The First Crusade — The Call from the East : Peter Frankopan, translate Biswendu Nanda
তিন
এশিয়া মাইনরের পতন
শহরের নিরাপত্তা বিধান করতে পুরোপুরি ছমাস কেটে গেল। ইতিমধ্যে আবুল কাশেমের আক্রমনে যারা নিকোমিডিয়ায় পালিয়ে এসে গুহায় আর মাটির তলায় গর্ত করে থাকছিল তাদের সেগুলি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হল। কিন্তু তাদের এই পুনর্বাসন প্রস্তাবে নিমরাজি হওয়া থেকে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল পলাতকেরাও একে বাইজান্টাইনের স্থায়ী বিজয় হিসেবে দেখতে রাজি ছিল না (২৫)।
নিকোমিডিয়া উদ্ধার হলেও পশ্চিম উপকূলের এগিয়ান দ্বীপগুলির অবস্থা খারাপ হল। এপ্রসঙ্গে আলেক্সিয়াদ যে বর্ণনা দিয়েছে, সেটা স্রেফ অবিশ্বাস্য। সন্ত ক্রিস্তোডুলাসের বেশ কিছু কাগজপত্রে আমরা আন্দাজ করতে পারি তুর্কিরা কী পরিমান বাড়তে থাকা সন্ত্রাস পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। তিনি উচ্চপদের এবং উচ্চস্তরে বহু বন্ধুওয়ালা চুম্বকীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আলেক্সিওসের মা আন্না ডালাসিনে তাঁকে আগিয়ান দ্বীপ কোস, লেরোস এবং লিপসসে রাজস্ববিহীন জমি দিয়েছিলেন। ক্রিস্তোডুলাসের উচ্চাশা ছিল লিপসসে বেশ কিছু মঠ তৈরি করবেন। আন্নার সমর্থন পাওয়া গেলে সম্রাটকে রাজি করিয়ে তার ব্যক্তিগত অনুমোদনক্রমে সন্ত জনের নামে পাটমোস দ্বীপে ১০৮৮-তে মঠ তৈরি করাবেন (২৬)।
১০৯০-এ শুরুতে ক্রিস্তোডুলাস এবং দ্বীপের অন্যান্য সন্তদের ভূমি দান এবং তার সঙ্গে রাজস্ব ছাড় পাওয়ার চেষ্টা দূরস্থান তার সে অঞ্চলে টিকে থাকাই সমস্যার হচ্ছিল। তুর্কি জলদস্যু আর ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নিয়মিত আক্রমনে তারা থাকার জায়গাটা সুরক্ষিত করার উদ্যম নিলেন। উল্লিখিত তিনটি দ্বীপে বাসিন্দাদের বাঁচাতে ছোট প্রাসাদ বানানোর চেষ্টা শুরু হলে বোঝা যাচ্ছিল ক্রিস্তোডুলাস খুবই কঠিন এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন (২৭)। তুর্কিদের হাতে ধরাপড়ার আশংকায় সন্তরা পালিয়ে গেল। ১০৯২-এ বসন্তে স্বয়ং ক্রিস্তোডুলাস হাল ছেড়েদিলেন এবং তিনি নিজে ইউবোইয়ায় পালিয়ে গেলেন এবং পরের বছর তিনি মারা যাবেন। মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে তৈরি করা তার উইলের ক্রোড়পত্র থেকে আমরা জানতে পারি, পাটমোস ছাড়ারতিনিই শেষ ব্যক্তি ছিলেন না; ‘আগারিনি, জলদস্যু এবং তুর্কিদের’ আক্রমনের প্রাব্ল্যে সেখানে থাকা অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল (২৮)।
আগামী বছরগুলোয় আগিয়ান অথবা এশিয়া মাইনরের পশ্চিম উপকূলের অবস্থার উন্নতি ঘটল না। যদিও আন্না কোমনেনে চাকাকে তাচ্ছিল্য করে তাকে উচ্ছন্নে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করলেন যিনি স্মিরণার সুরক্ষা নিশ্চিত করছেন সম্রাটের অনুকরণে স্যান্ডাল পরিধান করে এবং তিনি বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন তাকে খুব তাড়াতাড়ি এবং যথাযোগ্যভাবেই অবদমিত করা হবে। কিন্তু ঘটনাক্রম অন্য দিকে চলতে শুরু করছিল (২৯)। ১০৯৪-তে ক্রিস্তোডুলাসের প্রয়াণের পরে থিওডোর ক্রাস্তিসিওসকে পাটমোতে সন্ত জনের মঠে কেয়ারটেকার নিয়োগ করা হলেও তিনি পদত্যাগ করলেন। তিনি বলছেন, তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন কারন তাকে যে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কোনও কাজই তিনি পূরণ করতে পারছিলেন না — মঠ দেখাশোনার কাজ তো দূরস্থান, পূর্ব আগিয়ান সাগরে নিরন্তর তুর্কি হামলার জন্যে তার পক্ষে দ্বীপে পৌঁছনোই কষ্টকর হয়ে পড়ছিল (৩০)।
