The First Crusade – The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
বছরের পর বছর যে সব মানুষ আমায় পড়াশোনায় সাহায্য করেছেন, এই বইএর ভূমিকায় অন্তত তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমার বাধ্যতামূলক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ১৯৯৭এর পরের গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া উরসেস্টার কলেজের প্রোভোস্ট এবং সঙ্গী ফেলোদের কৃতজ্ঞতা জানাই; তারা অসীম ঔদার্যে আমার ঐতিহাসিক বায়নাগুলো বারংবার সহ্য করেছেন, সাধ্যমত উত্তর দিয়েছেন; আজ এই বইএর মুখবন্ধ লিখতে বসে প্রত্যেকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি কায়মনোবাক্যে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ জানাই, আমায় স্ট্যানলি জে সিগার ভিজিটিং ফেলো হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্যে। এই ফেলোশিপ গবেষণা আমায় মধ্য যুগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে প্রণোদিত করেছে। হারভার্ডের ফেলোরা আমায় ডাম্বারটন ওকসের ফেলো বানানোর পরের গবেষণার সময়ে অনেক পড়ে পাওয়া সুযোগ লাভ করেছি, সে সময়ে আমার মধ্যযুগ চর্চায় বহু নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। আমি প্রত্যেকের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকলাম। বদলিয়ান লাইব্রেরির কর্মীরা বিশেষ করে লোয়ার রিডিং রুমের এবং ইতিহাস বিভাগের গ্রন্থাগারের মাথা ঠাণ্ডা, সহিষ্ণু, হাজারো প্ররোচনায় রা না কাড়া খোশমেজাজি কর্মীদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। একই কথা বলব অক্সফোর্ড কলেজের সহকর্মী, যাদের মধ্যে লেট এন্টিক এবং বাইজান্টাইন স্টাডিজ বিষয়ের তীব্র মেধাবী মানুষেরাও ছিলেন, তাদের সঙ্গে আমি কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।
অক্সফোর্ডের সহকর্মীদের মধ্যে মার্ক হুইটাও, ক্যাথারিন হোমস, সিরিল এবং মার্লিয়া ম্যাঙ্গো, এলিজাবেথ এবং মাইকেল জেফরি, মার্ক লাক্সটারম্যান এবং জেমস হাওয়ার্ড-জনস্টনকে ধন্যবাদ জানাই একাদশ দ্বাদশ শতক নিয়ে আমার সঙ্গে নিয়মিত আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্যে। বিশেষ করে কৃতজ্ঞ থাকব, কেম্ব্রিজের আমার সেই প্রথম বিশেষ ক্লাসের শিক্ষক জোনাথন শেফার্ডের কাছে। তিনি বাইজান্টিয়াম জানতে বুঝতে আমায় প্রথম পথ দেখিয়েছেন; আমায় নিরন্তর প্রভাবিত করেছেন। আমি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরস্তরের বহু সহপাঠির কাছে আজও কৃতজ্ঞ। কন্সট্যান্টিপোল, আলেক্সিওজ এবং ক্রুসেড আলোচনায় তাদের বহুদিন মাঝরাত পর্যন্ত জ্বালিয়েছি। আমি যদি তাদের এবং অন্যান্যদের অসামান্য উপদেশ না মেনে থাকি, তার জন্যে আমি তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
ক্যাথেরিন ক্লার্ক অসীম আগ্রহে, উতসাহে আমায় প্রথম ক্রুসেডের কাহিনী শুনিয়েছেন। তার পথ নির্দেশনা ছাড়া এবং ফেলিসিটি ব্রায়ানের সাহায্য ছাড়া আমার পক্ষে এই বই লেখা সম্ভব হত না। হারভার্ড ইউনিভারসিটির বডলি হেডের উইল সালোকিন এবং জয়েস সেল্টার আমায় যার পর নাই সাহায্য করেছেন। ধন্যবাদ জানাই ইয়র্গ হ্যানসজেনের নানান কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বইটিকে নতুন রূপ দেওয়ার জন্যে। চোলে ক্যাম্পবেল যেন দেবদূত, তার স্থৈর্য, নিরন্তর পরামর্শ সারাক্ষণ আমায় উদ্দীপ্ত করেছে বইটিকে নতুন অবয়ব দেওয়ার কাজে। ধন্যবাদ এনথনি হিপ্পিসলে এবং মার্টিন লুবিকাওস্কিকে বই-এর উপযোগী মানচিত্র তৈরি করে দেওয়ার জন্যে। আমার পিতামাতার কাছে তো সেই ছোটবেলা থেকেই কৃতজ্ঞ হয়ে আছি, নতুন কথা আর কীই বা বলব।
