্রিকভাষী জনগন তার পক্ষে দাঁড়িয়ে তাকে শহর দখল নিতে সাহায্য করেছে। মাথায় রাখা দরকার আলেক্সিওস বিচক্ষণভাবে ফিলারেটোস শিবির বদলের বদলা নিতে শহরে সেনা পাঠান নি অথবা সুলেইমান যে এন্টিওক দখলে যাচ্ছেন সেই প্রচেষ্টাতেও বাধা দেন নি। এন্টিওক দখল, তুর্কি আর বাইজান্টাইন জোটের আরেকটা সহজ শহর উদ্ধার কাজ ছিল।
পরের দিকে আরবি লেখকেরা সুলেইমানের শহরদখলটি গৌরবময় শব্দে ভরিয়েছেন। এক কবির কবিতা, ‘তুমি যে [সহজ]ভাবে এন্টিওক দখল করেছ তাতে আলেকজান্ডারের পরিশ্রম মুখ লুকোবে/তোমার অশ্ব তার বাহিনীকে পদদলিত করেছে এবং হতমান/পাংশুমুখ কন্যার অসময় গর্ভপাত করেছে (৪৭)’। কিন্তু ঘটনা কবিতার শৈল্পিক প্রকাশ থেকে অনেক বেশি ছিল। কবিতার মাধ্যমে দেখানো চেষ্টা করা হয়েছে যে এন্টিওকের প্রশাসক একজন মুসলমান। শহরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরে সুলেইমান এবং সাথীরা শহরবাসীকে উদ্দেশ্য পরিষ্কার করে বলেন ফিলারেটোস যে স্থানীয় তুর্কি আমীরকে রাজস্ব দিতেন, সেটা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তাকে শাসিয়ে বলা হল সুলতানের বিপক্ষে যাওয়া ভয়ঙ্কর হবে — সুলেইমান বললেন তিনি বাগদাদের সুলতানের অনুগামী। এলাকা সুলতানের এবং তার সুলতানের বশংবদ হওয়া নিয়ে কোনও প্রশ্নই ওঠা উচিৎ না; নিকাইয়া এবং এন্টিওকের প্রশাসনের সুলতানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল না (৪৮)। একই যুক্তিতে সুলেইমান এন্টিওক থেকে আলেপ্পোয় গেলেন ১০৮৫-র গ্রীষ্মে। এই শহর বাইজান্টাইন সেনা এক শতাব্দ আগে ধ্বংস করেছিল। তিনি তুর্কি প্রশাসকের কাছে দাবি করলেন তার হাতে শহরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হোক। এই শহরটাও আলেক্সিওস দখল করতে চেয়েছিলেন (৪৯)। (চলবে)