এশিয়া মাইনর সামগ্রিকভাবে পতন ঘটল খুবই দ্রুত এবং লক্ষ্যণীয়ভাবে। পেচেনেগেদের নিরন্তর আক্রমন এবং তাদের হামলার ভয়ে শিঁটিয়ে থাকা পরিবেশের সুযোগ নিল আবুল কাশেম আর চাকার মত স্থানীয় তুর্কি সর্দার। আলেক্সিওসের স্থানীয়ভাবে জোটবাঁধার নীতি গ্রহণের ব্যর্থতাতেই বাইজান্টিয়ামের সাম্প্রতিক সামগ্রিক সমস্যার সূত্রপাত ঘটল। অতীতে আলেক্সিওস তুর্কি সরদারদের সঙ্গে জোট বাঁধতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং বাগদাদের সুলতানের সঙ্গেও কার্যকর চুক্তি সম্পাদনা করেছিলেন, যারা নিজেদের স্বার্থেই সেলজুক বিশ্বের সীমান্ত এলাকার শত্রুদের দমন করছিলেন।
মালিক শাহের সঙ্গে চুক্তি ১০৯১-এর বসন্তকাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল, যতক্ষণনা আলেক্সিওস অভিযোগ করলেন সুলতান যে বাহিনী পাঠাচ্ছেন সেগুলি চাকা নিজের বাহিনীর অংশ করে নিচ্ছে (৩১)। এছাড়াও ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় মালিক শাহ বেশ কিছুটা অস্বস্তিতেও ছিলেন। ১০৯২-এর গ্রীষ্মে তাঁর এক অনুগততম সেনানায়ক বুজানকে এশিয়া মাইনরের ভিতর অঞ্চলে আবুল কাশেমকে শিক্ষা দেওয়ার অভিযানে পাঠালেন। বুজান, নিকাইয়ায় তীব্র আক্রমন করলেও শহরের কঠিন সুরক্ষা ভাঙতে পারেন নি, তাঁকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসতে হয় (৩২)। তবুও সেই বছরের বসন্তে বাগদাদ এবং কন্সট্যান্টিনোপলের মধ্যে দৌত্য যোগাযোগ বজায় ছিল। তারা পরিকল্পনা করছিলেন কীভাবে আবুল কাশেম এবং অঞ্চলের অন্যান্য বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে যৌথভাবে অভিযান করা যায় (৩৩)।
১০৯২তে মালিক শাহের মৃত্যু আলেক্সিওসের পূর্বাঞ্চল নীতিকে বড় ধাক্কা দিয়ে গেল। তার মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে বাগদাদের ক্ষমতার ওপর সুলতানের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিখিল হতে থাকে এবং সুলতানের বিরুদ্ধ প্রতিপক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখতে মালিক শাহ বেশ কিছু প্রবীণ আমলার পদাবনতি ঘটান, এতে বিদ্রোহ আরও পাকিয়ে উঠল (৩৪)। সুলতানের উজির বহুজ্ঞানী নিজামুল মুলকের ওপর বিদ্রোহীদের নজর ছিল, তিনিই বাগদাদের সঙ্গে একাদশ শতকের শেষের দিকে সেলজুকদের সম্পর্ক স্থাপন করার অন্যতম হোতা। ১০৯২-এর শেষের দিকে তাঁকে হত্যা করে একদল পেশাদার এবং গোপন ধর্মান্ধ দল যাদের নাম এসাসিনিস, অনেকে মনে করেন এই হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুলতানের নির্দেশে (৩৫)। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিষাক্ত মাংস খেয়ে মালিক শাহের মৃত্যু হলে তুর্কি বিশ্ব উথালপাথাল হয়ে ওঠে। প্রয়াত সুলতানের শুন্য সিংহাসনে কে বসবেন, সুলতানের ঘনিষ্ঠ কারা সেই প্রশ্নে উথালপাথাল বাগদাদে দুবছর তীব্র টালমাটাল চলল (৩৬)।
বহু পণ্ডিত মনে করেন তুর্কি সামাজ্যের বিপর্যয়ে এশিয়া মাইনরে বাইজান্টাইম সাম্রাজ্যের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার সুযোগ হিসেবে ধরে নিলেন আলেক্সিওস। কিন্তু ঘটল উল্টোটা। বিপন্নতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মালিক শাহের মৃত্যুতে হারাল এক অমূল্য স্থায়ী বন্ধু। সব থেকে বড় সমস্যা হল বাগদাদে ক্ষমতার লড়াই চলতে থাকায় ক্ষমতাশূন্য আনাতোলিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ চলে এক তুর্কি সর্দারদের সামনে। নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ আলেক্সিওসের পক্ষে গেল না। বাগদাদের ক্ষমতা দখলের লড়াইতে তিনি বহিরগতই থেকে গেলেন। সেই রাজনৈতিক লড়াইতে তিনি বিন্দুমাত্রও ছাপ ফেলতে পারলেন না। তুর্কি সর্দারেরা পড়ে পাওয়া স্বাধীনতা এবং দোদুল্যমান বাইজান্টাইন প্রতিক্রিয়ায় আক্রমন শানানোর জোর পেতে শুরু করল।
