The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
পূর্বদেশে স্থিতিশীলতা
এশিয়া মাইনরের শহরগুলো বিশেষ করে এটিওক দখলের উদ্দেশ্যে সুলতানকে আবুল কাশেমের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হল। উল্লেখ্য সুলতান এই অঞ্চলের শহরগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেই অঞ্চলের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী প্রজা তাঁকে হার্দিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। এই অঞ্চলে সুলতানের সদর্থক কাজকর্মের ফলে তার দ্রুত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। অঞ্চলের স্থায়িত্ব আর স্থানীয় তুর্কি সর্দারদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার ক্ষেত্রে এই জনপ্রিয়তা কাজে লেগেছে। শেষ অবদি সুলতানের ককেসাস যাত্রা শেষ হল বাধাহীনভাবে। পিতৃত্বসুলভ ব্যক্তিত্বে নিয়ে ককেসাস যাত্রার ফলে প্রজাদের মন থেকে বাগদাদের শাসকেরা যে তাদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে, সে ভয় মোটামুটি স্থায়ীভাবে দূর হল (৬২)। স্থানীয় খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী জনগণের প্রতি মালিক শাহ যে সহনশীল ছিলেন সেটা স্থানীয় মানুষেরা জানতেন। ১০৭৪-এর শুরুর দিকে সলতনতে পিতার স্থালাভিষিক্ত হওয়ার পর কন্সট্যান্টিনোপলে একটি দৌত্য দল পাঠিয়ে খ্রিষ্টিয় শাস্ত্র, বিশ্বাস এবং আচার আচরণ সম্বন্ধে বহু তথ্য জোগাড় করেন (৬৩)। ১০৮৬-৮৭-র অভিযান সম্বন্ধে এক সমসাময়িক সমীক্ষক মন্তব্য করেছেন, তিনি প্রজাদের ওপর সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্ব চাপাচ্ছেন, শুধুমাত্র খ্রিষ্টিয় জনগণের ওপরে নয় (৬৪); তিনি এডেসা এবং মেলিটেনি দখল করলেও সেখানে সাম্রাজ্যের প্রশাসক বসান নি, অথবা সম্রাটের হয়ে যে আমলা সেখানে প্রশাসন চালাচ্ছেন তাকে বহিষ্কার করেন নি (৬৫)।
সুলতান বাহিনী পাঠিয়ে যে সব এলাকা দখল করতে পারে নি, সে সব এলাকা দখল নিতে সম্রাট ১০৮৬-৮৭তে অভিযানে বেরোবেন। আক্রমণ শুরু করলেন নিকাইয়ায়, শেষ করলেন আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আক্রমণে। আন্না কোমনেনে লিখছেন, ‘আক্রমন থামানো হল, কিন্তু আবুল কাশেমকে শান্তি চুক্তিতে উপনীত হতে দেওয়া হল না (৬৬)।’ কাইজিকোস এবং এপোলোনিওস এবং পশ্চিম এশিয়া মাইনরের যে সব এলাকা তুর্কি সর্দারেরা নজরে রেখেছিল, সাম্রাজ্যের বাহিনীকে সেগুলি উদ্ধার করতে পাঠানো হল (৬৭)। কাইজিকোসের পতন হয়েছিল আলেক্সিওসের বিদ্রোহের সময়, তিনি সেটিকে সাম্রাজ্যের অধীনে আনেন ১০৮৬-তে এবং সেনানায়ক এবং সম্রাটের ঘনিষ্ঠতম মানুষ কন্সট্যান্টিন হাম্বারতোপপুলাসের হাতে ছেড়ে দেওয়া হল যতদিন না আবার তাকে পেচেনেগেদের বিরুদ্ধে ডেকে না নেওয়া হবে (৬৮)।
বেশ কিছু তুর্কি সর্দারকে উপঢৌকনের প্রলোভনে এবং খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার শর্তে সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসা গেল (৬৯)। এই ধর্মান্তরকরণ কন্সট্যান্টিনোপলের পুরোহিতেরা সমর্থন করলেন এবং আলেক্সিওস যে ধর্মের প্রতি প্রণোদনা দেখাচ্ছেন এবং এই ধর্ম বিশ্বাস বিস্তারে বিপুল ভূমিকা পেশ করছেন, সে বিষয়ে তাঁরা তাঁর প্রশংসা করলেন (৭০)। সম্রাট এই বাহবাটা নিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি জানেন তিনি সফল হয়েছেন ধর্মীয় উদ্দীপনা নয়, বরং এই কাজটা করেছেন ধ্রুপদী দৌত্য অবলম্বন করে – গুরুত্বপূর্ণ তুর্কি নেতাদের সাম্রাজ্যের উপাধি আর আর্থিক উপঢৌকন দেওয়ার বদলে সম্রাট বুঝিয়ে দিলেন বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের সঙ্গে থাকার উপযোগিতার যৌক্তিকতা প্রমান করে। শহর এবং অঞ্চল উদ্ধারের জন্যে তাদের কিছুটা দাম দিতে হলেও সেটা খুব সমস্যা খাড়া করল না।
৮ জানুয়ারি ১০৮৮ জনৈক উচ্চচপদস্থ এবং প্রবীণ পুরোহিত সম্রাট এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতার উপস্থিতিতে ফিস্ট অব এপিফানি উপলক্ষ্যে যে বক্তৃতা দিলেন সেখানে পূর্বের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা হাল্কাভাবে ছুঁয়ে গেলেন। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলে পেচেনেগদের তীব্র আক্রমনের তুলনায় পূর্বাঞ্চলের অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল হল এবং তারা খুব একটা বড় মাথাব্যথার কারন হয়ে উঠছিল না। স্তেপের যাযাবরদের হুমকির উদ্যত ফনা কেটে দিয়ে আলেক্সিওস যেভাবে তাদের শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে বাধ্য করলেন, সে বিষয়ে সম্রাটকে সাধুবাদ জানালেও ওরহিডের থিওফাইলাক্ট বক্তৃতায় কিন্তু এশিয়া মাইনর নিয়ে কোনও বক্তব্যই উত্থাপন করলেন না। পুরোহিত বললেন, ভাগ্য ভাল আলেক্সিওস তুর্কি এবং সব থেকে বড় কথা সুলতানের বিরুদ্ধে মধুর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। সাম্রাজ্য এইভাবে মালিক শাহের সম্মান জানিয়েছে এবং যখনই মালিক শাহের নাম উঠে এসেছে, তখনই তিনি তার মদ্য পাত্র উর্ধ্বে তুলে ধরে তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়েছেন। থিওফাইলাক্ট বললেন সম্রাটের সাহস এবং শৌর্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে (৭১)।
১০৮৮তে সাম্রাজ্য, সম্রাট সম্বন্ধে যে উৎসাহী বর্ণনা আমরা দেখি, সেটা ১০৮১তে আন্না কোমনেনের সাম্রাজ্যের দুর্দশা সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বানীর সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। অথচ আন্নার দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকেরা আজও অনুসরণ করেন। উপকূলীয় হুমকিগুলির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপের দাবি জানালেও পূর্বের প্রদেশগুলো ধ্বংস হওয়ার বদলে সাম্রাজ্যকে স্থায়িত্ব দেওয়ার ভূমিকা পালন করছিল। সমস্যার সমাধান বাইজান্টাইনেরা করে ফেলেছিল — এবং অবস্থা এমনই ছিল যে পোপকে আবেদন করে বিদেশ থেকে সাহায্য চাওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। এবং ১০৮০-র দশকের শেষের দিকে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা এমন যে তার ক্রুসেড বাহিনীরো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। (চলবে)