কৃতজ্ঞচিত্ত স্ত্রী জেসিকার কাছে, যেদিন প্রথম যাযাবর, মধ্যপ্রাচ্য, বাইজান্টিয়ামের গল্প শুনছি, সেদিন সেও সেগুলো প্রথম শোনে, আমি সাত সকালে যা শুনেছি, সেই পাঠ ঝালিয়ে নিতে তাকে সেই গল্প বারবার হুবহু বলেছি, জ্বালিয়েছি, আজও সেই একইভাবে জ্বালিয়ে চলেছি। আমার খুঁজে পাওয়া স্বপ্ন সে মন দিয়ে শুনেছে, ক্লাউন্সে প্রথম ক্যাপাচিনো চুমুক দিতে দিতেই সে আমায় এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছে; বইটি তাকেই উৎসর্গ করলাম।
পিটার ফ্রাঙ্কোপ্যান
লেখকের ভাষ্য
গ্রিক নামগুলি অনুবাদ করার সময় আমি কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম মানিনি, এবং হয়ত সব সময় প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি নামগুলো অনুসরণ না করায় বিষয়টা একটু কর্কশ শোনাতে পারে। আমি এবিষয়ে নিজস্ব বিচারে অগ্রসর হয়েছি আশাকরি পাঠক এই ব্যবস্থায় অসুবিধেয় পড়বেন না। যেমন আমি কন্সট্যান্টিনোপল, নিকাইয়া, কাপাডোসিয়া ব্যবহার করেছি ডাইরাক্ষিয়ন, থেসালোনিকি এবং নিকোমেডিয়াও রেখেছি। ব্যক্তি নামের ক্ষেত্রে আমি ব্যবহার করেছি জর্জ, আইজাক এবং কন্সট্যান্টাইন আর আলেক্সিওজ, নিকেফোরোস, পালাইওলোগোস এবং কোমনিনোস। পশ্চিমি নামের ক্ষেত্রে আধুনিক নাম গিলেরমুসের জায়গায় উইলিয়াম, রবার্টাসের জায়গায় রবার্ট ব্যবহার করেছি। তুর্কি নামের ক্ষেত্রে এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম অনুসরণ করেছি।
যেখানে সম্ভব হয়েছে মূল সাহিত্যের ভাষা তুলে না দিয়ে তার ইংরেজি অনুবাদ দিয়েছি। সব জায়গায় আমি অনুবাদ করি নি, বিশেষ করে বহু উদ্ধৃতির আরও ভাল আধুনিক অনুবাদের সূত্র থাকায়। আধুনিক অনুবাদের নির্দিষ্ট সূত্রগুলোকে একটা নির্দিষ্ট সাম্যে বেঁধে রাখার চেষ্টা করেছি আমার মত করে সংস্কার করে নিয়ে। নাম ব্যবহারে স্বাধীনতা আমি আশাকরি বইটির মূল বিষয়ে আনন্দ গ্রহণ বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
ভূমিকা
১০৯৫-এর ২৭ নভেম্বর মধ্য-ফ্রান্সের ক্লেরমঁ শহরে পোপ দ্বিতীয় আরবান, নিজের ধর্মীয় ক্ষমতা আরও স্থায়ী আর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি যে এক ধাক্কায় পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার মত ঘটনা হয়ে উঠবে, সেই তথ্যটা তিনি সে দিন আন্দাজ করতে পেরেছিলেন কীনা আজ বলা মুশকিল। ক্লেরমঁ শহরের এক সপ্তাহের চার্চ কাউন্সিলের বৈঠক পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা থাকবে। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সের ১২ জন আর্চবিশপ, ৮০ জন বিশপ, এবং প্রবীণ পুরোহিতমণ্ডলীর বড় একটা অংশ। পোপ দ্বিতীয় আরবান সেই বার্ষিক বৈঠক সিনোডের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। চার্চের বিপুল ক্ষমতাশালী আমলাতন্ত্রকে পোপ স্পষ্ট জানালেন তিনি ঠিক করেছেন খ্রিষ্ট ধর্মের অনুগামীদের এক বিশেষ জনসভা ডেকে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মনের কথা জানাবেন। তবে তিনি এই বক্তব্য ক্লেরমঁর চার্চের বদ্ধ ঘরের পালপিটে উপস্থিত থাকার যোগ্যতার হাতে গোণা ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের জন্যে দেবেন না, তিনি বক্তবের অভিঘাত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। জনগণের মনে সুগভীর অভিঘাত তৈরি করার জন্যে পোপ বেছে নিলেন তার বক্তব্য উপস্থাপন করার রাস্তা – প্রকাশ্য জনসভা আয়োজন। চার্চের আমলাতন্ত্রকে তিনি বোঝালেন কেন তিনি চাইছেন জনসাধারণ বিশাল মাঠে জড়ো হয়ে তার বক্তৃতা শুনুক।