১০৯৪-তে অবস্থা আরও ঘরালো হয়ে উঠল। কন্সট্যান্টিনোপলে সামাজ্যের প্রত্যেক এলাকা থেকে বিশপদের সিনোড বা সম্মেলনে আলোচনা শুরু হল কোন কোন বিশপ পূর্বদিকের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। বহু বিশপ সে সময় রাজধানীতে ছিলেন নিজেদের ইচ্ছায় নয়, তারা তুর্কিদের দৌরাত্ম্যে তাদের এলাকায় ফিরতে না পারার বাধ্যবাধকতায়। সমস্যা বুঝতে পেরে সম্রাট কর্কশভাবে বলে উঠলেন পশ্চিঞ্চলের বিশপেরা লাকায় না যাওয়ার বাহানা দিচ্ছেন, তিনি বিশপদের কন্সট্যান্টিনোপল ছাড়তে নির্দেশ দিলেন (৩৭)। আনাতোলিয়ার বিশপ মুখের ওপর জানিয়ে দিলন তিনি এই নির্দেশ মানবেন না এবং তিনি এলাকায় না গিয়ে রাজধানীতেই থাকবেন এবং রাজধানীতে থাকার জন্যে আর্থিক সাহায্য দাবি করলেন। এই সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিজ্ঞাপত্র তৈরি করা হল (৩৮)।
এশিয়া মাইনরজুড়ে বাইজান্টাইনের ব্যর্থতা সার্বিক ছিল – অভ্যন্তরের এলাকাগুলোর পতন এবং একই সঙ্গে উপকূল এলাকা হাতছাড়া হওয়ার অর্থ ছিল এন্টিওকের মত বেশ কিছু এলাকায় জলপথ বা স্থলপথ, কোনও মাধ্যমেই পৌঁছনো যেত না; এন্টিওকের প্যাট্রিয়ার্ক জন দ্য অক্সাইট এই এলাকায় বহুকাল পৌঁছতে পারেন নি (৩৯)। ১০৯০-এর শেষের দিকে একের পর এক শহরের তুর্কদের হাতে পতন ঘটতে লাগল। সিরিয় নাগরিক মিচেলের দ্বাদশ শতকে লিখত কড়চা সেই সময়ের তারসোস, মপসুয়েসা, আনাজারবোস এবং সিলিসিয়ার অন্যান্য শহরের ঘটনাবলী জানার অন্যতম উপায়। তিনি বলছেন এই শহরগুলি হাতছাড়া হয়ে যায় ১০৯৪/৯৫-এর মধ্যেই (৪০)। এই ঘটনাক্রমের সঙ্গে পূর্বে উল্লিখিত পশ্চিমি নাইট যারা কাছাকাছি সময়ে এশিয়া মাইনর অতিক্রম করেছিল, তাদের ভাবনার সঙ্গে অনেকটা মিলে যাচ্ছে। তারা যখন প্লাসটেন্সিয়া নামক ‘খুবই জাঁকজমকময় এবং সমৃদ্ধ’ শহরে পৌঁছলেন, দেখলেন শহরটা তুর্কিরা অবরোধ করলেও, অধিবাসীরা তখনও সেটা নিজেদের অধিকারে রেখেছে (৪১); পাশের কক্সন তখনও খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল (৪২)।
এশিয়া মাইনরের উপকূল আর উর্বর নদী উপত্যকাগুলি আর তার পশ্চাদভুমির নিয়ন্ত্রণ হারানো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পক্ষে বিপর্যয় ডেকে আনে। চলতি বিপর্যয়গুলির মোড় ঘোরাবার চেষ্টার এবং পুণর্দখলের কাজে মঞ্চ তৈরি করাও জরুরি হয়ে পড়ল; কর্তৃপক্ষ বুঝল তারা জোট যদি না করতে পারে তাহলে পূর্বের প্রদেশগুলোর ওপরে চিরতরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। নিকাইয়ার প্রতি নজর দেওয়া গেল – এটির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ ছিল অসামান্য এবং এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অক্ষহৃদয়ে প্রবেশের কাজ এবং রাজপথ দিয়ে উপকূল এলাকায় আসা সহজ হওয়ার কথা। পূর্বের ওপরে যে কোনও রকম সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্যে শহর দখল করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়ল; সম্রাটের রণনীতির প্রথম কাজ হল শহর দখল। (চলবে)