বক্তৃতা দেওয়ার ভূখণ্ডের পরিবেশ মন মুগ্ধ করার মত অসামান্য সুন্দর। ঘুমিয়ে থাকা এক সার আগ্নেয়গিরির হৃদিঅক্ষের সব থেকে বড় লাভা ছাতা, Puy-de-Dôme সাক্ষী রেখে, ৫ মাইল দূরে বক্তৃতার মঞ্চ নির্বাচন করলেন পোপ দ্বিতীয় আরবান। মাঠে জড়ো হওয়া উৎসুক খ্রিষ্ট ধর্মবিশ্বাসী জনগণের হাজারে হাজারে কালো মাথাকে লক্ষ্য করে তিনি শুরু করলেন বিশ্বের কাঠামো বদলে দেওয়া পরিকল্পনা শোনানোর বক্তৃতার মুখড়া, ‘প্রিয় ভ্রাতারা, আমি পোপ আরবান, তোমাদের প্রধান যাজক, বিশ্ব পরিচালক সর্বশক্তিমানের অনুমতিসহকারে, সর্বশক্তিমানের দূত হিসেবে, সর্বশক্তিমানের সেবক হিসেবে, তোমাদের সামনে জরুরি একটা বিষয় উপস্থাপন করতে এসেছি (১)’।
বক্তৃতার প্রথমেই পোপ উপস্থিত জনগণের সামনে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করলেন ভীষণ সব অস্ত্র শস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে হাজার মাইল দূরের পবিত্র জেরুজালেম মুক্ত করতে অভিযান চালানোর উদ্দীপনাময় প্রস্তাব। বক্তৃতার উদ্দেশ্য দুটো – প্রথমত জনগণনকে পূর্ব দেশে খ্রিষ্টানদের ওপর অত্যাচার চালানোর তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধযাত্রায় উত্তেজিত করা এবং দ্বিতীয়ত, তাদের মনে অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তুলে যুদ্ধ করার পবিত্র ক্রোধে প্ররোচনা দেওয়া। পোপের আবেগময়ী ধর্মীয় বক্তৃতার ধাক্কা লাগল ধর্মপ্রাণ জনগণের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে। এশিয়া-ইওরোপের সম্পর্ক চিরতরে বদলে দেওয়ার এই ব্যতিক্রমী ঘটনার মাত্র চার বছরের মধ্যে পশ্চিমি দেশগুলোর নাইটেরা সর্বশক্তিমানের নাম নিয়ে যিশু খ্রিষ্টকে ক্রুসে চড়ানো পবিত্র শহর, বিধর্মীদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করার উত্তুঙ্গ মানসিকতা ছড়িয়ে দেবেন পশ্চিম ইওরোপের জনপদে জনপদে। ক্লেরমঁ শহরে পোপ আরবানের বক্তৃতার শব্দব্রহ্মের প্রভাবে পবিত্র খ্রিষ্ট শহর মুক্ত করতে রওনা হতে উদ্দীপ্ত হবেন লাখো লাখো সাধারণ ধর্মভীরু ইওরোপিয় জনগণ। ইওরোপের ভূখণ্ড পেরিয়ে, বছরের পর বছর বাড়িঘরদোর ছেড়ে হাজারো খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী তীর্থ শহর জেরুজালেমের সুবিশাল প্রাচীরের বাইরে জড়ো হলেন পবিত্র শহর দখলের প্রণোদনায়।
জনসভায় উপস্থিত মানুষদের পোপ বললেন, ‘আমরা চাই তোমরা জান, কোন দুঃখজনক কারন আমাদের এই জমিতে টেনে এনেছে এবং তোমরা যারা ধর্মে বিশ্বাসী, তাদের সামনে কোন জরুরি কারনে আমরা উপস্থিত হয়েছি।’ তিনি বললেন জেরুজালেম এবং কনস্ট্যান্টিলোপল শহর থেকে বেশ কিছু উত্তেজক সংবাদ তার কাছে নিয়মিত আসতে শুরু করেছে — মুসলমানেরা, ‘যারা বিদেশি এবং যাদের ঈশ্বর পরিত্যাগ করেছেন, খ্রিষ্টদের জমি দখল করেছে, হত্যা করছে স্থানীয় মানুষদের লুঠ করছে’। বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে; অন্যরা বন্দী হয়ে তাদের অধীনে রয়েছে(২)। (চলবে)